somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে আসা জীবনের কাছে

১৩ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ১১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নাসির মুজাহিদ
গাজীপুরের মেয়ে স্বপ্না, স্বপ্ন দেখত ডাক্তার হওয়ার। সেই লক্ষ্য পূরণের প্রত্যাশায় ৯ম শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিল ক্লাস ওয়ান থেকে ফার্স্ট হওয়া এ মেধাবী ছাত্রী। নিু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় সাধারণ মানের একটি স্কুলে পড়ত সে। পরিচয়সূত্রে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে একই ক্লাসের কিছু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে। ছুটির পর একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া হয়ে ওঠে নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। শুধু আলাপচারিতা নয়, একটা সময় সিগারেটও হয়ে ওঠে ওদের আড্ডার সঙ্গী। কৌতূহলী মেয়ে স্বপ্না, কৌতূহলবশতই নতুন এ সঙ্গীটির সঙ্গে গড়ে তোলে বন্ধুত্ব।
কিছুদিন পর বন্ধুটির আসল চেহারা দেখতে পেলেও কিছুই করার ছিল না স্বপ্নার। বাকিদের মতো সেও সিগারেটের সঙ্গে হেরোইন বা গাঁজা সেবন শুরু করে। তার বন্ধুরা করত আগে থেকেই। বুঝতে পারে মরণ-নেশা তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। তবুও নিরুপায়, অদৃশ্য এক শক্তির মোহনীয় টানে প্রতিদিনই সে ছুটে যেত টঙ্গীর বস্তিতে নেশার আড্ডায়। বাবার কাছ থেকে আবদার করে নেওয়া টাকায় এভাবে বছরখানেক নেশা করল স্বপ্না। বাবা-মা, ভাই-বোন কেউই সিগারেটটি পর্যন্ত কখনও ধরে দেখেনি। এমন পরিবারের মেয়ে হয়ে নেশা করে, লজ্জায় এ কথাটি কাউকে কখনও বলেনি, বুঝতেও দেয়নি।
কিছুদিন পর টঙ্গীতে ওই বস্তিটি উচ্ছেদ করা হলেও উচ্ছেদ হয়নি স্বপ্নাদের নেশার আড্ডা। সেই অদৃশ্য শক্তির প্রবল আকর্ষণে বাবা-মায়ের বাঁধন ছিন্ন করে স্বপ্নার নতুন ঠিকানা হয় বিএনপি বস্তি। পরিবার ছেড়ে আসায় নেশার জন্য অর্থের জোগান দিতে হয় নিজেকে। বাধ্য হয়েই সে পা বাড়ায় অজানা এক মুত্যুপুরীর পথে, কামুক পুরুষের ভোগের পণ্যে পরিণত করে নিজেকে।
শুধু স্বপ্নাই নয়, স্বপ্নার মতো এরকম হাজারও নারী এ মৃত্যুপুরীর যাত্রী। দেশের মাদকাসক্তদের প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ নারী, এই নারীরা ধূপমান বা কোনও না কোনও নেশায় আসক্ত। নিুবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত অনেক পরিবারেই স্বপ্নাদের বসবাস। আমাদের সমাজের অর্ধেকই নারী, দেশের প্রগতিতে তাদের তো পুরুষের সমান অবদান রাখাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের এ পুরুষশাসিত সমাজ নারীকে অবদমিত করে রাখতে চায় সব ক্ষেত্রেই। তবুও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় নিরন্তর লড়াই করছেন নারী। তাই শুনলে শিউরে উঠতে হয়, আমাদের দেশের মাদকাসক্তদের বড় অংশই তো তাহলে নারী। প্রশ্ন আসে, আমরা কি অচিরেই একটি মাদকাসক্ত জাতিতে পরিণত হচ্ছি, নাকি হয়েই গেছি?
