
ঢাকার শীতের সকালটা একটু ঘোলাটে ছিল। রাজিব নূর ট্রেনে চড়ে বগুড়া যাচ্ছিল। হাতে একটা পত্রিকা, মাথায় অন্য কিছু। ট্রেনের জানালা দিয়ে মাঠ, গ্রাম, আর ধোঁয়াটে আকাশ পেরিয়ে যাচ্ছিল। রাজিব নূর ব্লগার। তবে সাধারণ ব্লগার নয়—সে এমন মানুষ যে প্রশ্ন করতে ভালোবাসে। সমাজ, ধর্ম, বিজ্ঞান, নৈতিকতা—সব কিছু নিয়েই তার কৌতূহল। আজ তার গন্তব্য মহাজাগতিক চিন্তার অফিস। মহাজাগতিক চিন্তা—নামটা শুনলেই মনে হয় দার্শনিক কিছু। আসলেও তাই। লোকটা কম্পিউটার প্রশিক্ষক, পাশাপাশি ইসলামিক চিন্তা, ফিকহ, দর্শন নিয়ে গভীর পড়াশোনা করেন। রাজিব তাকে চাচা ডাকে—শুধু বয়সে বড় বলে না, শ্রদ্ধা করে বলে।
বগুড়া স্টেশনে নেমে রিকশা করে রাজিব পৌঁছাল একটা পুরনো বাড়ির সামনে। নিচতলায় একটা ছোট্ট অফিস। দরজায় কাঠের প্লেটে লেখা—"মহাজাগতিক চিন্তা | ইসলাম ও সভ্যতা"। ভেতরে ঢুকে দেখল দেয়ালজুড়ে বইয়ের তাক, পুরনো মানচিত্র, আর টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাগজ। মহাজাগতিক চিন্তা চেয়ারে বসে একটা পুরনো বই পড়ছিলেন। রাজিবকে দেখেই হাসলেন। রাজিব ঢুকে সোজা টেবিলের দিকে গেল। টেবিলের উপর আজকের একটা পত্রিকা রাখা। শিরোনামটা চোখে পড়তেই সে থমকে গেল—"চীনে ৬২ বছর বয়সে মা হলেন এক নারী"।
রাজিব পত্রিকাটা হাতে তুলে নিল। মহাজাগতিক চিন্তা তাকালেন। রাজিব বলল, "চাচা, এই খবরটা দেখেছেন? ৬২ বছর বয়সে গর্ভবতী! এটা কি আল্লাহর নিয়মের বাইরে কিছু না?" মহাজাগতিক চিন্তা চশমা খুলে রেখে বললেন, "আল্লাহর নিয়মের বাইরে কিছু হয় না, রাজিব। কিন্তু মানুষ কোন নিয়ম বানিয়ে নিচ্ছে, কোন পথে হাঁটছে—ওটাই প্রশ্ন।" রাজিব একটু ভাবল। তারপর বলল, "কুরআনে স্পষ্ট বলা আছে: 'তিনি যাকে চান কন্যা দেন, যাকে চান পুত্র দেন, আর যাকে চান বন্ধ্যা করেন'। সূরা আশ-শূরার এই আয়াত। তাহলে এই বয়সে সন্তান নেওয়া কি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়া?"
মহাজাগতিক চিন্তা হালকা হাসলেন। বললেন, "এই আয়াতটা দিয়েই সুন্নি আর শিয়া দুই পথে হাঁটে। সুন্নি আলেমরা বলেন, বন্ধ্যাত্ব আল্লাহর সিদ্ধান্ত। চিকিৎসা থাকবে, কিন্তু সীমা ভাঙা যাবে না। নসাব বা বংশপরিচয় পরিষ্কার রাখতে হবে। তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ মানে বংশপরিচয়ে জটিলতা। আর শিয়া আলেমদের একাংশ বলেন, আল্লাহই মানুষকে চিকিৎসার জ্ঞান দিয়েছেন। চেষ্টা করাটাই তাওয়াক্কুলের অংশ। তারা বলেন, যৌন সম্পর্ক না থাকলে এটা জিনা নয়, এটা চিকিৎসা। তবে শিয়ার মধ্যেও গুরুতর দ্বিমত আছে।" রাজিব নূর টেবিলের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসল। বলল, "মানে শিয়া আলেমরা এই ঘটনাকে জায়েজ বলেন?"
মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "পুরোটা না। দেখো, ১৯৯৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একটি যুগান্তকারী ফতোয়া দেন। তিনি বলেন, ডিম্বাণু দান, শুক্রাণু দান, এমনকি সারোগেসিও জিনা নয়, কারণ এখানে শারীরিক সম্পর্ক নেই। এটা সম্পূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে তার শর্ত ছিল—দাতা ও গ্রহীতা উভয়কেই পিতৃ-মাতৃত্বের ধর্মীয় নিয়ম মানতে হবে। ডিম্বাণু দাতা জৈবিক মা, তার থেকে সন্তান উত্তরাধিকার পাবে। যে নারী ডিম্বাণু গ্রহণ করবেন, তিনি দত্তক মায়ের মতো। শুক্রাণু দানের ক্ষেত্রেও তিনি বলেন, সন্তান বন্ধ্যা পিতার নাম নেবে, কিন্তু উত্তরাধিকার পাবে জৈবিক পিতার কাছ থেকে।"
"কিন্তু," মহাজাগতিক চিন্তা থামলেন, "খামেনির এই ফতোয়া সব শিয়া আলেম মানেননি। লেবাননের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিয়া ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ মুহাম্মাদ হুসাইন ফাদলাল্লাহ খামেনির সাথে আংশিক দ্বিমত করেন। তিনি ডিম্বাণু দান মেনে নেন, কিন্তু শুক্রাণু দান প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ পুরুষের জিনগত অবদানে তৃতীয় পক্ষ ঢুকলে পুরুষতান্ত্রিক বংশপরিচয় ব্যবস্থা ধ্বংস হয়। আর ইরাকের আয়াতুল্লাহ সিস্তানি সম্পূর্ণভাবে সব ধরনের তৃতীয় পক্ষ দান নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তিনি সুন্নি অবস্থানের কাছাকাছি।" রাজিব একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, "সুন্নি দিকটা বলেন, চাচা। দেওবন্দ, আল-আজহার—ওরা কী বলে?"
মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "ওরা একদম পরিষ্কার এবং ঐক্যবদ্ধ। ১৯৮০ সালে মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম আন্তর্জাতিক ফতোয়া আসে। সেখানে বলা হয়, স্বামী ও স্ত্রীর শুক্রাণু ও ডিম্বাণু দিয়ে আইভিএফ সম্পূর্ণ জায়েজ। কিন্তু যেকোনো ধরনের তৃতীয় পক্ষ—শুক্রাণু, ডিম্বাণু, ভ্রূণ বা গর্ভাশয় দান—সব হারাম। কারণ এটা জিনার মতো, যদিও শারীরিক সম্পর্ক নেই। এটা বিবাহিত দম্পতির পবিত্র বন্ধনে তৃতীয় কাউকে ঢুকিয়ে দেওয়া। ১৯৮৪ সালে মক্কার ইসলামিক ফিকহ কাউন্সিল এই অবস্থান নিশ্চিত করে। দারুল উলূম দেওবন্দ, সৌদি আরবের ফতোয়া প্রতিষ্ঠান, ইন্দোনেশিয়া, মরোক্কো—সবাই একই কথা বলে। চার মাযহাব—হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি, হাম্বলি—সবাই এখানে একমত। তাদের যুক্তি, ইসলামে বংশপরিচয় রক্ষা করা মাকাসিদুশ শরিয়ার মৌলিক লক্ষ্য।"
রাজিব একটু মাথা চুলকাল। বলল, "কিন্তু চাচা, ধরেন একজন ছেলে তার তরুণ বয়সে শুক্রাণু ব্যাংকে নিজের শুক্রাণু রাখল। পরে বিয়ে করে স্ত্রীর সাথে সেই শুক্রাণু দিয়েই সন্তান নিল। এখানে তো তৃতীয় পক্ষ নেই!" মহাজাগতিক চিন্তা হাসলেন। বললেন, "চমৎকার প্রশ্ন। সুন্নি আলেমরা বলেন, যদি শুক্রাণু স্বামীর হয়, ডিম্বাণু স্ত্রীর হয়, আর গর্ভধারণ বিবাহের সময়কালে হয়—তাহলে কোনো সমস্যা নেই। বংশপরিচয় পরিষ্কার। কিন্তু তারা শুক্রাণু ব্যাংক তৈরি হতে দিতে চান না। তারা বলেন, যদি শুক্রাণু ব্যাংক সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে নৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। শুক্রাণু মিশে যাওয়ার ভয়, পরিচয় গোলমাল, অজাচার—এসব ঝুঁকি আছে। তাই তারা বলেন, সাদ্দুয যারিয়াহ—মানে ফিতনার দরজা আগেই বন্ধ করো।"
