
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে বড় পাপ হলো তারা লাইকের(প্রতিক্রিয়ার) বিনিময়ে সত্যের উপরে উঠে একটি বিশাল জনমত ও সামাজিক অনুমোদন দেয় কোন পোস্ট কে, ফটো কে, কোন ভিডিও কে, পোল(ভোটিং) কে।
মানে একটি পোস্টে বিশাল অঙ্কের লাইক পড়ে গেলে আমাদের সাইকোলজি ভাবতে শুরু করে দেয় এটাই সত্য, এর ভিন্নতা কিছু হতে পারে না। আর প্রকৃত সত্য তখন গায়েব হতে থাকে। মানুষ সেটাই দেখে যা সে দেখতে চায়, সেটাই শোনে যা সে শুনতে চায়। গেটকিপিং বা ড্যামেজ কন্ট্রোল এখন গার্বেজে। সংখ্যাগুরু যেদিকে যায় সেটাই সত্য হয়ে উঠতে থাকে। উত্তর আধুনিকতা মানুন বা না মানুন পোস্ট ট্রুথের ভয়াবহতা হচ্ছে এটাই।
যে মানুষ তার প্ররোচনায় পড়বার ঝুঁকি থেকেই যায়। এটা বিষয় নয় যে, সে কোথায় থাকে? কি বিশ্বাস করে? অথবা কোন ভাষায় কথা বলে। প্রতিটা মূহুর্তে তার সাথে প্ররোচনা চলতে পারে। প্ররোচনায় পড়বার জন্য আপনার বুদ্ধিমত্তা সবসময় আপনার সাথে কাজ করবে এমনও নয়। এটা এমন নয় যে, পাশের ব্যক্তিটা কি জানে? এটা হলো আপনার মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করছে।
চারপাশের অবস্থা নিয়ে আপনার মন কেমন করছে। আমরা অনেকেই বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি সম্পর্কে জানি যারা শুধু মনোযোগ ধরে রাখার জন্য বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি কে নিয়োগ দিচ্ছে। তাদেরকে “Attention Engineer” বলা হয়ে থাকে। যারা বিভিন্ন আইডিয়া/ধারণা বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে থাকে।
সেটা ক্যাসিনো হতে পারে, জুয়া খেলার নানান রুপ সম্পর্কেও হতে পারে অথবা পাবলিক ইন্টারেস্ট। তারা সমস্ত ডাটা বিশ্লেষণপুর্বক এমন কিছু তথ্য ও প্রোডাক্ট দিয়ে সাধারণ মানুষদের মনোযোগ ধরে রাখে। শুধু তাই নয় এই “Attention Engineers” মানুষকে সেসবে আসক্ত করে তোলে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা আমাদের উপস্থিতি সুন্দর, নিয়ন্ত্রিত এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। আর এই ক্ষেত্রে চমকপ্রদ কিছু পোস্ট হোক বা ছবি, সামাজিক অনুমোদন সামাজিক মাধ্যমে আমাদের যেন চাই-ই চাই।
তখন আমরা অন্যরা আমাদের ব্যাপারে কি ভাবছে সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই। যেমন ধরুন, পল্টুর ১০টা লাইক হলে বল্টুর ১১টা লাইক চাই! কিন্তু কেন? কারণ এর মাধ্যমে এক ধরণের সামাজিক অনুমোদন মিলে যায় বলে আমরা ভাবি। যদিও বাস্তবতা প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা।
ফেসবুকে নতুন প্রোফাইল ফটো দেবার পর মি. হাসান চিন্তায় থাকে যে, এই প্রোফাইল ফটো কি অন্যদের পছন্দ হচ্ছে? ক’টা লাইক পড়লো? ক’জন কমেন্ট করলো? মানে এর মাধ্যমে এক ধরণের সামাজিক অনুমোদন যে, মানুষ আমাকে পছন্দ করে এবং দেখতে চায়।
এখন ফেসবুকের দিক থেকে দেখলে দেখা যায়, হুট করে টং শব্দে আপনাকে তারা একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠায় যে, মি. রানা আপনার প্রোফাইলে ফটোতে একটি লাইক দিয়েছেন। ফেসবুক কিন্তু এটা জেনেশুনেই করছে। কারণ তারা জানে যে, আপনি আপনার ফটো সম্পর্কে বেশ কৌতূহলী। আর ঐ লাইক দেখে আপনি তাদের প্রতি দূর্বল হয়ে যেতে থাকবেন। হাজার হোক নিজের ফটো, আমি কেয়ার করি ভাই।
হুট করে কোথাও থেকে এক বান্ধবী আপনার সাথে তোলা একটি ফটো আপনাকেই ট্যাগ করলো। তখন তাৎক্ষণিকভাবেই আপনি সেখানে লাইক দিতে যাবেন, হতে পারে একটা মন্তব্যও করবেন। ফলে যে কাজটি আপনি সময় নিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে করছিলেন সেখানে নিশ্চিত অর্থে বিঘ্ন ঘটতে বাধ্য।
