somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জুলাই ভুলে গেছে সবাই, শুধু জুলাই ভোলেনি

২৯ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জুলাই কোটা আন্দোলনের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গত দুই বছরে দেশে অনেক কিছু বদলেছে। সমাজের অনেক কুৎসিত দিক নতুন করে সামনে এসেছে। অনেক মানুষকে নতুন করে চেনা গেছে যাদের সম্পর্কে আগে অন্য ধারণা ছিল। কিন্তু যেটা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়, সেটা হলো জুলাই নিয়ে অনলাইনে এনসিপি আর তাদের সমর্থকদের একটা যুদ্ধংদেহী মনোভাব। যেন জুলাই মাসটা তাদের পেটেন্ট করা, আর বাকি সবাই সেই পেটেন্ট লঙ্ঘন করে বেঁচে আছে।

এনসিপির মূল লক্ষ্য হলো জুলাই সনদকে বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের উপরে প্রাধান্য দেওয়া, জুলাইকে যেকোনো মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা এবং জুলাই আন্দোলনকে পুঁজি করে ব্যবসা করা। এনসিপি নেতা সারজিস আলমসহ আরও অনেকের কাছে জুলাই আর জুলাই সনদ হলো হামের টিকার চেয়েও প্রিয়। এখন পর্যন্ত সব ঠিকই আছে, মানুষের পছন্দের স্বাধীনতা আছে। সমস্যা হলো অন্য জায়গায়।

জুলাইতে যে কোটা আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়েছিল সেটা তারা জুলাইয়ের পর থেকেই বিলকুল ভুলে গেছেন। কোটা না মেধা রব তুলতে তুলতে ডিসি, এসপি এবং বিচারপতি এনসিপি কোটায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। আর এই কাজে সমর্থন ছিল প্রফেসর ইউনূসের। তিনি সরাসরি বলেছিলেন ছাত্ররা জীবন দিয়েছে তাই তারা যা চায় সব করতে পারে। কোটাবিরোধী আন্দোলনের জায়গায় নতুন কোটা চালু করাটা রীতিমতো একটা শিল্প হয়ে উঠে।

গত বারোই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত জোটকে ক্ষমতায় বসানোর সব রকম মেকানিজম বা কলকাঠি নাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা আর কাজে আসেনি। এদিকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরেই খুব চতুরতার সাথে জুলাই সনদের বেলুনটা পাংচার করে দিয়েছে। তারা এসেই আলী রিয়াজকে একেবারে খালি রিয়াজ বানিয়ে ছেড়েছে। বদিউল আলম মজুমদার সাহেব যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে নিজের এনজিও সুজনের জন্য দুই কোটি টাকা এনেছিলেন, সেই গোপন তথ্যও ফাঁস হয়ে গেল। জানা গেল, ওই টাকা নেওয়া হয়েছিল গণভোটে হ্যাঁ ভোটের প্রচার চালানোর জন্য।

বিএনপির যারা আছেন, তাদের কারোরই জুলাই মাস বা জুলাই সনদ নিয়ে কোনো সময় বাড়তি মোহ ছিল না। আর সত্যি বলতে, দেশের নব্বই শতাংশ সাধারণ মানুষের মনোভাবও কিন্তু একই রকম। দেশের এক পার্সেন্ট লোকও হয়তো ভালো করে বোঝে না যে গণভোট বা জুলাই সনদ জিনিসটা আসলে কী ছিলো। তবে সাধারণ মানুষ খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছিলো সংস্কারের নাম করে মূলত একটা মূলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো, যাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের ক্ষমতার মেয়াদটা ইচ্ছেমতো লম্বা করতে পারে। আমার নিজের ভোটকেন্দ্রের কথাই যদি বলি, সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ ঠিকমতো লিখতে কিংবা পড়তে পারেন না। তাদের সামনে ব্যালট পেপার দিলে আগে থেকেই হ্যাঁ ভোটের ঘরে টিক চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়।

বিএনপি ক্ষমতায় এসে যখনই নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দিকে মনযোগ দিল, অমনি তারা জুলাই সনদ থেকে বেশ কায়দা করে দূরে সরে গেল। তবে এটা নিয়ে তারা কিন্তু কোনো হৈচৈ বা চিল্লাচিল্লি করেনি, একদম চুপচাপ নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যেই যখন দেশে হাম রোগের প্রকোপ দেখা দিল, বিএনপি তখন হামের টিকা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

