সে অনেক দিন আগের কথা (১৯৯৮)।
এক দেশে ছিলো এক ছেলে। সবে মাত্র মেট্রিক পাস। সামনে লম্বা ছুটি। বড় ভাই চট্টগ্রাম বি আই টি তে পড়ে।
তো চলো চট্টগ্রাম। যে ছেলে ঈশ্বরদী র বাইরে পাবনাতে ও কোনোদিন একা যায়নি তার কাছে তো সেটা সাত সমুদ্র পাড়ি দেবার মতো ই ঘটনা। কি বলেন?
সন্ধ্যা সাতটার অগ্রদুত বাসে আব্বা তুলে দিলেন।
শুরু হলো এক অদ্ভুত হ্রৎকম্পন।
তখন ঢাকা যাবার একমাত্র উপায় ছিলো আরিচা-নগরবাড়ি রুট।পাবনা পার হয়ে কিছুদুর যেতেই প্রথম পরিচয় জ্যাম নামের দানবের সাথে।রাত সাড়ে আট টার সময় আমি পাবনা ক্যডেট কলেজের সামনে, সেই আমি সাড়ে বারোটার সময় ফেরিতে উঠলাম।
অন্ধকার রাত আমার সব কৌতুহল ভালো ভাবে মিটতে দিলনা।
ফেরি তে উঠে দেখি , ও মা, এতো দেখি ৫তলা বাড়ি।এতোদিন আমি দেখেছি পাকশি ঘাটের একতলা হলুদ ফেরি গুলো, আমার কাছে এ এক সীমাহীন বিস্ময়। কোনায় কোনায় সিড়ি, ঘুপচি ঘুপচি ঘর। লাফাতে লাফাতে উঠলাম ৩য় তলায়। সেখানে রীতিমতো একটা রেস্টুরেন্ট।চিপ্স, বিস্কুট, চানাচুর থেকে শুরু করে ভাত মাছ ডাল, সবই আছে। রাতে বাসা থেকে খেয়ে এসেছি, তাই চানাচুর মাখানো, আর কোক এর বোতোল কিনে রওনা হলাম আরো উপরে।
কোনার একটা চিকন সিড়ি বেয়ে উঠতে থাকলাম, ৪র্থ তলা পার হয়ে একেবারে ছাদে...। আহ!
ছিট ছিট ব্রিষ্টি,,,,।
ঘন্টা খানেক পর আরিচা ঘাটে ভিড়ল ফেরি। তারপর কোনো রকম ঝন্ঝাট ছাড়া ভোর ৫টায় পৌছলাম গাবতলি।বাসের লোকদের আব্বা বলে দিয়েছিলেন, তাই ওরা আমাকে তখন নামতে দিলনা। অগত্যা ঘন্টা খানেক ঘুমিয়ে, সাড়ে ৬টায় আমার পদধুলি পড়ল ঢাকার মাটিতে।
এরপর সকালে নাস্তা করে আমি ইউনিক বাসে উঠলাম।ঢাকার প্রতিটি গলি, রাস্তা সবই কেমন জানি অদ্ভুত লাগছিলো।কিছুদুর যেতেই দেখি আরেব্বাবা গাড়ির দোকান!!! আমি মুদি দোকান থেকে শুরু করে কাপড় এর দোকান, এমন কি বড় বড় আড়ত দেখেছি, কিন্তু কোনো গাড়ির দোকান আমার জীবনে প্রথম দেখলাম। অবাক হচ্ছি মনে মনে, কিন্তু ভাব এ প্রকাশ করছিনা,
জানি তো সহযাত্রীরা আঁতেল ভাববে।
মতিঝিলের কাছে থামল, কিছু যাত্রী তোলার জন্য। আমি এক বোতোল পানি আর ২টা চিপস কিনে আবার বাসে উঠলাম। আমার সহযাত্রী, কয়েকজন রাজনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করল। আমি নাক গলানোর তাড়না অনুভব করলাম। বেশ জোর গলায় আমাদের এরশাদ চাচার পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করলাম। বুঝুন একবার, অবশ্য মুরুব্বীরা আমাকে ধমক দেয়নি, আমার সৌভাগ্য ,, কি বলেন?
এরপর কোনো ঝন্ঝাট ছাড়াই শুরু হলো লম্বা বাস যাত্রা। কাঁচপুর পেরিয়ে, অচেনা জায়গা পেরিয়ে আমাদের বাস থামল নুরজাহান হোটেলের সামনে। ততক্ষনে আমার ক্ষিধে লেগে গেছে। সুতরাং এখন উদর পুর্তি ছাড়া কি আর কিছু ভাবা যায়?
