somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মি. বিকেল
আমি মেহেদি হাসান, মি. বিকেল নামে পরিচিত। আমি একজন লেখক, অভিনেতা, সমাজকর্মী, রেডিও জকি, ওয়েব ও অ্যাপ ডেভেলপার, সম্পাদক, উপস্থাপক, রক্তদাতা, এবং নাট্য পরিচালক। মাইক্রোসফটে ডেভেলপার হিসেবে কর্মরত এবং গল্প বলা আমার প্রধান পরিচয়।

বলিউড (Bollywood): একটি মাফিয়া চক্রের বিশ্লেষণ (পর্ব - ০২)

১৭ ই মে, ২০২৪ দুপুর ২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সিনেমাটিক জীবনে আমাদের অধিকাংশের চোখে বলিউডের লেন্স যুক্ত। আমরা আমাদের বাস্তবতাকে বলিউডের সিনেমাটিক জীবনের সাথে অনেক সময় গুলিয়ে ফেলি। আমাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের বহু অংশে বলিউড একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। কিছু কিছু সংস্কৃতি প্রায় একেবারে বলিউডের জন্য আজ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত। ‘বার্থডে’ বা ‘জন্মদিন’ উদযাপন কোন বিলেত ফেরত ব্যক্তি যতটা আয়োজন করেছেন বা তার থেকে আমরা যতটা প্রভাবিত হতে পারি বলিউড থেকে তারচেয়ে বেশি আমরা প্রভাবিত এবং এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত।

উপনেশবাদের ধারক ও বাহক এই বলিউড ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু আবার ফেলে আসা হিন্দি সিনেমা নয়। হিন্দি সিনেমা এবং বাংলা সিনেমা (বাংলাদেশের) একসময় প্রায় হাত ধরে হাঁটতো। সেখানেও জন্মদিন পালন হত কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন সেটাকে শোভন বা গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। সুতরাং ঐ হিন্দি ও বাংলা সিনেমা আপাদমস্তক সস্তা শিল্প হলেও, আমাদের লেন্সে অনেক কিছু ধরা না পড়লেও তা অন্তত ক্ষতিকর ছিলো না।

সেখানে হয়তো ধনী-গরিবের বৈষম্যের লড়াই চলছে। ইংরেজিতে কথা বলা কে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছোট করা হয়েছে। ধনী ব্যক্তি মাত্রই দুর্নীতিবাজ, বাজে লোক, দুষ্ট লোক হিসেবে দেখানো হয়েছে। টাকার ধারণা বাদ দিয়ে জীবনের ধারণা ঐ সমস্ত ফেলে আসা সেলুলয়েডের পাতায় পাতায় রচিত হয়েছে।

প্রেমের সংজ্ঞা জোরদার করা হলেও সেখানে ‘ডেটিং’, ‘লিভ টুগেদার’, ‘ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড’, ‘সিচুয়েশনশীপ’, ‘বেঞ্চিং’ ইত্যাদি অদ্ভুত (ভারতীয় সাংস্কৃতির প্রেক্ষাপটের আলোকে) শব্দের বা বিষয়ের সাথে পরিচয় করানো হয়নি। এমনকি গার্লফ্রেন্ড/বয়ফ্রেন্ড শব্দগুলো এখন পর্যন্ত অনেক বাঙালী গ্রহণ করেন নাই। এবং তাঁরা খুব সম্ভবত এসব মেকানিজম সম্পর্কেও জানেন। আমরা বাঙালীরা এই সমস্ত দিনগুলোকে এত মূল্যায়ন করা শুরু করেছি যে, আমাদের যা ছিলো তা অবহেলায় আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। এমন কোন দিন নাই যা গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা মতে কোন বিশেষ দিন হওয়া থেকে মুক্ত।

যখন লিখছি তখন গ্রামীণফোন থেকে ‘মা দিবসের শুভেচ্ছা!’ জানানো হলো। আমি ভাবছি, মায়ের জন্যও নির্দিষ্ট দিবস থাকা উচিত? বাবার জন্যও নির্দিষ্ট দিবস থাকা উচিত? আমাদের পায়ে হালকা চোট লাগলে ও... মা..., ও... বাবা... বলে উঠি। পারলে মায়ের কোলে গিয়ে উঠে থাকি... ২৭ বছর বয়স মতান্তরে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বাবার কাছে পকেট খরচ না নিয়ে বাইরে বের হতে পারি না।

