
মানুষ আসলে কী?
Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো অস্পষ্ট; কিন্তু পশ্চিমা দর্শনের সংস্পর্শে এসে সে হয়ে উঠলো 'আলোকিত'। এই পশ্চিমা দর্শন শুরু হয়েছে মিলেটাসে প্রাক-গ্রীক দার্শনিকদের হাত ধরে। তারপর সক্রেটিস-প্লেটো-অ্যারিস্টটলের হাতে গোড়াপত্তন হয়ে মধ্যযুগে দেকার্তে-স্পিনোজা-লক-হিউম-বার্কলে হয়ে পদার্পণ করেছে কান্ট-হেগেল-মার্ক্সের মারফতে আধুনিক যুগে যেখানে ডারউইন-ফ্রয়েডও আছেন। বলা ভালো- পশ্চিমারা যখন দর্শনের ইতিহাস লেখে তখন ওইটা হয় আসলে পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাস, প্রাচ্য সেখানে বরাবরই উপেক্ষিত। ফলে, গার্ডারের সৃষ্টিতে কোথাও প্রাচ্যের কোন হদিস নেই, প্রাচ্যের কোন দর্শনের ইতিহাস নেই।
কিন্তু এই পশ্চিমা দর্শন তো কয়েক হাজার বছর পাড়ি দিলো, শেষপর্যন্ত এই দর্শন থেকে কী পেলাম আমরা? গার্ডার শেষ পর্যায়ে বলছেন, "মানুষ নক্ষত্রচূর্ণ (stardust)"। অর্থাৎ মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিলো বিগ-ব্যাং থেকে, আর যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলা যায় মানুষের দৈহিক উপাদানের যোগানদাতা আসলে রাতের আকাশে আমরা যে অজস্র নক্ষত্র দেখি 'এরাই'। অর্থাৎ পশ্চিমা দর্শনের সবচেয়ে হটকেক হাইপোথিসস, সৃষ্টির সূচনার ব্যাখ্যাদানকারী 'বিগ-ব্যাং' থিওরি থেকে আমরা ডিডাকশন টানতেই পারি যে, মানুষ আসলে নক্ষত্রের সন্তান।
এবার অন্য দিকে যাই একটু। গুরু হেগেলের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে 'দার্শনিকেরা এতকাল পর্যন্ত শুধু ব্যাখ্যাই করে এসেছে।"- বলে মার্ক্স দর্শন ছেড়ে প্রবেশ করেছিলেন অর্থশাস্ত্রে। গার্ডার সম্ভবত এই ঘটনা হজম করতে পারেননি। এজন্যই মার্ক্স সম্পর্কে গার্ডার দিলেন বাজারে-প্রচলিত ভুল বয়ান- 'মার্ক্স ছিলেন এক মানবতাবাদী দার্শনিক যিনি মানুষের দুঃখ-কষ্টে উদ্বেল হয়ে ক্যাপিটাল হাজির করেছেন।' ফলে, দর্শনের ইতিহাস যে মার্ক্সে এসে নতুন মোড় নিয়েছে এই ঘটনা গার্ডারে অনুপস্থিত।
ওদিকে দর্শনের আরেক শাখা যা শুধু মাত্র প্রকৃতি নিয়ে কাজ করে সেইটা আবার এমন এক বস্তুবাদী পর্যায়ে পৌঁছেছে যে 'সে' মানুষের মধ্যেও আর ব্যাখ্যাতীত সম্ভাবনাময় কিছু দেখে না। ফলে আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে শুরু হওয়া গ্রেকো-রোমান এই পশ্চিমা দর্শন শেষপর্যন্ত তার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে প্রকৃতিবিজ্ঞান নাম নিয়ে, যেই প্রকৃতিবিজ্ঞানে মানুষ শুধুই এক জৈবসত্তা যাকে বিশ্লেষণ করলে সে শেষপর্যন্ত খুঁজে পায় ইলেকট্রন-প্রোটন-নিউট্রন। তাই ইয়স্তেন গার্ডারও শেষপর্যন্ত মানুষকে নক্ষত্রচূর্ণের বেশি কোন তাৎপর্য দিতে অপারগ।

তবে স্যাটায়ারটা হলো, পশ্চিমা দর্শনের পতাকাবাহী গার্ডাররা প্রকৃতিবিজ্ঞানের মারফতে 'মানুষ নক্ষত্রচূর্ণ'- বয়ান আমদানি করলেও খোদ প্রকৃবিজ্ঞানীরাই আবার এই পশ্চিমা দর্শনকে নিচু-স্তরের জ্ঞান হিসেবে দেখেন। গ্রান্ড ডিজাইনে হকিং বলছেন- আদিতে দার্শনিকরা ছিলেন সেই সকল ব্যক্তিরা যারা প্রচলিত সকল জ্ঞান-তত্ত্ব-তথ্যের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকতেন। কিন্তু আধুনিক যুগে জ্ঞান এত শাখা-প্রশাখা-উপশাখায় বিভক্ত হয়েছে যে একজন মাত্র মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় জ্ঞানের সকল বিষয়ে পারঙ্গম হওয়া। ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন উপজাতির যাদেরকে হকিং ব্যঙ্গ করে বলছেন, 'বিজ্ঞানের দার্শনিক'। হকিং তার The Grand Design - এ সগর্বে ঘোষণা দিয়েছেন- 'Philosophy is dead.'। হকিং -এর মতে মানবজাতির আর দর্শনের কোন প্রয়োজন নেই, সামনে পথ দেখাবে শুধুমাত্র বস্তুবাদী প্রকৃতিবিজ্ঞান। আর এই বস্তুবাদী প্রকৃতিবিজ্ঞানে মানুষ আসলেই শুধুমাত্র নক্ষত্রচূর্ণ বাদে ভিন্ন কিছু নয়।
© wb
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