তারপরের খেলা আপনাদের জানা। তখন আমরা অন্যদের পোস্টে ও ছবিতে লাইক বা প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকি। যার ফলে তাদের অনুসরণকারী যেমন বাড়ছে, আপনারও তেমন বাড়ছে। আর এই খেলা একটি লুপের মত, বা ফাঁদের মত। একবার এই ট্র্যাপে পড়ে গেলে তাকে সেখান থেকে বের হওয়া মুশকিল।
আমরা আরো জানি, সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে এনগেইজমেন্ট থাকলে আমাদের মস্তিষ্ক থেকে এক ধরণের কেমিক্যাল নিঃসৃত হয়। যার নাম হচ্ছে, “ডোপামিন”। এই “ডোপামিন” হচ্ছে সেই কেমিক্যাল যখন কেই ধূমপান করেন, ড্রিক্স করেন, জুয়া খেলেন এবং এই কেমিক্যালের মাধ্যমে আনন্দ পান। পাশাপাশি আমরা এটাও জানি এই ডোপামিন হচ্ছে উঁচু মাত্রার আসক্তিকর কেমিক্যাল।
সুতরাং আমাদের প্রজন্ম সহ সামনের প্রজন্ম স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা এক ধরণের কেমিক্যাল(ডোপামিন) এর প্রতি আগ্রহী হতে যাচ্ছে। তার অনেকাংশ এখন তো প্রকাশ-ই পেয়ে গেছে। আর সেটা হলো স্মার্টফোন গেম। এখন স্মার্টফোন হাতে কোন বাচ্চা গেম চালাচ্ছে না এটা বললে ৯০% শতাংশ মানুষ অবিশ্বাস করবে। একবার তাদের কাছ থেকে ফোনটা নিয়েই দেখুন! কি ঝামেলা হয়ে যায়। মানে ইতোমধ্যেই তারা এক ধরণের ভয়ানক আসক্তির মধ্যে পড়ে গেছে।
মুশকিল হচ্ছে, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের কোপিং ম্যাকানিজম(Coping Mechanism) থাকে কোন আসক্তি থেকে বের হবার। কিন্তু একজন বাচ্চা বা কিশোরের সেই ম্যাকানিজম নেই। সুতরাং এখান থেকে পরবর্তীতে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। এখন তাদের জীবনে যখন কোন কঠিন স্ট্রেস আসবে তখন তারা সেটা থেকে কাটিয়ে উঠবে কীভাবে? উল্টো তারা একজন মানুষ না হয়ে, সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে যাবে একেকটা। জম্বি নিয়ে হয়তো অনেক সিনেমা দেখেছেন, কিন্তু রোবট মত বা অনুভূতিশূন্য মানুষ কে ঠিক কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় আমার জানা নেই।
আমরা ক্রমাগত ইনস্ট্যান্ট প্লেজার প্রিন্সিপলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যে আনন্দ খুবই সাময়িক। সায়েন্স এই বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য দিয়েছে যে, যে ব্যক্তি কম সময় ফেসবুকে ব্যয় করেছে সে ব্যক্তি তুলনামূলক কম ডিপ্রেশনে আছে, আর যে ব্যক্তি বেশি সময় ফেসবুকে ব্যয় করেছে সে ব্যক্তি বেশি ডিপ্রেশনে ভুগছে। আর এটাই সমস্যা, এটাই আসক্তি।
কর্মস্থলে হয়তো আপনি কোন মিটিং এ ব্যস্ত আছেন। সেখানে আপনি অন্যদের সাথে কথা বলছেন অথবা অন্যদের কথা শুনছেন ঠিক সেই মূহুর্তে বিপ শব্দে ফেসবুক আপনার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। কারণ আপনার স্মার্টফোনটা তো আপনার সামনে, টেবিলে রাখা আছে। ফলে ক্রমাগত এই চক্র আমাদের নেশাগ্রস্থ একটি প্রজন্ম দিয়েছে, এবং দিয়ে যাচ্ছে। সামনেও দেবে, যদি আমরা এখনি সাবধান না হই।
ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামের নতুন নতুন আপডেট আসছে, সেখানে নতুন নতুন ফিল্টারও যুক্ত হচ্ছে। যদি দক্ষতার কথা বলা হয়, তাহলে সবাই এখানে দক্ষ। ভুল তথ্য দেওয়া, নিজের ফটো অতিসুন্দর করে দেওয়া, অন্যের দেওয়া পোস্ট চুরি করা(ইন্টেলেকচুয়্যাল প্রোপার্টি) কয়েকটা ট্যাচ বা ক্লিকের দুরত্ব, মিনিটেই বা কয়েক সেকেন্ড-এ হয়ে যাচ্ছে। সবাই মেরিলিন মনরো, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি(মেয়েদের ক্ষেত্রে) বা টম ক্রুজ, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও(ছেলেদের ক্ষেত্রে) হবার এক কি সুন্দর সুযোগ!
