somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সংস্কৃতিক আধিপত্যের(Hegemony Culture) ধারণা: সমস্যা এবং সম্ভাবনা

২১ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১২:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



প্রিয় পাঠক, আশা করছি ভালো আছেন। আজ আমি “Hegemony Culture” নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। এই কনসেপ্ট এত দীর্ঘ যে আমার এই এক ব্লগে সেটা বুঝিয়ে দিতে অক্ষম থেকেও যেতে পারি। তবুও চেষ্টা করছি এই সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবার।

Hegemony Culture –সম্পর্কে জানার পূর্বে আমাদের জানতে হবে এই কনসেপ্ট কে দিয়েছেন? এবং কেন দিয়েছেন? এ ব্যাপারে জানাটা আমাদের অ্যাকাডেমিক কারণেও জরুরী। প্রথমেই বলে রাখি Hegemony শব্দটি আমাদের উপহার দিয়েছেন আন্তোনিও গ্রামশি।

তিনি একজন ইটালিয়ান ছিলেন। ১৮৯১ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। উনার মধ্যে জ্ঞানের প্রতি ব্যাকুলতা ছিলো সবসময়। ১৯১৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯১৫ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। এরকম জানা যায়, তিনি ১৯২১ সালে তার নিজস্ব পি.সি.আই কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন।

এখন প্রশ্ন হলো, এই “Hegemony” আসলে কী?
Hegemony এর আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে লিডারশীপ(নেতৃত্ব)। কিন্তু অন্যদিকে এর অর্থ বোঝায় আধিপত্য(ডমিনেশন)। আর এক সম্প্রদায় বা সংস্থা দ্বারা আরেক সম্প্রদায় ও সংস্থার প্রতি আধিপত্য কায়েম করাকেই Hegemony বলা হয়।

কিন্তু আন্তোনিও গ্রামশির কনসেপ্ট ধরে যদি চলা যায় তাহলে এই Hegemony সংজ্ঞা একেবারেই আলাদা। আমি পুনরায় বলছি, অল্প কিছু শব্দে এই কনসেপ্ট বোঝানো সম্ভব নয় তাই চেষ্টা করছি সংক্ষেপে এই বিষয়ে ধারণা দেবার। কোথাও কোন ভুল হলে মাফ করবেন।

Hegemony: Cultural hegemony refers to domination or rule maintained through ideological or cultural means. It is usually achieved through social institutions, which allow those in power to strongly influence the values, norms, ideas, expectations, worldview, and behavior of the rest of society.

এখানে বিষয় এটা নয় যে, কোন শক্তিশালী গোষ্ঠী তুলনামূলক কম শক্তিশালী গোষ্ঠী কে অত্যাচার করবে বা দমন করবে। এখানে আপনি “গোষ্ঠী” শব্দের জায়গায় রাষ্ট্র, জাতি, সম্প্রদায় ইত্যাদি বসে নিতে পারেন। কিন্তু গ্রামশি এটা বলছেন না।

গ্রামশি বলছেন, বর্তমান যুগ অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন কি হচ্ছে? এখন এই ক্যালচার স্থাপন করা হচ্ছে মানুষের সম্মতির উপর ভিত্তি করে। উপনেশবাদ থেকে আমরা যে শিক্ষা পেয়েছি গ্রামশি সে পথেই হেঁটেছেন। মানে শক্তিশালী রাষ্ট্র এসে বলছে, “ভাই তোমরা তো সভ্য নও, তোমরা অসভ্য। আমরা তোমাদেরকে সভ্য বানাবো।”

পাশাপাশি তারা এটাও বলেন, আমরা স্রষ্টার ম্যাসেঞ্জার(ফেসবুকের নয়)। এজন্যই আমরা এখানে এসেছি। আরেহ্ তোমাদের সংস্কৃতি একটা মিথ, তোমরা পৃথিবী সম্পর্কে কোন ধারণা রাখো না। সোজা বাংলায়, তোমাদের সংস্কৃতি হচ্ছে গোবর আর আমাদের সংস্কৃতি হচ্ছে সোনা।

এখন উপনেশবাদের শিকার(উল্লেখ্য, বাঙালীর মত আরো জাতি আছেন) হীনমন্য বাঙালীরাও এই মিথ্যা কে হা করে গলাধঃকরণ করতে থাকে। একসময় আমরা সত্যিই ভাবতে শুরু করে দেই, “ওরা তো ঠিকই বলছে, আমাদের সংস্কৃতিতে আছেই বা কি?”

