somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

“এরি নাম ভালোবাসা”

০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৫:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ট্রেনের টিকিট কেটে, সেই দিন স্টেশনে যেয়ে বসেছিলাম অজনা কোনো গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। ট্রেন ছাড়তে দেড় ঘণ্টা বাকি আছে। ঢাকার জ্যামের কথা মাথায় রেখে আগেভাগেই স্টেশনে পৌছেছি।আমি বসে আছি টারমিনালে, বসে বসে দেখছি কত হরেক রকমের মানুষ। দুনিয়ার হরেক মানুষগুলো দেখা যায় কিছু বিশেষ বিশেষ স্থানে। যেমন- বাস টারমিনালে, লঞ্চ টারমিনালে, ট্রেন স্টেশনে। এইসব স্থানে আসলে বুঝা যায় পৃথিবীতে কত রকমের যে মানুষ বাস করে তার কোন ইয়াত্তা নেই। আমিও দেখছি সেই হরেক রকমের মানুষজন। কারণ আমার হাতে অনেক সময় আছে। আজ আর আমার কোন ব্যস্ততা নেই, কোন কাজ নেই আর পড়ালেখাও নেই এখন। তাই মানুষ দেখেই এই দেড় ঘণ্টা পার করতে চাই। টারমিনালের মানুষগুলো আছে যে যার মতো। কেউ হাটছে, কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ বসে আছে, কেউ টিকিট কাটা নিয়ে ব্যস্ত আছে, আছে টোকাই, কুলি-মজুর, হকার ইত্যাদি ইত্যাদি।

আজকের ভ্রমণটা আমার কাছে একেবারে অন্যরকম। পরিক্ষা শেষ করে একাই বেরিয়ে পড়েছি কিছু অজানা তথ্যের খোজে। আমার আজকের যাত্রা চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায়। বসে আছি একটি লোহার বেঞ্চের উপর। হাতে একটি হাত ব্যাগ আর একটি ক্যামেরা ছাড়া আর কিছুই নেই। নিজের ভিতর কোন চিন্তাও নেই, যাচ্ছি তো যাচ্ছিই কিসের আবার উটকো চিন্তা। বসার কিছুক্ষণ পর চোখের নজরটুকো সামান্য বাম দিকে গেলো। আমার থেকে পাঁচ ছয় কদম দূর হবে। সেখানে একটি লোহার বেঞ্চের উপর একজন মধ্যবয়সি ভদ্র মহিলা বসে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে আমার মায়ের বয়সিই হবে। উনার দিকে তাকিয়ে আমি একটু অবাক হলাম। কেসটা কি? উনি ওভাবে ওখানে বসে খালি বেঞ্চটাকে হাত বুলিয়ে আদর করছে আর কাদছে কেনো? উনি এমন ভাবে কাদছেন যেনো সেখানে কেউ বসে আছে, কিন্তু ওখানে শূন্য, কেউ নেই!!! ভাবলাম পাগল টাগল নয়তো? কিন্তু দেখতে তো একেবারে ভালো মানুষের মতোই দেখাচ্ছে।

দু’তিন মিনিট পর আমি হাটতে হাটতে তার কাছে যেয়ে দাড়ালাম। তখনও সে কাঁদছে আর বেঞ্চটাকে হাত বুলিয়ে আদর করছে। ভাবলাম হয়তো সে কোন প্রিয়জনকে হারিয়েছে এখান থেকে। হতে পারে তার কোন সন্তান। আমি কিছু না ভেবে এদিক ওদিক একটু তাকিয়ে বললাম, আন্টি কাঁদছেন কেনো? কি হয়েছে আপনার? কিন্তু তার কোন সাড়া নেই! আলতো করে তার মাথায় আমি হাত বুলিয়ে দিলাম। তারপরও তার সাড়া নেই। শুধু ছোট্ট করে বলল “তুমি এসেছো”? আমি অবাক, এদিক ওদিক তাকালাম আশে পাশে কাউকে দেখলাম না, তাহলে কাকে বলল!

