[ফ্রেই বেত্তোর নামটা আমি প্রথম জানতে পারি কথাসাহিত্যিক “শাহাদুজ্জামানের” সাক্ষাতকার ভিত্তিক চমত্কার বই” কথা পরম্পরা”র মাধ্যমে।ওই বইটিতে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো’র যে বিশাল , বৈচিত্র্যময় এবং অত্যন্ত আকর্ষনীয় কথোপকথন আছে, তা এই ফ্রেই বেত্তো’র সংগে।ফ্রেই বেত্তো ব্রাজিলীয় যাজক কিন্তু পুরো লাতিন আমেরিকা’য় যে প্রগতিশীল আন্দোলন, সেখানে তাঁর সংশ্লিষ্টতা উল্ল্যেখযোগ্য।অবশ্য লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে’র বিভিন্ন সংগ্রামী অধ্যায়ে সেখানকার যাজকগোষ্টীর ভূমিকা প্রশংসার দাবীদার। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত কোন এক যাজক এমন মন্তব্য-ই করেছিলেন”ঈশ্বর, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কম্যুনিষ্ট” ।
এখানে সাক্ষাতকারগ্রহিতা বেত্তো, নিজেই সাক্ষাতকার দেয়ার ভূমিকায়। সাক্ষাতকারটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ল্যাটিন আমেরিকান পারস্পেকটিভস্ ইস্যু ১৫০,ভল্যু.৩৩, সংখ্যা ৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৬ -এ। সাক্ষাত্কার গ্রহীতার নাম তারসো লুই রামোস-পেশায় রাজনৈতিক গবেষক এবং ২০০৫ সাল থেকে “ব্রাজিলের ভূমিহীন শ্রমিক” Brazil’s Landless Worker” -এর স্বেচ্ছাসেবক তথ্য সহকারী হিসেবে কাজ করছেন।
সাক্ষাত্কারটি বেশ দীর্ঘ হওয়ায় ২ অথবা ৩ পর্বে অনুবাদ করতে হয়েছে। এখানে প্রথমপর্ব প্রকাশিত হলো।]
তা.লু.রাঃ ব্রাজিলে বৈদেশিক বিশেষতঃ যুক্তরাস্ট্রের প্রভাব গত কয়েক দশকে কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন বিশেষত আপনি যখন সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে সংগ্রাম করছেন?
ফ্রে.বেঃ দক্ষিন আমেরিকায় “গনতন্ত্রের” নামে “সামরিক একনায়কত্ব” প্রতিষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র আসলেই নিজেকেই কলঙ্কিত করেছে।আজকে আমরা তার ফলাফলা দেখতে পাচ্ছি;ভোটের মাধ্যমে জনপ্রিয় সরকার নির্বাচিত হচ্ছে।অন্যভাবে বলা যায়, এই সময়ে যে ব্যাক্তি প্রগতিশীল আন্দোলনে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখছে, সে হলো জর্জ ডব্লিউ বুশ।ইতালির নির্বাচনী ফলাফলের দিকে তাকান।এই মূহুর্তে দক্ষিন আমেরিকায় শুধুমাত্র পেরু এবং কলাম্বিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব স্পষ্ট।আমরা এখন অনেক বেশি স্বাধীন, যদিও এখনো বাণিজ্যিক ভাবে অনেকটাই নির্ভরশীল(যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রধান ব্যবসায়িক অংশীদার এবং কিছুটা মতাদর্শিকভাবেও(আমাদের সংস্কৃতিতে হলিউড এবং এর সংশ্লিষ্টতা’র প্রভাব)।কিন্তু “বুশ” গোটা মহাদেশেই অনাকাংখিত এবং আমরা সবাই ইরাক আক্রমনকে প্রত্যাখান করেছি। আমি কিন্তু মনে করিনা, ব্রাজিলবাসী তাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য সমন্ধে সচেতন দৃষ্টিভংগি পোষন করে।অবশ্যই তারা তাদের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতায় গর্বিত বিশেষত ব্রাজিলের মতামত নির্মাতাদের ক্ষুদ্র অংশটি। “লুলা এডমিনিষ্ট্রেশন” আমাদের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছে;”আমেরিকাস মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল” চুক্তি কে অগ্রাহ্য করে, “মারকসুল”কে পূরুজ্জীবিত করে, শাভেজের বৈধতা’কে ডিফেণ্ড করে এবং কিউবা’কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় পূণরায় অন্তর্ভুক্ত করে।
তা.লু.রাঃ এক পর্যায়ে ব্রাজিলে ১০০,০০০-এর মতো খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ছিলো।তাদের বর্তমান অবস্থান কি?
