বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আবারো সরব ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকনোমিস্ট। প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনেই স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান, যুদ্ধাপরাধের বিচার, গুম, রাজনৈতিক হয়রানি এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা। প্রতিবেদন দুটি গত শনিবার ইকনোমিস্টের মুদ্রিত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
‘দ্য প্রাইম মিনিস্টার সেটস দ্য কান্ট্রি অন এ ডেঞ্জারাস পাথ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ১৮ মাস আগেই বাংলাদেশের রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য সরকার বিরোধীদলীয় নেতাদের জেলে পাঠাচ্ছে, গুম ও হত্যাকা- চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে বিরোধীদল। কার অধীনে আগামী নির্বাচন হবে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা এ নিয়েই চলছে বিতর্ক। ইতিমধ্যে, বাংলাদেশিরা উচ্চ দ্রব্য ও জ্বালানি মূল্য, বিদ্যুৎ সংকট ও রাস্তাঘাট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে সমস্যাগ্রস্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেত্রী খালেদা জিয়া বলছেন, সবকিছুর জন্য সরকার দায়ী। মাসখানেক আগে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করা হয়েছে। সম্ভবত তিনি হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। আরো দুইজনকে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপি’র ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ নেতাসহ ৩ হাজারের মতো কর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য এটা করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশে একজন সৌদি কূটনীতিক খুন হয়েছেন, একজন শ্রমিক নেতাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। দুই জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন, গত জানুয়ারিতে সেনা অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা হয়েছিলো বলে গুজবও রয়েছে। এছাড়া ড. ইউনূসকে হেয় করার চেষ্টাতো রয়েছেই।
সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা অনেক বড়। সম্প্রতি রেলমন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগে দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছে। এসব ঘটনায় গণতন্ত্র টিকে থাকা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বলেছে, আগামী নির্বাচন অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক হতে হবে যাতে বিরোধী দল অংশগ্রহণ করে। অনেকেই বলছেন, ভারতের মনোভাবেই বোঝা যাবে কোন দল আগামীতে ক্ষমতায় আসবে। সম্প্রতি ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জী বাংলাদেশ সফর করেছে। সে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে সময় গ্রীষ্মের পর খালেদা জিয়া ভারত সফর করার কথা জানিয়েছে। সে ভারতকে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবেই আখ্যা দিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণের জন্য ভারতবিরোধী প্রচারণা চালায় দলটি।
শেখ হাসিনা যদি আরো কঠোর হয় তবে জনগণ আস্তে আস্তে তার বিরুদ্ধে চলে যাবে। বিএনপি ইতিমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ করছে, জুনে গণবিক্ষোভ মিছিলের হুমকি দিচ্ছে। এর ফলে রাজনীতিতে আরো মেরুকরণ ও বিতর্কের সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশে জনকল্যাণের সকল সূচকে উন্নতি হচ্ছে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ অব্যাহত থাকলে এক দশকের আগেই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও উৎপাদন বৃদ্ধির পথে বাধা দূর করা ও সামাজিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের একাগ্র মনোযোগ। এর পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার রাস্তাঘাটের শোচনীয় অবস্থার মতো রাজনীতিতেও জ্যাম লেগেছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মাঝে সংশয় বাড়ছে। তারা বলছেন- সামনে কঠিন, সহিংসপূর্ণ সময় আসছে। অন্য কারো বদলে দোষারোপ চালককেই করতে হবে। ‘হ্যালো দিল্লি, ইট ইজ আপ টু ইন্ডিয়া টু ট্রাই টু স্টপ শেখ হাসিনা রুইনিং’ বাংলাদেশ শীর্ষক অপর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুতুল নাচের অনুষ্ঠান চলছে। গত কয়েক দশক ধরে এ দুই নেত্রী পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। তাদের ক্ষমতার পালাবদলে পরিবর্তন খুব সামান্যই হয়েছে, যে কারণে বহির্বিশ্ব কম সময়ই দেশটির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। সম্প্রতিকালে অতি সাধারণ বিষয় নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে দেশটির ১৬ কোটি মানুষের জীবন হুমকিতে পড়েছে। এসব মানুষের ভাগ্য নিয়ে কোন আগ্রহই দেখায়নি রাজনৈতিক নেতারা।