somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ইমতিয়াজ ইমু
নিজের সম্পর্কে এখনো সঠিকভাবে জানা হয়নি। অনেক কিছু জানার বাকি। আপাতত মানুষ দেখি। মানুষ দেখে নিজেকে যাচাই করছ

লালনের দোলপুর্ণিমা উৎসব, মার্চ ২০১৭

২৪ শে মার্চ, ২০১৭ দুপুর ২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আখড়ার বাইরে মানুষের প্রচন্ড ভিড়। এলাকার মানুষ বলছে গতবারের তুলনায় এই ভিড় কিছুই না। অর্ধেক লোক হয়েছে এবার। আমি ভিড় ঠেলেই ভেতরে ঢুকলাম। পুলিশি কড়া পাহারা। একমাত্র বাংলাদেশেই মনে হয় পুলিশি কড়া নিরাপত্তায় মাদক সেবন হচ্ছে। জয়গুরু। ভিড় ঠেলে ঢুকে শেষপ্রান্তে দেখলাম এক আসরে ৫ জন বসে সিদ্ধি বানাচ্ছে। আমার হাতে ক্যামেরা। পাশে গিয়ে বললাম, “আমি কি এখানে একটু বসবো?” পাশের বুজুর্গ বলে বসলো, “বয়, কিন্তু কোন ছবি তুলতে পারবিনা।” উনি এটা বলার পরই পাশের ‘কাসেম পাগলা’ বলল, “আহা! ও তো বসতে চাইছে। বসুক। কি সমাচার শুনি। আগে থেইকাই এত কথা কও ক্যান মিয়া। বহো বাজান।” আমি বসলাম। কাসেম পাগলা বলতে থাকলো, “এখন সিদ্ধির সময়। কও কি কইতে চাও।” আমি জানতে চাইলাম লালন সম্পর্কে। উৎসুক হয়ে মজলিসের প্রধান ‘ফজলু পাগলা’ আমার দিকে তাকালো। শুরু হলো এক আশ্চর্য কথোপকথনের। বক্তার সংখ্যা ৪, শ্রোতা একা আমি। আশেপাশের মানুষ উৎসুক ভঙ্গিতে পাশে ঘুরছে। কি করছে ছেলেটা? জানলাম, শুনলাম। প্রশ্ন করলাম। উত্তর পেলাম। আধ্যাত্মিক কথা শুনলাম। সিদ্ধির গন্ধে বাতাস ভারি। আমার মাথা ধরছে, কথা শুনতেও ভালো লাগছে। এরা সহজ হচ্ছে। ফাঁক বুঝে বললাম এখন ছবি তোলা যাবে? ফজলু পাগলা বললেন, তোল। আমারে আর পায় কে!



ফজলু পাগলা

"বাপ মা নাম দিছে ফজলু। এদিক সেদিক ঘুইরা নামের শ্যাষে পাগলা লাগাইছি। থাকি সাঁইজির দরবারে। এই যে দাড়ি দেখছেন এইডা তো আগে ছিলো না। ১৬ বছর আগে পরিবাররে বলছি সাইঁজির চরণে জীবন দিমু। এই জীবন আর কতদিনের? আইজ আছি কাইল নাই। খাওয়ার মইধ্যে এই বাঁশীতে কইরা সিদ্ধি খাই। পরিবার বুঝছে। সংসার ধর্ম না মনের ধর্মই আসল। মা-বাপের দোয়া না থাকলে এই লাইনে থাকন যায় না। আমার মা-বাপের দোয়া ছিল। এহন থাকি কুষ্টিয়া। দরবারের কাছেই। গান বাজনা করি। কিন্তু এই স্টেজের গানের লগে কোন সম্পর্ক নাই। থাকেন আমগো লগে। দেখেন, বুঝেন। পরীক্ষায় শূন্য পাইবেন যদি না জীবন বুঝেন। এই দেহ বানাইছে আল্লায়, কিন্তু চলতে হইবো মন দিয়া। নিজেরে খুঁজেন।"

অনেক ধরণের মানুষ দেখলাম্। মানুষ দেখতে ভালো লাগে। কত মানুষ, কত বিচিত্র মানবজনম। কত বিচিত্র মানবচরিত্র। যাকে দেখে নি, তার জন্য পাগল। কেউ ভবের পাগল, কেউ ভাবের পাগল। অনেক ভন্ড দেখলাম। অনেক সাধু দেখলাম। গাঁজাটা আলাদা করে দিলে পুরা জিনিসটাই হতো এক ধর্মের মিলনমেলা। মানবধর্ম। আপনি আমন্ত্রিত। এক ফকিরের ছবি তোলার পর বললো, “তুই তো বিদেশী মানুষ। থাকবি কই, খাবি কি? আমার এহানে চাইল আছে, ডাইল আছে। আমার চাটিতে ঘুমাবি। থাকবি, খাবি।” আমি সাধারণত অল্পতে অভিভূত হই না। কিন্তু এই লোকের কথা শুনে অভিভুত হলাম। এই বোধহয় বিখ্যাত বাউল সম্রাটের শিক্ষা। মানবধর্ম শিক্ষা।