ফ্রে.বেঃ খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সমূহ এখনো বিদ্যমান।২০০৫-এর জুলাইয়ে আমি তাদের একাদশ তম অধিবেশনে অংশ নিয়েছিলাম,সেখানে প্রায় ৩০০০ ধর্মীয় গুরুকে আহবান করা হয়েছিল।তারা রাজনৈতিক এবং জনপ্রিয় নেতৃত্বের এক ধরনের সূতিকাগার(ইনকিউবেটর)। দরিদ্র অবস্থান থেকে উঠে আসা রাজনীতিক কিন্তু তাদের কর্মীজীবন সি,বি,সি-তে [CBC-Christian base Communities] শুরু হয়নি এমনটি পাওয়া দূর্লভ। পরিবেশ মন্ত্রী মারিনা সিলভা, সাবেক ভূমি সংস্কার মন্ত্রী মিগুয়েল রোসেতো এবং এম,এস,টি-নেতা জ়োয়াও পেদ্রো স্তেদিল সবাই।লুলাই একমাত্র ব্যাতিক্রম।
সি,বি,সি গুলা সর্বদাই এক্টিভ কিন্তু খুবই সহজ একটা কারনে তারা কখনো প্রচার মাধ্যমের দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে পারেনা,কারনঃ দ্যা হোয়াইট হাউজ, দ্যা সি,আই,এ। এবং বাকি কেউই বিশ্বাস করেনা, তারা ল্যাটিন আমেরিকায় কোন কম্যুনিষ্ট হুমকি-যেমনটা ১৯৮০ দশকে সান্দানিস্তা বিপ্লব কিংবা এল সালভাদর কিংবা গুয়েতেমালা গেরিলা আন্দোলন’কে মনে করত। সিবিসি-র প্রধানতম উদ্দ্যেশ্য ধর্মীয় মুক্তি।জন পল ২ এবং তার অনুগত বিশপগোষ্টী কতৃক লাতিন আমেরিকার চার্চ-কে ভ্যাটিকানাইজেশনের ফলে সংগঠনটি শক্তিহীন হয়ে পড়ে এবং ক্যাথলিক প্রকাশনা সংস্থাগুলা তাদের প্রকাশনা হতে নিজেদের বিরত রাখে। ওপাস দেই,ফোলকোলারি, দ্যা ক্যারিশম্যাটিক এবং অন্যান্য রক্ষনশীল মুভমেন্ট এবং তাদের শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম সাফল্য পেতে থাকে- তারা বিশ্বাসিদের মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা’র ব্যাপারটি প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে।
তা.লু.রাঃ ২০০২ -এর নির্বাচনে লুলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া ব্রাজিলের বামপন্থীদের সামাজিক আন্দোলনের সাফল্য নাকি প্রেসিডেন্ট ফার্দান্দো হেনরিক কারদোসো-র নব্য উদারীকরন নীতি, দূর্নীতি, বেসরকারীকরন প্রভৃতির প্রত্যাখান?
ফ্রে.বেঃ লুলা’র নির্বাচনে পাওলো ফ্রেইরা কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। সর্বোপরি, তার নির্বাচনি সাফল্য বিগত ত্রিশ বছরের গন আন্দোলনের স্বীকৃতি।এখন লাতিন আমেরিকার অন্য অনেক দেশের দরিদ্র ভোটার’রা পরিবর্তন,প্রত্যাশা,নব্য উদারীকরন এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিকল্প খুজে পেতে চায়। আবার একই সময়ে ব্রাজিলের জনগন কার্দোসো সরকারের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছিল এবং যুক্তরাস্ট্রের প্রতি তাদের নতজানু নীতিতে বিব্রত হচ্ছিল। যেমন কার্দোসো’র পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ,এস কাস্টম অফিসে জুতা খুলে প্রবেশ করেছিলো পক্ষান্তরে লুলা সরকারের মন্ত্রী সেলসো আমোরিম কিন্তু তা করেনি।কিন্তু লুলা সরকার গণ আন্দোলনের বিকশিত হতে দেয়নি তাদের কে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রন করতে -যেটা ছিল একটা ভুল পদক্ষেপ। সে তার পুরো আস্থা কংগ্রেস-এর উপরে রেখেছিলো,যে কংগ্রেস ছিলো রক্ষনশীল এবং শতভাগ দূর্ণীতিগ্রস্থ। আমি আশাবাদী, লুলা দ্বিতীয়বারের মত নির্বাচিত হবে এবং সামাজিক আন্দোলনের প্রতি অধিকতর মনোযোগী হবে।
তা.লু.রাঃ আপনি লুলা প্রসাশন থেকে বেরিয়ে গেলেন কেন?
ফ্রে.বেঃ মূলতঃ লেখালেখি’র কাজে ফিরে আসতে এবং “পশ্চাদপসরণ মূলক অর্থনৈতিক নীতি” নিয়ে আমার ভিন্নমতের কারনে-আমার মতে এই পলিসী সামাজিক বৈষম্য কমাতে কোন অবদান রাখছে না।কিন্তু আমি মনে করি, সামাজিক এবং বৈদেশিক নীতে প্রনয়নে এই সরকারে ভূমিকা সন্তোষজনক।
তা.লু.রাঃ লুলা দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হলে সামাজিক আন্দোলনের প্রতি আস্থাশীল হবে-এরকমটি ভাবার কি কোন কারন আছে?
চলবে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


