দেশে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। কারণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিকূল দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ সামনের দিকে রয়েছে। ব্যবসা-বানিজ্যের বিকাশ ঘটছে না ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে না। এমন অবস্থার মধ্যেও দেশে গণহারে গ্রাজুয়েট উৎপাদন চলছে।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সবচেয়ে বেশি গ্রাজুয়েট আর সবচেয়ে বেশি বেকার বের হয় এখান থেকে। প্রাইভেট সেক্টরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন হারিয়েছে অনেক আগেই। সরকারি খাতেও তাদের অংশগ্রহণ কমছে। নবম গ্রেডের পদগুলিতে এখন একশজনে দুই-তিন জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পায়। পাবে কিভাবে ভাইবা বোর্ডে যারা থাকেন সেই পাবলিকের শিক্ষকরাই কথায় কথায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অপমান করেন। নিম্নমানের শিক্ষা, অসুস্থ ছাত্র রাজনীতি আর সেশনজট নিয়ে কোন রকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। মাঝেমধ্যে মনে হয় সরকার শুধুমাত্র দলীয় কর্মী তৈরির জন্যই এখনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চালু রেখেছে।
প্রাইভেট ভার্সিটিগুলি এখন বেশ জনপ্রিয়। আগে শুধু উচ্চবিত্তরা পড়লেও এখন মধ্যবিত্তরাও এখানে পড়ছে। প্রাইভেট ভার্সিটিগুলির কয়েকটা আসলেই ভালো। বাকিগুলি কোম্পানির কামলা তৈরির কারখানা। প্রাইভেটের কিছু স্টুডেন্ট মেধাবী হয়, তারা আইবিএ, পাবলিক ভার্সিটির বিজনেস ফ্যাকাল্টি থেকে পাস করে ভালো চাকরি করে। যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা বিদেশি নামীদামী প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি এনে উচ্চপদে চাকরি করছে। বাকিদের জায়গা হচ্ছে নামীদামী কোম্পানিগুলির বেনামী পদে। রিলেশনশিপ অফিসার, টেরিটরি এক্সিকিউটিভ, মিডিয়া অফিসার ইত্যাদি আকর্ষণীয় নামে ১৫-২০ টাকা বেতনে তদেরকে চাকরি দেয়া হচ্ছে। ৪-৫ বছর আগেও এসব পোস্টে এইচএসসি পাস নিয়োগ দেয়া হতো আর এখন বিবিএতে সিজিপিএ ৩.৭৫ পাওয়ারা চাকরি করে।
এবার আসি পাবলিকে। ছোট একটা দেশে ৩৯ টা পাবলিক ভার্সিটি। তারপরেও তুমুল প্রতিযোগিতা করে মেধাবীরা এখানে পড়ার সুযোগ পায়। পাবলিকের বিজনেস গ্রাজুয়েটদের সরকারি বেসরকারি সবখানেই ব্যাপক ডিমান্ড। সাইন্সের ছাত্রদেরও অনেক চাহিদা রয়েছে। চাহিদা কম মানবিকের অথচ সেখানেই আসনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ইংরেজি, অর্থনীতিসহ হাতেগোনা কয়েকটা বিভাগ বাদে বাকিদের সরকারি সেক্টর বাদে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই কম। তারা নিজেরাও ভালো করেই জানে। অনার্স ফার্স্ট ইয়ার থেকেই শুরু হয় তাদের চাকরির প্রস্তুতি। পাবলিকের শিক্ষকরা যতই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অপমান করুক না কেন ন্যাশনাল ভার্সিটি আছে বলেই এসকল ছাত্ররা চাকরির সুযোগ পাচ্ছে। কারণ প্রতিবছর বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে অনেক নিয়োগ হয়। বিসিএস পরীক্ষার মান্ধাতা আমলের ইনফরমেটিভ প্রশ্নে এগিয়ে থাকলেও মানবিকেরা ব্যাংকের এনালিটিকাল প্রশ্নে বিজ্ঞান আর ব্যবসায় শিক্ষার কাছে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে। অফিসার, অফিসার ক্যাশ পদে অনেকে নিয়োগ পেলেও সিনিয়র অফিসার পদে এখন তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সরকারি চাকরির সুযোগ পাচ্ছে অল্প কয়েকজন। বাকিরা স্কুল শিক্ষক, এনজিওকর্মী ও কোচিংব্যবসায়ী হচ্ছে। ঢাবি থেকে পড়ে কেউ পুলিশের এসআই হবে কয়েক বছর আগে এটা অকল্পনীয় হলেও এখন অহরহ হচ্ছে। পড়ালেখা শুধু চাকরির জন্য না, কোন কাজই ছোট না – এগুলি হল ফাঁকা বুলি। সর্বচ্চো প্রতিষ্ঠান থেকে পড়েও প্রতিষ্ঠিত না হতে পারার কষ্ট ভুক্তভুগিই বোঝে। সংস্কৃতি, পালি, উর্দুর মতো অপ্রয়োজনীয় কিছু বিভাগ এখনো চালু রাখা হয়েছে। কর্মসংস্থান বাড়ছে না, হলের সিট বাড়ছে না, শিক্ষার মান বাড়ছে না তারপরেও বছর বছর ভার্সিটির আসন সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। একজন ছাত্রের পিছনে সরকারে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। পাঁচ বছর পড়াশুনা শেষে সে যদি বিদ্যা কাজেই লাগাতে না পারে তাহলে তা হবে মেধা আর সম্পদের অপচয়।
চীনে একবার ভার্সিটিতে তালা ঝুলিয়ে যুব সমাজকে আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। বাংলাদেশেও সেই সময় চলে এসেছে। গণ্ডায় গণ্ডায় প্রাইভেট ভার্সিটি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সীমিত করে কারিগরিতে ছাত্রদের অংশগ্রহণ বাঁড়াতে হবে। পাবলিকের অপ্রয়োজনীয় বিভাগগুলি বন্ধ করতে হবে বা আসন কমিয়ে আনতে হবে, বছর বছর ভার্সিটিগুলিতে আসন বাড়ানোর অসুস্থ চর্চা বাদ দিতে হবে, সান্ধ্যকালিন কোর্সের নামে শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। শুধুমাত্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে এমন ছাত্ররাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে। সবার গায়ে গ্রাজুয়েট ট্যাগ লাগানোর প্রয়োজন নেই। কারণ যে যাই বলুক একবার গ্র্যাজুয়েট ট্যাগ লাগলে এদেশে একজনের পক্ষে যেনতেন কাজ করা কঠিন।
এ লেখা পড়ে অনেকে অখুশি হতে পারেন। তবে এটিই বাস্তবতা। যারা সম্প্রতি চাকরি পেয়েছে বা চাকরির চেষ্টা করছে তারা ঠিকই বুঝছে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৫:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




