
একেকটা জন্মদিন পার করা মানে জীবন বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা, কয়েক বছর পরপর সেই বইয়ের একেক অধ্যায় শেষ হয়! বইটা ট্রাজেডি না কমেডি, একেবারে শেষ পর্যন্ত না পৌঁছালে তা জানার কোনো উপায় নেই!!! দুঃখের বিষয় এটাই, যখন জানা যায় তখন এই জানাটা নিজের কোনো কাজে লাগে না।
আজকে আমাদের দুজন ব্লগারের জন্মদিন।
শায়মা
কাজী ফাতেমা ছবি
তাদের প্রত্যেক জন্মদিন হোক সুখপাঠ্য বইয়ের একেক পৃষ্ঠার মতো, নিজের জন্য এবং তাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা অন্য সকলের জন্য। অনেক শুভকামনা...
জন্মদিনকে জীবন বইয়ের পৃষ্ঠার মতো মনে হয়, কারণ আমার শৈশবে দেখা সব জন্মদিনের স্মৃতিতে অনেক বই জড়িয়ে আছে। আমাকে প্রথম বই উপহার দিয়েছিলেন আমার মা, আমার দু বছরের জন্মদিনে, তার অনেক বছর পর আমি গল্প বই পড়া শিখি। সেই বইটা এখনো আছে।
আমাদের ছোটবেলায় জন্মদিন হতো, কিন্তু শুধু ছোটদের নিয়ে। এসব জন্মদিনের উপহার ছিল প্রধানত বই। সেসময় জন্মদিন খুব সাধারণভাবে পালন করা হতো। খুবই সামান্য আয়োজন, কিন্তু তাতে আনন্দে- উত্তেজনার কোনো কমতি থাকতো না। এই উপলক্ষে একটা অতি সাধারণ, কিন্তু নতুন জামা পাওয়া যেতো। মায়ের হাতে তৈরি সেই সাধারণ জামা পরে জন্মদিনের ক্রিমকেক কাটার বিমলানন্দ পরে আর কখনো পাইনি!
অতিথি থাকতো কেবল প্রতিবেশি ছোটরা। প্রবল আনন্দের সাথে কেক কাটা হতো, কারণ ক্রিম কেক নামের এই লোভনীয় খাবারটা কেবল জন্মদিন উপলক্ষেই ঘরে আসতো। তখন তো আর পাড়ায় পাড়ায় কেকের দোকান ছিল না, কেক কিনে আনতে হতো নিউমার্কেটের লাইট বা অলিম্পিয়া বেকারি থেকে। সেসময় ক্রিম কেক ছাড়া আর মাত্র দুই রকম কেকের নাম জানতাম, প্লেন কেক আর ফ্রূট কেক! আজকাল তো দেখি পনির দিয়েও কেক বানায়!
টেবিলে আগে থাকতেই প্লেটে প্লেটে খাবার সাজিয়ে রাখা হতো অতিথিদের জন্য। সেই খাবারও খুব সাধারণ খাবার; একটা লাড্ডু বা মিষ্টি, কলা বা অন্য কোনো ফল, ঘরে বানানো দুয়েকটা খাবার। কেক কাটা শেষ হতেই প্লেটে এক পিস করে কেক দিয়ে সবার হাতে প্লেট তুলে দেয়া হতো। তারপর গল্প করতে করতে, সেই সাধারণ খাবার খেতে খেতে, জন্মদিনের অসাধারণ আনন্দ উপভোগ করা...