রাজিব নূর একটু ভাবল। তারপর বলল, "চাচা, এখানে তো পুরুষের(স্বামী/সঙ্গী) শুক্রাণু কেবল ব্যবহার হতে পারবে ? মানে স্ত্রীর ডিম্বাণু কিন্তু শুক্রাণু অন্য কারো হলে তো হবে না।" মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "একদম ঠিক। সুন্নি এবং শিয়া উভয়েই মূল নীতি হল, সন্তান গঠনের জন্য পুরুষ ও নারী উভয়ের জিনগত অবদান লাগবে। যদি স্বামীর শুক্রাণু ব্যবহার না করা হয়, তাহলে বংশপরিচয় অজানা হয়ে যায়। তখন উত্তরাধিকার, বিবাহ নিষেধাজ্ঞা, মাহরাম সম্পর্ক—সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। এমনকি খামেনি যদিও ডিম্বাণু দান অনুমোদন করেন, শুক্রাণু দানে তিনিও সতর্ক। কারণ ইসলামি সমাজে পুরুষতান্ত্রিক বংশপরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রাণু দাতার সন্তানের মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।"
রাজিব বলল, "তাহলে চীনের এই ৬২ বছরের ঘটনায় আসল প্রশ্নটা কী?" মহাজাগতিক চিন্তা একটু সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, "চমৎকার প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো—ডিম্বাণু কার? শুক্রাণু কার? বিবাহ কাঠামো আছে কি না? ৬২ বছর বয়সে নিজের ডিম্বাণু প্রায় অসম্ভব। সাধারণত ৫০-৫২ বছরে মেনোপজ হয়, তখন ডিম্বাশয় নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। মানে প্রায় নিশ্চিত দাতার ডিম্বাণু। যদি দাতার ডিম্বাণু ব্যবহার করা হয়, তাহলে সুন্নি দৃষ্টিতে এটা সম্পূর্ণ হারাম। কারণ জৈবিক মা তৃতীয় পক্ষ। শিয়ার মধ্যে খামেনির অনুসারীরা বলবেন, শর্তসাপেক্ষে বৈধ হতে পারে। যদি জৈবিক মা এবং আইনি মা আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়, উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু ফাদলাল্লাহ ও সিস্তানি বলবেন, এটা হারাম। আবার, খবরে স্বামী বা শুক্রাণুর উৎস নিয়ে কিছু বলা নেই। যদি স্বামীর শুক্রাণু হয়, তাহলে পুরুষ বংশপরিচয় ঠিক আছে। কিন্তু যদি দাতার শুক্রাণু হয়, তাহলে সুন্নি-শিয়া উভয়ের বেশিরভাগই এটা হারাম বলবেন।"
রাজিব নূর পত্রিকাটা টেবিলে রাখল। বলল, "চাচা, কুরআন কি কোথাও বলে, এই বয়সে সন্তান হবে না?" মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "না। বরং কুরআন বলে, 'তিনি যখন কিছু চান, বলেন—হও, আর তা হয়ে যায়।' সূরা ইয়াসীন। কুন ফায়াকুন। ল্যাব, ডাক্তার, প্রযুক্তি—কিছুই আল্লাহকে বাধা দিতে পারে না। ৬২ বছরেও যদি সন্তান হয়, সেটাও আল্লাহর ইচ্ছাতেই। কিন্তু কুরআন এটাও বলে, 'তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো।' সূরা আহযাব। এই আয়াতটাই সুন্নি আলেমদের ভিত্তি। তারা বলেন, পিতৃপরিচয় মানে জৈবিক পিতাকে চিনতে হবে। তৃতীয় পক্ষ ঢুকলে এই পরিচয় অস্পষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা নিষেধ করেন।"