আন্টি আমাকে বললেন? উনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে আমার দিকে একনজর তাকিয়ে বললেন, না মা তোমাকে না! তার মধুর মা ডাক শুনে আমার বুকের মধ্যে কেপে উঠলো। তার মায়ায় পড়ে গেলাম। আমার মা মাঝে মাঝে আমাকে মা বলে ডাকে, তখন মনে হয় মা আমার পৃথিবী। আমি তার মিষ্টি ডাকের সাড়া পেয়ে তার পাশে যেয়ে বসে পড়লাম। কিন্তু সাথে সাথে আমাকে উনি উঠিয়ে দিলেন, আর বললেন কিছু মনে করো না মা, এখানে আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ এই সিটটিতে বসো না। আমি কিছু না মনে করেই তার ডান পাশে যেয়ে বসলাম। উনি আবারও কাদছেন বাম দিকেই ফিরে। বেচারা আমি বসে রইলাম। এই ভাবে একা বসে থাকার মানে হয়না! ধ্যৎ উনার কান্নাও ভালো লাগছে না। আবারও তার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম।

এই আন্টি আপনি কাঁদছেন কেনো? আপনার কেউ হারিয়ে গেছে?
উনি আমার দিকে তাকালেন, কি মায়া ভরা লাল চোখ, মায়া ভরা মুখ, মলিন চেহেরা। আমি তার তাকানোটা দেখে খুশিতে হেসে দিলাম। তুমি আমাকে কিছু বলছো মা? হ্যা আন্টি আপনি কাঁদছেন কেনো? উনি একটু মুচকি হাসিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি তো ছোট মানুষ ও তুমি বুজবে না। আমাকে কথাটি শুনিয়ে আবারও ঐ দিকে ফিরে কাঁদছেন আর কিছু একটা বিলাপ করছেন। এবার উনার প্রতি আমি খুবই বিরক্ত হয়ে গেলাম, ইচ্ছে হলো কিছু বলে দেই। যাক বাবা, আমি এতোই ছোট, উনি আমাকে ছোট বলল! আমি কি কিছু বুঝি না! আমি কি বাচ্চা নাকি যে উনি কিছু বললে আমি সেটা বুজবো না। রাগ করে আমি আমার আগের স্থানে চলে গেলাম।

ট্রেন ছাড়ার আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। অচেনা ঐ আন্টির দিকে আমি কয়েকবারই তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু উনাকে আমি ঐ একই রকম করে বসে থাকতে দেখি। একবার আমার দিকে তাকাবে তো দূরের কথা অন্যদের দিকে ফিরেও তাকায় না! হায়রে মানুষ। শেষবার ট্রেনে উঠার সময় যখন তাকালাম তখন আর উনাকে দেখতে পেলাম না। মনের অজানা মায়া নিয়ে উঠে পড়লাম ট্রেনে।


জানা ছিলো না সেই আন্টি আমার পাশের সিটেই বসবেন। এবং আমার সিটখানা দখল করে নিবেন। আমার কিছুটা ভালো লাগলো আবার রাগও হলো- রাগ করার কারণ উনি আমার সিটে জানালার পাশে বসছেন ঐ সিটটিই আমার। জানালার পাশে না বসলে আমার মোটেও ভালো লাগে না। উনি কি সুন্দর যৌবন বয়সের ছেলে-মেয়েদের মতো রোমান্টিক হচ্ছেন জানালার হাওয়া খেয়ে। রাগ করে বসে পরলাম তার পাশেই। আরে কি আর্শ্চয্য উনি ফিরেও দেখলেন না, তার পাশে কে বসলো। মনে মনে বিরক্ত হয়ে, বিরবির করতে লাগলাম আমি। রোমান্টিক হচ্ছে না বুড়ো হচ্ছে কে জানে?

হয়তো আমরা সব ছেলেমেয়েরা সব সময় বাবা-মা বা তাদের মতো বয়সি মানুষদের এরকম দেখল, পজেটিভ না ভেবে নেগেটিভটাই ভাবি। আমাদের জানা থাকে না যে তাদের ও একটি সুন্দর জীবন ছিলো, একটা সুন্দর মন ছিলো, তারাও একটা জীবন পার করে এসেছে। তাদের উনিশ থেকে বিশ খসলেই আমরা ছেলেমেয়েরা অপবাদ দেই বুড়ো বয়সে কি ঢং, এটা ওটা আরো কত কি।