এখন ওই জুলাই সনদ কোন ফাইলের নিচে চাপা পড়ে ধুলো খাচ্ছে, তা আর কেউ জানেও না। এনসিপি বাহিনী এখন মুখে ফেনা তুলে বলছে যে বিএনপি নাকি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখানে জাতি বলতে তারা আসলে শুধু জামায়াত সমর্থকদেরই বোঝাচ্ছে। কারণ দেশের সাধারণ মানুষের খেয়েদেয়ে তো আর কাজ নেই যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে তারা নিজেদের প্রতারিত ভাববে।

সাধারণ মানুষের মাথায় চিন্তা করার মতো এর চেয়ে অনেক বড় বড় বিষয় আছে। এবার আসা যাক পলাতক আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকদের কথায়। তারা পারলে জুলাই মাসকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে মুছে দেয়। আওয়ামী লীগ এখন নিরপেক্ষ মানুষের ভঙ্গি ধরে বলার চেষ্টা করছে জুলাইয়ে তারা প্রতারিত হয়েছে, শেখ হাসিনার সাথে অন্যায় হয়েছে। তখন পাল্টা প্রশ্ন করতে মন চায় শেখ হাসিনার সাথে কীভাবে প্রতারণা হয়েছে? তিনি নিজেই তো কারো না কারো আশীর্বাদে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল একদম শূন্য। শতকরা দশ জনের মধ্যে আট জন আওয়ামী লীগ সরকারকে চোর সরকার বলত। এ কারণে মানুষ বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাত।

প্রবাসী রেমিট্যান্স একসময় দুই বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। আজ একক মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসছে। প্রবাসীরা এখন বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাচ্ছেন, আর কিছু চোরও প্রণোদনার লোভে পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বোধহয় এখন ওই পাচারকারী আর চোরদের কথাই দিনরাত ভেবে কাঁদছেন।

সরকার যখন জনসমর্থনহীন হয়ে পড়ে, তখন চারপাশ থেকে সবাই সুযোগ নেবে, এটাই তো দুনিয়ার চিরন্তন নিয়ম। আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরা এখন জুলাই আন্দোলনকে মেটিকুলাস ডিজাইন বলে প্রচার করছেন। অবশ্য তাদের এই দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ খোদ ডক্টর ইউনূস সাহেবই তো আমেরিকায় গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলে এসেছেন যে এটা একটা মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল।

তবে এ রকম উন্নত মানের ডিজাইন না হলেও, এর চেয়ে অনেক সস্তা আর থার্ড ক্লাস ডিজাইন কি আমরা আওয়ামী লীগকে করতে দেখিনি? বিনা ভোটে একশো তিপান্ন জন এমপি বানানোর কথা না হয় বাদই দিলাম, রাতের অন্ধকারে যেভাবে ভোট ডাকাতি করা হয়েছিল, কিংবা ডামি নির্বাচনের যে নাটক তারা সাজিয়েছিল, সেগুলো কি ডিজাইন ছিল না? আপনি যখন নিজে বিভিন্ন ফর্মে ডিজাইন করে বছরের পর বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইবেন, তখন আপনার ওপরেও যে একদিন অন্য কেউ একই রকম ডিজাইন অ্যাপ্লাই করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। হয়েছেও ঠিক তাই।

আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এখন কথায় কথায় ডীপ স্টেটের বদনাম করে বেড়ায়। অথচ এই ডীপ স্টেটের সাহায্য নিয়েই তারা ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মহাসুখে সিংহাসনে বসে ছিলেন। তখন কিন্তু ডীপ স্টেটকে তাদের একটুও খারাপ লাগেনি। ডীপ স্টেট আসলে আওয়ামী লীগের বিরোধী দলগুলোকে পছন্দ করত না বলেই এদের এত বছর সহ্য করে গিয়েছিল।

কিন্তু যখনই স্বার্থের সংঘাত দেখা দিল, ডীপ স্টেটও সময়মতো এদের টিস্যু পেপারের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিল। আওয়ামী লীগ এখন আবার হঠাৎ করে খুব সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দল সেজে গেছে। তারা এখন দারুণভাবে আমেরিকা বিরোধী হয়ে উঠেছে এবং সারাদিন প্রচার করছে যে আমেরিকা নাকি বাংলাদেশকে গোলাম বানানোর চুক্তি করছে। এই বিষয়টাকে পুঁজি করে তারা এখন নতুন করে জনমত গড়ার সস্তা চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের ভাবখানা এমন যে এখন যদি মানুষ তাদের আবার ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়, তবে তারা আমেরিকার সাথে সব চুক্তি বাতিল করে দেশকে রক্ষা করবে। তারা প্রতিদিন নতুন নতুন রূপকথা ছড়াচ্ছে যে শেখ হাসিনা নাকি আমেরিকাকে টেক্কা দিয়ে দেশ বাঁচিয়েছিলেন।

