somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিক্ষক দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি: কামাল স্যারকে নিয়ে কিছু কথা

০৫ ই অক্টোবর, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে যখন কলেজে পা রাখলাম, দু'চোখ ভরা ছিল হাজারো স্বপ্ন। নতুন বন্ধু, নতুন শিক্ষক, নতুন পরিবেশ: সবকিছুই ছিল রোমাঞ্চকর। কলেজ লাইফ যেহেতু ব্যস্ত এবং সংক্ষিপ্ত, তাই সবার সম্পর্কে গভীরভাবে জানা সম্ভব হয় না। কিন্তু কিছু মানুষ এমনভাবে আপনার জীবনে প্রভাব ফেলে যে তাদের ভুলে যাওয়া অসম্ভব। কামাল স্যার ছিলেন ঠিক এমনই একজন শিক্ষক। ফিজিক্স সেকেন্ড পেপার পড়াতেন তিনি। প্রথম দিকে কামাল স্যারকে আমি প্রচণ্ড অপছন্দ করতাম। কারণ ? তিনি ক্লাসে শুধু আমাকেই পড়া ধরতেন। সবার সামনে আমার দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যেত, যা মোটেও ভালো লাগত না।

স্যার যত প্রশ্ন করতেন, তার মধ্যে জ্যামিতি থাকতই। আর আমার দুর্বলতা ছিল ঠিক এই জ্যামিতিতে, বিশেষত উপপাদ্যে। স্কুল লাইফে কিছুটা ফাঁকি আর শিক্ষকদের অবহেলায় উপপাদ্য নিয়ে আমার বেশ সমস্যা ছিল। যদিও সম্পাদ্য দিয়ে সেটা কাভার করে এসেছিলাম। কিন্তু কলেজে উঠার পর কামাল স্যার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমাকে সেই জ্যামিতিতেই নিয়ে যেতেন, যা আমার জন্য অস্বস্তিকর ছিল।

স্যারের সাথে আমার প্রথম কনফ্লিক্ট হয় ফিজিক্স ল্যাবে। ফিজিক্সের ল্যাব টিচার ছিলেন থার্ড ক্লাস একজন লোক। তিনি কখনও সঠিকভাবে কাউকে কিছু বুঝাতেন না। তাঁর মনে হতো যে বেতন পান সেটা অনেক কম। কোনো স্টুডেন্ট তাঁর কাছে ব্যাচ পড়তে চাইত না। স্কুল লেভেলে আমাদের শিক্ষকরা ভালোভাবে ল্যাব ক্লাস নিতেন না। কেমিস্ট্রি ল্যাব ছিল আমার প্রচণ্ড পছন্দের জায়গা। ল্যাব ক্লাসে আমি সবসময় উপস্থিত থাকতাম। এখন ফিজিক্স ল্যাব ক্লাসে স্যারকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই তিনি শুনিয়ে দিতেন; "ভালো করতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে পড়। তোমাদের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছাড়া গতি নেই। তোমরা কিছুই পারো না।" তিনি নিজেও ন্যাশনাল থেকে পাস করা।

একদিন আমি ফিজিক্সের মূল শিক্ষক কামাল স্যারকে দেখে বোকার মতো ল্যাব টিচারের নামে কিছু কথা বলে ফেলি, যা সঠিক ছিল না। ফিজিক্স ল্যাব স্যার চরম অপমান বোধ করেন। সেদিন থেকে আমি কামাল স্যারের নজরে পড়ে যাই। স্যার ক্লাসে কাউকে পড়া না ধরলেও আমাকে ধরতেন। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয় যখন তিনি আমার গাইড টিচার হন। এবার আমার মার্কশিট এবং অ্যাটেনডেন্স দেখার সুযোগ তাঁর হাতে চলে আসে। চলতে থাকে আমার উপর জ্যামিতির চাবুক। আমি বাধ্য হয়ে ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত সকল উপপাদ্য নিয়ে আবার পড়া শুরু করি। ইউটিউব দেখে দেখে কিছুটা ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করি। কিন্তু স্যারের হাত থেকে মুক্তি নেই।