ট্রেন কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিলো। কিছু দূর যাওয়ার পর ভদ্র মহিলা আমাকে বলল- কি রে রাগ করেছিস আমি একেবারেই ঘাবড়ে গেলাম, কি উত্তর দিবো, না না আন্টি আমি রাগ করিনি। করছিস, মায়ের চোখ কি ফাকি দেওয়া যায় রে মেয়ে! আমি তো তোর মায়ের মতোই তাই না?। হুম আন্টি মায়ের মতোই। আমি জানিরে মেয়ে, তুই সেই প্রথম থেকেই আমার উপর বিরক্ত হয়ে আছিস। কারণ তোর সাথে আমি কথা বলিনি, এই যে তোর সিটে এসে আমি বসে পড়লাম। নে তো মেয়ে এবার তুই তোর সিটে বস আমি আমার সিটে বসি। এই বলে তিনি উঠে গেলেন, আমি কিছু বলার আগেই উনি বললেন- জানিস জানালার পাশে বসাটা যে কি আনন্দের তা তোকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না। হয়তো তুইও সেটা অনুভব করিস। জানিস তো পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষই আলাদা আলাদা হয়। একেকটা মানুষের অনুভূতি একেক রকমের, একেকটা মানুষের মন একেক রকমের, একেকটা মানুষের ভালোলাগা ভালোবাসা একেক রকমের হয়।

উনার কথাগুলো আমাকে খুবই হতাশ করলো।, উনি খুব অদ্ভুত মানুষ, খুব অদ্ভুত আচারণ করেন। কি আছে উনার মনে? মনে খুব প্রশ্ন জাগে উনার ভিতর কি কোনো কষ্টের স্মৃতি লুকিয়ে আছে। তাকে প্রশ্ন করতেও সাহস পাচ্ছি না। বারবার উনার মুখের দিকে তাকাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর উনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, কিরে মেয়ে কিছু ভাবছিস, আমাকে কিছু বলবি? আমি জানি তুই কিছু বলবি। আমি হাসি দিয়ে উনার দিকে তাকালাম, দেখলাম লাল টকটকে ফোলা দুটো চোখ, এখনো চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে। হ্যা আন্টি আমি জানতে চেয়েছিলাম আপনি কেনো এই ভাবে কাঁদছিলেন?

একটি দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলেন-
সয়মটা ছিলো ১৯৮২ সাল আমার বয়স যখন ঠিক তোমার মতো। দেখতে তোমার থেকে আরো সুন্দরী। সেই সময় আমার জীবনে ঝড় হয়ে আসে একজন। তখনকার সময় প্রেম করা তো দূরের কথা, কোন ছেলেমেয়েরা একসাথে হয়ে কথা বলতে সাহস পায়নি। কিন্তু সবার নজর ফাকি দিয়ে আমিও প্রেমে পরেছি একজনের। ওর নাম ছিলো রাসেল। আমার বড় আপার বিয়েতে রাসেল বরযাত্রী হয়ে আসে। সে ছিলো আপার বরের মামাতো ভাই। সুন্দর, সুঠাম, সুদর্শন একজন যুবক ছিলো রাসেল। যে কোনো মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যেতো। জানিস, আমিও পড়েছিলাম ওর প্রেমে। কিন্তু ভালোবাসার কথাটি তখন ওকে বলতে সাহস পাইনি। মেয়েরা কখনোই আগে কোন ছেলেদের ভালোবাসার কথাটি বলতে পারে না, তাই আমিও পারিনি।

বড় আপাকে নিয়ে সেই দিন বরযাত্রীরা চলে যাচ্ছে। আমি এক অজানা অনুভূতি নিয়ে দাড়িয়ে তাকিয়ে ছিলাম ওদের যাওয়ার পথে। বিশ্বাস করো, সেই দিন কেনো জানি বড় আপার জন্য কষ্ট লাগেনি। কষ্টটা লেগেছে রাসেলের জন্য। কেনো জানি ওর জন্য মনটা খুব কেঁদেছিলো।

এরপর প্রায় ছয় মাস পর বড় আপার সাথে রাসেল আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে। বেড়ানোর দু’দিন পর রাসেল চলে যাচ্ছে। সেই সময় রাসেল আমাকে একটি চিরকুট হাতে ধরিয়ে দেয়। চিরকুটটি হাতে পেয়ে আমি কি খুশি হয়েছিলাম সেই দিন, যা বলে তোমাকে বুঝাতে পারবো না। একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো আর তিন টাকা দামের একটা সামান্য কলমের কালিতে লেখা ভালোবাসার ক’টা অক্ষর। তাতে যে কতটা সুখ ছিলো তা এখনকার যুগের ছেলেমেয়েদেরকে স্বর্ণে মোড়ানো ঘর বেধে দিলোও সেই সুখ পাবে না। চিরকুটটি আমি উড়নার কোণে বেধে রেখেছি কিন্তু পড়তে পারিনি। কারণ আমাদের পরিবারে অনেক সদস্য ছিলো, আমরা ছিলাম যৌথ পরিবার। আমার দাদা-দাদি, চাচা-চাচী, সকলের ছেলেমেয়ে, প্রায় দশ পনেরো জন একসাথে ছিলাম। বড়দের খুব শাসনে ছিলাম।




