somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জাহিদ সারওয়ার সুমন
জীবনে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় অনেক গান-গজল শুনেছি। কিন্তু কোরআন তিলাওয়াত শ্রবনের মত এই মজা, আনন্দ আমি আর কিছুতেই পাইনি। আল্লাহু আকবার!

মধ্যবিত্ত

০২ রা মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে মানুষেরা হাজারো কষ্টের ভীরে ভেজালমুক্ত কিছু ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে এক চিলতি সুখ খুঁজে নিয়ে হাসিমুখে অনায়াসে বলতে পারে, "আমি ভালো আছি।", সেইসব মানুষদের মধ্যবিত্ত বলে। মধ্যবিত্তদের প্রধান সম্পদ হচ্ছে তাদের সম্মান। তাদের আত্মসম্মানটা খুব সেনসিটিভ। মধ্যবিত্ত মানুষদের গরীভ হয়েও প্রতিনিয়ত ধনী থাকার অভিনয় করতে হয়। কারণ তারা তাদের দূর্বলতা কাউকে বুঝাতে চায়না। তারা চায়না কেউ তাদের সম্মানে আঘাত করুক। মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির মানুষগুলা খুব শক্ত হয়। কারণ তাদের একের পর এক বাঁধা পেরিয়ে বড় হতে হয়েছে। একের পর এক স্বপ্নকে অদূরেই জ্যান্ত কবর দিতে হয়েছে অভাবের সমাধিতে। তাদের চাওয়া টা সবসময় পাওয়া হয়ে উঠেনা। তাই বলে তারা থেমে থাকেনা। স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনা। এই স্বপ্নগুলোই তাদের বাঁচিয়ে রাখে। তাদের বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষরাই সব থেকে বেশী স্বপ্ন দেখে। কষ্টকর হলেও সত্য এটাই যে বেশীরভাগ স্বপ্নই অপূরণীয় থেকে যায়।
.
আমার জীবনের একটা ঘটনাই বলি। একবার আমি বাবার কাছে একটা দামী জিনিসের জন্য বায়না করলাম। মধ্যবিত্তদের জন্য এটা সত্যিই অনেক দামী। আমার বাবার প্রায় এক মাসের বেতনের সমান। কিন্তু তাও তিনি আমাকে না করেন নি। এক মিনিট স্তব্ধতার পরে হাসিমুখে বলেছিলেন, "আচ্ছা বাবা। পরের মাসে শিওর কিনে দিবো।" স্কুলে যাদের সাথে পড়তাম তাদের অধিকাংশারই ছিলো অনেক ধনী ফ্যামেলির। তাদের বাবার তুলনায় আমার বাবা ছিলেন অনেক গরীভ। তাদের হাতে যখনই নতুন কিছু দেখতাম তখনই আমি বাবার কাছে সে জিনিসটার জন্য বলতাম। আমার বাবা আমার আবদার রাখতেন। কখনো আমায় না করেন নি। কিন্তু এবারের চাওয়াটা একটু বেশীই ছিলো। তাও আমার বাবার রাজি হওয়া দেখে আমি প্রায় অবাক হই। এরমধ্যে হঠাৎ একদিন আমার দাদি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার দেখানোর পর বলা হয় অপারেশন করতে হবে। আমার বাবা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। আমি তখনও বাবার চিন্তিত মুখের মানেটা বুঝিনি। রাতে খাবার পর বাবার ঘরে উঁকি দেই। বাবা খেতে আসেন নি। তিনি আমায় দেখে তার ঘরে ডাকলেন। এই প্রথমবার আমি তার চোখে জল দেখলাম। আমি আমার বাবাকে কোনদিন কাঁদতে দেখিনি। অনেক শক্ত উনি। তবে আজ কি হল? আমায় জরিয়ে ধরলেন। আমি কিছুই বুঝতে না পেরে অবুঝ দৃষ্টিতে তার দিকে ছেয়েছিলাম। তিনি বললেন," বাবা, তোমার দাদি অসুস্থ। অপারেশন করতে অনেক টাকা লাগবে। আমার কাছে এতো টাকা নেই। তুমি জানোই তো বাবা। তোমার ওই জিনিসটা কিনে দেওয়ার জন্য আমি টাকা তুলে রেখেছিলাম। তোমার দাদির এই অবস্থা তুমিই বল কি করবো? আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনা। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই। তুমি অনেক বড় হয়েছো। তুমি তো বুঝো। তাই না? প্লিজ আমাকে মাফ করে দিও। পরের বার সত্যি কিনে দিবো। মন খারাপ করো না বাবা। " এক মুহূর্তের জন্য আমার মাথা ঘুরছিলো। আমার চোখ ঝাপ্সা হয়ে উঠে। আমি দৌড়ে আমার রূমে চলে যাই। নিজেকে বিষণ অপরাধী মনে হয়েছিলো তখন। খুব কান্না পাচ্ছিলো। আমি বাবার কাছে সেদিন ক্ষমা চেয়ে বলেছিলাম আমার কিচ্ছু লাগবেনা। ছোটকাল থেকে দেখে আসছি আমার মা অনেক দামী শাড়ি কিনেন। উনার শাড়ির খুব শখ। প্রতি ঈদে দুই-তিনটা দামী শাড়ি কিনতেন। যখন আমি একটু বড় হলাম। দেখলাম মায়ের শাড়ির বাজেটটা কমে গেলো। হাসিমুখেই তিনি আমাদের দিকে ছেয়ে তার শখটাকে ভুলে গেলেন।এখন মা খুব সস্তা শাড়ি কিনেন। তাও ঈদে বেশী হলে একটা। কোন ঈদে কিনেন ও না। বলেন ইচ্ছা নাই। শুধু আমাদের জন্য। কিন্তু কখনো আমাদের কিছু কিনে দেয়ার সময় কোন কথা বলেন না।আমাদের ইচ্ছানুযায়ী কাপড় কিনে দেন হউক সেটা আকাশচুম্বী দামের। শুধু আমাদের মুখে এক চিলতি হাসি দেখার জন্য। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা আমার ৮ বছর বয়স থেকে আমার বাবা নিজের জন্য নিজের টাকায় এক টুকরো কাপড় কিনেন নি। কেউ গিফট দিলে আর না হয় আম্মু কিনে দেন। আমি অবাক হই কীভাবে মানুষ এতোটা অদ্ভুত হয়। কোন শখ নেই, নেই কোন ইচ্ছা।