রাজিব একটু মাথা নাড়ল। বলল, "মানে ঝামেলা আল্লাহর ক্ষমতায় না, ঝামেলা মানুষের তৈরি নৈতিক কাঠামোয়?" মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "ঠিক ধরেছো। সুন্নি বলেন, ঝুঁকি থাকলে দরজা বন্ধ। তারা নিয়মভিত্তিক। তারা মনে করেন, বংশপরিচয় মানে বিবাহ আর যৌন একনিষ্ঠতা। তৃতীয় পক্ষ ঢুকলেই নসাব সন্দেহজনক। তাই দাতার শুক্রাণু, দাতার ডিম্বাণু, সারোগেসি—সব নিষিদ্ধ। আর খামেনির শিয়া অনুসারীরা বলেন, ঝুঁকি থাকলেও ঘটনা ধরে বিচার। তারা ইজতিহাদে বিশ্বাসী—যুক্তি দিয়ে বিচার। তারা প্রশ্ন করেন, জৈবিক পিতা কে? গর্ভধারিণী কে? আইনি পিতামাতা কে? সব এক না হলেও ফিকহি সমাধান সম্ভব। তারা বলেন, জৈবিক উৎস আর আইনি দায়িত্ব আলাদা করা যায়। কিন্তু ফাদলাল্লাহ, সিস্তানি এবং অন্যান্য শিয়া আলেমরা বলেন, এত ভাগ করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা হবে।"
রাজিব নূর একটু গভীরভাবে ভাবল। বলল, "চাচা, তাহলে কুরআন কি কার পক্ষে?" মহাজাগতিক চিন্তা হাসলেন। বললেন, "সত্য কথা হলো, কুরআন কোন পক্ষের নাম নেয়নি। কুরআন দিয়েছে মূলনীতি—সৃষ্টি আল্লাহর। কুরআন দিয়েছে নৈতিক কাঠামো—পরিবার, নসাব, দায়িত্ব। সুন্নি ও শিয়া এই নীতির ব্যাখ্যায় আলাদা রাস্তা নিয়েছে। সুন্নি বলেন, আমরা পূর্বসূরিদের ঐকমত্য মানি। শিয়া বলেন, আমরা ইজতিহাদ করি, যুক্তি দিয়ে বিচার করি। কিন্তু শিয়ার মধ্যেও বিভক্তি আছে। দুটোই কুরআনের বাইরে নয়। পার্থক্য ফিকহি পদ্ধতিতে, মূল বিশ্বাসে না।"
রাজিব বলল, "চাচা, আরেকটা কথা। যারা খাবার দিবে, যারা শিশুকে পালবে, তারাই বাবা ও মা —এটা কি যথেষ্ট না?" মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "খুব শক্ত যুক্তি। তুমি বলছো, যত্ন আর দায়িত্বই পিতৃত্ব-মাতৃত্ব তৈরি করে। এটা আধুনিক নৈতিকতার মূল ধারণা। আজকের দুনিয়ায় দত্তক, সৎ পিতামাতা, পালক পিতামাতা—সবখানে এটাই চলছে। কিন্তু ইসলামে সন্তানত্বের ধারণা মূলত জিনগত ভিত্তিতে। যারা ডিম্বাণু বা শুক্রাণু দিয়েছে, তারাই জৈবিক পিতামাতা। এটাকে বলা হয় বংশপরিচয় বা নসাব। সুন্নি আলেমরা বলেন, জৈবিক পিতামাতাই আসল। সামাজিক পিতামাতা আলাদা হতে পারে, কিন্তু নসাব জৈবিকের সাথে যুক্ত। তবে তারা এটাও বলেন, যে শিশুকে লালন-পালন করবে, সে অবশ্যই দায়িত্বশীল অভিভাবক। তাকে কাফালাহ বলা হয়—অভিভাবকত্ব। কিন্তু জৈবিক পিতার পরিচয় থাকতে হবে। উত্তরাধিকার, বিবাহ নিষেধাজ্ঞা, মাহরাম সম্পর্ক—সব নসাবের উপর নির্ভর করে।"
বাইরে শীতের সূর্য ঢলে পড়ছিল। অফিসের জানালা দিয়ে আলো এসে টেবিলে পড়ছিল। রাজিব নূর একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, "চাচা, আজ বুঝলাম, এই ৬২ বছরের গর্ভধারণ আসলে চিকিৎসা খবর না। এটা ফিকহের আয়নায় মানুষ কেমন সমাজ চায়—সেই প্রশ্ন।" মহাজাগতিক চিন্তা হেসে বললেন, "এই প্রশ্নটাই লিখে ফেল, রাজিব। মানুষ খবর পড়বে, কিন্তু ভাববে খুব কম। তুমি ভাবাও।"