তারপর কি হলো আন্টি?
তারপর...., তারপর রাসেলের চিরকুটটি পড়ার জন্য অনেক চেষ্টা করলাম, অনেক বার খোলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি তখন, কারণ ছোট ছোট ভাইবোনদের নিয়ে একসাথে পড়তে বসা একসাথে ঘুমানো। এই ভাবে দু’তিনদিন কেটে গেলো, চিরকুট পড়া আর হয় না। এরপর দু’তিনদিন পর চিরকুট নিয়ে স্কুলে চলে যাই। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। এটা ভেবে যে, আর কোথাও না পড়তে পারলে স্কুলে বাথরুমে যেয়ে পড়তে পারবো। চার লাইনের লেখা একটি চিরকুট- মনের মাধুরী মিলেয়ে ও আমাকে চিরকুটটি লিখেছে। ঐ সময়ের ভালোবাসার প্রতিটা শব্দের মূল্য যে কি ছিলো, তা এই যুগের কেউে বুঝবে না।

তারপর কি হলো আন্টি?
তারপর, প্রায় দু’তিন মাস পর আমিও একটি চিঠি লিখি। জানো সেই চিঠি লিখতে আমার কতদিন সময় লেগেছে? প্রায় এক মাস, দশ লাইনের একটি চিঠি লিখি। আমার মনের কথাগুলো ওকে লিখে পাঠাই। সেই চিঠি লিখতে আমাকে অনেক ঝড় পোহাতে হয়েছে।

কেনো আন্টি?
কিভাবে লিখবো বলো- সেই সময় তো আর এক রুমে থাকতে পারতাম না বা একা টেবিলে বসে পড়ালেখাও করার সুযোগ ছিলো না। যখন বসতাম তখন সব ছোট ভাই-বোনদের নিয়েই বসতে হতো, সবাইকে নিয়ে একরুমে ঘুমাতে হতো। জানো একটা মিনিটের জন্য একা একটা রুমে বসতে পারতাম না। ওতোগুলো মানুষের সামনে একা সময় কাটানোই ছিলো অসম্ভব। তারপর বুদ্ধি করলাম, স্কুলে যেয়ে লিখবো টিফিনের সময়। সেটাই করেছিলাম, তারপরও বিপদ ছিলো সেসময় বন্ধু তো ছিলোই না। বন্ধবীরা ছিলো একেবারে ঝামেলার কেউ কারো কিছু সহ্য করতো না। আর এই সব তো দূরের কথা। প্রতিদিন টিফিনের সময় একটা করে লাইন লিখতাম, তাও কত কষ্ট করে। মনে সবসময় ভয় কাজ করতো কোন বান্ধবীরা দেখে ফেলে কিনা। দেখলে আবার কি না কি হয়ে যায়। এই রকম করে আমি টানা দশ দিনে দশ লাইনের একটি চিঠি শেষ করি। আর বাকি বিশ দিন সময় লেগেছে আমার চিঠিটি পাঠাতে।

এই যুগের ছেলেমেয়েদের প্রেম-ভালোবাসা কতটা সহজ, দুই মিনিটেই ভালোবাসার শব্দটি বলে দিতে পারে তাদের কোন সমস্যা পোহাতে হয় না। জানো চিঠিটি পাঠাতেও আমাকে অনেক ঝামেলা সইতে হয়েছে। কি করে পাঠাবো, এই চিঠি কার কাছে দিবো। পোস্ট অফিসের কারো কাছে দিতে ভয় ছিলো, যদি কেউ দেখে ফেলে তারপর যদি বাড়িতে জানিয়ে দেয়। একদিন আমিই ঠিক করলাম আমি নিজেই যাবো পোস্ট অফিসে। একটি চিঠির খাম কিনে একদিন টিফিনের সময় চলে যাই পোস্ট অফিসে, জমা দিয়ে চলে আসি। তারপর একটু সস্থি পাই।

