
হিম শীতল মাঘ মাসের রাত। ঘন কুয়াশার কারণে পাঁচ হাত সামনেও কিছু দেখা যায় না আর খালপাড়ের বাঁশঝাড়টা তো অনেক দূরে, বাতাস নেই তারপরও বিচিত্র কারণে বাঁশপাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে। গ্রামে সন্ধ্যার পরপর মনে হয় গহীন রাত হয়ে গিয়েছে, অথচ খুব সম্ভব রাত নয়টা সাড়ে নয়টার বেশি হবার কথা না। সময় ১৯৭৩।
মজনু মিয়া ভৈরব বাজারে পাটের আড়তে কয়ালের কাজ করেন। তাঁর বয়স আনুমানিক ত্রিশ হবে, বেশ শক্ত সামর্থ্য শক্তিশালী মানুষ। আজ কিশোরগঞ্জ হতে গয়না নৌকা করে পাট এসেছে আছরের আজানের পর পর। পাটের বোঝা মাপতে মাপতে রাত হয়ে গিয়েছে। মজনু মিয়া কিশোরগঞ্জের লোকজনের সাথে রাতে আড়তে থেকে গেলে পাড়তো, কি মনে করে যে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে - এখন নিজের কাছেই বোকামী মনে হচ্ছে। মজনু মিয়া খালপাড়ের মাটির সড়ক ধরে বাড়িতে ফিরছিলেন।
চারপাশ এত নিস্তব্ধ যে নিজের পায়ের শব্দও অস্বাভাবিক জোরে শোনা যাচ্ছিলো। হঠাৎ তীক্ষ্ণ শিস দেওয়ার মতো বাঁশির শব্দ ভেসে এলো। এই বাঁশির শব্দ মজনু মিয়ার কাছে পরিচিত। ঠিক এমন তীক্ষ্ণ বাঁশিই বাজাতো সন্ধ্যা! সন্ধ্যা কুমার পাড়ার মেয়ে। ৭১এর যুদ্ধের সময় এক রাতে রাজাকার ইদ্রিচ্যা আর রাজাকার মতলইব্যা সন্ধ্যাকে চুলের মুঠি ধরে পাকিস্তানি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিলো। সন্ধ্যা আর ফিরে আসেনি। লাশও খুঁজে পাওয়া যায় নি। আর লাশ খোঁজার মানুষও ছিলোনা। জ্যান্ত মানুষই খোঁজার মানুষ নেই আর লাশ খুঁজবে কে?
মজনু মিয়া নিজেকে বোঝালেন - হয়তো ভুল শুনছেন। তিনি দ্রুত হাঁটা শুরু করেন। আবার সেই বাঁশি। এবার আরও কাছে। মজনু মিয়া লক্ষ্য করেন ব্লাউজ ছাড়া দেহাতি শাড়ি পড়া খালপাড়ে এক তরুণী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেজা চুল। মুখটা নিচু করে রাখা। মজনু মিয়ার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেলো। মজনু মিয়ার গলায় চিৎকার দেওয়ার শক্তি নেই। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গিয়েছে। তরুণী ধীরে ধীরে মাথা তুললো। কিন্তু সেইখানে কোনো মুখ নেই। শুধু কালো গর্তের মতো শূন্যতা।
অন্ধকারের মধ্যে খুব কাছে থেকে তরুণী কণ্ঠ ভেসে এলো - মজনুরে, তুই আমাকে বাঁচাতে আসলি না কেনো?
পরিশিষ্ট: সেই রাতে মজনু মিয়া কিভাবে বাড়িতে ফিরেছেন জানা নেই। রাতেই তার শরীরে প্রবল জ্বর আসে, টানা এগারো দিন জমদূতের সাথে জীবন মৃত্যু টানাটানি করে বেঁচে উঠেন। বারোতম দিন সন্ধ্যায় মজনু মিয়াকে ধান কাটার ছেনি-দা নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখা যায়। সন্ধ্যায় বাজার হতে ফেরার পথে ইদ্রিচ্যা আর মতলইব্যার ধড় থেকে মাথা আলাদা লাশ পাওয়া যায় খালপাড়ে। মজনু মিয়াকে আর কোনোদিন কোথাও দেখা যায়নি।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



