
দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছবি আঁকার সিদ্ধান্তটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। বলছি না যে তাদের ছবি আঁকা যাবে না। তবে সরকারের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডানপন্থী অংশের সাংস্কৃতিক রুচি সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকলেও বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথের ছবি তাদের বিশেষ পছন্দ হওয়ার কথা নয়। তারা রবীন্দ্রনাথকে কটাক্ষ করে রঠা ডাকে। সেই রঠাকে আবার সরকারি উদ্যোগে দেয়ালে আকাঁ হচ্ছে। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত।
ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটাও ভাবার বিষয়। আজকাল সবকিছু এমনভাবে ঘটছে যে মনে হয় কোথাও একটা রিমোট কন্ট্রোল আছে। কখন কোন বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হতে হবে, কখন কার মুখে কালি মাখাতে হবে, কখন কোন বিষয় নিয়ে জাতীয় বিতর্ক শুরু করতে হবে, সব যেন আগে থেকেই ঠিক করা। তবে দেয়ালে কয়েকজন কবি সাহিত্যিকের ছবি আঁকাকে কেন্দ্র করে এত বড় কেচ্ছা হওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত বুদ্ধিজীবী ব্রাত্য রাইসুর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি আঁকা হবে কেন? রবীন্দ্রনাথ তো ভারতীয় কবি। তার পরিবর্তে হুমায়ূন আহমেদ কিংবা বাংলাদেশের অন্য কোনো কবি সাহিত্যিকের ছবি আঁকা যেত। বাংলাদেশের কোনো কবি সাহিত্যিকের ছবি কি ভারতের দেয়ালে আঁকা হয়? হয় না। তাহলে দেশে রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার এত আগ্রহ কেন? এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। এমনকি রবি ঠাকুরের ছবি ঘন ঘন আকাঁ হলে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথও নাকি তৈরি হতে পারে।
এরপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় আগুন জ্বলে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকা হবে কি হবে না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জাতীয় পর্যায়ের তর্ক-বিতর্ক। এতদিন আমরা জানতাম রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। এখন নতুন একটি সম্ভাবনার কথা জানা গেল। কোনো রাজনৈতিক দল চাইলে রবীন্দ্রনাথের ছবির সাহায্যেও ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি থাকলে সেই ছবির আড়াল দিয়ে আওয়ামী লীগ কখন ঢুকে পড়ে, বলা তো যায় না।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এ ধরনের রাজনৈতিক বয়ান অবশ্য নতুন নয়। পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের ভাবধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এমন আপত্তি তুলতেন। তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রধান সমস্যা ছিল তার ধর্মীয় পরিচয় এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক। এখন যারা একই ধরনের যুক্তি সামনে আনছেন, তাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গেও মুসলিম লীগের পুরোনো রাজনীতির বেশ মিল পাওয়া যায়। সময় বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, রাজনৈতিক দলের নাম বদলেছে। শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আপত্তির ধরনটা খুব একটা বদলায়নি।
পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে শাসকগোষ্ঠীর অস্বস্তির ইতিহাস আমাদের অজানা নয়। রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীতকে বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে আলাদা করার চেষ্টাও হয়েছে। বাংলা ভাষার সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিয়ে পাকিস্তানি শাসকদের অজ্ঞতা ও অবজ্ঞার কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। অথচ রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেই রবীন্দ্রনাথকে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা পাকিস্তান আমলেও সফল হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে আবার সেই পুরোনো বিতর্ক ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন পড়ছে কেন ?
