somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিলেকোঠার প্রেম-১৭

২০ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



হঠাৎ জীবনে যেন এক বিশাল শূন্যতা নেমে এলো। কোনো বিষম কোলাহলের শহর থেকে যেন আমি চলে এসেছি কোনো নিশ্ছিদ্র নিরুত্তাপ নীরজন বনে। এখানে কোনো মানুষ নেই, জন নেই, পশু নেই পাখি নেই কিচ্ছু নেই। এখানে শুধুই আমি একা। মাঝে মাঝে মাথার মধ্যে কথা বলে যায় কারা যেন। কিন্তু পরক্ষনেই ভুলে যাই আমি। কি বলে গেলো বা কে বলে গেলো। এক পৃথিবীর আলো না দেখতে পাওয়া অদেখা ছোট্ট শিশুও যে আমাকে এইভাবে নিঃস্ব করে দিয়ে যেতে পারে ভাবিনি আমি কখনও আগে।

সাত সাতটা মাস আমার ভেতরে লালিত সেই সত্তাটির বিচ্ছেদে নিঃশেষ হয়ে পড়ি আমি। আমার কাউকে ভালো লাগে না। সবাইকেই বিরক্ত লাগে। মা কত কথা বলে যায়। শুভ্র এসে চুপচাপ বসে থাকে। বাকীটা সময় ঘুম পাড়িয়েই রাখে ওরা আমাকে। তবুও যতক্ষন জেগে থাকি। বুক ভেঙ্গে যায় কষ্টে আমার। আমার অনাগত সন্তান আমার স্বপ্নে আসে। আমাকে মা মা বলে ডাকে। আমি ওর সাথে খেলি। কখনও পুতুল নিয়ে, কখনও বা গাড়ি। কখনও পার্কে ওর হাত ধরে ঘুরি আমি। ও দেখতে যে কি সুন্দর হয়েছে। একদম পরী বাচ্চা। স্বর্গ থেকে নেমে আসা যেন এক দেবদূত।

হসপিটাল থেকেই জানতে পারি শুভ্র আমাদের সেই পুরোনো চিলেকোঠায় আবার ফিরে গেছে। ইদানিং নাকি খুব চেষ্টা করে যাচ্ছে একটা চাকুরী খোঁজার। মনে হয় আমার এ অবস্থার জন্য নিজেকেই দায়ী করছে বেচারা। অথবা হয়ত আমাকে ছাড়া ও বাড়িতে থাকাটাই ওর অসহ্য হয়েছে। থাক ও বাড়ি ফিরুক বা জব খুঁজুক। ওর যা মনে চায় করুক। আমি আর ওর মত করে চলায় বাদ সাধবো না। ও তো ওর মত করেই ওর জীবন চালাতে চেয়েছিলো। চালাক। আমি আর ওর কোনো কিছুতেই বাঁধা দেবোনা। কি হয় বাঁধা দিয়ে? কি হয় এসব করে? যা হবার তাই হয়। শত চেষ্টাতেও কোনো কোনো ভবিতব্য কখনও ঠেকানো যায় না।

আমার আজকাল খুব নিজের ছোটবেলা মনে পড়ে। মা দুই বেনী বেঁধে দিতেন। স্কুলের লাল চেক স্কার্ট আর সাদা শার্ট। খুব ছোট বেলার প্রথম বন্ধু রুনি। কি পাঁজী ছিলো মেয়েটা। আবার দারুন বুদ্ধিমতীও। কোথায় আছে সে? কোথায় হারিয়ে যায় মানুষ এইভাবে? মনে পড়ে পাতলা জিলজিলে কাগজে জড়ানো অভূত স্বাদের কুল-বরই এর আচার, মনে পড়ে হাওয়াই মিঠার অদ্ভুৎ রঙ, মনে পড়ে শোন পাপড়ির আশ্চর্য্য স্বাদ। দাদীকে মনে পড়ে। দাদীর বানানো আমসত্ব, ছোট্ট বেলার সবুজ বন-জঙ্গল আঁকা কাঁঠপেন্সিলটার ছবি চোখে ভাসে, নাকে ভাসে গন্ধওয়ালা গোলাপী রাবারের সুঘ্রান। একবার নানু বাড়িতে ঝড়ের পরে আম কুড়িয়ে স্তুপ করে রাখা ছিলো বারান্দায়......... কত কিছুই ভাবি আমি। এক পৃথিবী ভাবনায় ভেসে ভেসে যাই.......




