somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার পর তিনি লক্ষ্য করেন যে, এই পরিচয়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এবং এখন তারা নিজেদের 'আদিবাসী' (Indigenous) বলে পরিচয় দিচ্ছে।

আদিবাসী হওয়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড:
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে (যেমন: উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড) আদিবাসীদের যে স্বীকৃতি রয়েছে, তার পেছনে চারটি প্রধান শর্ত কাজ করে: কলোনিয়াল দখলদারিত্বের ইতিহাস, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, সার্বভৌমত্ব হারানো এবং আন্তর্জাতিক আইনে প্রান্তিক হিসেবে স্বীকৃতি। কিন্তু এই মানদণ্ডগুলো এশিয়া বা আফ্রিকার সব গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয় অর্থাৎ তারা এই সঙ্গার মধ্যে পরেনা।

জাতিসংঘের ভূমিকা ও বিভ্রান্তি:
একটি বড় ভুল ধারণা হলো জাতিসংঘ কোনো জনগোষ্ঠীকে 'আদিবাসী' হিসেবে লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট দেয়। বাস্তবে এমন কোনো আদালত বা মাস্টার লিস্ট নেই। জাতিসংঘ কেবল কিছু নির্দেশিকা (যেমন: মার্টিনেজ কোবো স্টাডি বা 'থ্রি-আই টেস্ট';) অনুসরণ করে। শুধু নিজে নিজেকে আদিবাসী দাবি করলেই আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতি পাওয়া যায় না।

আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি:
UNDRIP (২০০৭) এবং ILO 169-এর মতো আন্তর্জাতিক সনদে অনেক দেশই স্বাক্ষর করেনি, কারণ এতে 'স্বাধিকারের অধিকার' (Self-determination) এবং 'ফ্রি প্রায়র অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট' (FPIC)-এর মতো ধারা রয়েছে। এই ধারাগুলো কোনো রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, খনিজ সম্পদ এবং সীমান্ত সুরক্ষার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে ILO 107 অনুমোদন করলেও, বর্তমানের জটিল আইনি ফাঁদগুলোতে পা দেয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস:
ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা এবং কুকি-চিন গ্রুপের মাইগ্রেশনের ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, এরা বিভিন্ন সময়ে (১৫০০ থেকে ১৯০০ শতকের মধ্যে) বার্মিজ যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেছে। তাই একদলকে 'আদিম বাসিন্দা' আর অন্যদলকে 'বহিরাগত' বলা ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ।

রাজনীতি ও এনজিওর প্রভাব:
১৯৯০-এর দশক থেকে বিশেষ করে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর থেকে 'পাহাড়ি' বা 'জুম্মা' পরিচয়ের পরিবর্তে 'আদিবাসী' শব্দটির ব্যবহার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বাড়ছে। এর পেছনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিও ও ফান্ডিং নেটওয়ার্কের ভূমিকা রয়েছে, যা মানবাধিকারের মোড়কে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে।

রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক অবস্থান:
বাংলাদেশ সরকার ও সংবিধান কেন 'বাংলাদেশে আদিবাসী নেই' বলে অবস্থান নিয়েছে, তার চারটি কারণ রয়েছে:
১. সাংবিধানিক অবস্থান: সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সবাই বাংলাদেশি এবং ২৩(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
২. জাতীয় নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক আইনের 'স্বাধিকার' ধারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদের উস্কানি দিতে পারে।
৩. ভূমির অধিকার: আদিবাসী মর্যাদা দিলে সামরিক বা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয়দের অনুমতির বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
৪. বাঙালি এথনোজেনেসিস: বাঙালি জাতি নিজে হাজার বছরের মিশ্রণে গঠিত, তাই কাউকে একক আদিবাসী তকমা দিয়ে অন্যদের বহিরাগত বানানো অবাস্তব।

পরিশেষে, রাষ্ট্র কোনো আবেগ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-খণ্ডের অখণ্ডতা বজায় রাখার স্বার্থেই এই সংবেদনশীল বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।



Del H K এর বিশ্লেষণ থেকে সারসংক্ষেপ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৮
৭টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাকে দিয়ে সেলস হবে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫

আমাকে বাংলাদেশের এক ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি তাদের সেলসে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। কোম্পানি ভালো, বাজে কোন রেকর্ড নেই। আমার কাজ হচ্ছে, আমার পরিচিত মানুষদের সাথে তাদের মার্কেটিং টিমের যোগাযোগ করায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যাটারিচালিত রিকশা , তিন-চাকার যানবাহন ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকা সুরক্ষা এবং সিসা-দূষণরোধ বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাব।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮


বাংলাদেশের নগর ও শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি-বাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন-চাকার যান ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খরচের পরিবহন, বিপুলসংখ্যক চালক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×