উৎসর্গ : " আমি বাঁচতে চাই", এই শিরোনামে ৭ই জুন পোস্ট দিয়ে নিজের বিপন্নতার কথা লিখে যে ব্লগার কিছুক্ষণ পরে পোস্ট প্রত্যাহার করেন, তাকে।
আপনার কি কখনো এমন হয়েছে যে কয়েক বছর পর পূর্ব পরিচিত একজন মহিলার সাথে দেখা হল অথচ তাকে চিনতে পারলেন না!কারন যাকে চিনতেন তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মনির্ভরশী, হাসিখুসি, স্মার্ট - আর যার সাথে দেখা হল তিনি সদা তটস্থ, চুপচাপ, প্রায় মাটির সাথে মিশে যেতে চাওয়া একজন মানুষ। আমি জানি নিশ্চয় আপনার এমন নারী দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছ, আমাদের সমাজে এমন ভূরি ভূরি নারী দেখা যায়। কিছুদিন আগেই আমি এমন একজনকে দেখেছিলাম, যিনি বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত পরিবারের সন্তান। তার দাদা, বাবা, চাচা, ফুফুর যেকোন একজনের নাম করলেই তাকে সবাই চিনবেন- আমি সেটা চেনাতে চাইছি না। বরং শুধু তার কথাই বলি। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী, ভাল বিতার্কিক,স্মার্ট। লেখাপড়ার শেষে তিনি শিক্ষক হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে তার মাও শিক্ষকতা করতেন। তার বিয়ে হল বিরাট ব্যবসায়ী পরিবারের উচ্চশিক্ষিত, আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট পুত্রের সংগে। বিয়ের কিছুদিন পর তিনি চাকুরী ছাড়লেন, তারপর তার ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি পাল্টে গেল, তিনি কেমন জড়তাগ্রস্ত, ভীতু ব্যক্তিত্ব ধারন করলেন। এক অনুষ্ঠানে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার সাথে আলাপের সময় তিনি বললেন, "আমার মাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।" তিনি ভুলেই গেছেন তিনি নিজেও শিক্ষকতা করতেন, অথবা নিজেকে তার এতই অকিঞ্চিৎকর মনে হয় যে নিজের বিষয়ে কিছু বলাটাই তার কাছে বাহুল্য মনে হয়। এমন বেশ কিছু মহিলার সাথে আমার প্রায়শই দেখা হয়েছে, যাদের দেখে মনে হয়েছে যে তারা অজানা অপরাধের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে জীবন যাপন করছেন। এদের এমন আচরনের কারন এরা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। পরিবারের একজন সদস্য যখন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত আরেকজনের সাথে এমন আচরন করেন যে তাতে দ্বিতীয় জনের মানসিক, আর্থিক বা শারীরিক অবস্থার অবনমন ঘটে অথবা তার স্বাধীনতা খর্ব হয়, এবং এই আচরণ তিনি বেশ দীর্ঘ সময় ধরে করেন এবং ধীরেধীরে মাত্রা বাড়তে থাকে তবে একে বলে পারিবারিক নির্যাতন। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হতে পারেন নারী বা পুরুষের যে কোন একজন- তবে সাধারণত নারীদেরই বেশি এর শিকার হতে দেখা যায়।
কিন্তু কেন ভুক্তভোগী এই নারীরা কাউকে জানান না যে তাদের সাথে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে? কারণ ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স তাদের ভিতর এমন হীনমন্যতাবোধ তৈরি করে যা আদের আত্মসম্মানবোধ পুরোপুরি লুপ্ত করে দেয়,তাদের হীনমন্যতাবোধ এত চরমে পৌঁছায় যে তারা তাদের অবস্থার জন্য কেবল নিজেকেই দোষারোপ করতে থাকেন- এটা থেকে যে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বা উচিত সেই জিনিষটাই তাদের বোধে আসে না।
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স শুরু হয় ধীরে ধীরে- প্রথমদিকে যাকে নির্দোষ ভালবাসা বলে মনে হয়। তাই স্ত্রী তা সহজেই মেনে নেন। যেমন স্বামী একেবারে চান না স্ত্রী একমূহুর্তও তার চোখের আড়াল হোক, তাই সারাক্ষণ স্ত্রীকে তার চোখের সামনে থাকতে হয়। এটাই পরবর্তীতে স্ত্রীকে প্রায় গৃহবন্দি করার ফেলে এবং এ অবস্থার কথা স্ত্রী কাউকে জানালে বড় ক্ষতি করার হুমকি দেয় স্বামী। স্বামী মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ, গালিগালাজ করে। প্রথমদিকে গালিগালাজ করার পর স্বামী ক্ষমা চাইলেও পরে ক্ষমা চাওয়া দূরে থাক মারধোরও শুরু করে। অবশ্য মারধোর না করে শুধু খারাপ আচরণ করেও স্ত্রীকে ধীরেধীরে স্ত্রীকে হীনমন্যতায় আক্রান্ত করে ফেলেন স্বামী, একে বলে emotional abuse.
