চিৎ হয়ে শুয়ে আছি আমি। মাথার তলে বালিশ নেই। চোখ সোজা ঘরের ছাদে। বাম হাত বুকের ওপরে আর ডান হাত সোজা করে বিছিয়ে দেয়া আছে পাশে। সরু একটি পাইপ বেয়ে আমার দেহ থেকে রক্ত ক্রমে জমা হচ্ছে প্লাস্টিকের থলেতে। আমার দেহ থেকে যে রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে সেটা শরীরে কোনো অনুভূতি ছড়াচ্ছে না। আমি টেরই পাচ্ছি না যে আমার দেহ থেকে কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে যেনো চুপি চুপি রক্ত আমার দেহ ছেড়ে প্লাস্টিকের থলেতে আশ্রয় নিচ্ছে।
আমার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আমার অফিসের বস। তাঁর পাশে উনার স্ত্রী। আমি মাথা ঘুরিয়ে এক ঝলক উনাদের দিকে তাকালাম। দুজনকেই খুব বিচলিত দেখাচ্ছে। উনাদের প্রফুল্ল দেখার আশা অবশ্য অনর্থক। উনাদের একমাত্র মেয়ের একটা জটিল রোগ হয়েছে। রক্তের কী যেনো একটা রোগ। অফিসের পিয়ন আমি, পড়াশুনা বেশি করি নাই, জটিল এই রোগটার জটিল নাম তাই মনে থাকছে না আমার। কয়েকদিন পরপরই দুই-তিন ব্যাগ রক্ত লাগছে। রক্তের যোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আজ সকালে অফিসে এসে আমাকে তাঁর চেম্বারে ডেকে নিয়ে স্যার যখন আমার রক্তের গ্রুপ জিজ্ঞেস করলেন তখন আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিলো আল্লাহ যতটুকু রক্ত দিয়ে পাঠিয়েছেন শরীরে রক্তের মজুদ ততটুকুই। রক্ত দিলে তো কমে যাবে। কিছুদিন পর পর যদি রক্ত দিতে থাকি তবে এক সময় তো আমার শরীরে আর রক্তই থাকবে না! স্যারকে তবুও আমি মিথ্যে বলতে পারি নি। স্যারের মেয়ের রক্তের গ্রুপ আর আমার রক্তের গ্রুপ একই। এই গ্রুপের রক্ত নাকি সহজে পাওয়া যায় না। স্যার আমাকে রক্ত দিতে বললেন। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। দিতে না চাইলে চাকরি যাবে, চাকরি গেলে খেতে পাবো না, এমন অবস্থায় না করতে পারলাম না। ভয়ে ভয়ে শুধু বললাম, ‘স্যার, রক্ত দিলে আমার কোনো ক্ষতি হবে না স্যার!’
স্যার বললেন, ‘ক্ষতি হবে কেনো পাগল! আমাদের রক্ত কণিকা তিন মাসের বেশি বাঁচে না। তিন মাসের ভেতরে পুরনো কণিকা মারা যায়, আবার নতুন কণিকা সৃষ্টি হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর তাই রক্ত দিলে কোনো সমস্যা নাই।’
আমি স্যারের কথা তেমন বুঝলাম না। তবুও একটু খুশি খুশি ভাব নিয়ে বললাম, ‘তার মানে স্যার মাঝে মধ্যে রক্ত দিলে শরীর থেকে রক্ত ফুরিয়ে যাবে না!’
‘না, ফুরিয়ে যাবে কেনো! তিন মাস পরপর রক্ত দেয়ার নিয়ম আছে। তুমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো।’
তারপর স্যার আমাকে অনুরোধ করে বললেন, ‘ভাই রুহুল, নির্ভয়ে চলো। তোমার রক্ত দিয়ে আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে সাহায্য করো।’
স্যার এই প্রথম আমাকে ভাই বলে ডাকলেন। ক্ষতি যখন নেই আমি আর না করলাম না। স্যারের সাথে চলে এলাম মেডিকেলে। চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম বেডে। মাথার তলে বালিশ নেই। চোখ সোজা ছাদে। বাম হাত বুকের ওপরে আর ডান হাত সোজা করে পাশে বিছিয়ে রাখা। একটা সরু পাইপ দিয়ে ডান হাতের একেবারে ওপরের দিকে বাঁধা হলো। হাতের মুঠোয় কী যেনো ধরিয়ে দিয়ে বলা হলো নাড়তে থাকতে। মোটা একটা সুঁই ঢুকিয়ে দেয়া হলো চামড়ার ভেতরে। সুঁইয়ের সাথে সরু পাইপ দিয়ে একটা থলে যুক্ত। ওই থলেতেই রক্ত জমা হতে থাকলো। মিনিট চারেকের ভেতরেই থলেটা ভর্তি হয়ে গেলো। কখন কখন আমার দেহ থেকে এতোখানি রক্ত বেরিয়ে গেলো তা আমি টেরও পেলাম না!