এখন ব্রেইন-ওয়াশ করা হয়ে গেল। কোনরুপ যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা পড়লো না। এখন শক্তিশালী ঐ জাতি কলোনাইজড জাতির বাচ্চাদের প্রথমে টার্গেট করে। এরপর বাচ্চাদের মধ্যে তাদের ক্যালচার ইঞ্জেক্ট করতে আরম্ভ করে।

আমি আন্তোনিও গ্রামশি থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে একটি উদাহরণ দেই, এতে করে হতে পারে আপনার এবং আমার বুঝতে সুবিধা হবে। ধরুন, আমাদের মত সেক্স্যুয়্যালি ফ্রাস্টেডেট জাতি কে হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী বলে দিলেন, “Everybody belongs to everybody else.”। এর মানে হচ্ছে, যে কেউ চাইলে যে কারো সাথে সেক্স করতে পারবে। কোন বাধা দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পশ্চিম পাড়া আর পুর্ব পাড়ার হলগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলেও কিচ্ছুটি বলা হবে না।

এক্ষেত্রে কাল্পনিক একটি রাষ্ট্র কে কল্পনা করুন। যেখানে দূর্নীতি আকাশচুম্বী। সবার আন্দোলন করার কথা এই দুষ্টের দমনে। কিন্তু এই ঘোষণা আসবার পর মিছিল মিটিংয়ে লোক খুঁজে পাওয়া যাবে তো! ভাগ্য ভালো আমাদের জনপ্রতিনিধিরা এতটা ম্যাচিউর এখনো হয়ে উঠেনি। সেটা হতেও যে বেশি সময় লাগবে না এমন ধারণা অনেকের মাঝেই বিদ্যমান।

যেহেতু শ্বেতাঙ্গদের মাথার উপর নাকি সূর্য উঠতেও ভয় পায়। তাই আন্তোনিও গ্রামশির কাছে আবার ফিরে যাচ্ছি। এরপর যেটা হয়, কৃষ্ণাঙ্গ বা আমাদের মত বাদামী মানুষগুলো ভাবতে শুরু করেন, জি, সাহেব, আপনারা তো বেশ সুন্দর সুন্দর কথা বলছেন। আমরা আপনাদের কথায় মুগ্ধ হয়ে গেছি। আপনারা যা বলবেন এখন থেকে আমরা তাই করবো। এখানে বলে রাখা ভালো, উপনেশবাদ সবসময় জোর করে নয়, কিছু মানুষ এই দাসত্ব সেই সময়ে শিকারও করে নিয়েছিলেন। ভাবুন অবস্থা।

এখন সামনে আসছে রেসিজম বা বর্ণবাদ। টাকার ক্ষমতা হোক বা মিলিটারি ফোর্স! কার্ল মার্ক্স বলছেন, এসব তো একটি রাষ্ট্র কে নিয়ন্ত্রণ করার টুলস্ মাত্র। কিন্তু আন্তোনিও গ্রামশি বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি আবার বলছেন, যদি টাকার ক্ষমতা আর মিলিটারি ফোর্স দিয়েই যদি সব হত তাহলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো অনেক আগেই তছনছ হয়ে যেত। তিনি আরোও বলছেন, যদি নিয়ন্ত্রণ বেড়ে সেটা সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে যেত তাহলে ইংল্যান্ড হত কমিউনিজমে বিশ্বাসী প্রথম দেশ কারণ সেখানে সে সময় সবচেয়ে বেশি লুট হত। তা না হয়ে হয়েছে রাশিয়া।

গ্রামশির ধারণা ক্যাপিটালিস্টরা নতুন কোন টুলস্ নিশ্চয় আবিষ্কার করেছে। সেই নতুন টুলস্ কি? হ্যাঁ, সেটাই হলো এই “Hegemony Culture” এবং ক্যাপিটালিস্টরা এটা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। ভিন্ন অর্থে এটাকে সংস্কৃতিক আধিপত্যও বলা যায়।

এখন তারা দরিদ্র ও দিনমজুর মানুষদের বুঝাতে শুরু করেছেন, আপনার বর্তমান অবস্থা হলো আপনার কর্মের ফল। একটু গুরুত্বের সাথে খেয়াল করুন, কর্মফল হচ্ছে একটি ধর্মীয় বিশ্বাস। আর সাধারণ মানুষ ধর্মে বেশ সেন্টিমেন্টাল। তাই খুব সহজেই এটাকে ইমপ্লিমেন্ট করা সম্ভব হয়েছে, হচ্ছে, হয়তো সামনেও হবে। পুঁজিপতিরা এখন ধর্মগুরুদের সাথে হাত মেলায়। ধর্মগুরুদের বারবার ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার তাগাদা সাধারণ মানুষদের তাড়িত করছে। গ্রামশি একে নাম দিয়েছেন “অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়্যাল”।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধর্মের সাথে মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায় এমন মানুষদের সাথে বা এমন নেতৃত্ব মানুষ মাথা পেতে নিচ্ছে। উল্লেখ্য, গ্রামশি এটাকেই অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়্যাল নাম দিয়েছেন।

এখন এই অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়্যাল আবার কি? গ্রামশি কিছুটা পরিষ্কার করেছেন। যেমন ধরুন, শিক্ষক, ধর্মপ্রচারক, প্রিস্ট বা ফতোয়াবাজ। এখন ক্যাপিটালিস্টরা তো সরাসরি সাধারণদের কাছে যাচ্ছে না, তাই তারা এই ধরণের টুলস্ ব্যবহার করছেন যা “Hegemony Culture” –এর মধ্যে পড়ে।