অথচ যে আমেরিকার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তারা ক্ষমতার মধু খেলেন, আজ তাকেই ভিলেন বানাচ্ছেন। তাছাড়া ২০০৮ সালে তারা যে বিশাল মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, সেটা কার আশীর্বাদে হয়েছিল, তা তো সবারই জানা। এবার তারা শুধু মুখই ফিরিয়ে নেয়নি, একেবারে পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে।

এই পুরো ঘটনার ভেতরে যদি একটা সত্যি বিষয় থেকে থাকে, তবে তা হলো দেশের সাধারণ মানুষ। যাদের শাসন করার জন্য এই রাজনৈতিক দলগুলো সারাদিন কামড়াকামড়ি করে, সেই জনগণের আসলে এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকাই ছিল না। মানুষের বিশ্বাস বড়জোর দুর্বল হয়, কিন্তু আন্দোলন করে সরকার ফেলার মতো ক্ষমতা বা সচেতনতা এখনো এ দেশের আমজনতার তৈরি হয়নি।

জুলাই নিয়ে এখন কেবল জামায়াত, এনসিপি আর আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ তেমন কোনো মাথাব্যথা দেখাচ্ছে না। কারণ দেশের সাধারণ মানুষের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম, এলপিজি গ্যাস আর রান্নার তেলের বাজারের যে আগুন, সেখানে আওয়ামী লীগ বা এনসিপি কারও মুখের কথাই কোনো কাজে আসে না।

জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই মানুষ বলা শুরু করেছিল যে এর পর কী হবে, সামনে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলই আজ পর্যন্ত জনগণের সামনে একটা পরিষ্কার বা ভবিষ্যৎমুখী ভিশন তুলে ধরতে পারেনি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তাই এখন এনসিপি আর আওয়ামী লীগের ফাঁকা অনলাইন হইচই আর কাদা ছড়াছড়িতে কান না দিয়ে, মুখ বুজে নিজেদের রুটি রুজির লড়াই করে যাচ্ছে।

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:০৯
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ কোরবানি দেয়, আর কারও পুরো জীবনটাই কোরবানি হয়ে যায়...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:১৩

কেউ কোরবানি দেয়, আর কারও পুরো জীবনটাই কোরবানি হয়ে যায়...

আজ কোরবানির ঈদ। চারদিকে উৎসব, আনন্দ, কোলাহল। ঘরে ঘরে কোরবানির মাংস, আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা, শিশুদের হাসি। কিন্তু এই রাজধানীরই কোনো এক কোণে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“গাম্ভী”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২৮ শে মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০



বছর চার-পাঁচ আগের ঘটনা। পরিবারের সবার ছোট হওয়া সত্ত্বেও তখন নানা গঠনমূলক বিষয়ে আমার গ্রহণযোগ্যতা বেশ তুঙ্গে। কুরবানির ঈদের কয়েক দিন আগে গরু কেনা নিয়ে বাসায় আলোচনা চলছিল।
সেই সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই জঙ্গী

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে মে, ২০২৬ রাত ১১:৪৮



শেখ হাসিনার সাথে মূলত প্রতারণা করা হয়েছে।
প্রতারণা করা হয়েছে বাংলাদেশের সাথে। জুলাই জঙ্গীরা নিজেদের জুলাই যোদ্ধা ভাবে। যুদ্ধ কার সাথে করেছে? যুদ্ধ করেছে, পুলিশদের সাথে। তারা পুলিশ হত্যা করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই রাতে চাই কিছু আত্মহত্যা আর অ্যালকোহল

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ১:৩৭


বনলতা সেন যারা দেখতে এসেছিল, তারা অনেকেই শেষ করে বের হন নি। প্রথম ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই একটি পরিবার চলে যায়। তারা সম্ভবত বনলতা এক্সপ্রেস মনে করে দেখতে এসেছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই ভুলে গেছে সবাই, শুধু জুলাই ভোলেনি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮


জুলাই কোটা আন্দোলনের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গত দুই বছরে দেশে অনেক কিছু বদলেছে। সমাজের অনেক কুৎসিত দিক নতুন করে সামনে এসেছে। অনেক মানুষকে নতুন করে চেনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×