এমনি করে প্রায় এক বছর কেটে গেলো। রাসেল প্রতিমাসেই আমাকে একটি করে চিঠি পাঠাতো আমিও মাঝে মাঝে পাঠাতাম। আমরা দুজন মনের মাধুরি দিয়ে অনেক কথা বলতাম চিঠিতে। সেটা যে কতটা আবেগ, কতটা ভালোবাসার, কতটা আনন্দের ছিলো তোমরা হয়তো সেটা বুঝবে না।

এইভাবেই কেটে গেলো অনেকদিন। আমারও এসএসসি পরিক্ষা শেষ হয়ে গেছে। পরিবার থেকে লুকোচুরির মতো আমার বিয়ের কথাও চলছে। হঠাৎ একদিন সেটাও ঠিক করে ফেললো তারা। আমি রাসেলকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম। রাসেল একদিন পাগলের মতো ছুটে আসে আমাদের বাড়িতে। পরিবারের সবাই তো অবাক। রাসেল সরাসরি সবাইকে বলে দিলো-‘আয়েশাকে আমি ভালোবাসি, ওকে আমি বিয়ে করবো’। কিন্তু পরিবারের কেউ রাজি হলো না। সবাই এক বাক্যে না করে দিলো। পরিবারের সবাই এখন আরো বেশি বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগলো। এদিকে হঠাৎ একদিন রাসেল চিঠি দিলো। আমি যেনো বাড়ি থেকে পালিয়ে আসি।

জানো সেই দিন আমি এই কমলাপুর স্টেশনেই চলে এসেছিলাম। সময়টা ছিলো ১৯৮৪ সালের ২২ এপ্রিল। ট্রেন থেকে নেমেই রাসেলকে আমি বসে থাকতে দেখি। আজ আমি যেই বেঞ্চে বসেছিলাম সেই বেঞ্চে ঐ দিন রাসেল আমার অপেক্ষায় পাঁচ ঘণ্টা বসেছিলো। রাসেলকে দেখে আমি দৌড়িয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরি। ঐ স্টেশনে ওতোগুলো মানুষের সামনে নিজের আনন্দটাকে ধরে রাখতে পারিনি সেইদিন।

তারপর কি হলো আন্টি?
তারপর, তারপর কিছুই বুজলাম না। দু’জন তো বসে মনের কতশত কথা বলেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কো’থা থেকে যেনো একটা ঝড় এসে আমার রাসেলকে নিয়ে গেলো। হারিয়ে ফেললাম আমি রাসেলকে। আমি পেয়েও ওকে হরিয়ে ফেললাম।

হারিয়ে ফেললেন মানি কি?
হ্যা রে মা রাসেল হারিয়ে গেলো! অনেক দূরে। জানিনা রে মা কো’থা থেকে যেনো একটি বড় পথরের টুকরো এসে রাসেলের মাথার পরে। আর সাথে সাথে রাসেল মাটিতে ঢলে পরে যায়। ওর সারা শরীর রক্তে রক্তাক্ত হয়ে যায়। কিছুতে থামাতে পারছি না ওর রক্ত। আমার সারা জামাকাপুর রক্তে ভরে যায়। ওখানে এতো মানুষ কেউ একটু এগিয়ে আসেনা। অবশেষে একজন রেল কর্মচার্রী এগিয়ে আসে। তারপর রাসেলকে একটা স্থায়ী হাসপাতাল নিয়ে যাই টেক্সি করে। কিন্তু ততক্ষণে রাসেল বেচে ছিলো না। ডাক্তার বলল ও আর নেই! নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি ডাক্তারের কথা শুনে।

তারপর?
তারপর নিজেকে শক্ত করি, আমি আমার গলার একটা স্বর্ণের চেইন দিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে রাসেলের বাসার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেই ওর লাশটি। সেই দিন আমিও ঐ পাথর নিক্ষেপকারীর মতো নিষ্ঠুর হয়ে যাই। ওর মৃত্যুদেহটা নিষ্ঠুরতা করে ফিরিয়ে দেই। জানো প্রকৃতি মনে হয় সেইদিন আমাকে খুব নিষ্ঠুর ভেবেছিলো। যেমনটা প্রকৃতিও আমার সাথে নিষ্ঠুরতা করেছিলো।