হাত থেকে সব খুলে নেয়া হলো। সুঁই ফোঁড়ার জায়গায় তুলা চেপে দিয়ে কুনুই ভাঁজ করে শুয়ে থাকতে বলা হলো। আমি শুয়ে থাকলাম। চোখ মেলে রাখলাম ছাদে। আমার মতো পিয়নের শরীরের রক্ত চলে যাবে স্যারের মেয়ের শরীরে! কী বিচিত্র বিষয়! ভাবনার তাল কেটে দিলেন স্যার।
‘এবার উঠে বসো রুহুল।’
আমি উঠে বসলাম। স্যার নিজেই একটা ব্যান্ড হাতে সুঁই ফোঁড়ানোর জায়গায় লাগিয়ে দিলেন। তারপর একটা জুস আর বিস্কিটের প্যাকেট হাতে দিলেন।
‘বিস্কিটটা পরে খেয়ো। এখন জুসটা খাও।’
যা বেতন পাই তাতে ডাল-ভাত জোটে কোনোমতে, এই জুস-টুস খাওয়ার সাধ থাকলেও খাওয়া হয় না। জুসটা তাই ঢক্ ঢক্ করে খেয়ে ফেললাম।
স্যারের স্ত্রী আমার হাত চেপে ধরলেন। একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘আপনি আমাদের যে উপকার করলেন, যা দান করলেন তার ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। আমাদের মেয়েটার জন্য এখন এক ফোঁটা রক্তও অনেক মূল্যবান। আপনার এই রক্ত আরো কিছুদিন মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমাকে আরো কিছুদিন মা ডাক শোনাবে আপনার এই রক্ত।’
আমি ভদ্রভাবে এবং গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। ম্যাডামের এমন কথার উত্তরে কী বলা উচিত সেটাও আমি জানি না। কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়ি নি। ম্যাডামের কথায় আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। মাছের মতো খাবি খেতে লাগলাম।
স্যার বললেন, ‘জানো রুহুল, হাদিসে আছে কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে রক্ত দান করলে রক্তদাতার নাম শহীদদের পাশে লেখা হয়। আর শহীদদের স্থান জান্নাতে। তুমি এখন শহীদদের কাতারে। নিশ্চয় তুমি জান্নাত পাবে।’
আমি ঠিক মতো নামাজই পড়ি না। জান্নাত নিয়ে তাই ভাবলাম না। স্যারকে বললাম, ‘স্যার, এভাবে কেনো বলছেন। রক্ত দেয়া তো এমন কোনো ব্যাপার না। আমি তিন মাস পর পর আপনার মেয়েকে রক্ত দেবো।’
স্যার আমাকে বুকে চেপে ধরলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম!
‘চলো এখন আমরা মামনির কাছে যাই।’
ম্যাডাম আমাকে বাঁচালেন। স্যারের আয়রন করা জামায়, সুবাসিত বুকে আমার দিন দশেক না ধোয়া জামা, ঘামের দুর্গন্ধ ভরা বুক মিলিয়ে রাখতে অস্বস্তি লাগছিলো। স্যারের বুক থেকে মুক্তি পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম!
স্যার বললেন, ‘চলো রুহুল, যার জন্য রক্ত দিলে তাকে একবার দেখে যাও।’
আমরা স্যারের মেয়ের কেবিনে গেলাম। বেডে সাদা চাদর জড়িয়ে চোখ বুঁজে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে পরীর মতো একটা মেয়ে। চেহারাটা দেখেই ছলাৎ করে উঠলো বুকের ভেতরে। মাত্র নাকি ১২ বছর বয়স। এই বয়সের একটা মেয়ে, এমন সুন্দর একটা মেয়ের শরীরে এতো জটিল একটা রোগ বাসা বেঁধে আছে! এই মেয়েটা যে কোনো সময় মারা যাবে! রোগ-বালাইয়ের কি বাছ-বিচার নাই!
আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু ও ঘুমিয়ে নেই। ম্যাডাম মাথার পাশে বসতেই ও চোখ খুললো। ম্যাডাম ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘ঘুমোও নি মামনি।’
‘ঘুম তো আসে না!’
মৃত্যুর পরোয়ানা যার হাতে সে কি খুব সহজে শান্তিতে ঘুমোতে পারে! সামান্য জ্বর হলেই তো আমি ঘুমোতে পারি না।
স্যার বললেন, ‘এদিকে দেখো মামনি কে এসেছে।’
ও সোজা আমার দিকে তাকালো।
স্যার আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ইনি তোমার এক আঙ্কেল। এ আঙ্কেল তোমার জন্য আজ রক্ত দিয়েছেন।’
‘তাই!’ মেয়েটা যেনো খুব খুশি হয়ে উঠলো। আমাকে বললো, ‘দাঁড়িয়ে আছো কেনো আঙ্কেল? আমার পাশে একটু বসো না!’
