somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেই সৈনিকটি কি রাতে ঘুমাতে পেরেছিল?

১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সেই সৈনিকটি কি রাতে ঘুমাতে পেরেছিল?

এই বাংলাদেশের পলিমাটিতে ইতিহাস খুব ভয়ংকর।

এখানে কখনো কখনো নদী শুধু পানি বহন করে না- বহন করে রক্তের স্মৃতি।
গাছ শুধু ছায়া দেয় না- তার পাতায় পাতায় লেগে থাকে কোনো এক রাতের আর্তনাদ।
আর কিছু সিঁড়ি… সিঁড়ি কখনো শুধু দোতলায় ওঠার পথ থাকে না; হয়ে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই রাত।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে তখন একের পর এক গুলির শব্দ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। চারদিকে আতঙ্ক, রক্ত আর মৃত্যুর গন্ধ।
সেই বিভীষিকার মধ্যে দশ বছরের শিশু শেখ রাসেল।

একটি শিশ- যার পৃথিবী তখনও খুব ছোট।
তার পৃথিবী মানে মা, বাবা, ভাই-বোন, পরিচিত কয়েকটি মুখ, আর নিরাপদ একটি ঘর।

সে তখনও বুঝতে পারেনি- তার পৃথিবীটা শেষ হয়ে গেছে।

শোনা যায়, মৃত্যুর আগে ছোট্ট রাসেল বলেছিল,
“আমি আম্মুর কাছে যাব।”
কী ভয়ংকর একটি বাক্য!
একজন শিশুর শেষ আশ্রয- তার মা।

যে সৈনিক তাকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছিল, সে কি জানত তার কোলে কোনো বন্দি নয়- একটি দশ বছরের শিশু?
সিঁড়ি দিয়ে যখন রাসেলকে ওপরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তার চোখের সামনে পড়ে ছিল তার বাবার রক্তাক্ত দেহ।
ভাবুন তো-
একটি দশ বছরের শিশু তার ছোট্ট পা দিয়ে বাবার রক্ত মাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে।
সে কি বুঝেছিল সেই রক্ত কার?
সে কি ভেবেছিল-
“বাবা এখানে কেন পড়ে আছেন?”

নাকি শিশুমন তখনও বিশ্বাস করছিল-
বাবা হয়তো উঠে দাঁড়াবেন?

তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো মায়ের কাছে।
কিন্তু সেখানেও মৃত্যু।

একটি শিশুর শেষ আকুতি ছিল-
“আমি আম্মুর কাছে যাব।”
আর সেই মায়ের কাছেই পৌঁছে তার পৃথিবীটা চিরতরে থেমে গেল।

কিন্তু আমার প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
যে সৈনিকটি সেই শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিল-
সে কে ছিল?
তার নাম কী?
সে কি বেঁচে ছিল?
তার কি নিজের সন্তান ছিল?
সেই রাতের পর সকালে সে কি বাড়ি ফিরেছিল?
সে কি তার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েছিল?

সন্তানটি যখন বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে বলেছিল- “বাবা”, তখন কি তার বুকের ভেতর একবারও কেঁপে উঠেছিল চোখে ভাসছিল গুলি করার সেই দৃশ্য?
স্ত্রী যখন জিজ্ঞেস করেছিভ-
“কী হয়েছে তোমার?”
সে কি উত্তর দিতে পেরেছিল?
সেদিন রাতে সে কি ভাত খেয়েছিল?
ঘুমিয়েছিল?
নাকি একটি দশ বছরের শিশুর চোখ তার চোখের সামনে সারাজীবন ঘুরে বেড়িয়েছে?
আমি জানি না।

আমি শুধু জানি- একজন সৈনিকের হাতে একটি শিশু ছিল।
আর সেই শিশুটির হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র।
ছিল না কোনো অপরাধ।
ছিল শুধু মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি।

ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম দৃশ্যগুলোর একটি হয়তো এটাই-
একটি শিশু তার বাবার রক্ত মাড়িয়ে মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল।
তারপরও তাকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি।

আরও ভয়ংকর হলো- ৫৪ বছর পরও সেই বাড়ির ইতিহাস থেমে থাকেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে আবারও আগুন, ভাঙচুর ও ধ্বংসের দৃশ্য দেখা গেল। ইতিহাস যেন আবারও সেই বাড়ির দেয়ালে নিজের ক্ষতচিহ্ন আঁকল।

রাজনীতি বদলায়।
ক্ষমতা বদলায়।
মানুষ বদলায়।
সময় বদলায়।

কিন্তু একটি শিশুর রক্তের স্মৃতি কি বদলায়?