তারপর রক্তাক্ত জামাকাপুড়ে আমি সেইদিন রাতেই স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে সকালে বাড়িতে চলে আসি। ধিরে ধিরে বাড়িতে ঢুকি। ভুলে গেছি সব কথা মনে হলো আমি যেনো একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছি। মূল গেটের সামনে সবাইকে দাড়িয়ে থাকতে দেখি, আমাকে দেখে কেউ কোন কথা বলছে না। আমি হাটছি বুজতে পারছি না কি হলো। মা যখন আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলো আমি মোমের মতো গড়িয়ে পরে গেলাম মাটিতে। তারপর আমার প্রায় দশদিন পর জ্ঞান ফিরে।

আমি সিদ্ধন্ত নিলাম আর কোদিনও বিয়ে করবো না যতদিন বেচে থাকি। সেকালের মেয়ে ছিলাম বলে সেই প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি রে মা। সেই ঘটনার ছয়মাস পর পরিবার থেকে আবারও বিয়ের চাপ দিতে থাকে। পরিবারের ওরা খুব নিষ্ঠুর হয়ে গেলো। আমাকে নানা কথা শুনাতে লাগলো। আমার জন্য অন্যদের বিয়ে দিতে পরেনা, আমার জন্য সমাজে মুখ দেখাতে পারেনা এটা ওটা আরো কত কি! এগুলো শুনতে শুনতে কানটা জ্বালাপালা হয়ে গেলো। ইচ্ছে হয়েছিলো একা কোথাও পালিয়ে যাই। কিন্তু পারিনি সমাজ-সংসার আর পরিবারের কথা ভেবে।

বিয়ে দিয়ে দিলো বাবা মা সেই দিন, আমাকে সংসার করতে পাঠালো স্বামীর ঘরে। যেই দিন আমার বিয়ে হয়েছিলো সেই দিন আমি রাসেলের দেওয়া সব চিঠি নিয়েই বাসর ঘরে ঢুকেছিলাম। বরকে সব চিঠিগুলো দেখিয়ে দিয়েছি। মিথ্যে জীবন থেকে সত্যিটা বলে সুখ পাবো বলে সব জানিয়ে দিয়েছি সত্যিটা। ভেবেছিলাম চিঠিগুলো দেখলে হয়তো বর আমার সাথে সম্পর্ক রাখবে না। কিন্তু না, বর সেই দিন আমাকে একটা কথাই বলল- মনে করো আমিই তোমার হারিয়ে যাওয়া রাসেল। আমাকে রাসেলের মধ্যে খুজে নিও। এরচেয়ে বেশি কিছু আমি তোমার কাছে চাইবো না। রাসেল যে ভালোবাসাটা তোমার কাছ থেকে পেতো সেইটা আমাকে দিও তাতেই আমি সুখি হবো।

ট্রেন অনেক দূরে চলে এসেছে। এতোক্ষণ আন্টির সব কথা শুনেছি। আন্টি আমার চোখের পানি মুছে দিলো। আমি একটু নড়ে উঠলাম বুঝতে পারলাম না কখন থেকে আমি কাঁদছি আর কখন থেকেই বা আমার চোখের পানি পড়ছে। চোখের পানিতে ভেসে যাচ্ছে আমার দু’গাল। কিরে মেয়ে তুই এইভাবে কাঁদছিস কেনো? তার কথা শুনে আমি থ’ হয়ে গেলাম। হ্যা রে মেয়ে তুই তো আমার গল্প শুনে কাঁদছিস, আর আমি হলাম সেই গল্পের মূল নায়িকা!!

সেই বছর থেকেই আমি প্রতি বছর এই দিনে এখানে এসে পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকি রাসেলের অপেক্ষায়। জানিস আমার স্বামী কখনো আমাকে বলেনি তুমি আর ওখানে যেতে পারবানা। আমার উপর কখনোই বিরক্ত হয়নি। ওই আমাকে প্রতিবছর এখানে নিয়ে আসে। আজ ওর একটা কাজ পড়ে গেছে তাই আমাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে চলে গেছে। এখন আমার অপেক্ষয় দাড়িয়ে আছে স্টেশনে, নামলেই ওকে দেখতে পাবো।

