somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

স্মৃতিভুক বৈশাখী মেলা আর হালখাতা....

১৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্মৃতিভুক বৈশাখী মেলা আর হালখাতা....

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালীর পহেলা বৈশাখ উদযাপন করার রীতিও বদলে গিয়েছে। অনেক ঐতিহ্য কালের গর্বে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আবার যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন রীতি, যা অপসংস্কৃতির নামান্তর।

বৈশাখ ঘিরে সবারই আছে কিছু না কিছু স্মৃতি।
ছেলেবেলায় আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল- বৈশাখী মেলা। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি যেসব যায়গায় বৈশাখী মেলা বসতো তার মধ্যে অন্যতম কলাবাগান মাঠ, ধানমণ্ডি মাঠ, গ্রীন রোড স্টাফ কোয়ার্টার মাঠ এবং একটু দূরে আজিমপুর মাঠ পেরিয়ে পিলখানা ইপিআর/বিডিআর ২ নং গেইট পেরিয়ে আজিমপুর-পলাশী-ইডেন কলেজ থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত সড়কের উপর নানান ধরনের পসার। আজিমপুর কলোনি- অগ্রনী স্কুলের মাঠে বসতো চরকা...। তখনও চরকি জুয়ার প্রচল ছিলো।

পরিবারের বড়োদের হাত ধরে মেলায় যেতাম। মেলায় যেতাম খেলনা কেনার জন্য। মেলায় নানা ধরনের খেলনা, ঢোল, ডুগডুগি, পুতুল, তালের পাখা ইত্যাদি পাওয়া যেত। মাটির দুই চাকা লাগানো টমটম পাওয়া যেত, যেটা সুতা দিয়ে বেঁধে টেনে নিলে টমটম আওয়াজ হতো। আমার খুব প্রিয় ছিল এই খেলনাটি। মেলা থেকে আরো কিনতাম বাঁশের বাঁশি। বৈশাখী মেলায় পাওয়া যেতো মজার মজার খাবার। মোয়া, মুড়কি, খৈ, বাতাসা, তিলের নাড়ু, তিলের খাজা, আংগুল গজা, দানাদার, কদমা, কটকটি- আরো কতো কি! আমি তিলের খাজা খেতে খুব পছন্দ করতাম। আরেকটু বড় হওয়ার পর বৈশাখী মেলায় যেতাম বন্ধুদের সঙ্গে। তখন আমরা কিনতাম একতারা, লাটিম, খেলনা পিস্তল, বন্দুক, পটকা, তারাবাতি ইত্যাদি। আতসবাজিও পাওয়া যেতো, যা আমাদের ছোটদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।

আমার ছোটবেলা কেটেছে একান্নবর্তী পরিবারে। তখন মাঝেমধ্যে আমরা পরিবারের সবাই মিলে ঈদ এবং পহেলা বৈশাখ উপভোগ করতে কয়েক দিনের জন্য গ্রামে যেতাম। শহরে ঈদের আনন্দ ভালো লাগতো, আর গ্রামে ভালো লাগতো পহেলা বৈশাখের আনন্দ। চোখ বন্ধ করলে এখনও স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই গ্রামীন জীবনের মাঠ ঘাট আর বিলের ছবি। গ্রামে ছিল দাদার আমলের দোতলা বাড়ি। আর বাবা চাচারা বানিয়ে ছিলেন একতলা, দোতলা বিল্ডিং। গ্রামের মানুষ বিল্ডিং কে বলতো পাকা বাড়ি/ দলান বাড়ি। বিদ্যুৎ ছিলো না, রাতে হ্যারিকেনের আলোয় চলতো সব কাজ। তবে আমরা যখন দলবদ্ধ হয়ে গ্রামের বাড়িতে যেতাম তখন হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে গোটা বাড়ি আলোকিত করা হতো। অন্ধকারে আমরা ছোটরা যাতে ভয় না পাই সেজন্য আমাদের বাড়ি ছাড়াও পাশাপাশি জ্ঞাতি আত্মীয়দের বাড়িও হ্যাজাক লাইটে আলোকজ্জ্বল করা হতো। দিনের পড়ন্ত বিকেলে আমরা বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে গাছের ছায়ায় মাদুর বিছিয়ে বসতাম। সন্ধ্যা নামার আগেই হারিকেন আর হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে গোটা এলাকা আলোকিত করে দিতো। পাশের গ্রাম ছাড়াও দূর দুরন্ত থেকে আমাদের বাড়িতে লোকজন আসতেন। আমাদের গ্রামটি ছিল পুরোপুরি হিন্দু অধ্যুষিত। কিন্তু কোনো প্রকার ধর্মবিদ্বেষ বা বিভেদ ছিলো না।

