somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এসির আরামঃ কার্বন নির্গমন ও পরিবেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা

০২ রা জুন, ২০২৬ রাত ৮:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দেশের এলিট শ্রেনীরা অনেক আগেই থেকেই এই যন্ত্রটার ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এয়ার কন্ডিশনার (এসি) এর ব্যবহার এলিট ছাড়িয়ে মধ্যবিত্তদের ঘর পর্যন্ত ঢুকতে শুরু করেছে। এটা ভালো না খারাপ, তা বিশ্লেষণ করা বা মতামত দেওয়া কোনটাই আমার কাজ না, উদ্দেশ্যও না। বাইরে যে গরম, তা সয্য করার মত মধ্যযুগীয় ধৈর্য্য তো আর আমাদের নেই। আমাদের দরকার একটু রিলাক্স। মানে আরাম!


কিন্তু এই আরামের মূল্য আমাদের এই আশেপাশের পরিবেশটা কীভাবে পরিশোধ করছে? জানেন? চলেন, একটু জেনে নিতে চেষ্টা করি আজ।


কি জানবো?

খুব সহজ একটা ‍দৃশ্যমান প্রতিফলনঃ একটি এসি সারাক্ষণ চালালে কতটুকু কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, সেই কার্বন শোষণ করতে কতগুলো গাছ প্রয়োজন হয় এবং এসি থেকে নির্গত তাপের পরিবেশগত প্রভাব কী? এই।

চলুন, শুরু করি।


এসি কি সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে?

অনেকের ধারণা, এসির আউটডোর ইউনিট থেকে যে গরম বাতাস বের হয়, তার সঙ্গে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইডও বের হয়। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। এসি কোনো জ্বালানি পোড়ায় না; এটি কেবল ঘরের ভেতরের তাপ বাইরে স্থানান্তর করে। ফলে এসির গরম বাতাসে সাধারণত অতিরিক্ত CO₂ থাকে না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে এসির সঙ্গে কার্বন নির্গমনের কোনো সম্পর্ক নেই। এসি চালাতে যে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, সেই বিদ্যুৎ যদি গ্যাস, তেল বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয় (আমাদের দেশের প্রায় পুরো বিদ্যুৎ খা), তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ CO₂ বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়। তাই এসির পরিবেশগত প্রভাব মূলত তার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।


একটি ১ টন এসির কার্বন পদচিহ্ন

ধরা যাক, একটি ১ টন এসি ২৩° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা সারা বছর চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার গড় নির্গমন হার বিবেচনায় এ ধরনের একটি এসি বছরে আনুমানিক ৪.৮ থেকে ৫ টন CO₂ মানে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন করতে পারে। যার পুরোটাই আমাদের পরিবেশের ভল্টে যোগ হয় আরকি B-)) !

এর সাথে যদি এসি তৈরির সময় ব্যবহৃত কাঁচামাল, উৎপাদন ও পরিবহনের কার্বন ব্যয় যোগ করি তাহলে মোট পরিবেশগত প্রভাব আরও বাড়ে অনেক!


এই কার্বন শোষণের জন্য কত গাছ প্রয়োজন?

এখন আপনি খুব ভালো মানুষ হইয়া যদি চান এই কার্বন ডাই অক্সাইডের দায় আপনি রাখবেন না। পরিশোধ কইরা দেবেন। তাহলে কিন্তু সুন্দর একটা উপায় আছে! গাছ লাগান :) :) !!

গবেষণায় দেখা যায়, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে গড়ে প্রায় ২২ কেজি CO₂ শোষণ করতে পারে। সেই হিসাবে একটি ১ টন এসির বার্ষিক কার্বন পদচিহ্ন সমন্বয় করতে প্রায় ২২০ থেকে ২৩০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যভাবে বললে, একটি এসির কারণে বছরে যে পরিমাণ CO₂ বায়ুমণ্ডলে যোগ হয়, তা শোষণ করতে একটি ছোটখাটো বনভূমির সমপরিমাণ গাছের প্রয়োজন হতে পারে।

গাছ কত অক্সিজেন উৎপাদন করে?

