মৌলভীবাজারের সরকার বাজার। গ্রাম গঞ্জের বাজার ভীড় হয় প্রচুর। এখানে গ্রামের সব বেচা কেনা হয় সকাল থেকেই অবশ্য শহরতলির এই গ্রামটায় সন্ধ্যা নামে সুর্য ডোবার পরপরই। দোকানে দোকানে শাটার লাগিয়ে দোকানিরা বাসায় ফেরে বউয়ের সাথে খোশ গল্প করে পান চিবোয়। সকালের বাজার যেমন মানুষে মানুষে ভরপুর রাতের বাজার তেমনি নিস্তব্দ। আমার একটা দোকান আছে। অবশ্য আমি সে দোকানের মালিক নই। একজন কর্মচারী মাত্র। আমার কোন ঘর নেই। সবাই যখন বন্ধ করে চলে যায় আমি তখন পাশেই একটা হোটেলে বসে বাংলা সিনেমা দেখি। সাকিব খান আর অপু বিশ্বাসের সিনামা। যারা দেখে নাই তারা জানেই না প্রেম কাকে বলে। তারপর কোন একটা সস্তা হোটেলে বসে ডাল ভাত খেয়ে ফিরে আসি। দোকানের পিছনে কোথার মত একটা কাঠের চকিতে ভারী কাঁথা পাতা একটা স্যাঁতস্যাঁতে বালিশ এই আমার ঘর।
আমাদের এই বাজারেই এক পাগলী আছে নাম বানু। নামটা ধরে ডাক দিলেই সে চিৎকার দিয়ে ওঠে বলে এই এই আমারে এই নামে ডাকবি না। আমারে ডাকবি বিনীতা বলে। বিনীতার চুল গুলো ছোট ছোট। কাপড় ময়লা। একটাই জামা তার। দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে খাবার চাওয়াই তার প্রধান কাজ, কেউ খাবার দেয় কেউ দেয় না। আমাদের দোকানে অবশ্য সে আসে মাঝে সাঝে আমি তারে পান সাজিয়ে দেই। সে আমাকে দেখে খুশি মনে বলে মতি ভাই এক মাত্র তুমিই আমারে পান সাজায়া দাও। আর কেউ দেয় না। যার কাছে চাই সেই আমারে ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দেয়। আমি তারে বলি শোন বিনীতা যখনই পান খেতে মন চাইবে আমার কাছে চলে আসবি। কেমন?
বিনীতা তার হলুদ তরকারীর পরদ পরা দাঁতে খিলখিল করে হাসে।
বয়স তার বেশি না, সতেরো আঠারো হবে এর চেয়ে একটু বেশিও হতে পারে।বিনীতার চুল গুলো ছোট ছোট। কাপড় ময়লা। একটাই বোধয় জামা তার। ভরা যৌবনের ছায়া তার শরীরে বহতা নদীর মতই। তারে দেখলে আমার অন্তর কাঁদে! মনে হয় এই মেয়ে পাগল কেন? সুস্থ হলেই বিয়ে করে ফেলতাম আর বলতাম বিনীতা তোরে আমি প্রতিদিন পান সাজিয়ে দেব? আমারে তুই সকাল সন্ধ্যা আদর করবি? পারবি না?
বিনীতা তখন হয়তো মুচকি হাসতো আর বলত মতি ভাই কি যে বল না!