একটি বাড়ি ভেঙে ফেলা যায়।
একটি সিঁড়ি পুড়িয়ে দেওয়া যায়।
একটি দেয়াল মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়।

কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নকে কি পুড়িয়ে ফেলা যায়?

আজও মনে হয়-
সেই সৈনিকটি যদি কোথাও বেঁচে থাকে, কোনো এক সন্ধ্যায় নিজের সন্তানের মাথায় হাত রাখার সময় কি তার মনে পড়ে
একদিন আমিও তো একটি শিশুকে কোলে নিয়েছিলাম। দুতালার উঠেছিলাম
সে শিশুটিও কাউকে “বাবা” বলে ডাকতে চেয়েছিল।
সে শিশুটিও তার “আম্মুর” কাছে যেতে চেয়েছিল।

পার্থক্য শুধু একটাই-
সেই শিশুটির জন্য পৃথিবী আর অপেক্ষা করেনি।
বাংলাদেশের পলিমাটিতে তাই ইতিহাস শুধু লেখা থাকে না-
কখনো কখনো ইতিহাস মিশে থাকে রক্তের সঙ্গে।

আর কিছু প্রশ্নের উত্তর কোনো আদালত, কোনো সরকার, কোনো রাজনৈতিক দল দিতে পারে না।
সেগুলোর উত্তর খুঁজতে হয় মানুষের বিবেকের কাছে।
শেখ রাসেল- একটি নাম নয়; একটি অসমাপ্ত শৈশব।
আর সেই অসমাপ্ত শৈশব আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে-
“আমি তো শুধু আম্মুর কাছে যেতে চেয়েছিলাম… আমাকে কেন মেরে ফেললে?”
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:২৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঁশি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৪



হিম শীতল মাঘ মাসের রাত। ঘন কুয়াশার কারণে পাঁচ হাত সামনেও কিছু দেখা যায় না আর খালপাড়ের বাঁশঝাড়টা তো অনেক দূরে, বাতাস নেই তারপরও বিচিত্র কারণে বাঁশপাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হুলো বেড়াল

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২৮


গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। কোথাও মানুষের কোনো সাড়া-শব্দ নেই। মাঝেমধ্যে অবশ্য ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে যাচ্ছে। শব্দে কান ঝালাপালা। এত ঝিঁঝিঁ পোকা কোথা থেকে এলো?

দুটো জঙ্গল পেরিয়ে মূল সড়কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের এই দিনে ১৯৭৫-এর শোকাবহ আগস্ট/ রক্তাক্ত দিবস॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১১



“আজ থেকে অনেকদিন পরে হয়ত কোন পিতা তার শিশুপুত্রকে বলবেন, জানো খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ঘাটতি : ভারসাম্যের লক্ষ্যে বাংলাদেশে উৎপাদন ও রপ্তানি কৌশল

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:০২


ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও নিকটতম বাণিজ্য অংশীদার। ভৌগোলিক নৈকট্য, দীর্ঘ সীমান্ত, পরিবহন সুবিধা এবং পরস্পর-নির্ভরশীল উৎপাদনব্যবস্থার কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর কারা মিষ্টি বিতরণ করেছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:১৬


যদি কোনোদিন টাইম ট্রাভেল মেশিন আবিষ্কার হয়, পঁচাত্তরের ঘটনা নিজের চোখে দেখার চেষ্টা করতাম। সে সময় কিছু মানুষ মিষ্টি বিতরণ করেছিল বলে শোনা যায় । আমি তাদের কাছ থেকে মিষ্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×