somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গজল আর শের নিয়ে দু'চার কথা

২২ শে জুন, ২০২৩ সকাল ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গজল

গজল উর্দু কবিতার ধ্রুপদী ধারার কবিতা। গজলের সূচনা আরবি কবিতায় সপ্তম শতাব্দীতে। ক্বাসিদার কিছুটা সংক্ষিপ্ত রূপ গজল। গজল অর্থ ‘প্রেমাস্পদের সাথে কথপোকথন’। উর্দুতে গজল এসেছে প্রতিবেশী ফারসী সাহিত্য থেকে। তবে উর্দু গজল খুব দ্রুতই ফারসী গজল থেকে কিঞ্চিৎ ভিন্ন পথে চলে স্বতন্ত্র চেহারা লাভ করেছে। বিশিষ্ট গজল অনুবাদক জাভেদ হুসেন বলেছেন, 'গজলের জন্ম আরবে। এর সমৃদ্ধি পারস্যে। আর সবচেয়ে সফল সে ভারতবর্ষে'। দ্বাদশ শতাব্দীতে দিল্লী সালতানাতের প্রতিষ্ঠা এবং মরমী সুফীবাদের প্রভাবে এ উপমহাদেশে গজলের প্রচলন হয়। এর আগে পারস্যের সাহিত্যে গজলের পরিপুষ্টি ঘটে। এরপর উর্দু, তুর্কি ভাষায় এবং নজরুলের হাত দিয়ে বাংলা ভাষায় গজল প্রচলিত হয়।

গজল কতিপয় শের-এর সমাহার। প্রতিটি শের গঠিত হয় দু’টি পংক্তি বা ’’মিস্রা’’ মিলে। প্রথম পংক্তির নাম ’’মিস্রা-ই-উলা’’ আর দ্বিতীয় পংক্তির নাম ’’মিস্রা-ই-সানি’’। প্রতিটি শের একটি অভিন্ন ভাবের দ্যোতক। শের-এর বহুবচন ’’আশার’’। কিন্তু একই গজলের শেরগুলোর মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্কের কোন বালাই নেই। একদম স্বাধীন, পারষ্পরিক সম্পর্কহীন অনেক শের মিলেমিশে খাসা একখানা গজল হয়ে ওঠে। গরমিলই যেন সেখানে সবচেয়ে বড়ো মিলের ভিত্তি। এ রকম ৫ থেকে ২৫টি শের মিলে হয় একটি গজল। গজল রচনায় পাঁচটি নিয়ম অনুসরণ করা হয়। প্রথমতঃ গজলের সূচনা শেরকে বলে ‘মাত্লা’। মাত্লায় গজলের মূল ‘টোন’ বা সুরটি ফুটিয়ে তোলা হয়। মাত্লার গঠনের সাথে অবশিষ্ট সব শের-এর গঠনগত ও ছন্দ-সঙ্গতি থাকতে হয়। দ্বিতীয়তঃ মাত্লার উভয় লাইনের রাদীফ বা ধুয়া পরবর্তী সকল শের-এর দ্বিতীয় লাইনের রাদীফ একই হতে হবে। তৃতীয়তঃ রাদীফের আগের শব্দাবলী বা বাগধারার যে ‘কাফিয়া’ বা মিলের ধরন তা পরবর্তী সকল শের-এ বজায় রাখতে হয়। চতুর্থতঃ গজলের শেষ শের-কে বলে ‘মাক্তা’। মাক্তায় সাধারণতঃ কবির তাখাল্লুস বা কবিনাম/ছদ্মনাম (যেমন, গালিব লিখতেন-আসাদ) ব্যবহার করে সমাপনী শেরকে নতুন ব্যঞ্জনায় ঋদ্ধ করা হয়। পঞ্চমতঃ সকল শের-এ বিষয়-বৈচিত্র্য বা স্বাতন্ত্র্য থাকলেও একই ছন্দ ও সমান মাত্রা ব্যবহার করতে হয়। একে বলা হয় বাহ’র বা বেহের। উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের সব রথী মহারথীই গজল লেখক হিসাবেও খ্যাতিমান। বিখ্যাত গজল রচয়িতাদের মধ্যে রয়েছেন পারস্যের মাওলানা রুমী, হাফিজ সিরাজী, শেখ সাদী (রঃ), উর্দুতে মীর্জা গালিব, মীর তকী মীর, আল্লামা ইকবাল আর বাংলায় কাজী নজরুল ইসলাম। এখানে নজরুলের একটি বিখ্যাত গজল শেয়ার করলাম, যাতে নজরুল গজল রচনার সব সূত্র অনুসণ করেছেন-

আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফঁস্ গয়ি
বিনোদ বেণীর জরীন ফিতায় আন্ধা ইশক্ মেরা কস্ গয়ি
তোমার কেশের গন্ধে কখন
লুকায়ে আসিলো লোভী আমার মন
বেহুঁশ হো কর্ গির্ পড়ি হাথ মে বাজু বন্দ মে বস্ গয়ি
আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফঁস্ গয়ি
কানের দুলে প্রাণ রাখিলে বিঁধিয়া আঁখ্ ফিরা দিয়া চোরী কর্ নিন্দিয়া
দেহের দেউড়িতে বেড়াতে আসিয়া অর নেহিঁ উয়ো ওয়াপস্ গয়ি
আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফঁস্ গয়ি

শের

শের মূলতঃ গজলের অংশ। কিন্তু স্বতন্ত্র কবিতা হিসাবে শের রচনার প্রচলনও আছে। উর্দুতে এসব স্বতন্ত্র শেরকে বলে ফর্দ্। প্রতিটি শের দুটি মিসরা বা লাইনের সমন্বয়ে রচিত হয় (মিসরা-ই-উলা আর মিসরা-ই-সানি)। শের-এ অন্ত্যমিল থাকতে পারে আবার অন্ত্যমিল না-ও থাকতে পারে। গালিব অন্ত্যমিল ছাড়া শের রচনা করেছেন। শের বাংলা কবিতার আসরেও প্রায় শত বছর ধরে সমাদর পাওয়া অতিথি। বহু উমদা শের নানা গুণীর রত্নভাণ্ডার থেকে বাংলায় অনূদিত হয়েছে। আবার অনেক গুণী বাংলা ভাষাতেই শের এর আঙ্গিকে কবিতা লিখেছেন। কবি রফিক আজাদতো শেরভর্তি আস্ত একটি বই লিখেছেন, নাম 'দিওয়ান-ই-রফিক'। শের প্রাচ্য সাহিত্যের এক অসাধারণ কীর্তি। আবেগ, ভালোবাসা, দার্শনিকতা আর মিস্টিক চেতনা শেরকে ঋদ্ধ করেছে। বাকচাতুর্য আর রহস্যময়তাও শেরকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

শের-এর চলনের সাথে বাংলা অক্ষরবৃত্ত ছন্দের চলনের মিলই বেশী। আমার বিবেচনায় বাংলায় শের-চর্চার জন্য অক্ষরবৃত্তই সবচেয়ে মোক্ষম ছন্দ। তবে শের চর্চার সময় মাত্রাবৃত্ত আর স্বরবৃত্ত ছন্দকেও শের-এর বাহন করে তোলা হয়েছে। এটা কবিপ্রতিভার ঐশ্বর্যের ওপর নির্ভরশীল। শের অন্ত্যমিল ছাড়া লেখা হয় আবার অন্ত্যমিল রেখেও লেখা হয়। অন্ত্যমিলসহ আর অন্ত্যমিল ছাড়া দু'টি শে পেশ করছি-

খসরু দরিয়া প্রেম কা উল্টি ওয়া কি ধার
যো উতরা সো ডুব গ্যায়া জো ডুবা সো পার - আমির খসরু
খসরু প্রেমের নদীর ধারাই উল্টো রকম
যে পার হলো সে ডুবে গেলো যে ডুবলো সে-ই পার হলো

সর্দ মেহরি পর জাফর তুম ইশক কি মাত যাইও
রাখতা ইস সরদি মে আতিশ কা শারারা ইশক হ্যায় - বাহাদুর শাহ জাফর
প্রেমের নির্দয়তায় তুমি ধোঁকা খেও না জাফর
এই শীতলতার আড়ালে ফুলকি রাখে প্রেম

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুন, ২০২৩ সকাল ১১:৩৮
১০টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"কর্পোরেট_ফ্যাক্টসমুহ"

লিখেছেন মামুন রেজওয়ান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"কর্পোরেট_ফ্যাক্ট_২১"



সব সময় ইন্টার্ভিউ দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমরা জানতে পারি অনলাইনে। কিন্তু যারা ইন্টার্ভিউ নেন বিভিন্ন পজিশনের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা জানা হয়না আমাদের। তাই আমরাও যারা মোটামুটি এক্সপেরিয়েন্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা: (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয়, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০০

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×