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার শাসনকাল ছিলো নিষ্ঠুর চৌর্যবৃত্তিসুলভ। এরপর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে। এ বিপুল জনসমর্থনকে শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা দৃঢ় করা এবং প্রকৃত ও কল্পনাপ্রসূত শত্রুদের নির্মূলে ব্যবহার করেছে। আকস্মিকভাবে দেশে গুমের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মাসেই ভাঙচুর ও গাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনায় বিরোধীদলের ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ নেতাকে আটক করে জেলে পাঠানো হয়েছে।
ইতিমধ্যে সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের দুরবস্থা ও ভীতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গত বছর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পদ্ধতি বাতিল করেছে। এটা আদর্শ কোনো ঘটনা নয়। ২০০৭ সালে বিএনপিও তাদের নিজেদের অধীনে নির্বাচন করার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু এর পরিণতি শুভ হয়নি। যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা না থাকে তবে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না। এ অবস্থায় আরো বেশি বিক্ষোভ, সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে।
বহির্বিশ্ব এ অবস্থায় তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সন্দেহমূলক দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে একটি বড় সেতু (পদ্মা) নির্মাণে অর্থ প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রসঙ্গত: উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ইংল্যান্ডের দ্য ইকোনোমিস্ট এর প্রতিবেদন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি জাতীয় দৈনিক খুব গুরুত্বের সাথে ছেপেছে। এবং সরকারী দল ও বেসরকারীদল তথা সাধারণ জনগণও গভীর মূল্যায়ন করেছে। দ্য ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদনে বর্তমান সরকারের সমালোচনা যা করা হয়েছে- তা অনেকাংশেই সঠিক একথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দেশের কথা নিজের কথা অপরের মুখে শুনে আন্দোলিত হওয়ার হীনম্মন্যতা কেন আমাদের?
দেশবাসী হিসেবে এত সংকীর্ণমনা কেন আমরা?কোথায় আমাদের স্বাধীনতার চেতনা?কোথায় আমাদের স্বাতন্ত্রবোধ?কোথায় আমাদের স্বকীয়তাবোধ?কোথায় আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য?কোথায় আমাদের নিজস্ব অনুভব ও উপলব্ধি?
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে বিতর্কিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ফ্যালাপ এর বরাতে প্রচার করা হয়েছে যে, শেখ হাসিনার সরকারের জনপ্রিয়তা শতকরা ৭৭ ভাগ। বলাবাহুল্য বাস্তবতার সম্পূর্ণ উল্টো এ প্রতিবেদন সাধারণের অন্তরে কেবল হাস্যরোল আর ঘৃণারই উদ্রেক করেছে।
একথা ঠিক দেশের বাস্তবতা সীমান্ত পেরিয়েও বহুদূর বহুদেশে চলে যায়। কিন্তু বাইরের দেশ কী বলে, বাইরের জরিপ কী লিখে তার উপর নির্ভর করে চলার মনোবৃত্তি সরকার এবং জনগণ উভয়েরই পরিহার করা আবশ্যক। তবে ইকনোমিস্টের প্রতিবেদনে এক গভীর পরিতাপের এবং প্রতিবাদের বিষয় প্রকাশিত হয়েছে।
ইকনোমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে একটিমাত্র দেশ ভারতের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বাংলাদেশের উপর। ইসলামী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কারণে এখন পর্যন্ত ভারত শেখ হাসিনার বাড়াবাড়ি মেনে নিচ্ছে। যদি প্রতিবেশী দেশটিতে (বাংলাদেশে) গণতন্ত্রকে ক্রিয়াশীল দেখতে চায় তবে অবশ্যই ভারতকে জোর গলায় সে কথা বলতে হবে।
সঙ্গতকারণেই আমরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের খেলাপ ইকোনোমিস্টের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। মূলত: বর্তমান সরকারের ভারতের প্রতি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই ইকোনোমিস্টের এরূপ মন্তব্য করা সহজসাধ্য হয়েছে। তদুপরি বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে হলে ভারতকে উচ্চকিত হতে হবে। ইকোনোমিস্টের এ গর্হীত এবং ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্যেরও চরম প্রতিবাদ করছি। আমি মনে করি বিষয়টি সম্পর্কে এক্ষুনি সরকারেরও উচিত গভীর প্রতিবাদ জানানো এবং নিজেদের শক্ত অবস্থান স্পষ্ট করা।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০১২ দুপুর ১২:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


