মানুষ তাঁর ভিতরের কদর্যতাকে সুনিপুনভাবেই ঢেকে রাখতে চায়। সেজন্য অনেকে লেবাস ধারণ করে, অনেকে ভিতরের মন্দ মানুষটাকে আটকে রাখতে চেষ্টা করে বিভিন্ন ছলনায়। যারা অনবরত অনুশীলন করে, বিপুল পাঠাভ্যাস গড়ে তুলে, ভাল সার্কেলে চলে তাদের ভিতরের দানবটা অবদমিত থাকতে থাকতে সুপ্ত হয়ে যায়। পরিবার থেকেই মানুষ এই শ্রেষ্ঠ শিক্ষাটা অর্জন করতে পারে। কেউ সমাজ থেকেও পারে। অনেকের ভিতরের মন্দ মানুষটা ঠিকই বের হয়ে আসে সুযোগ পেলে। রবার্ট লুই স্টিভেনসন এর সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘ড. জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড’-এ বিজ্ঞানী ড. হেনরি জেকিল সমাজের সুশিক্ষিত উচুতলার ভাল মানুষ, শহরের অন্যতম শ্রদ্ধাভাজন বিত্তশালী সুখি পরিতৃপ্ত গণ্যমান্য বিখ্যাত ব্যক্তি। আর মিস্টার এডওয়ার্ড হাইড সাক্ষাৎ শয়তান-মূর্তিমান পিশাচ, নৃশংস বর্বর। এই পাষণ্ডের সাথে ওই ধীমান পুরুষের সম্পর্কটাই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ওরা একই মানুষ, একই চৈতন্যের অংশীদার, অমোঘ অবিচ্ছেদ্যতা। আলোকিত ড. জেকিল নিজের ভিতরের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে নিজেই সৃষ্টি করেছেন পাষণ্ড হাইডকে। উপন্যাসটা আমাকে এতোটাই আলোড়িত করে যে মুখোশধারীদের আড়ালটা খসে পড়লে অবাক হই না। তাই বুঝি মহামানবদের ভিতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে দানবতা। আমার মনে হয়েছে ক্ষমতার লোভ, সম্পদের লোভ, প্রাচুর্যের লোভ, অমর হওয়ার লোভ ড. জেকিলদের মিস্টার হাইডে পরিণত করতে পারে।
উপন্যাসে ড. জেকিল এমন একটি ওষধ আবিষ্কার করেন যা খেলে সে বদলে যাবে। দ্য মাস্ক ছবিটা যারা দেখেছেন তারাও দেখেছেন ওই জাদুর মাস্ক মানুষের ভিতরটাকেই প্রকাশ করে দিয়ে তার আসল রূপটা ধারণ করে। ড. জেকিল ওষধ খেয়ে নিজে বদলে যায়, অর্থাৎ একবার খেলে নিজের ভিতরের লুকায়িত থাকা বদমাশটার রূপ (মি. হাইড) ধারণ করে আরেকবার খেলে আবার শ্রদ্ধেয় মানুষ। তাঁর এই আবিষ্কারের ফাঁদেই তিনি পড়ে যান। খারাপ রূপটা বাইরে গিয়ে একটি অপরাধ করে ফেলে এবং সেটার অনুসন্ধানেই বেরিয়ে আসে যে বিপরীত চরিত্রের ড. জেকিল ও মিস্টার হাইড মূলত একই ব্যক্তি।
একজন শাণিত ও শালিন মানুষ নিজেকে রূপান্তর করে নেয় ভালমানুষী গুণাবলী দিয়েই। এটা অনুশীলন করতে করতে এমন অবস'ায় পৌঁছে যে, নির্জনে একাকী থেকেও সে একটি খারাপ কাজ করতে পারে না। কেউ দেখবে না নিশ্চিত থেকেও সে- চুরি করে না, বজ্জাতি করে না, হুজ্জতি করে না, অন্যকে নিপিড়ন করে না। ক্ষমতা থাকলেও তার অপপ্রয়োগ সে করে না। গতবছর আমাদের বাজারে দুই বজ্জাত বাপ-বেটাকে দেখলাম একজন পাগলের বিরুদ্ধে চোটপাট করতে। আমার মনে হলো ওরা পাগলটাকে মারবে। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওরা সাহস পেল না মারতে। যেই আমি দূরে চলে গেছি ওমনি বাপ-বেটা ঝাপিয়ে পড়ল। এই দানবতা ওরা ধর্মীয় লেবাস দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। সময়মতো প্রকাশিত হয় চরিত্র, আবারো লেবাসে ঢেকে রাখে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ৮:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




