somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রোকেয়া পদক ২০২৫: ঘৃণা আর পুরস্কারের এক অদ্ভুত সহাবস্থান

১৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে অনেক কিছু ঘটেছিল। কিছু আশার, কিছু উত্তেজনার, আর কিছু একেবারে হতবাক করে দেওয়ার মতো। হতবাক করার মতো প্রথমেই যে দৃশ্যটা চোখে পড়েছিল সেটা হলো তৌহিদি জনতার একটা দল বেগম রোকেয়ার ছবিতে কালি মাখিয়ে দিচ্ছে। পাশে লেখা "শাহ মা@গী"। প্রথমে ভেবেছিলাম চোখের ভুল দেখছি। তারপর ভাবলাম স্ক্রিনের সমস্যা। তারপর বুঝলাম না, দুটোই ঠিক আছে। এটাই সত্যি।

বেগম রোকেয়াকে গালি দেওয়া যায়, এই ধারণাটাই আমার মাথায় কোনোদিন আসেনি। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বোঝা যায় তৌহিদি জনতার রাগটা কোথা থেকে আসছে। বেগম রোকেয়া মেয়েদের পড়াশোনা শিখিয়েছেন। সেই মেয়েরা এখন চাকরি করছে, নিজের পছন্দমতো চলছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটা করছে সেটা হলো তৌহিদি জনতার ভালোবাসার প্রস্তাব রিজেক্ট করে দিচ্ছে। তৌহিদি জনতা নিজেদের আলফা মেল মনে করে। শিক্ষিত হোক বা না হোক, পুরুষ হওয়াটাই তাদের কাছে সর্বোচ্চ পরিচয়, সর্বোচ্চ যোগ্যতা। কিন্তু শিক্ষিত মেয়েরা সেই পরিচয়ে মুগ্ধ হচ্ছে না। এই অপমান সহ্য করার শক্তি তাদের নেই। তাই মূল সমস্যা খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গেছে বেগম রোকেয়াকে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুধু কালি মাখানোতেই থামেনি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও পরিবর্তন করার চেষ্টা হয়েছিল। ছাত্রদের তীব্র প্রতিবাদে সেটা হয়নি। কিন্তু এই পুরো সময়জুড়ে যে একটা বেগম রোকেয়াবিরোধী আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আর ঠিক এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বেগম রোকেয়া পদক দিল বেশ কয়েকজন নারীকে। উদ্যোগটা ভালো। কিন্তু পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় একটা নাম আছে যেটা নিয়ে বলাটা জরুরি। সেই নামটা হলো ডক্টর নাবিলা ইদ্রিস।

নাবিলা ইদ্রিস বর্তমানে গুম কমিশনের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি ক্যামব্রিজ থেকে পিএইচডি করেছেন। শুনতে দারুণ লাগছে তাই না? কিন্তু পিএইচডিটা কী বিষয়ে সেটা একটু জানা দরকার। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা নীতির রাজনীতি নিয়ে। গুম, মানবাধিকার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, এগুলোর সাথে এই বিষয়ের সম্পর্ক ঠিক কতটুকু সেটা বলার দায়িত্ব আমি পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম। তিনি চীন থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করেছেন। এরপর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত হয়েছেন বলে পরিচয় দেওয়া হয়। যদিও ব্র্যাকের নিজস্ব ফ্যাকাল্টি তালিকায় তাঁর নাম খুঁজে পাওয়াটা বেশ কঠিন কাজ। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে গুম বা মানবাধিকার বিষয়ে তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য কাজের প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি।

এরপর ঘটতে শুরু করলো একটার পর আরেকটা অবাক করার মতো ঘটনা। আগস্টে ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এলো। মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় নাবিলা ইদ্রিস গুম কমিশনের সদস্য। এর ঠিক বাইশ দিন পর আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানির বোর্ড ডিরেক্টর। একই সাথে সেই বোর্ডের প্রকিউরমেন্ট রিভিউ কমিটিতেও জায়গা। প্রকিউরমেন্ট রিভিউ কমিটি মানে শত শত কোটি টাকার চুক্তি অনুমোদন করার কমিটি। এই পদে আগে কে ছিলেন? বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন অধ্যাপক, যাঁর ৯০টিরও বেশি প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণাপত্র আছে। নাবিলা ইদ্রিসের বিদ্যুৎ বা প্রকৌশল খাতে কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও উল্লেখ থাকত। সেটা এখন পর্যন্ত খুজে পেলাম না

এতকিছুর পরে এলো ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেগম রোকেয়া পদক। মানবাধিকার ক্যাটাগরিতে। যে সরকার তাঁকে গুম কমিশনে বসিয়েছে, যে সরকার তাঁকে আশুগঞ্জের বোর্ডে বসিয়েছে, সেই একই সরকার তাঁকে পদকও দিল। এটাকে পুরস্কার বলা যায় নাকি প্যাকেজ ডিল বলা উচিত সেটা নিয়ে আমি এখনো ভাবছি। সরকারি কাজ করে যদি পদক পাওয়া 'যোগ্যতার মাপকাঠি' হয় তাহলে বাংলাদেশের আমলারা পদক পাওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন ।

