কালপুরুষ
হায় কষ্ট! গার্মেন্টস্ ফ্যাক্টরীতে অগ্নীদগ্ধ মানুষের অসহায় মৃত্যুবরণের কষ্ট। আগুনে ঝলসে যাওয়া মানুষগুলোর অসহ্য যন্ত্রণার কষ্ট। ফ্যাক্টরীর ছাদের নীচে চাপা পড়া মানুষের করুণ মৃত্যুর কষ্ট। থেঁতলিয়ে গুঁড়িয়ে যাওয়া মানুষের গোঁ গোঁ আর্তনাদের কষ্ট। পঙ্গুত্ব আর অসহায়ত্বের কষ্ট। স্বজন হারানোর কষ্ট। অভাবের কষ্ট। দুঃখের কষ্ট। বেঁচে থাকার কষ্ট। কষ্ট পাওয়ার জন্য কষ্ট। কষ্ট শেষ না হবার কষ্ট। শুধু কষ্ট, কষ্ট আর কষ্ট। যেন কষ্টের পাহাড় জমেছে চারিদিকে। আর কত কষ্ট দেখবো এই দু'চোখ ভরে।
কষ্ট দেহ ও মনের এক ধরণের জ্বালা-পোড়া, ব্যথা-বেদনা, অস্বস্তি ও তিক্ততার অভিজ্ঞতা। আমার এই লেখাটা শুধুমাত্র কষ্টকে আলাদাভাবে একটা মাত্রা দেবার দূর্বল প্রয়াশ মাত্র। দূর্বল বললাম এই কারণে যে আমার হাতের কাছে এই মুহূর্তে কষ্টের উপর লেখা কোন বই বা বক্তব্য নেই। কষ্টের কোন স্মারকলিপি বা অভিধান, শব্দকোষ বা পরিভাষা কোনকিছুই মজুদ নেই। এই মুহূর্তে আমার কাছে কষ্টের আভিধানিক অর্থ একটাই- শুধুই কষ্ট। আমার মনে হয় বিশ্বের সর্বত্র সব মানুষের কাছেই কষ্টের সংজ্ঞা এক এবং অভিন্ন। বসনিয়ায় অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের কষ্ট। ইরাকী জনগণের কষ্ট। সুনামীর কষ্ট। খরাপীড়িত মানুষের কষ্ট। শুধু মানুষ কেন পৃথিবীর যাবতীয জীবকুল যাদের প্রাণ আছে তাদের সবারই কষ্ট আছে। নিজের সীমিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে সার্বজনীন কষ্টের একটা কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা বা অপচেষ্টা যাই বলুন কেন আমি তাই করছি। আপনাদের কাছে তাই প্রথমেই মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি এই অপরিপক্ক উপস্থাপনার জন্য।
মনে কষ্ট নেই, এমন লোক হয়তো পৃথিবীতে নেই। বিশ্বের ধনী দরিদ্র সব মানুষেরই মনে কিছু না কিছু কষ্ট আছে। আমি বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়া সমীচীন মনে করি। তাই তর্ক এড়ানোর স্বার্থে সুখের বিপরীত শব্দ হিসেবে এখানে কষ্টকে বিশ্লেষণ করিনি। এমনকি কষ্টের পরিপূরক রা সম্পূরক শব্দ হিসেবে দুঃখকেও টানিনি। সুখের সমার্থক শব্দ আনন্দ নিয়েও কথা বলতে চাই না। আনন্দ, সুখ, দুঃখ ওরা ওদের মতই থাকুক। আমি কষ্ট নিয়েই কথা বলি। তবে স্বতঃসিদ্ধভাবেই মনে করি সুখ-দুঃখের পাশাপাশি আনন্দ ও কষ্ট অবস্থান করে বা করে আসছে। দুঃখের চিত্রটা আরেকটু সহজ করে দিতে পারি। সকল শারীরিক ও মানসিক কষ্টই দুঃখের। কিন্তু সকল দুঃখই শারীরিক কষ্টের নয় হয়তোবা মানসিক কষ্টের। তেমনি সকল আনন্দই সুখের নয় বা সব সুখই আনন্দের নয়। একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী মরে সুখ পেলেন- অন্যদের কাছে তা সুখের নাও হতে পারে। সুখ থাকলেও কষ্ট থাকতে পারে, না থাকলেও কষ্ট থাকতে পারে। দুঃখ সেখানে কষ্টের সহযাত্রী মাত্র, মানসিক সঙ্গী- শারীরিক বাহক নয়।