আমার জামা-কাপড় নোংরা। এই নোংরা জামা-কাপড়ে কোনো রোগীর বেডে বসা ঠিক না। কিন্তু মেয়েটার চাহনি আমাকে ওর পাশে বসতে বাধ্য করলো। মেয়েটার নাম আমি এখনো জানি না। বসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার নামটা যেনো কী আম্মু।’
‘মাইশা।’
মাইশা আমার হাত ধরলো। তারপর বললো, ‘রক্ত দেয়ার সময় তোমার ব্যথা লাগে নি আঙ্কেল?’
‘কই নাতো! আমি তো টেরই পাই নি কখন কখন এতোখানি রক্ত বেরিয়ে গেলো।’
‘জানো আঙ্কেল, তোমরা যখন রক্ত দিয়ে যাও তারপর কয়েকদিন খুব ভালো থাকি।’
কথাটায় বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। মন বলছে শরীরের সবটুকু রক্ত এই মেয়েটাকে দিয়ে দেই। এমন মিষ্টি একটা মেয়ে, যে মেয়েটা এমন সুন্দর করে কথা বলে তার জন্য শরীরের সবটুকু রক্ত দিয়ে দিতে মন চাইলো। কিন্তু সত্যি সত্যি এটা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমারও যে পরিবার আছে! আমিও যে এক মায়ের বুকের ধন!
‘তুমি আর কথা বলো না মামনি। ডাক্তার কথা বলতে মানা করেছে। এখন একটু ঘুমোও।’
ম্যাডামের নির্দেশ মেনে মাইশা চুপ করে গেলো। আমি উঠলাম। মাইশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমি এখন যাই মামনি। পরে আবার আসবো। আর তুমি ভয় পেয়ো না। আমরা আছি তো, দেখো তুমি ঠিক হয়ে যাবে।’
মাইশা চোখ বুঁজে নিলো। যেনো আমার সান্ত্বনায় আশ্বস্ত হতে পারলো না, ভরসা পেলো না।
স্যারের সাথে আমি কেবিন থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে স্যার আমার হাতে একটা খামের প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন।
‘এটা রাখো রুহুল।’
প্রথমে আমার একটু সংকোচ হলো। পরক্ষণেই সংকোচটা উবে গেলো। খামটা শক্ত করে ধরে রাখলাম। বুঝতে পারলাম ওতে বেশকিছু টাকা আছে। কেউ আমাকে নিজে থেকে টাকা দিতে চাইলে আমি ভদ্রতা করেও কখনো বলি না, না ভাই এসবের দরকার নাই। টাকাকে আমি কখনো না বলি না। খামটা তাই বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করে স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
মেডিকেল থেকে বেরিয়েই খামটা খুললাম। খামের মুখ লাগানো ছিলো না। ভেতর থেকে বের হলো তিনটা পাঁচশ টাকার নোট। এক ব্যাগ রক্তের বিনিময়ে দেড় হাজার টাকা! তিন মাস পর পর এক ব্যাগ রক্তের বিনিময়ে দেড় হাজার টাকা পেলে মন্দ হয় না। এতোদিন কেনো আমি রক্ত দেয়ার বিষয়টা জানতাম না! রক্ত দিলে যে ক্ষতির কিছু নেই, এটা আরো আগে জানতে পারলে ভালো হতো। অনেক অপূর্ণতা পূরণ করে নিতে পারতাম।
দুপুর হয়ে গেছে। আজ আর অফিস যেতে হবে না আমাকে। স্যার বলে দিয়েছেন। মেডিকেল থেকে কিছুটা হেঁটে এসে রহমানিয়া হোটেলে ঢুকলাম। দুপুরের এই সময়টা রহমানিয়া হোটেল বেশ গরম থাকে। আমি মাঝে মধ্যে দুপুরে এখানে আসি। একটা সবজি আর এক প্লেট ভাত খেয়ে উঠে যাই। পকেটে যা থাকে এবং সারা মাসে যা ইনকাম তা দিয়ে এর বেশি খাওয়ার সাহস কখনো হয় না আমার। অনেক বড়লোক মানুষ খেতে আসে এখানে। সবজি দিয়ে ভাত খেতে খেতে চেয়ে চেয়ে দেখেছি, কতোজন কতোকিছু খায়। মুরগি, খাসির অনেক আইটেম; রুই, ইলিশ, চিতল আরো কতো মাছ; নাম না জানা আরো অনেক মজার খাবার। সুবাস নেয়া আর চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না আমার। বাস্তবে খাওয়ার সাহস করা হয় নি কখনো। কেবল ভেবেছি, যদি খেতে পারতাম!
আজ খাবো। ইচ্ছে মতো খাবো। চেয়ারে পা তুলে আরাম করে বসে পেট পুরে খাবো। অনেকদিন থেকে খাওয়ার খুব ইচ্ছে আমার, ঘি দেয়া গরম ভাত আর চিতল মাছের পেটি...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