এবার একটু অন্যদিকে তাকাই। সঞ্জিদা ইসলাম তুলির কথা মনে আছে? তাঁর ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ২০১৩ সালে র‍্যাব তুলে নিয়ে যায়। সেই থেকে তিনি "মায়ের ডাক" নামে গুমপীড়িত পরিবারগুলোকে একত্রিত করা শুরু করেন। মাত্র ৮টি পরিবার নিয়ে শুরু হয়েছিল। এখন প্রায় এক হাজার পরিবার এই প্ল্যাটফর্মে আছে। হাসিনা সরকারের আমলে যখন গুম নিয়ে কথা বলাটাই বিপদের কাজ ছিল, তখন তিনি জেনেভায় গিয়ে জাতিসংঘের সামনে সাক্ষ্য দিয়েছেন। নেদারল্যান্ডসের হিউম্যান রাইটস টিউলিপ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, যেটা বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মানবাধিকার পুরস্কার। তাঁর কাজ এখন অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়েও জায়গা পেয়েছে।

মানবাধিকার ক্যাটাগরিতে বেগম রোকেয়া পদক কার পাওয়ার কথা ছিল? এই প্রশ্নটা করলে যে কেউ এক সেকেন্ডে উত্তর দিতে পারবে। কিন্তু সঞ্জিদা তুলি পদক পাননি। কারণটা খুব জটিল নয়। তাঁর ভাই ছিলেন বিএনপির ওয়ার্ড নেতা, তিনি নিজেও বিএনপির টিকেটে নির্বাচন করেছেন। ইউনূস সরকারের কাছে তিনি সহজ ভাষায় "ভুল দলের" মানুষ। দশ বছরের কাজ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, পাঠ্যবইয়ে জায়গা, এসব দিয়ে পদক হয় না। পদক হয় রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে।

এখানেই ঘটনার সবচেয়ে মজার অংশটা আসে। তৌহিদি জনতা বেগম রোকেয়ার মুখে কালি মেখেছিল কারণ তারা শিক্ষিত নারীদের অগ্রযাত্রা সহ্য করতে পারে না। আর বেগম রোকেয়া পদক পেলেন নাবিলা ইদ্রিস, যাঁর স্বামী একজন সাবেক শিবির এবং বর্তমানে আপ বাংলাদেশের নেতা। অর্থাৎ তৌহিদি জনতার নিজেদের ঘরের মানুষ বেগম রোকেয়া পদক জিতলেন। তৌহিদি জনতার কি একটুও খারাপ লাগেনি? নিজেদের পছন্দের মানুষ যে নারীর মুখে তারা কালি মেখেছিল তাঁরই নামে পদক পাচ্ছেন, এটা কি তাদের কাছে বিজয়ের মতো ছিল? নাকি এই পদকটা দেওয়া হয়েছিল তৌহিদি জনতাকে একটু ঠান্ডা রাখার চেষ্টায়, একটু বার্তা দেওয়ার জন্য যে দেখো তোমাদেরই লোককে সম্মান দিচ্ছি?

কিন্তু ঠান্ডা হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে। এখন তৌহিদি জনতা প্রয়াত ওসমান গণি হাদির ডিপি লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্লাট শেমিং করে চলেছে। জাইমা রহমান থেকে শুরু করে একদম সাধারণ অপরিচিত নারী পর্যন্ত কেউ এই হেনস্তা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। রাজনীতি নেই, পরিচিতি নেই, কোনো কারণ নেই, শুধু নারী হওয়াটাই যথেষ্ট। বেগম রোকেয়া তাঁর সময়ে সমাজের বাধা ডিঙিয়ে মেয়েদের মানুষ হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। আর তাঁর নামের পদকটা যখন রাজনৈতিক বিতরণের মঞ্চ হয়ে যাচ্ছে, ঠিক একই সময়ে তাঁর স্বপ্নের মেয়েরা প্রতিদিন অনলাইনে নতুন নতুন কায়দায় অপমানিত হচ্ছেন।

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) যুদ্ধে আল্লাহ হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) পক্ষে ছিলেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:০৬



সূরাঃ ৫ মায়িদা, ৬৭ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭। হে রাসূল! তোমার রবের নিকট থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা’ প্রচার কর। যদি না কর তবে তো তুমি তাঁর রেসালাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভুলে যেও

লিখেছেন জিনাত নাজিয়া, ১৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০১

" ভুলে যেও "

একটু একটু করে চলে যাচ্ছি গভীর অতলে,
ধীরে সুস্থে হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছি
অনন্তকালের ঘরে।
যেখানে থাকতে হবে একাকি
নি:স্বীম আঁধারে।

ভালো থেক ফুল,পাখি, লতাপাতা,
ভালো থেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ আকাশ বলতে কিছু নেই

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪২

অনেক হয়েছে । আর না ।
সেই পরশু রাত থেকে । এক-দুই-পাঁচ-দশবার নয় । তিরাশিবার ! হ্যাঁ, তিরাশিবার ঈশিতার নাম্বারে ডায়াল করেও কোনো রেসপন্স পায় নি অলক ।
ওপাশ থেকে একটা নারীকণ্ঠ... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতিভুক বৈশাখী মেলা আর হালখাতা....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪১

স্মৃতিভুক বৈশাখী মেলা আর হালখাতা....

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালীর পহেলা বৈশাখ উদযাপন করার রীতিও বদলে গিয়েছে। অনেক ঐতিহ্য কালের গর্বে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আবার যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন রীতি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ- মেঘলা আকাশ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৩৮

তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস
সময় সন্ধ্যা ৭টা বেজে ৪০ মিনিট
জানালা থেকে ঐ বাঁ দিকে Lake Ontario -র জল আর আকাশের মেঘের মেলা মিলেমিশে একাকার


একটু আলোর রেখা
টরোন্টো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×