বিএনপির রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা কখনো প্রধান বিষয় ছিল না। সম্ভবত সে কারণেই শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে তার ছবি আঁকা নিয়ে সরকারের বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু জামায়াতের রাজনীতিতে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নটি একটু আলাদা। রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে তাদের আপত্তির ইতিহাস আছে। জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবিও বিভিন্ন সময়ে ইসলামপন্থী মহল থেকে উঠেছে। ফলে রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে আপত্তি ওঠাটা খুব অপ্রত্যাশিত নয়। অপ্রত্যাশিত হলো, সেই আপত্তিকে কেন্দ্র করে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদেরও নতুন একটি সাংস্কৃতিক সংঘাতের মধ্যে টেনে আনা।
জুলাই আন্দোলনের তরুণদের নিয়ে সরকার আসলে কী ভাবছে, সেটা বোঝা কঠিন। একদিকে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি মাখানোর মতো ঘটনায় তাদের পরিচয় সামনে আসছে। অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মাহদীকে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে। আবার সরকারের প্রতিমন্ত্রী ভিপি নুর প্রশ্ন তুলছেন, হাদি কেডা ? ওসমান হাদির কবর কাজী নজরুল ইসলামের পাশে দেওয়া উচিত হয়নি বলেও মন্তব্য করছেন। এসব কথা এখন বলার প্রয়োজন কী? হাদিকে বারবার টেনে এনে নতুন বিতর্ক তৈরি করারই বা দরকার কী? সরকার আসলে কী করতে চায়, কী বলতে চায়, সেটা সম্ভবত সরকারের কাছেও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
তবে রবীন্দ্রনাথ বিতর্কের একটা উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে। একই দিনে সরকারি চাকরির একটি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। প্রায় তিন লাখ পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এসেছিলেন। শেষ মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার পর পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। এত মানুষের যাতায়াতের খরচ, থাকা খাওয়ার খরচ, সময় এবং মানসিক প্রস্তুতি এক মুহূর্তে নষ্ট হয়ে গেল। যারা দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় এসেছিলেন, তাদের অনেকেই হয়তো ধারদেনা করে এসেছেন। তাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
কিন্তু আশার কথা হলো, পরীক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগ নিয়ে আমাদের খুব বেশি সময় নষ্ট করতে হয়নি। রবীন্দ্রনাথ যথাসময়ে উদ্ধার করতে এসেছেন। তিন লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যতের চেয়ে একজন মৃত কবির ছবি দেয়ালে থাকবে কি থাকবে না, সেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে, পরীক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে গেছেন। এসব নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। আপাতত রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি মাখানো হয়েছে কেন, সেটার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নির্ধারণ করা জরুরি।
রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন, এমন একটি পুরোনো দাবিও আবার সামনে এসেছে। ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাব থাকলেও দাবিটির জনপ্রিয়তা কমেনি। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রতীক, তিনি বাংলাদেশের মানুষের আপনজন নন, এ ধরনের কথাও বলা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন ১৯৪১ সালে। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে ১৯৪৭ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে। অথচ এত বছর পরেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের একটি বড় অংশের দায় তার ওপর চাপানো যাচ্ছে। একজন কবির রাজনৈতিক প্রভাব এত দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।
আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা হওয়া দরকার। শিল্পকলা একাডেমি কিংবা অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে কার ছবি আঁকা যাবে, কার ছবি আঁকা যাবে না, সেটা আগে থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা যেতে পারে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর, সত্যজিৎ রায়, হুমায়ূন আহমেদসহ প্রত্যেকের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হবে। যার ব্যাপারে আপত্তি থাকবে, তার ছবি আপাতত স্থগিত রাখা হবে। এতে জাতীয় ঐকমত্য বজায় থাকবে।
চাইলে একটি স্থায়ী কমিটিও গঠন করা যেতে পারে। কমিটির কাজ হবে দেয়ালে ছবি আঁকার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, জন্মস্থান, সাহিত্যকর্ম এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব পরীক্ষা করা। বিশেষ করে কোনো মৃত কবি বা সাহিত্যিকের ছবি ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারে কি না, সেটা যাচাই করা জরুরি। কারণ দেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই।
তবে এই কমিটির কার্যক্রম যেন সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হলে আবার পরীক্ষা নেওয়া যায়। পরীক্ষার্থীরা আবার ঢাকায় আসতে পারেন। আবার টাকা খরচ করতে পারেন। তাদের বয়স শেষ হয়ে গেলে সেটাও ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু দেয়ালে ভুল মানুষের ছবি আঁকা হয়ে গেলে জাতির যে সাংস্কৃতিক ক্ষতি হবে, সেটা পূরণ করা কঠিন।
আমাদের সমাজে এখন দরকারি আলোচনার চেয়ে বে-দরকারি আলোচনা অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ, নিত্যপণ্যের দাম, গ্যাসের সংকট, বিদ্যুতের বিল কিংবা কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর। এসব সমস্যার সমাধানও সহজ নয়। তার চেয়ে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক করা সুবিধাজনক। এখানে প্রত্যেকেই নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন। কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও দিতে হয় না।
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, রবীন্দ্রনাথ নিজে আর কোনো প্রতিবাদ করতে পারবেন না। ফলে তার পক্ষে বিপক্ষে যত খুশি কথা বলা যায়। জীবিত তিন লাখ পরীক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে মৃত একজন কবিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনেক নিরাপদ। সম্ভবত সে কারণেই আমাদের জাতীয় আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের গুরুত্ব এত বেশি। তিন লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা আবার কবে হবে, সেটা এখনো অনিশ্চিত। তবে রবীন্দ্রনাথের বিচার ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আমাদের অগ্রাধিকারের জায়গাটা অন্তত পরিষ্কার।
ফটোকার্ড ক্রেডিট : ফ্রাইডে পোস্ট
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




