
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা দেখানো হবে। পারিবারিক সিনেমা। সেন্সর বোর্ড থেকে পাস করা। নাম "বনলতা এক্সপ্রেস।" ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ঈদের আনন্দে মানুষকে একটু সিনেমা দেখাতে চাইল। এতটুকুই ছিল ঘটনা । এদিকে কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদ ঘোষণা দিল, সিনেমা দেখানো যাবে না। ফেসবুকে প্রচারণা শুরু হলো। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগে হল দিয়েছিল, পরে সেই অনুমতি কেড়ে নিল। প্রশাসন সহযোগিতা করল না। শেষমেশ সিনেমা বন্ধ। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে না, কসবায় যখন দ্বিতীয়বার চেষ্টা করা হলো, সাত গাড়ি পুলিশ পাঠিয়ে সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হলো। একটা পারিবারিক সিনেমা ঠেকাতে সাত গাড়ি পুলিশ লাগল। চিন্তা করা যায়?
এই ঘটনার দুইদিন পর মানববন্ধন হলো। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে এলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বললেন, যে রাষ্ট্র শিশু ধর্ষণ বন্ধ করতে পারে না, সে রাষ্ট্র সিনেমা বন্ধ করতে এত তৎপর কেন? তিনি বললেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলো সংস্কৃতি ও ধর্মের সহাবস্থান। তিনি বললেন, এই দেশ কোনো একটি গোষ্ঠীর সম্পত্তি না। কথাগুলো সুন্দর। মানুষ তাই হাততালি দিল। কিন্তু একটু থামা যাক।
রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি জনগণের ভোটে জিতেছেন। তার হাতে ক্ষমতা আছে, পরিচিতি আছে, প্রশাসনের সাথে কথা বলার সুযোগ আছে। ঘটনা যেদিন ঘটল সেদিন তিনি কোথায় ছিলেন? ঘটনার দিন কি একটাও ফোন করেছিলেন জেলা প্রশাসককে? কওমী গোষ্ঠীর হুমকির বিরুদ্ধে কি একটাও বিবৃতি দিয়েছিলেন? সিনেমা বন্ধ হওয়ার আগে কি একবারও বলেছিলেন, "এটা বন্ধ হতে দেব না" ? না। ঘটনা ঘটে গেল। সিনেমা বন্ধ হয়ে গেল। তার দুইদিন পর মানববন্ধনে এসে সুন্দর সুন্দর কথা বললেন। এটাকে বলে পপুলিজম । কথায় সাহস, কাজে নীরবতা।
মজার বিষয় হলো, মানুষ তাকে বাহবা দিচ্ছে। "কী সুন্দর কথা বললেন!" "কত সাহসী নেত্রী!" সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার হচ্ছে। এই বাহবাই আসলে সমস্যার গোড়া। কারণ এই বাহবা পেলে একজন রাজনীতিবিদের কাজ না করেও চলে। কথা বললেই ভোট আসে, তাহলে কাজ করতে যাবে কেন? এখন একটাই প্রশ্ন বাকি থাকে। রুমিন ফারহানা কি তার নিজের এলাকায়, সরাইল বা আশুগঞ্জের যেকোনো একটা স্কুলে, এই সিনেমার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করবেন? নিজে উপস্থিত থাকবেন? প্রশাসনকে নিরাপত্তা দিতে বলবেন? কওমী গোষ্ঠী বাধা দিলে আইনি ব্যবস্থা নেবেন?
এই একটা কাজ করলে প্রমাণ হয়ে যায় যে তিনি সত্যিকারের নেত্রী। না করলে প্রমাণ হয়ে যায় যে মানববন্ধনটা ছিল শুধুই রাজনৈতিক আইওয়াশ ।মানববন্ধন হলো সাধারণ মানুষের হাতিয়ার। যাদের কোনো ক্ষমতা নেই, কোনো পরিচয় নেই, শুধু গলা আছে, তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। এটা তাদের শেষ অস্ত্র। একজন সংসদ সদস্যের হাতে সেই অস্ত্র ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে। সেগুলো ব্যবহার না করে রাস্তায় দাঁড়ানো মানে ক্ষমতা থাকতেও অসহায় সেজে থাকা। এটা অভিনয়, প্রতিবাদ না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ সংস্কৃতিপ্রেমী। এই জেলা থেকে উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো মানুষ বের হয়েছেন। সেই জেলায় আজ সিনেমা দেখানো যায় না। সিনেমা হল নেই। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো চাপে আছে। ২০২১ সালে সঙ্গীতাভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল।এই অবস্থায় একজন এমপির দরকার ছিল যিনি বলবেন, "আমি আছি, ভয় নেই।" শুধু কথায় না, কাজে। সেটা হয়নি। পরিবর্তে মানববন্ধন হয়েছে। ফেসবুকে শেয়ার হয়েছে। আর সিনেমা বন্ধই আছে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০২৬ রাত ২:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



