
ঢাকা থেকে রাজশাহী শহর যাচ্ছেন, আপনার হাতে দুই ঘণ্টা সময় আছে আপনি কী করবেন? রাজশাহী সিল্ক শপিং নাকি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ ডুব দেবেন ? একজন ভ্রমণ পিপাসু হিসেবে আমি আজ বেছে নিলাম রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি ভ্রমণ। কিভাবে কোথায় যাবেন সেসব অনলাইনে পেয়ে যাবেন আমি শুধু আমার সাথে আপনাদের নিয়ে ঘুরে আসব উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এই দৃষ্টিনন্দন রাজবাড়ি। স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব এক নিদর্শন এই পুঠিয়া রাজবাড়ি যার নকশা ইন্দো ইউরোপীয় স্থ্যাপত্যের আদলে। ১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবীর সময়কালে তৈরি এই এই স্থাপত্য চত্বরটি ৪ দশমিক ৩১ একর আয়তনের জমির উপর প্রতিষ্ঠি। এই প্রাসাদপম ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন, উনার শাশুড়ি মহারানি শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে। রাজশাহী থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে পুঠিয়া রাজশাহীর অন্তর্গত প্রাচীন ও সম্ভান্ত এলাকা। পুঠিয়া বাজার থেকে এর দূরত্ব দের কিমি' র মত চলার পথে শুরুতেই শিব মন্দির এর পর দোল মন্দির পার হয়ে দেখা মিলে রাজবাড়ির ।

জমিদার পরেশ নারায়ন এর স্ত্রী মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবী। এই একটা ব্যাপার কিন্তু এই রাজবংশের ব্যপারে প্রনিধান যোগ্য। কেউ রাজার নাম না জানলেও মহারানী ব্যক্তিত্ব দানশীলতা সামাজিক কাজের মাধ্যমে ইতিহাসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রজাবৎসল দানশীলতায় শুধু পুঠিয়া নয় সমগ্র রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের মনে রয়ে গেছেন মহারানী। অনেকক্ষণ থেকেই আমার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিলো বলা হচ্ছে জমিদার, কিন্তু বাড়ির নাম রাজবাড়ি এবং জমিদার পত্নীর নাম মহারানী ? কেন ? সেই প্রশ্নের উত্তর পেলাম উইকি ঘেঁটে, যদিও এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার পীতাম্বর, পরবর্তীতে পীতাম্বরের উত্তরপুরুষ নীলাম্বর মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে রাজা উপাধি লাভ করার পর থেকেই এই রাজবংশ এবং বাড়ি রাজবাড়ি নামে প্রসিদ্ধ হয়। সপ্তদশ শতকে মুঘল আমলে বিভিন্ন রাজবাড়ি র মাঝে পুঠিয়া রাজবাড়ি ছিলো প্রাতীনতম ।

পুঠিয়া রাজবাড়ি যা পাচঁআনি জমিদার বাড়ি নামেও পরিচিত, সেটা মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবীর বাস ভবন। তবে আমি যেখান থেকে ভ্রমণ শুরু করেছি, সেটা মূলত জমিদারদের প্রশাসনিক ভবন। সিংহ দরোজার ঢুকতেই রথ যাত্রার রথ সাজানো দেখতে রেলাম। পাশেই দোতালায় যাবার সিড়ি, ৩০টাকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবার পর সেখান থেকেই আমি একজন গাইড পেয়ে গেলাম। প্রাসাদের নীচ তলার রয়েছে ১২টি কক্ষ, সামনের অংশ এবং পিছনের পুরো ভবন মিলিয়ে দ্বিতীয় তলায় ১৫টি যা এখন প্রায় পুরোটাই জাদুঘর হিসেবে প্রদর্শনীর জন্য খোলা। সিড়ি বেয়ে উঠতেই লম্বা টানা ব্যালকনির নকশা দেখে মন ভালো হয়ে গেলো, সফেদ ভবনের সিড়ি কোঠা, রেলিং নকশা সবকিছুতেই মুগ্ধ। উপর তলায় কারুকাজ করা জোড়া থাম আর দুপাশেই সেই ইউরোপিয়ান ধাঁচের ঝুলবারান্দা।

আজকাল মনে হচ্ছে সংস্কার করা হয়েছে, সে জন্য আরও ভালো লাগছিল। জাদুঘরে রাজবাড়ির নিজস্ব সম্পদের মাঝে বেশকিছু সিন্দুক দেখতে পেলাম,


এই ভবনের সামনের স্তম্ভ অলংকরন, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়ালে ও দরজার উপর ফুল ও লতাপাতার চিত্রকর্ম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর পরিচয় বহন করে। রাজবাড়ীর ছাদ সমতল, ছাদে লোহার বীম, কাঠের বর্গা এবং টালির ব্যবহার এর মোহনিয়তা বাড়িয়েছে।


নীচের তলার কক্ষ গুলোর ব্যবহার অনুযায়ী এর যে অবস্থান বেশ ইন্টারেস্টিং লাগলো আমার কাছে- যেহেতু রাজবাড়ি লিখিত ইতিহাসে দেখা যায় হেমন্তকুমারি দেবী উনার শাশুড়ি মহারানী শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে নির্মাণ করেছিলেন এর ভবন, সেই ভবনে জলসা ঘরের মাহাত্ম্য টা বুঝতে পারলাম না। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রবেশ মুখের ডানপাশে নাচ ঘর এবং বামের পুরোটা জুড়ে টর্চার সেল, সেখানে রয়েছে ৪০০ বছরের পুরানো কারাগার অন্ধকূপ, বিশাল পানির চৌবাচ্চা যেখানে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হত এবং সর্বশেষে ফাঁসি মঞ্চ।