পহেলা বৈশাখে আমাদের বাড়ি থেকে মাইল খানিক দূরে কয়েকটি গ্রামের পরে মেলা বসতো। একটি দীঘির চারপাশের পাড়ে তাল-শিরিশ গাছের ছায়ায় মেলা বসতো। গ্রামের লোকেরা মেলাকে বলতো 'থৌল'। দীঘির অনতিদূর বিশাল এলাকা জুড়ে মাঠ। সেই মাঠে মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিলো- ঘোড়ার দৌড়। ঘোড়ার দৌড় হতো বিকেলের দিকে। দূর দুরান্ত থেকে অজস্র মানুষ আসতো ঘোড় দৌড় দেখতে। মেলা চলতো ৩/৪ দিন। দোকানীরা পরশা সাজিয়ে বসতো- মাটির তৈজসপত্র, আসবাবপত্র এবং গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় কিছু খাবার সাজিয়ে। গ্রামের মানুষজন এগুলি কিনতে মেলায় ভিড় করতেন। মেলা থেকে সবাই জিলিপি, মটর ভাজা, ছোলা ভাজা, পাঁপড় ভাজা এসব কিনে আনতো।

বাংলা নববর্ষ ঘরে-বাইরে উৎসব-আনন্দের ফল্গুধারা বয়ে যাওয়া এ জনপদের আবহমান কালের ঐতিহ্য।
পয়লা বৈশাখ এলে মনে পড়ে ফেলে আসা ছোটবেলার দিনগুলোর কথা। বৈশাখী মেলার আরও একটি লোভনীয় আকর্ষণ ছিলো হালখাতা। ব্যবসায়ীদের নতুন হালখাতার সূচনায় বাংলা পঞ্জিকা এবং দেবদেবীর ছবি ওয়ালা ক্যালেন্ডার প্রাপ্তির আনন্দময় স্মৃতির আর গ্রামীণ মেলার কথা এখনো আমার চোখের সামনে ভাসে। সদ্য সাজানো দোকানগুলো সন্ধ্যায় হ্যাজাক লাইটের উজ্জ্বল আলোতে কী যে সুন্দর লাগতো। দোকানে ঢুকলেই দুটো রসগোল্লা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। আমাদের বাড়ির জন্য থাকতো স্পেশাল কিছু...হাড়ি ভর্তি রসগোল্লা, আমেত্তি বাতাসা....

ইংরেজি নববর্ষের আগ্রাসনে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা ছাড়া এখন কেউ পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষে আর হালখাতা করেনা। অন্যান্য বছরের মতো এবছর গতকাল এবং আজ নিউমার্কেটে জুয়েলারি দোকান ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসায়ীদের হালখাতা করতে দেখিনি। ফলে বাংলা লোকনাথ পঞ্জিকাও আর হাতে পাওয়া যায় না। তবুও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পয়লা বৈশাখ এলে ফেলে আসা জীবনের সেইসব আনন্দময় স্মৃতির কথা মনে পড়ে যায়। তখন অদ্ভুত এক নস্টালজিক ঘোরের মধ্যে পড়ে যাই। কিন্তু শৈশবের সেই নির্মল আনন্দ কিছুতেই ফিরে আসেনা।
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রিয়েলিটি আপনারা মাইনে নেন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩০



নরেন্দ্র মোদীকে আপনি যতই অপছন্দ করেন না কেন, তার একটা একটা প্রশংসনীয় গুণ আছে। সে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ নিতে এবং সেই অনুযায়ী নিজের অপছন্দের কাজটা করতেও পিছপা হয় না।
সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এভাবেই নাকি এখন চলে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



চাবি সহযোগে তালা খোলা অতিশয় সহজ
কিন্তু আজকাল প্রায়শই গুলিয়ে ফেলি তালগোল!
এটা নিয়ে নিত্য বাহাসে ভেঙে যায় পাখিদের পার্লামেন্ট!
অতঃপর গোপনে সেরে ফেলি সহজ বোঝাপড়া!

প্রতিদিন যে পথে আসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না।

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:২৬

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না। আর এগুলো কোন কিছুই তার বানানো না। একেকটির বয়স শত বছর থেকে কিছুর ইতিহাস হাজার বছরের ও।
যদিও সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদীর টানে, সবুজের গানে

লিখেছেন মাকার মাহিতা, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫

বয়ে চলে নদী দূর হতে দূরে,
অনন্তকালের শান্ত এক সুরে।
তার দুই কূলে রূপের মেলা,
সবুজ প্রকৃতির মিষ্টি খেলা।
হাওয়ায় দোলে ঘাস আর বন,
আকাশের সাথে মেলায় মন।
নদীর জলে আলোর ঝিলিক,
বাতাসে মেশে পাখির কিচিরমিচির।
গাছের ছায়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×