রঞ্জিত ফকির

আমার দেখা লালনের আখড়ায় সবচেয়ে সেরা মানুষ।

"ধর্ম, জাত, গোত্র এগুলো মানুষের কাছে মুখ্য। কিন্তু লালন বলে গেছে “জাত কারে কয়”, আমি জাত পাতে বিশ্বাসী না। হুম, এইটা মানি আল্লাহ আমারে তৈরী করছে। কিন্তু উনি কিন্তু ধর্ম দিয়ে পাঠান নাই। আখিরাতের দিন উনি ডাকবেনও না যে এই মুসলমানের দল এদিকে আয়, এই হিন্দুর দল এদিকে আয়। তার কাছে সব মানুষই সমান। সব একই ধর্ম। মানবধর্ম। লালন বলছে, “সহজ মানুষ ভজে দেখ নারে মন দিব্যজ্ঞানে”, ধর্ম বলছে মানুষের সেবা করতে। তাহলে কি দাড়ালো? সাইঁজির কথাই সত্য। মানুষের সেবা করতে হবে। এটাই ধর্ম, এটাই জাত।
আমি ১৯৬০ সাল থেকে এই আখড়ায় আসি সাইঁজির চরণে। আমি সেবাদাস। মানবধর্ম যাতে নিজে করতে পারি সে চেষ্টা করি। দোয়া করি, তুমিও যাতে মানবধর্ম করতে পারো। সাইঁজির কৃপা তোমার উপর পড়ুক।"


আমি যেখানেই গিয়েছি বসার পরপরই মোবাইলের রেকর্ডটা অন করে কথাবার্তা রেকর্ড করেছি। পরেরবার আর এই ভুল করবো না। টেপ রেকর্ডার নিয়ে যেতে হবে।

পুরো আখড়া জুড়ে মানুষ খুজে প্রকৃত সাইঁজির শিষ্য খোঁজার চেষ্টা করলাম। ভন্ডকে জিঞ্জাস করলাম ধর্ম সম্পর্কে, আর যাকে দেখে প্রকৃত সুধিজন মনে হলে তাকে জিঞ্জেস করলাম লালন সম্পর্কে। বিভিন্ন মানুষ, ভিন্ন উত্তর। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো যতো জনের সাথেই কথা বলেছি, ছবি তুলেছি কেউ টাকা চায়নি। উল্টো আতিথেয়তা করেছে। ঢাকা বা অন্য জায়গার পীর ফকির পাগলা সব কিছু্তেই পাওনা খোঁজে। এদের হয়তো ধর্মটাই এমন। ভীড়ের মধ্যে এক বাউল হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। বললো, আয় তোরে গান শুনাই। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো গেলাম। ৮-৯ জনের একটা গ্রুপ। শুরু করলো, “করিমনা কাম ছাড়ে না মদনে” দিয়ে। গান শুরু দোতারা দিয়ে। ঢোলের বাড়িতে লোক জুড়ে গেলো অনেক। এরই মাঝে বাউলের গান শুনলাম। আহ! জীবনটা অতটা খারাপ না। হোক না গাঁজার পরোক্ষ সেবনে বছর পাঁচেক আয়ু কমেছে!



ঢোল এবং ঢুলি

রাতে শুরু হলো সকল বাউলদের গান। আগে হয়তো বটতলায় হতো। এখন স্টেজ বানিয়ে সেখানে হচ্ছে। শুরু হলো “মারেক পাগলার” গান দিয়ে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো লোকটার গায়েকী শুনলাম। একে একে শাহাবুর, নজরুল, আবির, মানসী বিভিন্ন গায়কের গান শুনলাম। এরা প্রখ্যাত কেউ নয়। সাধারণ লালনগীতির ভক্ত। কি চমৎকার এদের গানের গলা। আর আমরা কি সব বালছাল দিয়ে গানের ইন্ড্রাস্ট্রি ভরিয়ে রেখেছি। হতাশা জনক। গান দেখে যখন রাত ২ টায় কুষ্টিয়া ফিরছি তখন মনের মধ্যে এক আশ্চর্য প্রশান্তি।



মারেক পাগলা সাথে আব্দুল কুদ্দুস।[/si

পুরো অ্যালবাম বা স্টোরি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০১৭ দুপুর ২:৪৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মিনি পোস্ট!

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৬

ইদানীং ব্যস্ততার কারণে সামুতে আসা হয়না। মাঝে মাঝে ঢু মারলেও লগইন করা হয়না।
আজ একটা ভাবনা মনে উদয় হওয়ায় সবার সাথে শেয়ার করতে এলাম-

জামায়াতের একজন সংসদ সদস্য সংসদে দাড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই সৈনিকটি কি রাতে ঘুমাতে পেরেছিল?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৯


সেই সৈনিকটি কি রাতে ঘুমাতে পেরেছিল?

এই বাংলাদেশের পলিমাটিতে ইতিহাস খুব ভয়ংকর।

এখানে কখনো কখনো নদী শুধু পানি বহন করে না- বহন করে রক্তের স্মৃতি।
গাছ শুধু ছায়া দেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কুরআন থেকে মাদ্রাসার ছাত্রের বিস্ময়কর বিদ্যুৎ আবিস্কার :-ls

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫২

চারিদিকে বিদ্যুতের জন্য ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার মধ্যে মাদ্রাসার এই ছাত্রটি কুরআন গবেষণা করে আমাদের জন্য ফ্রি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। বিজ্ঞান পড়েননি, পড়েছেন কুরআন-হাদিস! সেই মাদ্রাসাছাত্রই বানালেন মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে বিদ্যুতের যন্ত্র!

অবেশেষে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে----- ড্রাকুলা হাসিনা।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৭



ড্রাকুলার হাসিনা তো আর এমনি এমনি বলেনি যে, আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা মূলত ভারতকে একতরফা সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবিশ্বাস্য, অবিস্মরণীয়! বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে!!! :-ls B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯



অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত, অতুলনীয়,অবিস্মরণীয় যে বিশেষণই ব্যবহার করি না কেন বাংলাদেশের এই জয়ের মহত্ব বুঝাতে কোন শব্দ ভান্ডারই যেন যথেষ্ট নয়। আমি রীতিমত বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি বাংলাদেশের এমন পারফর্মেন্স দেখে!! বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×