শোনা যায় - যেহেতু মহারানী হেমন্ত কুমারী গোবিন্দ ভক্ত ছিলেন রাধার মত উনিও অস্ট সখী নিয়ে চলতেন, স্নানে যেতেন সখিদের নিয়ে। আহ্নিক মন্দিরে স্নান শেষে সরাসরি যেতেন। রাধারানীর ডাকে শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন, অস্টসখী নিয়ে রাধারানী কৃষ্ণ কে মোহিত করতে নৃত্য করেছিলেন। সেই দৃশ্যকে পোড়া মটির ফলকে তুলে এনে সাজিয়েছেন আহ্নিক মন্দিরের দেয়ালে। রাজপরিবারের অন্দর মহল থেকে রাধা গোবিন্দ মন্দিরে আসবার একটা ছোট্ট পথ রয়েছে সেখানে রয়েছে বিশাল এক তুলসী মঞ্চ।
ঐ দরজা দিয়ে মহারানী হেমন্ত কুমারী প্রতিদিন এসে সান্ধ্য প্রদীপ জ্বালাতেন। এর পাশের লক্ষ্মী মন্দির ও এবং সেবায়িতদের থাকবার ভবনগুলো প্রায় বিলিন অবস্থায় আছে।

পাঁচ আনী জমিদার বাড়ির ভেতরে রয়েছে ৪০০ বছরের পুরানো গোবিন্দ মন্দির রাধাকৃষ্ণ বা রাধা গোবিন্দ মন্দির যে কৃষ্ণ সেই নাকি গোবিন্দ। এই মন্দিরে পোড়া মাটির অসংখ্য কাজ যা কি-না কান্তজীর মন্দিরের সদৃশ্য রয়েছে।


এই রাজবাড়িতে ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বড় শিব মন্দির বা ভূবনেশ্বর মন্দির।শিব মন্দির বিশাল শিবলিঙ্গ রয়েছে কষ্টিপাথরে নির্মিত বলা হয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় সেটি, তবে সেটার কোন ঐতিহাসিক দলিল নেই। ভূমি থেকে বেশ উচুতে নির্মান করা হয়। টানাবারান্দা ঘেরা রয়েছে এর চারিপাশে মাঝে গর্ভগৃহ। এটাকে পঞ্চরত্ন মন্দির ও বলা হয় চারদিকে চারটি ছোট চূরা মাঝে পাচঁ নাম্বারটি বৃহৎ চূরা নিয়ে গঠিত বলে। সেখান থেকেই দেখা যাবে রথ মন্দির যা এক গম্ভূজ বিশিস্ট, যা আমরা দূর থেকে রাজবাড়ি প্রবেশের সময় শুরুতেই দেখেছি। পাশের দোল মন্দির অবশ্য চারতলা।

মোটামুটি ছয় একর করে ছয়টি দিঘী ও ছযটি মন্দির নিয়ে এই পাঁচআনি জমিদার বাড়ি। এটি ছাড়াও, আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে- একআনি, তিন আনি ও সাড়ে তিন আনির দুই তরফের বসত ভিটা ও চার আনির ভবন এসবের অধিকাংশই যদিও ভগ্নপ্রায়।



মন্দিরের সেবায়ত এর কাছে গল্প শুনলাম, প্রজাবৎসল উদার মহারানী হেমন্ত কুমারী উনার ব্যক্তিত্ব কর্মগুণ ও দানশীলতার জন্য ইতিহাসে আজও ভাস্বর হয়ে আছেন। রাজশাহীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলেও উঠে আসে তার নাম, রাজশাহীতে ঢোপকল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পানিজনিত কলেরা মহামারির হাত থেকে এখানকার মানুষকে পরিত্রাণ দিতে তার অবদান আজও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করা হয়।
প্রায় একঘণ্টা ব্যাপি আমার এই ভ্রমণে রাজশাহীর এই শরত সময়ের উজ্জ্বল মেঘমুক্ত নীল আকাশ আর চকচকে রোদ আপনাদের মত সারাক্ষণ আমার সাথে ছিলো। ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে। ও হ্যাঁ ফেরার সময় আপনার ভ্রমণ গাইড কে তার প্রাপ্য মজুরী এবং মন্দিরের দানবাক্সে দান করতে ভুলবেন না যেন।
নোটঃ প্রথম ছবিটা উইকি থেকে নেয়া, বাকি সব আমার ক্যামেরার। বেশির ভাগ ভিডিও ধারণ করেছি বিধায় দারুণ সব ছবি দিতে পারলাম না। এই ভ্রমণের সময় কাল গোঁট বছরের সেপ্টেম্বার মাস, এরপর দিন সময় মাস কিভাবে কেটেছে বলতে পারবো না। একটু ফ্রি হবার পর পোষ্ট দেবার আগ্রহ, ব্লগারদের পোষ্ট পড়ার ও মিথস্ক্রিয়ার আগ্রহ আমাকে আবার ব্লগে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে।
আশা করছি সকল ব্লগার ভালো আছেন!
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




