আমি মানুষ হিসেবে জীবনের অনেককটা স্তর পাড় হয়ে এসেছি। এক সময় ছাত্র জীবন, তারপর কর্মজীবন এবং অবশেষে সংসার জীবন। আমার স্ত্রী একই প্রক্রিয়ার অংশীদার। সামাজিক নিয়মে আমরা হয়ে গেলাম বিবাহিত নারী পুরুষ। তারপর সাংসারিক গন্ডিতে এসে আমরা বিভিন্নরূপে নিজেদের আবিষ্কার করলাম। অবতীর্ণ হলাম সংসার নামক এক যুদ্ধকে জয় করার বাসনা নিয়ে। আর এই সংসার যুদ্ধে আমরা হয়ে গেলাম কারও স্বামী/স্ত্রী, কারও পিতা/মাতা, কারও ভাই/বোন, কারও পুত্র/কন্যা এবং আরও নাম না জানা অনেক সামাজিক সম্পর্কের নারী পুরুষ। নিয়মের সকল অনুশাসনে আমরা অবশ্যই আগে মানব মানবী। কারণ আমাদের মধ্যে মানুষের যাবতীয় গুনাবলী বিদ্যমান এবং তারই নিক্তিতে আমাদের বাকি অস্তিত্ব। তাই আমাদের অবচেতন মনে প্রেম ভালবাসা, হিংসা ক্রোধ, লোভ লালসা, পাপ পূণ্য, সত্য মিথ্যা, ভাল মন্দ, হাসি কান্না, সুখ দুঃখ সব মানবীয় আচার আচরণ ব্যতিরেকে তার উর্দ্ধে কেউ নই।
বিভিন্ন অবস্থানে (বাসা ও কর্মক্ষেত্র) অহরহ আমাদের ভিন্ন ভিন্ন কতর্্যব্য ও দ্বায়িত্ব পালন করে যেতে হচ্ছে। অথচ কেউ এই দ্বায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে জোড় করে চাপিয়ে দেয়নি। আমাদের দুজনেই আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন যাপনের পদ্ধতি বা আচার আচরণ থেকে জেনে এসেছি সংসার কেমন হয়। আমাদের উভয়েই সমাজের চলমান প্রক্রিয়া থেকে অনবরত জানতে চেষ্টা করেছি আমাদের কি করতে হবে, কি করা উচিৎ এবং কি করলে সংসার সুখের হয়। আমাদের এই ভাবনা ও ইচ্ছার সবকিছুই নির্ভরশীল আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, আমাদের বুদ্ধি বিবেচনা, আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা, আমাদের কর্তব্যপরায়নতা, আমাদের প্রয়োজন ও সামর্থের উপর। আর সবচেয়ে বড় যেটা তা হলো আমাদের মানবিক মূল্যবোধ যেমন আমাদের পারস্পারিক সমঝোতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস ও একের প্রতি অন্যের আস্থা ও নির্ভরশীলতার উপর। একজন আরেক জনের সাথে সবকিছু শেয়ার বা ভাগ করে নেয়ার উপর। আমরা কে ছোট কে বড় তা বিচার করি না। কারণ জীবনে চলার পথে আমাদের দুজনকেই দুজনের প্রয়োজন। তাই কারও কাজকে কেউ ছোট ভাবি না, কাউকে কেউ ছোট করার চেষ্টা করি না। কাজকে তোমার/আমার কাজ বলে ভাগ করি না। সংসারটা শুধু নিজের একার না ভেবে নিজেদের ভাবি। তাই সংসারের ভাল মন্দ সব কিছুই আমাদের দুজনের।
বিয়ে প্রসঙ্গে বলা যায়, বাবা-মা বা অভিবাবক কখনই ভবিষ্যত দ্রষ্টা নয়। ভবিষ্যতের কথা একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানেন না। তাই বাবা মা হাজার বাছ বিচার করে বিয়ে দিলেই যে সেই বিয়ে সুখের হবে সেটা কখনই কেউ দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন না। তাই বাবা-মা আর অভিবাবক নির্ভর বিয়ে মানেই সুখের বিয়ে এটা ভাববার কারণ নেই। সংসারে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা এই নিয়ামকগুলো বাবা-মা বা অবিভাবক বিয়ে দিলেও আসতে পারে, নিজেরা বিয়ে করলেও আসতে পারে। এর জন্য সেটেল্ড বা অ্যারেঞ্জড বিয়ে কিংবা প্রেম বা ভালবাসার বিয়ে কোনটাই দায়ী নয় বা কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক হবে না।