পরে ভাবলাম, স্যার বুঝি প্রাইভেট ব্যাচে যাওয়ার জন্য এমন করছেন। এক বন্ধুর সাথে স্যারের ব্যাচে গেলাম। স্যার কেবল বললেন, "এসো।" এরপর আমার দিকে ফিরেও তাকালেন না। ব্যাচে আমার পড়া তিনি ধরতেন না, কিন্তু কলেজে আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতেন । কামাল স্যার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে গ্র্যাজুয়েশন এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। আবার বুয়েট থেকেও ডিগ্রি নিয়েছেন। স্যারকে নিয়ে তাঁর বাবার মনেও দুঃখ ছিল: তিনি বিসিএস দিলেন না তাই।

আমার সাথে একই বেঞ্চে বসত এক ছেলে , শুভ। একদিন শুনি তার নাকি ক্যান্সার ধরা পড়েছে । ছেলেটার স্বপ্ন ছিল গেইম ডেভেলপার হবে। সারাদিন তার মুখে কেবল গেইমের গল্প। আমরা তার গেইম সেন্স দেখে অবাক হয়ে যেতাম। সেই ছেলেটার ক্যান্সার আক্রান্ত শুনে আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। চিন্তা করে দেখুন, আপনার একজন সহপাঠি যে আপনার সাথে একই বেঞ্চে বসত, কিন্তু কয়দিন পর সে আর বসবে না; এমনটা ভাবতেই কেমন লাগে। আমার রাতে ভয়ে ঘুম হতো না। শুভকে দেখতে আমরা মিরপুর বারো গিয়েছিলাম তার বাসায়। শুভর বাবা নেই। মা আর বড় ভাই আছে। বড় ভাই উত্তরা ব্যাংকে চাকরি করত। শুভর কন্ডিশন দেখে আমরা চমকে উঠি। নিষ্ঠুর ক্যান্সারের সাথে আমাদের বন্ধু যেন লড়াই করে হাঁপিয়ে গেছে। এই দৃশ্য দেখে আমার চোখে পানি চলে এলো।

একদিন যথারীতি কামাল স্যারের ব্যাচে প্রাইভেট ক্লাস করছিলাম। প্রায় ২০-২৫ জনের মতো একটা রুমে ক্লাস করতাম। বেশ বড় রুম ভাড়া করেছিলেন স্যার। সবাই তাঁর কাছে পড়তে চাইত কারণ তিনি আধুনিক জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষক ছিলেন। স্যার সবাইকে বললেন, "আগামীকাল তোমরা সবাই এই মাসের বেতন নিয়ে আসবা।" আমরা খুব অবাক হই। স্যার কখনও এমনভাবে বলতেন না। কেউ কেউ তাঁর বেতন মাসের বিশ তারিখে দিত। স্যার কিছু বলতেন না। একজন স্যারকে জিজ্ঞেস করে, "স্যার, আপনার কি কোনো সমস্যা?" স্যার বললেন, "না, আমার কোনো সমস্যা না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুভকে সাহায্য করব।" আমরা আরো অবাক হয়ে যাই। আরেকজন বলে উঠে, "কিন্তু স্যার, আমরা চাইলে স্কুলে টাকা উঠিয়ে দিতে পারি শুভর ট্রিটমেন্টের জন্য।"

স্যার রিপ্লাই করেন, "ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট ব্যয়বহুল। তোমাদের ১০/২০/৫০/১০০ টাকায় কিছু হবে না। তাছাড়া তোমরা আমাকে বেতন দিচ্ছ, আমি কারো কাছে চ্যারিটি চাই না। কেবল সবাই একদিনে বেতন দেবার চেষ্টা করবা।" মাসও শেষ হয়ে এসেছিল বলে ১৮-১৯ জন স্যারকে একদিনে বেতন দেয়। স্যার আমাদের বলে, "চাইলে আমার সাথে শুভর বাসায় যেতে পারো তোমরা।" কিন্তু পাচ জনের বেশি কেউ যেতে রাজি হলো না। এদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমি শুভর বাসা চেনায় বাকিদের গাইড করে নিয়ে গেলাম ।