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন আর্থিক অবস্থার মানুষের মধ্যে দেখা দিলেও তার মূল ধরণ দেশ, কাল, পাত্র ভেদে একই,যেগুলো নীচে দিলাম। এই ধরণগুলো সবক্ষেত্রে দেখা না গেলেও মোটামুটি এইগুলিই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের প্রধান ধরণ।
-স্ত্রীর প্রতি কাজে খুঁত ধরা, তাকে সবসময় বলা তুমি কিছু জানো না, পারো না, বোঝো না।
-স্ত্রী তার আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের সাথে সময় কাটালে তাতে রাগ করা, এদের সাথে দেখা করতে না দেয়া।
-স্ত্রীকে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত করা।
-অন্যলোকের সামনে স্ত্রীকে অপদস্থ করা।
-সংসারে ব্যয়িত প্রতিটি পয়সা নিয়ন্ত্রণ রাখা।
-স্ত্রীকে কোনপ্রকার অর্থ না দেয়া। স্ত্রী নিজে রোজকার করলে সেই অর্থও নিয়ে নেয়া।
-সবসময় এমন আচরণ করা যাতে স্ত্রী ভীত থাকে।
-স্ত্রী কেমন পোশাক পরবে, চুল কেমন হবে, কার সাথে কোথায় দেখা করতে পারবে তা নিয়ন্ত্রণ করা।
-সবসময় স্ত্রীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা, তার ইমেইল, ফেইসবুক, আর ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করা।
- স্ত্রীকে নিজের থেকে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখা।
-সবসময় সন্তানের মা হিসাবে স্ত্রীর দোষ ধরা এবং তার থেকে সন্তানকে আলাদা করে ফেলার হুমকি দেয়া।
-কখনো কখনো বন্দুক বা ছুরি নিয়ে স্ত্রীকে ভয় দেখানো-
-স্ত্রীকে পড়াশোনা বা চাকরি করতে বাঁধা দেয়া- যদিও বা করে তবে নানা কাজে তাকে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা যে সে ঠিকমত ক্লাস বা অফিসে না যেতে পারে।
দিনের পর দিন এইধরনের নির্যাতন চলার ফলে স্ত্রী পরিনত হন স্বামীর হাতের পুতুলে। ফলে অনেক শিক্ষিত, আত্মনির্ভর নারীও বুঝতেই পারেন না যে এর থেকে বের হওয়া সম্ভব এবং এর জন্য কারো সহায়তা দরকার। অবশ্য স্বামী সর্বাত্মক চেষ্টা করেন স্ত্রীর কাছে সহায়তা আসার সব পথ রুদ্ধ করে রাখতে। স্ত্রীর নাগালে থাকে না অন্যের সাথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম। এমনকি পরিচিত কারো সাথে কথা বলার সময়ও স্ত্রী স্বামীর নজরদারিতে থাকেন। তাই পালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলেও স্ত্রীকে সবসময় সুযোগ খুঁজতে হবে তার অবস্থার কথা ইংগিতে এমন কাউকে জানানো যে তাকে সহায়তা করতে পারে। বিদেশে এই সহায়তা দেবার জন্য নানা সংগঠন আছে যাদের কাছে কোনভাবে একবার খবর পৌঁছালেই হল। আমাদের দেশে এমন কোন সংগঠন নেই। তাই স্ত্রীকেই ঠাণ্ডা মাথায় একশন প্ল্যান ঠিক করতে হবে। একটা চিরকুটে অবস্থা জানিয়ে লিখে রাখতে হবে আর সুযোগ বুঝে তা স্বামীর অগোচরে কাউকে দিতে হবে। যাই করা হোক না কেন তা করতে হবে স্বামীর অগোচরে, কারণ টের পেলেই তিনি নির্যাতন বহুগুনে বাড়িয়ে দেবেন।
স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সুন্দর একটা সংসার গড়ার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে স্বামী কেন এমন আচরন করেন? এর প্রধান কারণ স্ত্রীর উপর সর্বতভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। যদি স্ত্রী অন্য কারো সাহায্য নেন বা পালিয়ে যান বা সম্পর্কচ্ছেদ করেন তাহলেই কিন্তু ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের পরিসমাপ্তি ঘটে না। স্ত্রীর উপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য স্বামী তাকে নানা ভাবে বিরক্ত ; করতে থাকেন, হুমকি দেন, শারীরিক ক্ষতি এমনকি হত্যাও করতে পারেন। তাই নির্যাতক স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে গেলেও স্ত্রীকে সাবধানে থাকতেই হবে।