গাছ শুধু কার্বন শোষণই করে না; একই সঙ্গে প্রকাশ-সংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেনও উৎপাদন করে। উপরের হিসাব অনুযায়ী, এসির কারণে সৃষ্ট প্রায় ৫ টন CO₂ শোষণের প্রক্রিয়ায় গাছগুলো বছরে প্রায় ৩.৫ টন অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে দিতে পারে।

অর্থাৎ, গাছ পরিবেশের জন্য দ্বৈত উপকার করে—একদিকে কার্বন কমায়, অন্যদিকে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে।


তাহলে এসির গরম বাতাসের সমস্যা কোথায়?

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যদিও এসির গরম বাতাসে CO₂ থাকে না, তবুও সেই বাতাস পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ নিরীহ নয়। এসি ঘরের ভেতরের তাপ বাইরে নিক্ষেপ করে এবং ব্যবহৃত বিদ্যুতের শক্তিও শেষ পর্যন্ত তাপে পরিণত হয়। ফলে আশপাশের পরিবেশে অতিরিক্ত তাপ যুক্ত হয়।

যখন একটি এলাকায় হাজার হাজার এসি একসঙ্গে চলে, তখন শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি হয়ে যায়। পরিবেশবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে **Urban Heat Island Effect** বলা হয়।



গাছ কি এই অতিরিক্ত তাপের সমাধান হতে পারে?

আংশিকভাবে হ্যাঁ। গাছ সরাসরি এসি থেকে বের হওয়া তাপকে বাতাস থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে না, কিন্তু তারা পরিবেশকে শীতল করতে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। গাছের ছায়া ভবন, রাস্তা ও মাটির তাপমাত্রা কমায়। পাশাপাশি পাতার মাধ্যমে পানি বাষ্পীভবনের ফলে আশপাশের বায়ু ঠান্ডা হয়।

ফলে একটি সবুজ নগরী একই পরিমাণ এসি ব্যবহার করেও তুলনামূলকভাবে কম উষ্ণ হতে পারে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক শহরে বৃক্ষরোপণকে শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বরং নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে দেখা হয়।



এসি ব্যবহারকারীর সামাজিক দায়বদ্ধতা কী হতে পারে?

এসি ব্যবহার আজ অনেক ক্ষেত্রে বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। তবে এর পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় প্রত্যেক ব্যবহারকারীর কিছু সামাজিক দায়িত্বও রয়েছে। যেমন—

* নিয়মিত বৃক্ষরোপণ ও গাছের পরিচর্যা করা।
* বাড়ি ও ভবনের আশপাশে সবুজায়ন বৃদ্ধি করা।
* ছাদবাগান ও সবুজ ছাদ (Green Roof) তৈরি করা।
* শক্তি-সাশ্রয়ী ইনভার্টার এসি ব্যবহার করা।
* অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত কম তাপমাত্রায় এসি না চালানো।
* সম্ভব হলে নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো।

যদি প্রতিটি এসি ব্যবহারকারী অন্তত কয়েকটি গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নেন, তাহলে সামগ্রিকভাবে নগর পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০২৬ রাত ৯:৩১
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেষ ঠিকানা সাড়ে তিন হাত মাটির খরচ সাড়ে ৪ কোটি!

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৩

শেষ ঠিকানা সাড়ে তিন হাত মাটির খরচ সাড়ে ৪ কোটি!




কবরের জমিতে বিলাসিতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম চিত্র

মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন: আরও একটি প্রশ্ন

লিখেছেন মুনতাসির, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫০

প্রথম আলোতে মুনির হাসানের ‘পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন’ লেখাটি পড়লাম। পাকিস্তানে Google-এর নিজস্ব অফিস চালু হওয়াকে সামনে রেখে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একসময় খুব বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮




ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×