রাজিব উঠে দাঁড়াল। বলল, "চাচা, আরেকটা কথা। কুরআনে আর কোনো আয়াত আছে যেটা দিয়ে এই বিতর্ক বোঝা যায়?" মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "হ্যাঁ। সূরা আল-মুমিনূন। আল্লাহ বলছেন, 'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর নিরাপদ স্থানে রেখেছি।' বিরোধীরা বলেন, নিরাপদ স্থান মানে প্রাকৃতিক জরায়ু, ল্যাব নয়। সমর্থকরা বলেন, আয়াতে পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়নি, শুধু উৎস বলা হয়েছে। আইভিএফ-এও শুক্রবিন্দু আর ডিম্বাণুই ব্যবহার হয়, জরায়ুতেই ভ্রূণ স্থাপন করা হয়। ল্যাব শুধু মাধ্যম, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহই। আবার সূরা আন-নাজম-এ আছে, 'তিনি যুগল সৃষ্টি করেছেন—পুরুষ ও নারী—শুক্রবিন্দু থেকে, যখন তা নির্গত হয়।' বিরোধীরা বলেন, যখন তা নির্গত হয় মানে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক। সমর্থকরা বলেন, আয়াত বৈজ্ঞানিক উৎস বলছে, আইনগত পদ্ধতি নয়। শুক্রবিন্দু যেভাবেই নির্গত হোক, সৃষ্টি আল্লাহর ইচ্ছাতেই।"
রাজিব বলল, "তাহলে আসল সংঘাত কোথায়?" মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "কুরআন কোথাও বলেনি আইভিএফ হারাম। কুরআন জোর দিয়েছে নসাব পরিষ্কার রাখা, বিবাহ কাঠামো ভাঙা যাবে না। সুন্নি আলেমরা বলেন, স্বামী-স্ত্রীর শুক্রাণু আর ডিম্বাণু জায়েজ, দাতার শুক্রাণু বা তৃতীয় পক্ষ হারাম। এটা কুরআনের সরাসরি নিষেধ নয়, বরং কুরআনের নীতিকে রক্ষা করার ফিকহি ব্যাখ্যা। খামেনির অনুসারী শিয়ারা বলেন, জৈবিক উৎস আর আইনি দায়িত্ব আলাদা করা যায়। তাই তারা কিছু ক্ষেত্রে নমনীয়। কিন্তু ফাদলাল্লাহ, সিস্তানি সহ অধিকাংশ শিয়া আলেমও সতর্ক। তারা বলেন, জৈবিক পিতা, গর্ভধারিণী মা, আইনি পিতামাতা—সবাইকে চিহ্নিত করতে হবে। নাহলে সমাজে বিশৃঙ্খলা হবে।"
রাজিব বলল, "আর সুন্নি আর শিয়া ঠিক কোন জায়গা থেকে আলাদা হয়ে যায়?" মহাজাগতিক চিন্তা বললেন, "পার্থক্যের মূল জায়গা হলো নসাব বোঝার পদ্ধতি। সুন্নি পদ্ধতি নিয়মভিত্তিক। তারা বলেন, নসাব মানে বিবাহ আর যৌন একনিষ্ঠতা। তৃতীয় পক্ষ ঢুকলেই নসাব সন্দেহজনক। তাই দরজা বন্ধ। খামেনির অনুসারীদের পদ্ধতি ঘটনাভিত্তিক ইজতিহাদ। তারা বলেন, নসাব মানে জৈবিক উৎস আর আইনি দায়িত্ব। যদি নির্ধারণ করা যায় জৈবিক পিতা কে, গর্ভধারিণী মা কে, তাহলে আলাদা আলাদা হুকুম দেওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ শিয়া যেমন ফাদলাল্লাহ, সিস্তানি—বলেন, এত ভাগ করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা হবে। একই কুরআন, তিন ধরনের সিদ্ধান্ত : পার্থক্য ফিকহি পদ্ধতিতে, মূল বিশ্বাসে না।"
বগুড়ার সন্ধ্যায় আজান ভেসে এলো। রাজিব নূর উঠে দাঁড়াল। বলল, "চাচা, আজ যা শিখলাম তা লিখব।" মহাজাগতিক চিন্তা হাসলেন। বললেন, "লেখো। কিন্তু মনে রেখো, এটা ফতোয়া নয়। এটা দেখানোর চেষ্টা যে একই কুরআন, ভিন্ন পদ্ধতি, ভিন্ন সিদ্ধান্ত। প্রশ্ন করা মানে ঈমান হারানো নয়, বরং ঈমান গভীর করা।" রাজিব নূর বাইরে বেরিয়ে গেল। পকেটে পত্রিকা, মাথায় প্রশ্ন। বগুড়ার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবল, এই ৬২ বছরের গর্ভধারণ শুধু একটা খবর নয়। এটা একটা দর্শন, একটা বিতর্ক, একটা জিজ্ঞাসা—মানুষ কেমন সমাজ চায়? কোন নীতি মানবে? কোন সীমা রক্ষা করবে? প্রশ্নটা রয়ে গেল। উত্তর হয়তো এখনো তৈরি হচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