একটু বাবা-মা কে দেখার জন্য যারা ঘনঘন ছুটিতে বাড়ি আসেন তারা আর যাইহোক ‘Homesick’ নয়, এই আবেগ কোন রোগ নয় যে সারাতে হবে। আমরা থাকি তো সবসময় বাবা-মায়ের হাত ধরে। এমন দিন নাই আমাদের বাবা-মা আমাদের খবর রাখে না। তাই বলিউড আমাদের প্রতিষ্ঠিত ও যা এখন অনেকখানি ভঙ্গুর ‘সমাজ’ নামক বস্তুর অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

আপনি বলবেন, “না, না, সব সোশ্যাল মিডিয়ার দোষ। আজকাল ছেলেমেয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সাথে মিশছে, সেসব দেখছে, সেসব দেখে শিখছে... তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। আরেহ্, এ তো ভালো জিনিস!” এই ধরণের পাগলের সাথে আমি তর্কে যাবো না, শুধু এটুকু বলবো, যতটুকু সিনেমা মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে তার অর্ধেকও সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া মিলে করতে পারে না। সিনেমা হচ্ছে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। এর আশেপাশে প্রতিযোগিতায় এখন পর্যন্ত কিছু জন্মায় নাই।

বাঙালী মায়েরা আজীবন শাবানার মত জীবনযাপন করে গেছেন বা যাচ্ছেন আর বাবারা সবাই একেকজন জসিম। এই উদাহরণ যদি আপনার মনে দাগ কাটে তাহলে বাংলা সিনেমা একসময় সত্যিই ‘সিনেমা’ ছিলো, আর যেহেতু বাংলা ও হিন্দি সিনেমা সে সময় হাত ধরে হাঁটতো সেহেতু আমি ঐ ফেলে আসা স্বর্ণালী ও সুন্দর সময়ের সমালোচনা করছি না। বরং আমি প্রশংসা করতে চাই ঐ সমস্ত সস্তা শিল্প কে। যে শিল্প সহজ ছিলো, বোধগম্য ছিলো...

কলকাতার ‘হেমলক সোসাইটি’, ‘প্রেম আমার’, ‘বুঝে না সে বুঝে না’, ‘সেদিন দেখা হয়েছিলো’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’, ‘পাগলু’, ‘সকাল-সন্ধ্যা’ এই সিনেমাগুলো বেশিরভাগ রিমেক ছিলো। কিন্তু এই সিনেমার নাম নেওয়ায় যদি আপনার শৈশব/কৈশোর মনে পড়ে যায় তাহলে খুব সম্ভবত এসব ভালো শিল্প ছিলো। সালমান শাহ্ তো ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ আমাদের সবার জনপ্রিয়। মুদ্রার অন্যপিঠে একই সিনেমায় হিন্দি সিনেমার আমির খান ছিলেন। এবং এই দুই সিনেমা একটা গোটা প্রজন্মের জন্য পুরা নস্টালজিয়া।

কিন্তু বলিউডের কাছে আর দেবার মত খুব বেশি কিছু নাই। নেটফ্লিক্স/আমাজন প্রাইমের সাবক্রিপশন ক্রমান্বয়ে কোরিয়ান, জাপানীজ ইন্ডাস্ট্রির দিকে যাচ্ছে না তো? যদি যায় তাহলে ভালো খবর। কারণ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমাতেও লুঙ্গী বা ধূতি পরা ওল্ড স্কুল হয়ে গেছে। কিন্তু ওটাই ওদের এবং কিছুটা আমাদের সংস্কৃতি।

এদের সিনেমায় আমরা যত আশা বেঁধে রেখেছিলাম তত বেশি হতাশ করেছে। সামগ্রিকভাবে পুরো সাউথ ইন্ডাস্ট্রি যে ভয়ানক ভায়োলেন্স প্রোমোট করছে তা তো আর অস্বীকার করা যায় না। ধরুন, একদিন হুট করে রাস্তার কোন টোকাই চাকু নিয়ে রাতের বেলা আপনাকে আটকে রেখে পুস্পা স্টাইলে বলছে, “ঝুকেগা নেহি শালা!”