খেয়ে দেয়ে আবার বাসে। সীতাকুন্ডু এসে আমারতো আর আনন্দ ধরে না। আমি যে পাহাড় দেখলাম!!!
তখন প্রায় সন্ধ্যা। কালচে সবুজ রংয়ের পাহাড় গুলো যে কেমন লাগছিলো, বলে বোঝাতে পারবনা।
আরি সর্বনাশ!! পাহাড় এর নিচ দিয়ে এক খান ট্রেন যাচ্ছে....।
সন্ধ্যার কিছু পর নামলাম পুরাতন রেলস্টেশনের সামনে। তারপর বড় ভাইয়ের বলে দেয়া বাসে করে বহদ্দার হাট, তারপর আরেক বাসে পাহাড়তলীর পথ। নিকশ কালো রাত, আমি কিছু চিনিনা, কারো কথা বুঝিনা, শুধু চিনি বি আই টি গেট।
এখন মনে হয়, তখন মোবাইল খুব দরকার ছিলো
এই বার শুরু হলো আমার অভিযান।
হলের নাম মনে নেই। খুব সম্ভব সাউথ হলের নিচতলায় আমার বড় ভাই থাকতেন। আমাকে রুমে ঢুকতে দেখেই তো অবাক। আগেই বলেছি তখন মোবাইল ছিলনা। সুতরাং আমি শুধু একটা চিঠির উপর ভরসা করে কোনো রকম সাহায্য ছাড়াই পৌছে যাব, আমার বড় ভাই তা স্বপ্নেও ভাবে নি।
যা হোক, সে রাতে আমার পেটে প্রথম পড়ল হলের খাবার। যে রকম শুনি আমার কাছে কিন্তু খাবার অতো টা খারাপ মনে হয়নি। খেয়ে দেয়ে সিন্গেল খাটে কষ্টের ঘুম। বরাবর ই মাশাল্লাহ, আমার ঘুম ভালো হয়।
খুব মজায় কাটতে লাগলো দিন গুলি। ফাঁকা মাঠে ফুটবল, সকাল, বিকাল পাহাড়ে ঘোরা, ওফ কি আনন্দ।
বিকালে রাস্তার ওপারে ছোটো ছোটো আনরস, কি যে মিস্টি ! মাত্র ২ টাকা পিস।
জীবনে প্রথম খেলাম বার্গার। পাউরুটির ভেতরে মাংসের চপ-- কি আজব কথা !
কয়েক দিন পর দাদা আমাকে নিয়ে গেলেন পতেন্গা। জীবনে আমার প্রথম সমূদ্র দর্শন! বড় বড় সিমেন্টের টুকরা আর ঘোলা পানি। আমি তাতেই অবাক। হাজার হোক, সমুদ্র তো! আমি দাদা আর দাদার এক বন্ধু সিমেন্টের টুকরার উপর বসে আছি, কিছু লোক আমাদের পাশে ঘোরাঘুরি করছিলো, এক লোক এগিয়ে এসে বললো, ভাই, লাগবে? ফরেন জিনিস আছে। আমি কিছু বুঝলাম না, দাদার বন্ধু দিলো এক রাম ধমক। কেনো? তাও বুঝলাম না।
সেখান থেকে কিনলাম একটুকরো প্রবাল, সে এক ......অনুভূতি।
পরদিন গেলাম ফয়ে'স লেক। কি অদ্ভুত সুন্দর, বলে বোঝাতে পারবনা(বর্তমানের ক্রত্রিম নয়, প্রাক্রিতিক)। পাহাড়ের পর পাহাড় উঠছি, নামছি। নিচে তাকিয়ে লেকে পানিতে সাম্পানের যাতায়াত দেখছি। একটু পর একটা সাম্পান ভাড়া করে আমরাও নেমে পড়লাম।
পাশের পাহাড়ে নাকি বি ডি আর এর ক্যাম্প, ওপারে আরো সুন্দর। কিন্তু গার্ডরা যেতে দিলনা। ওখানে নাকি কিছুদিন আগে বিরাট এক অজগর পাওয়া গেছে।
পাশের ছোটো চিড়িয়াখানা দেখে ফিরতে রাত হয়ে গেলো। পরদিন আমার জন্য আরো মজা অপেক্ষা করছে, আমি কিন্তু তা জানিনা।
চলবে..........................
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৩:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