স্বচ্ছলতা প্রসঙ্গে বলা চলে বিয়ের আগে পাত্রের স্বচ্ছলতার কথাটা অবশ্যই বিবেচনায় আসতে পারে, কিন্তু স্বচ্ছলতাই সুখের সংসার বা সুখের বিয়ের একমাত্র নিয়ামক তা হতে পারে না। বিবাহিত জীবন সুখের হবার জন্য স্বচ্ছলতা বা অভিবাবকের দূরদর্শিতা কোনটাই বাধ্যতামূলক নয়। আবার অস্বচ্ছলতার কারণে বিবাহিত জীবনে একেবারেই সুখ থাকবে না সেকথাও ঠিক নয়। কিছু কষ্টের মাঝেও সুখ থাকতে পাওে আবার কিছু সুখের মাঝেও কষ্ট থাকতে পারে। সুতারাং যে কোন অবস্থাতেই কার বিয়ে কেমন হবে বা কার জীবনে কি ঘটবে তার কোনটাই পূর্বনিধর্ারিত নয়। হবার কথাও নয়। তাই স্বচ্ছলতার সাথে সাথে বার মানুষ হবার প্রয়োজন আছে। আর ভাল মানুষ মানেই তো ভাল পাত্র বা ভাল পাত্রী।
এবার কাজের কথায় আসি। সংসারের কাজ সবার জন্যই সমান। কাজ কখনও নারী বা পুরুষে ভাগ হয়না। ভাগ হয় নারী পুরুষের বায়োলজিক্যাল এ্যাবিলিটি। আর এই এ্যাবিলিটির কথা চিন্তা করেই বা বিবেচনায় রেখেই নারী পুরুষের অনেক কাজ ভাগ করে নেয়া হয়। কর্মজীবি নারীদের "ম্যাটারর্নিটি লীভ" আছে। পুরুষদের এমন কোন লীভ নেই। কারণ পুরুষরা বায়োলজিক্যালি সেটা পাবার অধিকার রাখেনা। এখন একজন নারী যদি অন্তস্বত্তা হয় তাকে কি আগের রুটিন বেঁধে কাজ করতে হবে? মোটেও না। কারণ সেটা অমানবিক একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি এবং আমার স্ত্রী দুজনেই সরকারী চাকরী করি। আমি অফিসের একজন পদস্থ কর্মকতর্া, সে সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করে। আমাদের দুটো ছেলে। আমরা যথেষ্ট সৎ । আমরা জীবনকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। সমস্যাগুলো মোকাবেলা করেছি।
আমাদের কাছে সংসারটা একটা এ্যাডজাষ্টমেন্টের ব্যাপার। সমঝোতার ব্যাপার। কিছুটা ত্যাগের ব্যাপার। সংসারের স্বার্থে কে কতটা স্যাক্রিফাইস করতে পারি তার উপর নিজেদের সুখ নির্ভর করছে। কারণ আমরা জানি হাত বাড়ালেই আমরা সবকিছু পেয়ে যাব না। সবকিছু একদিনে অর্জন করাও সম্ভব না। তাই নিজেদের চাহিদার গন্ডিকে নিজেদের সামথ্যর্ের মধ্যেই রাখার চেষ্টা করি। ছেলেদের কাছে নিজেদের অবস্থানটা তুলে ধরি যাতে তারা বুঝতে পারে তাদের পাবার যোগ্যতা কতটুকু আর তাদের অধিকার কতটুকু। আর আমি মনে করি আমাদের মত শিক্ষিত বাবা মায়েরা তাই করেন। অনেকে ভিন্ন মত পোষণ করতেই পারেন। আর এই কারণেই তো এতো যুক্তি তর্কের অবতারণা। সবার চিন্তা চেতনা এক নয়। এক হতেই হবে এমন কোন কথাও নয়। তাইতো আমরা এক এক জন এক এক রকম বৈশিষ্টের মানুষ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