আমার মাথায় কেবল একটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল: ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট করাতে কত টাকা লাগে? স্যারকে দেখে শুভর পরিবারের সবাই খুব অবাক হয়। শুভর অবস্থা ভালো না। কেমোথেরাপি দিতে দিতে মাথার চুল নেই। স্যার যখন টাকা দিতে চাইলেন, শুভর ভাই নিতে চাচ্ছিলেন না। স্যার বললেন, "আমার কাছে যারা প্রাইভেট পড়ে, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা শুভকে সাহায্য করবে। তাদের সরল মনে এভাবে আঘাত করা উচিত না।" শুভর ভাই টাকাটা নেয়।

আমাদের বন্ধু শুভকে বাঁচানো গেল না। তবে সেদিন আমি এক মহান হৃদয়ের মানুষের সন্ধান পেয়েছিলাম, যিনি উপর থেকে দেখতে খুবই কঠোর, কিন্তু ভেতরে একজন বড় মনের মানুষ। স্যারের কথা আমার আজও মনে পড়ে। এটা খুব বিরল ঘটনা যে কেউ তাঁর প্রাইভেট পড়ানোর এক মাসের টাকা পুরোটাই একজনের ট্রিটমেন্টের জন্য দিয়ে দিলেন। এই ভালো মানুষগুলোর জন্যই এখনও পৃথিবী সুন্দর। তবে শুভ মারা যাওয়ার ট্রমা যতদিন কলেজে ছিলাম, আমাদের সাথে ছিল। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে কামাল স্যারের মতো শিক্ষকদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। যিনি শুধু পড়াননি, জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়েছেন: মানবিকতার শিক্ষা।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:০৬
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অবশেষে ভোট দেশে

লিখেছেন সামিউল ইসলাম বাবু, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০৬



আমার বয়সে(৩০+) আজও সরকার নির্ধারণ বা নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি।

এখন প্রায় কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। তবুও নানা অজানা কারণে বিভিন্ন অনিশ্চয়তা ভোট হয় কি হয়না। সেদিন এক স্থানীয় পাতি নেতার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহার এবং আমার পর্যবেক্ষণ

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭

বিএনপির প্রতি আমার যথেষ্ট ভালোবাসা কাজ করে, এবং ভালোবাসা আছে বলেই আমি তার প্রতিটি ভুল নিয়েই কথা বলতে চাই, যাতে সে শোধরাতে পারে। আপনিও যদি সঠিক সমালোচনা করেন, সত্যকে সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

=যতই মোহ জমাই দেহ বাড়ী একদিন ঝরবোই=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৯



আমিও ঝরা পাতা হবো, হবো ঝরা ফুল,
রেখে যাবো কিছু শুদ্ধতা আর কিছু ভুল,
কেউ মনে রাখবে, ভুলবে কেউ,
আমি ঝরবো ধুলায়, বিলীন হবো,
ভাবলে বুকে ব্যথার ঢেউ।

সভ্যতার পর সভ্যতা এলো,
সব হলো এলোমেলো;
কে থাকতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা যেন পারষ্পরিক সম্মান আর ভালোবাসায় বাঁচি....

লিখেছেন জানা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪২



প্রিয় ব্লগার,

শুভেচ্ছা। প্রায় বছর দুয়েক হতে চললো, আমি সর্বশেষ আপনাদের সাথে এখানে কথা বলেছি। এর মধ্যে কতবার ভেবেছি, চলমান কঠিন সব চিকিৎসার ফলে একটা আনন্দের খবর পেলে এখানে সবার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালাদেশের নির্বাচনী দৌড়ে বিএনপি–জামায়াত-এনসিপি সম্ভাব্য আসন হিসাবের চিত্র: আমার অনুমান

লিখেছেন তরুন ইউসুফ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩



বিভিন্ন জনমত জরিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করে ৩০০ আসনের সংসদে শেষ পর্যন্ত কে কতটি আসন পেতে পারে তার একটি আনুমানিক চিত্র তৈরি করেছি। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×