আবার ফেসবুক থেকে এটাও জানতে পারবেন না যে, ঐ ব্যক্তি কোন একটা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ভালো আর ভালোটা ফেসবুকে দেওয়া কিন্তু ব্যক্তিজীবনে কি ঘটছে মানুষ তা জানেই না। একসময় ডিপ্রেশনে পড়ে সে ব্যক্তি আত্মহত্যাও করছে কিন্তু কেউ কিচ্ছুটি জানে না। এর নাম অসুস্থ প্রজন্ম নয় তো কি!
একজন মানুষ তার জীবন সম্পর্কে সেটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাইকে দেখাতে চায়, যেটা কিনা তার ভালোর জন্য ঘটেছে। আর মন্দটা? মনের মধ্যে, মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে। সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়ে একটি কাপল সেই ছবি-ই তুলে থাকেন, যখন তারা খুশী বা সুখী ছিলেন। তারপর সেটাতে ফিল্টার দিয়ে একটা প্রেজেন্টেশন ওয়েতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া হচ্ছে। এসব দেখে মন্টু মিয়ার মনে হতেই পারে, এটা তো ভাই স্বর্গ। আমাকেও একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিন না!
কিন্তু মন্টু মিয়ার জীবনে হয় তার উল্টো। সেকেলে মানুষ, ফেসবুকের কিছুই জানে না। ফলে অন্যদের সুখী জীবন দেখে সে ক্রমাগত হতাশ হতে থাকে। একসময় তার মনে হয়, “জন্মই তার আজন্ম পাপ”।
মন্টু মিয়া তখন কোন ঝন্টু মিয়ার মত হবার চেষ্টা করেন। ঝন্টু মিয়ার মত সুখী হবার চেষ্টা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ঝন্টু মিয়াও বাস্তবে অত সুখী নয়। কিন্তু মন্টু নিজের প্রতি প্রেসার ক্রিয়েট করতে করতে একসময় ঝন্টু মিয়ার কাছাকাছি চলে যায় ফলে সে নিজ সত্ত্বাকে হারায়। আর যদি এতে অক্ষম হয় তবে ফ্রিতে ডিপ্রেশনের ড্যাবল ডোজ খেয়ে পড়ে থাকে।
আর সোশ্যাল মিডিয়া(ফেসবুক) ভালো করেই জানে তারা আমাদের মস্তিষ্কে কি ইঞ্জেক্ট করেছে। হ্যাঁ, সেটাই হলো ডিপ্রেশনের ইনজেকশন। এটা আমাদের মূহুর্তের মধ্যে কিছু সুবিধা দিলেও আমাদের সময় নষ্ট করছে, টাকা দিয়ে কেনা ডাটা নষ্ট করছে, সম্পর্ক নষ্ট করছে আর সবচেয়ে বড়কথা আমাদের অসুখীও করে তুলছে।
মার্ক জাকারবার্গ কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, “যদি আপনি এই সপ্তাহ জুড়ে কাউকে মেসেজে করে থাকেন তবে সেটা কি আমাদের একটু জানাবেন?”
মার্ক জাকারবার্গ এই প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি বলেছিলো, “না”। অর্থ্যাৎ তিনি নিজেই ফেসবুক চালান না।
বাকিটা আমাদের হাতে। আগামীর প্রজন্ম হোক সেটা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন, যেদিকেই যাক না কেন আমাদের কিন্তু ভালোটা বোধহয় হতে যাচ্ছে না।
ধন্যবাদ
- মেহেদি হাসান(Mehedi Hasan)
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১২:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