.
মধ্যবিত্ত ফ্যামেলির মায়েরা ম্যাজিক জানে। সত্যিই ভেবে দেখুন। মাসের ১০ দিনের মাথায় যখন সংসার খরচের টাকা অর্ধেক হয়ে যায়, তখন বাকি অর্ধেক টাকা দিয়ে ২০ দিন কীভাবে চালান?? এই কাজটা শুধু একজন মধ্যবিত্ত ফ্যামেলির মায়েদের ক্ষেত্রেই সম্ভব। ঘরে মানুষ চারজন। মাছ রান্না হবে চারটা। হঠাৎ ছেলে বলে উঠলো," মা, মাছটা খুব মজা হয়েছে। আরেক পিস হবে?" মা এক মিনিট ও দেরি না করে ছেলের প্লেটে মাছ তুলে দিবেন হাসিমুখে। যখন জিজ্ঞেস করা হবে, " তোমার পিসটা কই?" তখন বলবেন," আছে তো। আমার জন্য রেখে এসেছি। " আর না হয়," এই মাছ আমি খাইনা। আমার ভালো লাগেনা।" অনেক সময় এই প্রশ্নগুলো এড়াতে সবার শেষে শূন্য প্লেটে ভাতের সাথে মরিচ আর লবণ মিশিয়ে খেয়ে নেন। কই? তাদের তো কোন প্রতিবাদ থাকেনা? কোন অতৃপ্তি থাকেনা? কারণ তারা সুখ খুঁজতে শিখে নিয়েছেন। একজনের হাসি থেকে কীভাবে সুখ খুঁজে নিতে হয় তারা জেনে গেছেন। এই মায়েরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অর্ধাঙ্গিনী। এই মায়েদের জন্যই হয়তো কবি লিখেছিলেন," প্রত্যেক পুরুষের সফলতার পেছনে একজন নারী রয়েছেন"
.
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা মাঝে মাঝে বুঝতে পারেন না তারা আসলে কি? ধনী না গরীভ?কারণ,
ধনীদের মতো তাদের ঘরেও একটা টিভি থাকে, কিন্তু ১৪ ইঞ্চির।
তাদের ঘরেও ফ্রিজ থাকে, কিন্তু ছোট সাইজের।
তারাও অনেক বড় বড় বাসায় থাকে, শুধু এক বাথরুম আর বারান্দাবিহীন।
তিনবেলা তাদের মুখেও ভাত জুটে, কিন্তু মাংস না।
তারাও প্রতি ঈদে কাপড় কিনে, শুধু বাজেটটাই কম।
তাদের ও সবার হাতে মোবাইল থাকে, কিন্তু কমদামী।
দূরে কোথাও তারাও বাসে যায়, কিন্তু লোকাল।
ছুটিতে তারাও বেড়াতে যায়, কিন্তু সিংগাপুর, ব্যাংককে নয়।
.
মধ্যবিত্ত ফ্যামেলির মানুষেরা সত্যিই অদ্ভুত।
তারা ৫ তারা হোটেলেও খেতে পারে, আবার রাস্তার মোড়ের টঙ দোকানে বসে চাও খেতে পারে।
তারা যেমন স্যুট টাই পরতে পারে, তেমনি লুঙ্গিও পরতে পারে।
তারা এসির নিচেও থাকতে পারে, আবার টাকফাটা গরমে শীতল পাটিতে শুয়েও থাকতে পারে।
তারা যেমন প্রাইভেট কার চরতে পারে, তেমনি ৮:৮ এর লোকাল বাসের ভীরেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে।
তারা যেমন চিকন চালের ভাত খেতে পারে, তেমনি মোটা চালেরও ভাত খেতে পারে।
.
তারপর ও মধ্যবিত্তরা স্বপ্ন দেখে। হাজারো স্বপ্ন। রঙ বেরঙের স্বপ্ন। বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আমার মায়ের কিছু কথা বলছি যেটা দেখে আপনারা বুঝতে পারবেন, মধ্যবিত্তরা কতোটা স্বপ্ন প্রিয়।
"বাবা, তুই যখন প্রথম বেতন পাবি, তখন তোর খালা আর দাদিকে শাড়ি কিনে দিবি।"
"বাবা, তুই যখন প্রথম বেতন পাবি, তখন অনেক দামী দুটা গরু কুরবানী দিস"
"তুই বড় হলেও বড় একটা বাসা বানাবি। সেখানে বারান্দা থাকবে। দামি দামি জিনিসপত্র থাকবে। আর একটা বাগান থাকবে।"
"তুই প্রথম গাড়ি কিনলে আমাকে গাড়ি করে স্কুলে দিয়ে আসবি। সবাই দেখবে। আমি বলবো আমার ছেলে।"
"তুই ডাক্তার হলে আমার আর ঔষধ খেতে হবেনা।"
"তুই বড় হলেই আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারবো।"
"আমার খুব শখ তোর সাথে হজ্ব করবো।"
"তোর প্রথম বেতন পেলেই আমি বড় রেস্টুরেন্ট এ খাবো, তার আগে নয়।"
"এখন যেরম তোকে আমি মোবাইল কিনে দিসি, তুইও তোর ভাইকে কিনে দিবি।"
.
এরপরেও আমরা মধ্যবিত্ত। আমরা আমরাই। আমরা সুখী। আমরা ভেঙ্গে যাই। তবুও মচকাই না। আমরা কান্নাকে মুহূর্তেই হাসিতে পরিণত করতে পারি।আমরা সূর্যের নিছে দাঁড়িয়েও ভাবতে ভালোবাসি চাঁদ উঠবে। আমরা অতৈ সমুদ্রেও ভেসে থাকা ভেলা দেখতে পাই। জ্বি আমরাই মধ্যবিত্ত।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ অদৃশ্য পাতায় লেখা ছিল যে