মোটামুটি সবার বাড়িতেই এভাবেই জন্মদিন পালন হতো। কিন্তু নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হল কলোনির বন্ধু মুন্নির (ওর আসল নামটা কাছাকাছি) জন্মদিনে গিয়ে। খাওয়া-দাওয়ার পর খেলাধুলার আয়োজন ছিল, এটা আগে কখনো দেখিনি। আমার মত ছোটদের জন্য খেলা ছিল পিলো পাসিং। আমার বোনের মতো বড়দের জন্য(যারা সেভেন, এইট, নাইন বা টেনে এ পড়তেন) ছিল লেখা প্রতিযোগিতা! মুন্নির আম্মা লেখা প্রতিযোগিতার বিষয় বলে দিলেন, চার্চিলকে নিয়ে ইংরেজিতে দশটা বাক্য লিখতে হবে দশ মিনিটে! সবাইকে কাগজ আর পেন্সিল দেয়া হয় লেখার জন্য। সেসময় ৬/৭ টা ফাউন্টেন পেন কারো বাসায় থাকতো না, তাই পেন্সিল! সবার লেখা শেষ হলে মুন্নির আম্মা সব লেখা পড়ে আমার বোনের লেখা সবচেয়ে ভালো হয়েছে বলে জানান, পুরস্কার হিসাবে দেয়া হয়েছিল জাহানারা ইমামের অনুবাদ করা লরা মেরীর বই। নাইন বা টেনে পড়ুয়া আমার বোন খুব খুশি হয়ে বলেছিলো, "আমি গতকালকেই চার্চিল কে নিয়ে লেখা একটা বই পড়েছি, তাই সহজে লিখতে পারলাম।" জন্মদিনে এই রচনা প্রতিযোগিতার কথা আমার এখনো মনে পড়ে! মনে পড়ার সাথে সাথে ভাবি, আজকাল নাইন টেনে পড়ুয়ারা পাঠ্য বই ছাড়া এই রকম অপাঠ্য বই পড়ার সুযোগ পায় নাকি!! আরেকটা জিনিস মনে হয়, সেসময় জ্ঞানের চর্চাকেও আনন্দদায়ক কিছু বলে মনে করা হতো।
সেসময় জন্মদিনে উপহার হিসেবে যে বই উপহার দেয়া হতো, সেই বইয়ের প্রথম দিকে "উপহার" লেখা একটা পাতা থাকতো। সেখানে উপহার দাতা যাকে উপহার দিচ্ছেন তার নাম লিখে লিখতেন, "শুভেচ্ছা সহ... "কেউ আবার পন্ডিতি করে সাহিত্য করতেন। আমার জন্মদিনে আমার বন্ধু মুন্নি যে বই দিয়েছিল সেখানে লিখে দিয়েছিল,
শিশু পুষ্প আঁখি মেলি হেরিল এ ধরা—
শ্যামল, সুন্দর, স্নিগ্ধ, গীতগন্ধভরা—
বিশ্বজগতেরে ডাকি কহিল, হে প্রিয়,
আমি যত কাল থাকি তুমিও থাকিয়ো।
কবিতাটা মুখস্ত করেছিলাম, কিন্তু আজ অবধি বুঝতে পারিনি জন্মদিনের উপহারে এই কবিতাটা কিভাবে প্রাসঙ্গিক হয়!
আমার বোনের এক বান্ধবী যে বই উপহার দিয়েছিলেন, সেই বইতে "উপহার" লেখা পৃষ্ঠায় দীর্ঘ একটা কবিতা লিখেছিলেন,
স্নেহ উপহার এনে দিতে চাই
কি যে দেব তাই ভাবনা,
যত দিতে সাধ করি মনে মনে
খুঁজে- পেতে সে তো পাবো না!
- - - - - - - - - - - - - - - -
- - - - - - - - - - - - - - - -
অচল শিখর ছোটো নদীটিরে
চিরদিন রাখে স্মরণে --
যতদূর যায় স্নেহধারা তার
সাথে যায় দ্রুতচরণে।
তেমনি তুমিও থাক না'ই থাক,
মনে কর মনে কর না,
পিছে পিছে তব চলিবে ঝরিয়া
আমার আশিস-ঝরনা॥
এই কবিতাটাও মুখস্ত করেছিলাম। আর সেই আপাটাকে এখনো মনে করি।
এই বইগুলো পেয়েছিলাম আমার আট বছরের জন্মদিনে। আমাদের বাসায় নিয়ম ছিল দশ বছর পর্যন্ত এমন জন্মদিন হতো, তারপর আর হতো না। নবম জন্মদিনের আগে আমার বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো। আমার নবম জন্মদিনের দিন, আব্বা রেডিও থেরাপি নিয়ে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছেন। আমি বললাম, "আব্বা, এবার তো আমার জন্মদিন হলো না। তাহলে আমার জন্য কিন্তু ১০ বছর না, ১১ বছর পর্যন্ত জন্মদিন করতে হবে। ঠিক আছে?"
আমার বাবা ক্লান্ত বিষন্ন চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, কোন উত্তর দিলেন না... দশম জন্মদিনের আগেই তাঁকে চিরদিনের জন্য হারালাম। তারপর আর কখনও আমার কোনো জন্মদিন পালন করা হয় নি! কিন্তু প্রতি জন্মদিনে আমার মনে পড়ে যায়, আমার বাবার সেই ক্লান্ত- বিষন্ন- অসহায় দুটো চোখের কথা! আমি জানতাম না, কিন্তু আমার বাবা জানতেন আমার পরের জন্মদিনে তিনি আর থাকবেন না।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