আমার প্র্রথম সন্তান পৃথিবীতে যখন আসে সেই দিন শুধু একটা কথাই বলেছিলো। আমাদের কোন সন্তান যেনো এই ব্যপারটা না জানে। জানো, ওরা বড় হওয়া পর আমাকে প্রশ্ন করেছিলো আমি প্রতিবছর এইদিন কোথায় যাই? সেই উত্তরটা আমার বর’ই দিয়ে দিয়েছে ওদের। বলেছে আমার এক প্রিয় আত্মীয় মৃত্যুর শোক পালন করতে যাই একটা জয়গায়।

আন্টি যে স্টেশনে নামবে সেখানে চলে এসেছে ট্রেন। যাবার বেলায় আমাকে বলল, হ্যা রে মেয়ে তোমার নামটা তো জানলাম না আমি। দেখো আমি’ না জা তা! আগে তো তোমার নামটা জিজ্ঞেস করবো! হ্যা সমস্যা নেই, আমি মলি। তুমি কোথায় যাচ্ছো মা? এই তো চট্টগ্রামই এসেছি ঘোরার জন্য। দু’তিন দিন থেকে চলে যাবো। ঠিক আছে মা ঢাকায় ফিরার আগে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসো কেমন, এই নেও তোমার আঙ্কেলের ভিজিটিং কার্ড। ঠিক আছে আন্টি সময় পেলে আসবো।

উনি ট্রেন থেকে নেমে গেলেন। উনার যাওয়ার পথে আমি তাকিয়ে থাকলাম। উনি যখন ট্রেন থেকে নামছিলেন তখন একজন, এই ষাট/পয়ষট্টি বছরের ভদ্রলোক তাকে হাত ধরে নামাচ্ছেন। বুঝে নিলাম ঐ ভদ্রলোকই তার বর। যতদূর আমার চোখ গেলো ততদূর আমি তাদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলাম। দেখলাম পয়ষট্টি আর পঞ্চন্ন বছরের দুইজন কপল/কপলি দু’জন দু’জনার হাত ধরে নিজেদের গন্তব্যে দিকে যাচ্ছে। আমি তাদের পানে চেয়ে রইলাম অজানা এক অনুভুতি নিয়ে। আর মনে মনে জপলাম “এরি নাম ভালোবাসা”।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১:২১
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অভিযোগ, অভিযোগ, অভিযোগ

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২০ শে জুলাই, ২০১৯ ভোর ৫:৫৫



সবার মতোই, আমার প্রাইমারী স্কুলের জীবনটা বেশ আনন্দের ছিলো: টিফিনের সময় ও স্কুল ছুটির পর ফুটবল খেলাই আমাকে স্কুলে ধরে রেখেছিলো। আমাদের টিফিনের ছুটি হতো, আমরা কোনদিন টিফিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ১৩ বছর!!!

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২০ শে জুলাই, ২০১৯ দুপুর ১২:৫৭

দেখতে দেখতে সামুতে ১৩ টা বছর পেরিয়ে গেল!!! অথচ এখনো মনে হচ্ছে এইতো সেদিনের কথা। কিভাবে যে এতটা দিন হয়ে গেলো এখনো ভাবতে অবাক লাগে। সামুর বর্তমান অবস্থা অনেকটা জরুরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ও প্রিয়া তুমি কার?

লিখেছেন এম. বোরহান উদ্দিন রতন, ২০ শে জুলাই, ২০১৯ দুপুর ২:৫৩





রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য প্রিয়া সাহা এমন কান্ড করেছে, এমন মনে করার কোন কারণ নেই। এটা বললে তার অপরাধের গুরুত্ব বরং হালকা হয়ে যাবে। সে যা করেছে তা অতি সুক্ষ্মভাবে বিশেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয়া সাহাকে নিয়ে সাধারন মানুষ যা ভাবছেন

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে জুলাই, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:০৩



১। সরল বিশ্বাসে এসব কথা বলা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। দেশের মানুষ জানতে চায় প্রিয়া সাহা কেন এমন উস্কানিমূলক বক্তব্য পেশ করল। এর সঠিক উদ্দেশ্য কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয়া সাহা কি আর দেশে ফিরতে পারবে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২০ শে জুলাই, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৩১



*** কোন এক ডোডো পোষ্টটাকে রিফ্রেশ করছে ***

উনার দেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে: প্রিয়া সাহার ঘটনা নিয়ে, উনার বিপক্ষে ব্যবস্হা নেয়ার কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×