২ মাস ১১ দিন পর বাসায় ফিরি আমি। বাড়িটাকে অচেনা লাগে।আসলে আমার জীবনটাই বদলে গেলো যেন হঠাৎ। নিজেকেই অচেনা লাগে আজকাল আয়নায় দাঁড়ালে। শুভ্র প্রায়ই ফোন দেন। আমার এ অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী করে সে। আমার হাসি পায়। ভীষন হাসি পায়।অট্হাস্য হাসতে ইচ্ছা করে আমার। কিন্তু আমি কিছুই বলি না, একটা কথাও না। অনেকেই ভাবে আমি বোবা হয়ে গেছি। ভাবলে ভাবুক আমার কি?আমার কথা বলতে ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমিও শুভ্রের এই দূর্গতীর জন্য দায়ী।ওমন হুট করে বিয়ে করাটাও আমার উচিৎ হয়নি। ওর যে বয়সে স্বামী হবার কথা ছিলো না, বাবা হবার মানসিকতা গড়ে উঠেনি সেখানেই টেনে ফেলে দেওয়া হয়েছে ওকে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হয় সেই সিচুয়েশনটার জন্য তো আমি দায়ী ছিলাম না শুধু একা। শুভ্র আমাকে ভাবিয়েছিলো। বদলে দিয়েছিলো চিরায়ত আমার ধ্যান ধারণা, ভাবনা চিন্তা।

নাসিমা আপা ফোন দেয়। ফোন দেয় সুরুচী। হসপিটালেও দেখতে গিয়েছিলো তারা আমাকে। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি ৩ মাসের।পরের মাসে জয়েন করবো। ডক্টরও বলেছে আমার এই মানসিক শকটা কাটাতে ব্যাস্ততাই সব চাইতে বড় ঔষধ। যত তাড়াতাড়ি কাজে ডুবে যেতে পারি সেটাই আমার মঙ্গল। আমি ইদানিং আবার ছবি আঁকতে শুরু করেছি। চুপচাপ একা একা ছবি এঁকে চলতে আমার এখন শুধু ভালো লাগে। কারো সাথে কথা বলতে হয় না। কোনো কাজের প্রেশার নেই শুধু নিজের মনে ভাবতে পারা যায়। আমার ভালো লাগে। খুব ভালো লাগে। কিন্তু ডক্টর বলে আমাকে নাকি এই ছবি আঁকা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। কারণ এইভাবে ছবি নিয়ে পড়ে থাকলে আমার এই বিষন্নতা আরও প্রগাঢ় হবে। আমি স্বাভাবিক জীবনে হয়ত আর কখনও ফিরতেই পারবোনা।

ডক্টর কেনো এই কথা বলে আমি জানি। কারণ আমি শুধু দিনের পর দিন আমার অনাগত সেই সন্তানের মুখটাই আঁকি। আর কিছুই আমার আঁকতে ভালো লাগেনা আজকাল। আর কি যে এক আশ্চর্য্য ব্যপার! আমি দিনের পর দিন ওকে আঁকতে আঁকতে এখন সত্যিকারেই ওর মুখটা দেখতে পাই। ও কখনও হাসে। কখনও কাঁদে। কখনও বা অভিমানে ঠোঁট ফুলায়। হা হা বিধাতা আমাকে ওর হাসি কান্না দেখতে দেয়নি বটে। কিন্তু বিধাতা প্রদত্ত আমার এই দুই হাতে আমার জগতে আমি ঠিকই সৃষ্টি করেছি সেই অদেখা শিশুটির হাসি কান্না। আমার সন্তানের হাসি, আমার সন্তানের অভিমান, ওর ঘুমিয়ে থাকা মুখ সবই আমি সৃষ্টি করে চলি দিনের পর দিন।

আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি আর শৈলী এসেছিলো হসপিটালে। আমার শ্বাশুড়ি তার বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন আমাকে অনেকক্ষন। উনার চোখে ছিলো বিষন্ন ক্ষ্ট কিন্তু উনার বুকে মাথা রেখে বুঝেছিলাম আমি কত মায়া জমে আছে সেখানে। আমার জন্য , শুভ্রের জন্য, তার স্বামী সন্তান এবং সেই অনাগত নাতিটির জন্যও। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এত এত তার পুরোনো নতুন শাড়ি কেটে ফেলে তার নাতির জন্য বানানো কাঁথা কাপড় জামাগুলি কি করেছেন তিনি? আমার খুব ইচ্ছে করে সে সব ছুঁয়ে দেখতে। বুকে নিয়ে বসে থাকতে। সে সব কাঁথা কাপড় জামা নাই বা হলো সেই শিশুর ব্যবহারের জন্য তবুও সেসবে মিশে আছে আমার সেই নিস্পাপ অদেখা শিশুটি। কিন্তু কিছুই বলা হয় না আমার। এক রাশ কষ্টে গলা চেপে আসে। আমি চুপ থাকি।