বলিউড সবসময় ইংরেজিতে কথা বলে। লক্ষ্য করে দেখবেন, বলিউডের সর্বশেষ দুটো পছন্দের সিনেমায় ইংরেজির ব্যবহার নাই। নামও বলতে হবে? ‘12th Fail’ ও ‘Laapataa Ladies’। আমার মতে ইংরেজিতে কথা বলা অন্যায় নয় কিন্তু হিংলিশ কেন? বিনাকারণে অনর্গল হিংলিশ বলছে। তার দেখাদেখি বাংলা নাটকে চলছে বাংলিশ।

ভাষার প্রতি এত কদর দেখে চোখে জ্বল চলে আসে। আপনি বাংলাদেশি হলে বাংলায় বলুন, আরো ভালো হয় যদি আপনি আপনার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। আমরা যারা প্রমিত বাংলার পন্ডিত তারা নাহয় কষ্টকরে বুঝে নেবো। এতে লজ্জার কি আছে? এতে সমস্যা কি? এটাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Inferiority Complex’ বলে।

কিন্তু এমন সমাজ এই বলিউড তৈরি করেছে যে সমাজে আমরা সবাই এই রোগে আক্রান্ত। এই ভুল সমাজ ভুল ড্রেস-আপ সেন্স শেখাচ্ছে, হিরোইক দর্শনে অহংকারী হতে শেখাচ্ছে, বাংলিশ বা হিন্দি+বাংলা+ইংরেজি ভাষাত অদ্ভুত মিশ্রণে ভুলভাল হাইব্রিডাইজেশনের শিকার হতে হচ্ছে, ভায়োলেন্স শেখাচ্ছে, আর উপনেশবাদের ধারণা এমনভাবে আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকে দেওয়া হচ্ছে এতে করে এক জীবনে আমাদের মধ্যে হীনমন্যতা যাবে না। ইউরো-সেন্ট্রিক জীবন কে আদর্শ হিসেবে বিবেচনায় আমরা নিচুস্তরের। আর এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ হলো কালজয়ী বৃথা সাহিত্য বা দর্শন।

এক সেকেন্ড, আমাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের থেকে দাম্পত্যের কলহের মূখ্য না হলেও গুরুত্বপূর্ণ গৌণ অনুঘটক এই বলিউড কে বিদায় দেবার পালাও এসেছে। আরো বেশি দেরি করলে মুক্তি অসম্ভব। “আগুনের দিন শেষ হবে একদিন...” এটা সেই সময়ের বাংলা সিনেমার গান। সস্তা গান। আরো অদ্ভুত বিষয় কি জানেন? এই সিনেমায় দুই বাংলা একসাথে কাজ করেছিলো।

ছবি: Bing Enterprise (Copilot Ai)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২৪ বিকাল ৩:৫৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ব্লগার ভাবনা: ব্লগ জমছেনা কেন? এর পেছনে কারণ গুলো কি কি? ব্লগাররা কি ভাবছেন।

লিখেছেন লেখার খাতা, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ৮:৩৫


সুপ্রিয় ব্লগারবৃন্দ,
আম পাকা বৈশাখে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি। কাঠফাটা রোদ্দুরে তপ্ত বাতাস যেমন জনপ্রাণে একটু স্বস্তির সঞ্চার করে, ঠিক তেমনি প্রাণহীন ব্লগ জমে উঠলে অপার আনন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার ২৭ নম্বর সমুদ্রবন্দর থেকে

লিখেছেন অপু তানভীর, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ১১:০০

চারটার দিকে বাসায় ফেরার কথা ছিল । তবে বৃষ্টির কারণে ঘন্টা খানেক পরেই রওয়ানা দিতে হল । যদিও তখনও বৃষ্টি বেশ ভালই পড়ছিল । আমি অন্য দিন ব্যাগে করে রেইনকোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধা কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৪ ই জুন, ২০২৪ রাত ৩:৩২

কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।
সকল যোগ্যতা জিপিএ-্র প্রমান দিয়ে, এরপর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, সেকেন্ডারি।
এরপর ভাইবা দিয়ে ৬ লাখ চাকুরি প্রার্থি থেকে বাছাই হয়ে ১০০ জন প্রাথমিক নির্বাচিত।

ধরুন ১০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিউ জার্সিতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে পেয়ে গেলাম একজন পুরনো ব্লগারের বই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৪ ই জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:৩৭

জাকিউল ইসলাম ফারূকী (Zakiul Faruque) ওরফে সাকী আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু; ডাঃ আনিসুর রহমান, এনডক্রিনোলজিস্ট আর ডাঃ শরীফ হাসান, প্লাস্টিক সার্জন এর। ওরা তিনজনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একই... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেনজীর তার মেয়েদের চোখে কীভাবে চোখ রাখে?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ১৪ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৩:০৬


১. আমি সবসময় ভাবি দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর যারা মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত পরিবারের কাছে সৎ ব্যক্তি হিসেবে থাকে, কিন্তু যখন সবার কাছে জানাজানি হয়ে যায় তখন তারা কীভাবে তাদের স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×