দীর্ঘ চার বছর মৃত্যুপুরীর দিকে চলতে চলতে ফেলে আসা সোনালী অতীতের দিকে স্বপ্না যে একবারও ফিরে চায়নি ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম নয়। ফিরে চাইলেই বা কী, ফিরে যাওয়ার সব রাস্তাই যে সে বন্ধ করে এসেছে। অবশেষে বছর খানেক আগে জানতে পারে আসক্ত পুনর্বাসন নিবাস (আপন) সম্পর্কে। বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকায় আপন-কে খুব সহজে আপন করে নেয় স্বপ্না। আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে।
বাংলাদেশে যে গুটিকয়েক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে তার মধ্যেআপন উলে¬খযোগ্য। কেবল নারী মাদকাসক্তদের সেবার জন্যই এই প্রতিষ্ঠান। ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চারশ মাদকাসক্ত নারীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা প্রদান করেছে এটি। ইউএসএআইডি ফান্ড থেকে ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনালের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি।
কথা হলআপন-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার আফসানা পারভীন লুনার সঙ্গে। তিনি জানালেন, একজন ডাক্তার, ৩ জন হেলথ এ্যাসিসটেন্ট ও ২ জন কাউন্সিলরের সমন্বয়ে চলছে তাদের সেবা প্রদান কার্যক্রম।আপন-এ কোন শ্রেণীর মাদকাসক্তরা আসেন এবং তাদের কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমাদের এখানে যারা আসেন তাদের প্রায় সবাই নিুবিত্ত শ্রেণীর তরুণী ও যৌনকর্মী। আর তাই তাদের এইচআইভি (এইডস) ও যৌন রোগ সংক্রান্ত সচেতনতা ও চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এছাড়া আমাদের কাউন্সিলররা তাদের মানসিক উন্নতি সাধনে কাজ করেন। মাদকাসক্তরা স্বেচ্ছায় চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন কী-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে যারা আসেন, তারা সবাই স্বেচ্ছায় আসেন। কারণ আমরা মনে করি মাদকাসক্ত ব্যক্তি যদি অনুভব করেন যে তার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করা উচিত। তাহলে এতেই তার অর্ধেক চিকিৎসা হয়ে যায়।
কিশোর বয়সের মেয়েরা কেন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে? এ প্রশ্নের উত্তরেআপন-এর কাউন্সিলর নাহিদ আক্তার জানান, আমাদের কাছে যে মেয়েরা আসে তাদের অধিকাংশই কৌতূহলবশত বন্ধুদের সঙ্গে মাদক সেবন করে আসক্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ আবার ড্রাগ ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ে আসক্ত হয়। কারও কারও বাবা-মা দুজনই মাদকাসক্ত হওয়ায় সেও আসক্ত হয়ে পড়ে। আবার অনেকেই আছেন, যারা মাদকাসক্ত স্বামীর প্রভাবে বাধ্য হয়ে আসক্ত হন। তবে দেহব্যবসার সঙ্গে জড়িত মেয়েরা বেশি লাভের আশায় মাত্রারিক্ত মাদক সেবন করে বলে জানান তিনি।
রংপুরে মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর মাদকাসক্তদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেনআপন-এর সবার আপন ‘ডাক্তার আপা’ ডা. শাকিলা ইসলাম। তিনি জানান, এখানে মাদকাসক্ত নারীদের দু’ধাপে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রথমত, ১৪ দিনের ডিটক্সিফিকেশন প্রোগ্রাম, যেখানে এইচআইভি ও যৌনরোগ প্রতিরোধে প্রাথমিক চিকিৎসা ও সচেতনতা প্রদান করা হয়। পরে তাদের ৩ মাসের পুনর্বাসন প্রোগ্রামের আওতায় সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
এই তিন মাসেই তারা স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপযোগী হয়ে ওঠে বলে জানান তিনি। প্রশ্ন করি, পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে ফিরে গিয়ে সবাই কি স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন? উত্তরে ডা. শাকিলা জানান, না, সবাই পারেন না। আপন থেকে ফিরে গিয়ে অনেকেই আবার মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তবে এ জন্য চাই সমাজ থেকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণগুলো দূর করা এবং চিকিৎসার পর সুস্থ হওয়া মাদকাসক্তদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আছে কী-না জানতে চাইলেআপন-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার আফসানা পারভীন লুনা জানলেন, আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করি তাদের কোনও একটা জায়গায় চাকরি দিতে। তবে এদের অধিকাংশেরই লেখাপড়া না থাকায় এরা সম্মানজনক কোন কাজ পান না। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি জানান তিনি।
একই কথা বলল স্বপ্নাও। এর আগেআপন-এ এসে তিন মাস থেকেছিল। সুস্থ হওয়ার পর অনেক চেষ্টা করেও ভালো কোনও চাকরি না পাওয়ায় আবারও বেছে নেয় পুরনো সেই পথ। তবে এবার আর পেছনে ফিরে তাকাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে স্বপ্না। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে একটা চাকরি করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার স্বপ্ন বুনছে সে।
কথা বলতে বলতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। বিদায় নিয়ে যেই বের হব তখনি কানে ভেসে এলো খুব পরিচিত একটি গান। মেয়েরা গাইছেনঃ
আমরা করব জয়
আমরা করব জয়
আমরা করব জয় একদিন ঃ
হ্যাঁ, সত্যিই, ওরা একদিন জয় করুক এটাই সবাই চায়। সেই সঙ্গে মাদকাসক্তির মতো এক অভিশাপের হাত থেকে মুক্ত হোক দেশ। নারী আপন ভাগ্য জয় করার জন্য যে সংগ্রাম করছেন সে সংগ্রামের সাথী হোকআপন আর তার সেবায় জীবন ফিরে পাওয়া নারীরা।

০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×