এই পোস্ট দেবার উদ্দেশ্য স্বামীদের হেয় করা নয়। এখানে কেবল সেই স্বল্পসংখ্যক স্বামীদের আচরনের কথা বলেছি যারা স্ত্রীদের জীবন এমন করে তোলেন যে স্ত্রীরা মনে করেন তারা এক গর্তের ভিতর পড়ে গেছেন, আর বেরোতে পারবেন না। যে সব নারীদের জীবনে উপরে উল্লিখিত কোন এক বা একাধিক নির্যাতনের ধরন মিলে যায় তাদের সচেতন করাই এই পোস্টের উদ্দেশ্য। ইন্টারনেটের সাহায্যে নিয়ে পোস্ট টা লেখা হলেও কোন অজ্ঞাত কারনে সেই লিংকগুলো কিছুতেই দিতে পারলাম না।
৭ই জুন প্রথম পাতায় "আমি বাঁচতে চাই" শিরোনামে যিনি পোস্ট দিয়েছিলেন তার উদ্দেশ্যে অনেক ব্লগার পরামর্শ দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, স্মরণ করতে পারছি আমি ইহতিব ও আলপনা তালুকদারের মন্তব্যের কথা। আমি সেই ব্লগারের ব্লগে গিয়ে দেখলাম আরেকটি পোস্ট দিয়েছেন, যাতে শেয লাইন লেখা মৃত্যু ছাড়া কি আমার আর কোন উপায় নেই? কিছুক্ষণ পর প্রতিমন্তব্য খুঁজতে গিয়ে দেখি লেখক পোস্টদুটিই সরিয়ে ফেলেছেন। তার স্বামীর নির্যাতনের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে তার ব্লগ পর্যন্ত স্বামীর নজরদারীর বাইরে নয়। এই পোস্ট দিলাম এই আশায় তিনি এটা পড়বেন এবং নিজের করনীয় ঠিক করতে পারবেন, আর নতুন ভাবে বাঁঁচবেন।
উৎসর্গ : " আমি বাঁচতে চাই", এই শিরোনামে ৭ই জুন পোস্ট দিয়ে নিজের বিপন্নতার কথা লিখে যে ব্লগার কিছুক্ষণ পরে পোস্ট প্রত্যাহার করেন, তাকে।
আপনার কি কখনো এমন হয়েছে যে কয়েক বছর পর পূর্ব পরিচিত একজন মহিলার সাথে দেখা হল অথচ তাকে চিনতে পারলেন না!কারন যাকে চিনতেন তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মনির্ভরশী, হাসিখুসি, স্মার্ট - আর যার সাথে দেখা হল তিনি সদা তটস্থ, চুপচাপ, প্রায় মাটির সাথে মিশে যেতে চাওয়া একজন মানুষ। আমি জানি নিশ্চয় আপনার এমন নারী দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছ, আমাদের সমাজে এমন ভূরি ভূরি নারী দেখা যায়। কিছুদিন আগেই আমি এমন একজনকে দেখেছিলাম, যিনি বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত পরিবারের সন্তান। তার দাদা, বাবা, চাচা, ফুফুর যেকোন একজনের নাম করলেই তাকে সবাই চিনবেন- আমি সেটা চেনাতে চাইছি না। বরং শুধু তার কথাই বলি। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী, ভাল বিতার্কিক,স্মার্ট। লেখাপড়ার শেষে তিনি শিক্ষক হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে তার মাও শিক্ষকতা করতেন। তার বিয়ে হল বিরাট ব্যবসায়ী পরিবারের উচ্চশিক্ষিত, আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট পুত্রের সংগে। বিয়ের কিছুদিন পর তিনি চাকুরী ছাড়লেন, তারপর তার ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি পাল্টে গেল, তিনি কেমন জড়তাগ্রস্ত, ভীতু ব্যক্তিত্ব ধারন করলেন। এক অনুষ্ঠানে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার সাথে আলাপের সময় তিনি বললেন, "আমার মাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।" তিনি ভুলেই গেছেন তিনি নিজেও শিক্ষকতা করতেন, অথবা নিজেকে তার এতই অকিঞ্চিৎকর মনে হয় যে নিজের বিষয়ে কিছু বলাটাই তার কাছে বাহুল্য মনে হয়। এমন বেশ কিছু মহিলার সাথে আমার প্রায়শই দেখা হয়েছে, যাদের দেখে মনে হয়েছে যে তারা অজানা অপরাধের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে জীবন যাপন করছেন। এদের এমন আচরনের কারন এরা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। পরিবারের একজন সদস্য যখন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত আরেকজনের সাথে এমন আচরন করেন যে তাতে দ্বিতীয় জনের মানসিক, আর্থিক বা শারীরিক অবস্থার অবনমন ঘটে অথবা তার স্বাধীনতা খর্ব হয়, এবং এই আচরণ তিনি বেশ দীর্ঘ সময় ধরে করেন এবং ধীরেধীরে মাত্রা বাড়তে থাকে তবে একে বলে পারিবারিক নির্যাতন। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হতে পারেন নারী বা পুরুষের যে কোন একজন- তবে সাধারণত নারীদেরই বেশি এর শিকার হতে দেখা যায়।
কিন্তু কেন ভুক্তভোগী এই নারীরা কাউকে জানান না যে তাদের সাথে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে? কারণ ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স তাদের ভিতর এমন হীনমন্যতাবোধ তৈরি করে যা আদের আত্মসম্মানবোধ পুরোপুরি লুপ্ত করে দেয়,তাদের হীনমন্যতাবোধ এত চরমে পৌঁছায় যে তারা তাদের অবস্থার জন্য কেবল নিজেকেই দোষারোপ করতে থাকেন- এটা থেকে যে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বা উচিত সেই জিনিষটাই তাদের বোধে আসে না।
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স শুরু হয় ধীরে ধীরে- প্রথমদিকে যাকে নির্দোষ ভালবাসা বলে মনে হয়। তাই স্ত্রী তা সহজেই মেনে নেন। যেমন স্বামী একেবারে চান না স্ত্রী একমূহুর্তও তার চোখের আড়াল হোক, তাই সারাক্ষণ স্ত্রীকে তার চোখের সামনে থাকতে হয়। এটাই পরবর্তীতে স্ত্রীকে প্রায় গৃহবন্দি করার ফেলে এবং এ অবস্থার কথা স্ত্রী কাউকে জানালে বড় ক্ষতি করার হুমকি দেয় স্বামী। স্বামী মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ, গালিগালাজ করে। প্রথমদিকে গালিগালাজ করার পর স্বামী ক্ষমা চাইলেও পরে ক্ষমা চাওয়া দূরে থাক মারধোরও শুরু করে। অবশ্য মারধোর না করে শুধু খারাপ আচরণ করেও স্ত্রীকে ধীরেধীরে স্ত্রীকে হীনমন্যতায় আক্রান্ত করে ফেলেন স্বামী, একে বলে emotional abuse.
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন আর্থিক অবস্থার মানুষের মধ্যে দেখা দিলেও তার মূল ধরণ দেশ, কাল, পাত্র ভেদে একই,যেগুলো নীচে দিলাম। এই ধরণগুলো সবক্ষেত্রে দেখা না গেলেও মোটামুটি এইগুলিই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের প্রধান ধরণ।
-স্ত্রীর প্রতি কাজে খুঁত ধরা, তাকে সবসময় বলা তুমি কিছু জানো না, পারো না, বোঝো না।
-স্ত্রী তার আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের সাথে সময় কাটালে তাতে রাগ করা, এদের সাথে দেখা করতে না দেয়া।
-স্ত্রীকে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত করা।
-অন্যলোকের সামনে স্ত্রীকে অপদস্থ করা।
-সংসারে ব্যয়িত প্রতিটি পয়সা নিয়ন্ত্রণ রাখা।
-স্ত্রীকে কোনপ্রকার অর্থ না দেয়া। স্ত্রী নিজে রোজকার করলে সেই অর্থও নিয়ে নেয়া।
-সবসময় এমন আচরণ করা যাতে স্ত্রী ভীত থাকে।
-স্ত্রী কেমন পোশাক পরবে, চুল কেমন হবে, কার সাথে কোথায় দেখা করতে পারবে তা নিয়ন্ত্রণ করা।
-সবসময় স্ত্রীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা, তার ইমেইল, ফেইসবুক, আর ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করা।
- স্ত্রীকে নিজের থেকে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখা।
-সবসময় সন্তানের মা হিসাবে স্ত্রীর দোষ ধরা এবং তার থেকে সন্তানকে আলাদা করে ফেলার হুমকি দেয়া।
-কখনো কখনো বন্দুক বা ছুরি নিয়ে স্ত্রীকে ভয় দেখানো-