আমার শ্বশুর। যাকে দেখে প্রথম দিনটিতেই সদাই হরিষ উপাধীটি মনে পড়েছিলো আমার। সেই হাসি মুখে প্রথম দেখি বিষন্ন সন্ধ্যা! চুপচাপ বসেছিলেন তিনি। বিদায় নেবার সময় ছোট্ট শিশুর মত হাউ মাউ কেঁদে উঠলেন। আমি নির্বাক তাকিয়ে থাকি। উনি হাউমাউ করে বলছিলেন, মা নাতি হারানোর দুঃখে কাঁদছি এ কথা ভেবোনা তুমি। আমি তোমার এ অবস্থা সহ্য করতে পারছি না। তুমি কেনো এমন হয়ে গেলে? কি হয়েছে তোমার আমাকে বলো? কেনো তুমি কথা বলো না? কেনো তুমি হাসো না? মানুষের কি এমন হয় না বলো? ধরে নাও এটা একটা এক্সিডেন্ট। তুমি আবারও মা হবে। তোমার কোল আলো করে জন্মে নেবে এই শিশুটিই আবারও খুব শিঘ্রী। কেনো এইভাবে ভেঙ্গে পড়ছো? কেনো নিজের জীবনটা নষ্ট করছো।


আমি মনে মনে হাসছিলাম। হায়রে জীবন। যে মানুষটির এতটুকু কষ্ট সহ্য করতে পারবোনা ভেবে, আমার বাড়িতে এলে তার সাদর সম্ভাষনে এতটুকু ত্রুটি হতে পারে ভেবে আমি কখনও চাইনি উনি আসুক। সেই মানুষটিকেই আজ আসতে হলো আর দুঃখ পেতে হলো আমারই কারণে। আসলেই পৃথিবীতে যা হবার তাই হয়। সৃষ্টিকর্তা তার উপন্যাসে আগেই লিখে রেখেছেন সব ঘটনাগুলিই। মানুষ শুধু সেই রোলগুলিই প্লে করে যায় তার সাজানো সব ঘটনার মাঝ দিয়েই। তবুও মানুষ কত আপ্রাণ চেষ্টাই না করে। সুখে থাকার....... ভালো থাকার......
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:৩৯
৩৯টি মন্তব্য ৪৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জীবনানন্দের উইকিপিডিয়া.......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ৮:৫৮

অক্টোবর-১৪, ১৯৫৪সাল৷

চুনিলাল নামের এক চা বিক্রেতা তাঁর দোকানের সামনে ট্রামের ধাক্কায় একজন পথচারীকে আহত দেখতে পান৷ প্রথমবার নিজেকে সামলাতে পারলেও দ্বিতীয় ধাক্কাটায় তিনি ট্রাম লাইনে পড়ে যান! তাঁর হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিরোধ

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২২ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ৯:২৯


প্রতিবাদের সময় নেই বাকি, তাই
অবিলম্বে গড়ে তোলো তীব্র প্রতিরোধ;
অন্যায়ে রুখে দাঁড়াও একত্রে সবাই-
নিতে হবে সব অন্যায়ের প্রতিশোধ।
অবহেলিত সকল, যত নিপীড়িত
সয়ে যাচ্ছো জালিমের শত অত্যাচার;
তোমার দাবি-দাওয়া সব উপেক্ষিত-
দাম নেই দুনিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আকাশে বিমান উড়লে মাটিতে তার ছায়া পড়ে না কেন?

লিখেছেন সোহাগ আহমেদ মায়া, ২২ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১০:৫৭



খুব মজার প্রশ্ন। আকাশে বিমান উড়ে যেতে দেখি। কিন্তু খুব কম মানুষের মধ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ওঠে। তাই শুরুতেই এই তাত্পর্যপূর্ণ প্রশ্ন করার জন্য যায়েদ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে ধন্যবাদ জানাই। এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নক্সী কাঁথার মাঠ - জসীম উদ্‌দীন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ২:০৫


পল্লী কবি জসীম উদ্‌দীনের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো। গ্রন্থটি মূলত রূপাই এবং সাজু নাম দুই যুবক-যুবতীর প্রেমের কাহিনী। মজার বিষয় হলো, গ্রন্থটির চরিত্র বা "রূপাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ মাতানো ব্লগারদের ফিরে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ২৩ শে অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১:৪০

সামু ব্লগে এখন দুর্দিন চলছে। এই ব্লগে আমি মুলত একজন পাঠক। শক্তিসালী লেখকদের পোস্ট পড়তে ও কমেন্ট করতেই মুলত আমি ব্লগে লগিন করি। কিন্ত ইদানিং ব্লগ মাতানো ব্লগারেরা এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×