
ঈদ-উল-আজহার এই আনন্দের সময়ে যখন দেশের মানুষ কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ছুটির আমেজ উপভোগ করছেন, ঠিক তখনই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ শব্দটিকে কেন্দ্র করে নতুন নাটক শুরু হয়েছে। এটি আসলে রাষ্ট্রপরিচালনার একটি ভেতরের প্রক্রিয়া, যেখানে সরকারপ্রধান তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত দুই-তিনজনকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গোপন বৈঠক বা সিদ্ধান্ত নেন। এই বিষয়টি হঠাৎ সামনে আসার কারণ হলো, সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই কিচেন ক্যাবিনেটের মাধ্যমেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতেন। একই ধরনের ক্ষোভ ও অভিযোগ আমরা সাবেক উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন এবং আসিফ নজরুলের মুখেও শুনেছি, যা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের মূল ক্ষোভের জায়গা হলো, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকার সাথে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির সময়ে নাকি তাঁকে সম্পূর্ণ পাশ কাটানো হয়েছিল, তিনি কিছুই জানতেন না। তাঁর বদলে বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান (সাবেক উপদেষ্টা) তখন আড়ালে থেকে পুরো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তৌহিদ হোসেন তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে, যখন তাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তখন কেন চুপচাপ সব মেনে নিলেন আর এখন ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর সবাই সাধু সাজার চেষ্টা করছেন? সাধারণ মানুষ এখন তাঁদের এই কৈফিয়ত বা আফসোসের গল্প শুনতে আগ্রহী নয়। বড় প্রশ্ন হলো, তাঁরা নিজেরা কীভাবে এবং কার মাধ্যমে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দিয়েছিলেন? কার পছন্দে তাঁরা উপদেষ্টা হয়েছিলেন, সেই গোপন রহস্যনিয়ে তাঁরা কেউ আজ মুখ খুলছেন না।
তৌহিদ হোসেনের অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সংকটের সময়ে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া তাঁর জন্য নতুন কিছু নয়। তিনি ১/১১-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও অত্যন্ত প্রভাবশালী পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন এবং সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন নির্বাচন কমিশনার। ২০০৮ সালের সেই বিতর্কিত নির্বাচন, যেখানে বিএনপিকে মাত্র ২৯টি আসন দিয়ে রাজনীতি থেকে প্রায় ছিটকে দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ার সাথে তাঁরা গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। তাই আজ যখন তাঁরা সরকারের অনিয়ম নিয়ে কথা বলেন, তখন তাঁদের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বর্তমানে এই সাবেক উপদেষ্টা ক্ষোভ প্রকাশের পেছনে কোনো অপরাধবোধ নয়, বরং নিজের স্বার্থ জড়িত । তিনি নতুন চাকরির খোঁজে দৌড়ঝাঁপ শুরু করছেন। মেক্সিকোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৌহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জাতিসংঘে মানবাধিকার বিষয়ক সহকারী মহাসচিব পদের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও এবং প্রধান উপদেষ্টার সবুজ সংকেত পাওয়া সত্ত্বেও তৌহিদ হোসেনের বাধার কারণে তিনি এগোতে পারেননি। তৌহিদ হোসেন তাঁকে চিঠি দিয়ে আবেদন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। অথচ আজ সেই তৌহিদ হোসেন নিজেই নিজের জন্য জাতিসংঘে চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং নির্বাচিত সরকারের চারপাশে তোষামোদি করছেন। ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে একসময় যাঁরা বিএনপির নাম শুনলে নাক সিটকাতেন, আজ তাঁরাই নতুন সরকারের সুনজরে আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
তৌহিদ হোসেনকে ঘিরে চলমান এই আলোচনার উত্তাপ যখন চূড়ায়, ঠিক তখনই নাটকটি নতুন মোড় নিয়েছে। হঠাৎ করেই আরেক সাবেক তরুণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ আজকে দাবি করেছেন: তিনিও নাকি সেই রহস্যময় ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর অংশ ছিলেন না! যে আসিফ মাহমুদ এবং নাহিদ ইসলামদের হুংকারে একদা খোদ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পর্যন্ত তটস্থ থাকতেন, যাঁদের কথায় রাষ্ট্রের বড় বড় সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হতো, আজ তাঁরাও অবলীলায় গা ঝাড়া দিয়ে বলছেন যে তাঁরা নাকি সেই খাস দরবারের অংশ ছিলেন না! ক্ষমতার গদিতে থাকার সময় যাঁদের অঙ্গুলিহেলনে পুরো দেশ চলত, আজ তাঁরা কোন ভয়ে নিজেদের সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরাতে চাইছেন?
বিদায়ী পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে নিয়ে মুশফিকুল আনসারীর গুরুতর অভিযোগ-যুগান্তর

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