-স্ত্রীকে পড়াশোনা বা চাকরি করতে বাঁধা দেয়া- যদিও বা করে তবে নানা কাজে তাকে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা যে সে ঠিকমত ক্লাস বা অফিসে না যেতে পারে।
দিনের পর দিন এইধরনের নির্যাতন চলার ফলে স্ত্রী পরিনত হন স্বামীর হাতের পুতুলে। ফলে অনেক শিক্ষিত, আত্মনির্ভর নারীও বুঝতেই পারেন না যে এর থেকে বের হওয়া সম্ভব এবং এর জন্য কারো সহায়তা দরকার। অবশ্য স্বামী সর্বাত্মক চেষ্টা করেন স্ত্রীর কাছে সহায়তা আসার সব পথ রুদ্ধ করে রাখতে। স্ত্রীর নাগালে থাকে না অন্যের সাথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম। এমনকি পরিচিত কারো সাথে কথা বলার সময়ও স্ত্রী স্বামীর নজরদারিতে থাকেন। তাই পালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলেও স্ত্রীকে সবসময় সুযোগ খুঁজতে হবে তার অবস্থার কথা ইংগিতে এমন কাউকে জানানো যে তাকে সহায়তা করতে পারে। বিদেশে এই সহায়তা দেবার জন্য নানা সংগঠন আছে যাদের কাছে কোনভাবে একবার খবর পৌঁছালেই হল। আমাদের দেশে এমন কোন সংগঠন নেই। তাই স্ত্রীকেই ঠাণ্ডা মাথায় একশন প্ল্যান ঠিক করতে হবে। একটা চিরকুটে অবস্থা জানিয়ে লিখে রাখতে হবে আর সুযোগ বুঝে তা স্বামীর অগোচরে কাউকে দিতে হবে। যাই করা হোক না কেন তা করতে হবে স্বামীর অগোচরে, কারণ টের পেলেই তিনি নির্যাতন বহুগুনে বাড়িয়ে দেবেন।
স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সুন্দর একটা সংসার গড়ার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে স্বামী কেন এমন আচরন করেন? এর প্রধান কারণ স্ত্রীর উপর সর্বতভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। যদি স্ত্রী অন্য কারো সাহায্য নেন বা পালিয়ে যান বা সম্পর্কচ্ছেদ করেন তাহলেই কিন্তু ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের পরিসমাপ্তি ঘটে না। স্ত্রীর উপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য স্বামী তাকে নানা ভাবে বিরক্ত ; করতে থাকেন, হুমকি দেন, শারীরিক ক্ষতি এমনকি হত্যাও করতে পারেন। তাই নির্যাতক স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে গেলেও স্ত্রীকে সাবধানে থাকতেই হবে।
এই পোস্ট দেবার উদ্দেশ্য স্বামীদের হেয় করা নয়। এখানে কেবল সেই স্বল্পসংখ্যক স্বামীদের আচরনের কথা বলেছি যারা স্ত্রীদের জীবন এমন করে তোলেন যে স্ত্রীরা মনে করেন তারা এক গর্তের ভিতর পড়ে গেছেন, আর বেরোতে পারবেন না। যে সব নারীদের জীবনে উপরে উল্লিখিত কোন এক বা একাধিক নির্যাতনের ধরন মিলে যায় তাদের সচেতন করাই এই পোস্টের উদ্দেশ্য। ইন্টারনেটের সাহায্যে নিয়ে পোস্ট টা লেখা হলেও কোন অজ্ঞাত কারনে সেই লিংকগুলো কিছুতেই দিতে পারলাম না।
৭ই জুন প্রথম পাতায় "আমি বাঁচতে চাই" শিরোনামে যিনি পোস্ট দিয়েছিলেন তার উদ্দেশ্যে অনেক ব্লগার পরামর্শ দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, স্মরণ করতে পারছি আমি ইহতিব ও আলপনা তালুকদারের মন্তব্যের কথা। আমি সেই ব্লগারের ব্লগে গিয়ে দেখলাম আরেকটি পোস্ট দিয়েছেন, যাতে শেয লাইন লেখা মৃত্যু ছাড়া কি আমার আর কোন উপায় নেই? কিছুক্ষণ পর প্রতিমন্তব্য খুঁজতে গিয়ে দেখি লেখক পোস্টদুটিই সরিয়ে ফেলেছেন। তার স্বামীর নির্যাতনের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে তার ব্লগ পর্যন্ত স্বামীর নজরদারীর বাইরে নয়। এই পোস্ট দিলাম এই আশায় তিনি এটা পড়বেন এবং নিজের করনীয় ঠিক করতে পারবেন, আর নতুন ভাবে বাঁঁচবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০১৭ সকাল ৯:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