লিখেছেন সামিয়া, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২১



আমি একটা বায়িং হাউসে চাকরি করতাম। তখন জীবনটা খুব সাধারণ ছিল। সকালবেলা অফিস, সারাদিন কাজের চাপ, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিয়ে নিয়ে তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট ও বিএনপি কি একে অপরের পরিপূরক?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩৭


গ্যাস নাই ,বিদ্যুৎ নাই। নিত্যদিনের নানা সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। এভাবে মানুষ বিএনপিকে কতদিন সহ্য করবে? মানুষ সহ্য করতে করতে যখন ধর্যের বাধ সহ্যের বাধ ভেঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ সরকারের কাছে সোলার এনার্জি বিক্রি করা কতটা লাভজনক?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭



যারা আগামী ৬ মাসের মধ্যে বাড়ির ছাদে সোলার সিস্টেম ইন্সটল করবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটির জন্যে ১০.৫০ টাকা করে দিবে। রুফটপে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট বসিয়ে লাভ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্পর্ক ও আত্মহত্যা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭



কাউকে আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে বিয়ে করা অথবা আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে অথবা ব্ল্যাকমেইল করে গুরুতর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের মাধ্যমে কাউকে বিয়েতে বাধ্য করা। - বিশ্বের যে কোনো দেশের আইনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২ লাখ কর্মীর খবর ভুয়া - তবে ২৫ টা সাদা হাতি আসছে!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০২



স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া সেপ্টেম্বর মাস থেকে ধাপে ধাপে ২ লাখ কর্মী নেবে ।

আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ কর্মী নেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×