
গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। কোথাও মানুষের কোনো সাড়া-শব্দ নেই। মাঝেমধ্যে অবশ্য ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে যাচ্ছে। শব্দে কান ঝালাপালা। এত ঝিঁঝিঁ পোকা কোথা থেকে এলো?
দুটো জঙ্গল পেরিয়ে মূল সড়কে ওঠলাম। সড়কের দু’পাশে বড়ো বড়ো গাছ। গাছের ছায়া পড়ে সড়ক আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি হেঁটে চলেছি। হঠাৎ একটা হুলো বেড়াল আমার সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াল। “হোশ” করতেই লাফিয়ে পাশ কেটে চলে গেল বেড়ালটা। আমি আবার হাঁটা ধরলাম।
হঠাৎ খটকা লাগল, বেড়ালটা লাফিয়ে চলছিল কেন? কোনো বেড়ালকে তো লাফিয়ে চলতে দেখিনি! তাছাড়া বেড়াল তো গৃহপালিত প্রাণী। এত রাতে জনশূন্য রাস্তায় কী করে?
পেছনে তাকাতেই শিরদাঁড়া বেয়ে হিমেল স্রোত বয়ে গেলো। দেখি, বেড়ালটা জ্বলজ্বল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সাহস সঞ্চার করে আবারও “হোশ” করতেই বেড়ালটা পাশের ঝোপঝাড়ে ঢুকে গেল। হঠাৎ মনে হলো, ঝোপঝাড়টা কেমন যেন কেঁপে উঠল। প্রবল বেগে বাতাস বইতে শুরু করল। ঝড় আসবে মনে হয়।
গতকাল একজন বলেছিল, এখানকার এক ঘন জঙ্গলে এক বাচ্চা ছেলেকে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। মাসখানেক পর বিশ্রি গন্ধ পেয়ে লোকজন নরকঙ্কাল খোঁজে পায়। হঠাৎ সে কথা মনে পড়ে ভয় করতে লাগল।
বাড়ির দিকে দৌড় লাগালাম যত জোরে সম্ভব। কিন্তু পথ যেন ফুরোতে চায় না। আমার পা যেন অবশ হয়ে যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পর প্রচন্ড তেষ্টা পেল। তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। জল না খেলেই নয়। কিন্তু এই অন্ধকারে জল কোথায় পাব? কোথাও তো কোনো ঘরবাড়িও নেই, জলাশয়ও নেই।
আর দৌড়াতে পারছি না। টলতে টলতে রাস্তার মাঝখানেই বসে পড়লাম। একটু না জিরোতে পারলে হাঁটা আর সম্ভব নয়।
ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। তবুও একটু জিরিয়ে নিলাম। তারপর যখন হাঁটতে শুরু করলাম, পাশের বাঁশঝাড়ে একটা কান্নার শব্দ শোনা গেল।
“কার কান্না?” কান পেতে শুনতে লাগলাম। খুব পরিচিত মনে হলো।
সাদিয়া নামে এক কিশোরী কয়েকদিন আগে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার বাড়ি বাঁশঝাড় থেকে ৫-১০ মিনিটের পথ। কান্নাটা কি তাহলে সাদিয়ার?
আবার দৌড় লাগালাম। প্রাণপণে দৌড়। চিন্তা করলাম বাড়ি না পৌঁছা পর্যন্ত আর থামব না। কিন্তু পেছন থেকে কারও ডাকে থামতেই হলো।
“কে?” ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলাম
“ভাতিজা, চিনতে পারছিস না? আমি মোশাররফ। তোর কাকা হই।”
“ও। কেমন আছেন?”
“ভালো। তুই ভালো তো?”
“হুঁ।”
“মরচী গিয়েছিলি?”
“হুঁ।”
“শিল্পীর জামাইয়ের খবর কী (শিল্পী আমার বড়ো বোনের নাম)? ফুটবল খেলতে গিয়ে নাকি পা ভেঙে ফেলেছে?”
“এখন ভালো।”
ওনার সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ির কাছাকাছি চলে এলাম। অবাক লাগল সেই তখন থেকে ওনি আমার অনেক পেছনে। অন্ধকারে মুখটাও ঠিকমতো দেখা যায় না। কেউ একজন যে আমার পেছনে হেঁটে আসছেন, এটা শুধু বোঝা যাচ্ছে।
বললাম, “কাকা, চলুন বাড়িতে যাই।”
ওনি কোনো কথা বলছেন না।
বললাম, “কথা বলছেন না কেন?”
পেছনে তাকিয়ে দেখি উনি নেই। না বলেই চলে গেলেন?
হঠাৎ মনে পড়ল মোশাররফ কাকা তো কয়েকদিন আগে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তাহলে এতক্ষণ কার সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ি পর্যন্ত এলাম?
ছবি: এআই
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