সুখের চরিত্র ও রূপ কষ্টের মত অতিমাত্রায় বিস্তৃত নয়। অবস্থানও তেমন প্রলম্বিত হয় না। মনের মাঝে সুখের অবস্থান ণিকের জন্য। সহবাসের সুখ যেমন ক্ষণস্থায়ী, আরার কাউকে না পাবার কষ্ট তেমনি সাড়া জীবনের। মনে সুখের স্থায়ীত্ব অল্প সময়ের জন্য, বিস্তৃতি ও ব্যপ্তিও খুব কম। সুখের গন্ডি পার হলেই যে কষ্ট আসবে এমন কোন কথা নেই। আবার কষ্টের গন্ডি পার হলেই যে সুখ আসবে সেরকম ভাবারও সুযোগ নেই। তাই সুখকে বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন। কারণ সুখের কোন নির্দ্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। কষ্টের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে সুখের অবস্থান এটাও বলা মুশকিল। মনে সুখ থাকলেও কষ্ট থাকতে পারে, সুখ না থাকলেও কষ্ট থাকতে পারে। আবার উল্টোভাবে বলা যায়। কষ্ট থাকলেও সুখ থাকতে পারে, কষ্ট না থাকলেও সুখ থাকতে পারে। তাই কষ্টের সম্পূর্ন বিপরীত অথর্ও সুখ নয়।
একজন সুখী মানুষের মনে কষ্ট ও সুখ সহাবস্থান করতে পারে। তাই ওই বিতর্কে যেতে মন চাইছে না। কিন্তু কষ্টের প্রকাশ, বিকাশ, প্রভাব, স্বভাব, আবেদন, নিবেদন, মাত্রা, তীব্রতা, স্থায়ীত্ব, স্থিতিশীলতা, গ্রহণযোগ্যতা, প্রত্যাখান, প্রতিদান ও লালন-পালন সকল মতা ও বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে একরকম ভাবে থাকে না। সর্বোপরি কষ্টের ধারণ, সৃজন ও অনুধাবন সবই মানুষের মানবিক ও মস্তিষ্কের গুনাবলী ও উপাদানের উপর নির্ভরশীল। কষ্ট প্রতিটি মানুষের বাহ্যিক ও অন্তরীণ আচরণে ও ব্যবহারে পরিবর্তন আনে। সহ্যশক্তি, সৌকর্য ও সংবেদনশীলতা কষ্টের ব্যপকতার উপর প্রভাব ফেলে। কষ্ট চলমান জীবনের বাঁকে বাঁকে বৈচিত্র্য ও পরিবর্তন আনে। এক মানুষের কষ্ট অন্য মানুষের মনের উপর নানাভাবে প্রভাব ফেলে, তাড়িত করে। অনেক কিছু ভাবতে শেখায়, বুঝতে শেখায়। যেমন ঐ অসহায় ও যন্ত্রনাকাতর মানুষগুলোর কষ্ট আমাকে ভাবায়।
কষ্ট মানুষের সুপ্ত এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর এক অনুভূতি। কষ্ট চোখে দেখা যায় না ঠিকই তবু মানুষের বাহ্যিক আচার আচরণে অনেক সময় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কষ্টের চিরাচরিত রূপ যন্ত্রণাকাতর মানুষের মুখগুলোর দিকে তাকালে অনেকটা উপলব্ধি করা যায়। বোঝা যায় কি অব্যক্ত জ্বালা আর যন্ত্রনার মাঝে কষ্টের চিত্র ফুটে ওঠে ওই চেহারাগুলোর মাঝে। যন্ত্রনার সূত্র ধরে বিচার করলে বলা যায় কষ্টের সাথে মোটামুটি সবারই পরিচিত আছি। কম আর বেশী। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ করে সেই কষ্ট যা মনের গভীরে রক্তরণ করে। যে যন্ত্রণার চিত্র মুখে ফুটে ওঠে না। যা শত চেষ্টা করেও দেখা যায় না। সেই কষ্টের কথা মানুষ জানবে কি করে। বুঝবে কি করে।
কষ্ট মানুষের চিরাচরিত মানবিক অনুভূতির চলমান প্রবাহ। কষ্টকে দুই ভাবে ভাগ করা যেতে পারে। দৈহিক বা শারীরিক কষ্ট এবং মানসিক বা মনের কষ্ট। দৈহিক বা শারীরিক কষ্ট উপশম যোগ্য। সমযের সাথে সাথে এবং চিকিৎসার মাধ্যমে এই কষ্ট থেকে আংশিক সম্পূর্ন পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু মানসিক বা মনের কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুব সহজ নয়। মনের কষ্ট থেকে মানসিক রোগী হওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। এই কষ্ট মানুষকে দীর্ঘকাল ভোগাতে পারে। এক সমক্ষায় জানা গেছে এদেশের শতকরা ৭৫ ভাগ লোক মানসিক কষ্টে ভুগছেন। আমিও হয়তো সেই দলেরই একজন।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০০৭ দুপুর ২:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