একটু খেয়াল করে দেখবেন, ধর্মগুরুরা মোটামুটি সবাই বলছেন, “সরকার যা করছেন বা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তা আমাদের ভালোর জন্য”। এখন সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তাদের কর্মফল নিয়ে কনভিন্সড হয়ে যাচ্ছেন। তারা ভাবছেন, দেখলে ভাই! গুরু বলে দিলো আসলেই আমাদের কর্মফল আমাদের এই অবস্থার জন্য দায়ী।

এখন আসা যাক একজন রাজনৈতিক নেতা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ভাষণ কীভাবে দেন, “আমি তো আপনাদের সেবক। আপনারা আমার ভাই। আপনারাই রাজা। আপনাদের ভোট নির্ধারণ করবে আমার ভবিষ্যৎ। এবং আমি আপনাদের প্রজা হয়ে এই মহান দায়িত্ব পালন করবো। আমাকে আপনারা বিশ্বাস করুন ও সুযোগ দিয়েই দেখুন।”

কিন্তু মাঠে তার চেহেরা আলাদা। একবার ক্ষমতা পেয়ে গেলে উল্টো আমাদের তাদের স্যার স্যার… বলতে বলতে এক জীবন শেষ হয়ে যায়। খেয়াল করুন, জনপ্রতিনিধি বলছেন একটা আর করছেন ঠিক তার উল্টোটা।

হয়ে গেল না “খিচুরি!” আর ঠিক এই জায়গায় গ্রামশি বলছেন, এটাই হচ্ছে “Hegemony Culture” । না টাকা লাগলো, না মিলিটারি ফোর্স। আপনার সম্মতি আপনার ধ্বংশের রাস্তা তৈরি করে দিলো।

হিটলারের বন্ধু মুসোলিনি ঠিক এজন্যই গ্রামশি কে জেলে পাঠান। “The Prison Notebooks” –এর মত বিখ্যাত বই গ্রামশি জেলে বসেই লিখেছিলেন।

একজন ডাক্তার তো আপনার সাহায্য করে তাই না? কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি পয়সা চার্জ করেন, অনেকক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোম্পানির ঔষধ নেবার জন্য প্রেস্ক্রিপশন দেন। আপনার কি মনে হয়, তিনি স্রেফ আপনার ভালোর জন্য এসব করছেন? মন্তব্যের বক্স আছে কেন? চলুন কিছু ব্রেইন স্টর্ম হয়ে যাক। ধন্যবাদ।


- মেহেদি হাসান(Mehedi Hasan)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১২:৪৬
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গঞ্জিকা সেবনকারীরাই পঞ্জিকা লিখে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ৯:৪৫

গঞ্জিকা সেবনকারীরাই পঞ্জিকা লিখে....

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রত্যাহিক জীবনে পঞ্জিকা একটি অপরিহার্য বিষয়। তাদের পুজো, বার-তিথি-নক্ষত্র দেখা ছাড়াও পঞ্জিকার গুরুত্ব আছে বাংলা সাহিত্যে। আমার মতে, পঞ্জিকার মতো নির্মল হাস্যরসের ভাণ্ডার বাংলা সাহিত্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা লেখা, কবি হওয়া ও নিজস্ব কিছু চিন্তাধারা

লিখেছেন নীল আকাশ, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ৯:৫০



কবিতা লেখা একটা গুণ। একটা বিশেষ গুণ। ইচ্ছে করলেই সবাই কবিতা লিখতে পারে না। কবিতা লেখার জন্য বুকের ভিতরে ‘কবি কবি’ একটা মন থাকতে হয়। বাংলা সাহিত্যে বহু বছর ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ কতটা উন্নতি করলো?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৩:৫১

ছবিঃ আমার আঁকা।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে বলা যাবে না।
যতদূর এগিয়েছে তার চেয়ে ত্রিশ গুণ বেশি এগোনো দরকার ছিলো। শুধু মাত্র দূর্নীতির কারনে আজও পিছিয়ে আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার নতুন নকিবের গোপন এজেন্ডা

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৪:৩৮


আসসালামুয়ালাইকুম। আপনারা সবাই ব্লগার নতুন নকিবকে চেনেন। তাকে আমার খুব পছন্দ ছিলো। কারণ সে ইসলামী ভালো ভালো পোস্ট দেয়। কিন্তু হঠাৎ করে এক পোস্টে তার মুখোশ খুলে গেছে। দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্নানঘরের আয়না

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:৪৯



দিনের শেষে প্রিয়বন্ধু হয়ে থাকে একজন' ই
- স্নানঘরের দর্পণ
যে দর্পণে তুমি নিজে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী রাজকন্য হয়ে র'বে
কনে সাজে তুমি, অথবা মাতৃত্বের জ্বরতপ্ত বিষণ্ণ মুহূর্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×