বিনীতার কথা ভাবতে ভাবতে আমার ঘুম চলে আসে। ভোর হয় আবার শুরু হয় আমার দৈনন্দিন জীবন। দোকানে কাস্টোমার আসে যায়। কেউ কেউ বেঞ্চে বসে রাজনৈতিক আলোচনা করে। আর আমি তাদের কথায় তাল দেই। সন্ধ্যায় গিয়ে বসি সিনামা ঘরে। সিনামা দেখি মনোযোগ দিয়ে। আর রাতের বেলা বিনীতার কথা ভাবতে ভাবতে চোখে ঘুম নামে। অস্বাভাবিক আচ্ছন্ন করা ঘুম। ঘুমের মধ্যে বিনীতা আসে আমি তাকে পান সাজিয়ে দেই। সে তার লাল ঠোট দিয়ে আমার ঠোট ছুঁয়ে দেয়। মশার পেনপেনানি শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায় আফসোস করতে করতে এর পরে কি হতে পারতো ভেবে ভেবে।
শেষ রাত থেকে এলোমেলো করা ঝড় শুরু হয়। দোকানের চাল টং টং করে শব্দ করতে থাকে। খানিক ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। এই সময় কে যেন দোকানের শাটারে এসে জোড়ে জোড়ে ধাক্কা দেয় আর বলে মতি ভাই ও মতি ভাই... পান খাব।
আমি শাটার তুলে বিনীতা কে দোকানের ভেতরে নিয়ে আসি। পাঁচ পদের জর্দা দিয়ে পান সাজিয়ে দেই আর বিনীতা আমার পাশে বসে আরাম করে পান খায়। চুনের রঙে আমাদের ঠোট লাল হয় বিনীতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি বুঝে ফেলি। পানের রঙে কোন ফরমালিন নাই।
সকাল বেলা পাখি ডাকার আগেই বিনীতাকে বের করে দেই দোকান থেকে। আস্তে আস্তে দোকানে ভীড় জমতে থাকে, একটা একটা করে মানুষ আসতে থাকে। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাতের ঝড়ের কথা ভুলতে ভুলতে ভুলেই যাই।
পরের রাতে বিনীতা আবার আসে পান খেতে। তার পান খাওয়ার অভ্যাস দেখে আমার ভালোই লাগে। বিনীতার জন্য আনা লাল নীল কাঁচের চুড়ি হাতে পড়িয়ে দেই, বিনীতা খিলখিল করে হাসে আর বলে মতি ভাই তুমি ভালো অনেক গুলা ভালো।
এভাবে চলতে থাকে। তারপর দেখা যায় অনেক দিন বিনীতার কোন খোঁজ নেই। আমি ছাড়া হয়তো এই পাগলী মেয়েটাকে কেউ খোঁজে না। খোঁজার অবশ্য প্রয়োজনও কারো পরে না। রাত বিরাতে বিনীতা পান খেতে আসে না। আমিও আর এত আয়েস করে কাউকে পান সাজিয়ে দেই না। এভাবে দিন যায় যেতে যেতে আমিও ভুলে যাই বিনীতার কথা। রোজকার জীবন চলতে থাকে। কখনো সিনামা ঘরে কখনো খারাপ পাড়ায়। চলতে চলতে একদিন হঠাৎ খোঁজ মেলে বিনীতার। কে যেন এসে বলে যায় যাও যাও মতি ভাই দেখে আসো বাজারের পশ্চিম দিকে বিনীতা কি কাণ্ডটাই না ঘটাইছে!
আমার আত্মা ধক করে ওঠে। দৌড়ে যাই বিনীতার কাছে।
বিনীতা শুয়ে আছে অর্ধনগ্ন হয়ে তার পাশেই ফর্শা একটা মেয়ে বাচ্চা। দেখে মনে হচ্ছে এই মাত্র ভুমিষ্ট হয়েছে। এখনো নাভির নাল কাটা পরেনি। সবাই জড়ো হয়ে দেখছে বিনীতাকে। বিনীতার হুঁশ নেই। মরে গেছে কিনা দেখতে গিয়ে তার হাতটা হাতে নিতে নিতেও নিলাম না। ঘেন্নায় দূরে সরে এলাম এমন সময় আমার পাশের দোকানের রাজু বলে উঠলো আরে আরে বাচ্চাটা দেখতে কিছুটা মতি ভাইর মত না?
সবাই হাহাহাহা করে হেঁসে উঠলো। আমি বললাম উল্টা পাল্টা কথা বললে মাইর একটাও মাটিত পরবো না কইলাম। চলে আসছি জায়গাটা ছেড়ে, কার না কার বাচ্চা আমার নামে লাগিয়ে দিলেই হল নাকি।
দূর থেকে বাচ্চাটার কান্না ভেসে আসছে৷ আর আমি মনে মনে বলছি অনেক বাঁচা বাঁচছি রে বাবা, পাগল ছাগলের সাথে আর না...মৌলভীবাজারের সরকার বাজার। গ্রাম গঞ্জের বাজার ভীড় হয় প্রচুর। এখানে গ্রামের সব বেচা কেনা হয় সকাল থেকেই অবশ্য শহরতলির এই গ্রামটায় সন্ধ্যা নামে সুর্য ডোবার পরপরই। দোকানে দোকানে শাটার লাগিয়ে দোকানিরা বাসায় ফেরে বউয়ের সাথে খোশ গল্প করে পান চিবোয়। সকালের বাজার যেমন মানুষে মানুষে ভরপুর রাতের বাজার তেমনি নিস্তব্দ। আমার একটা দোকান আছে। অবশ্য আমি সে দোকানের মালিক নই। একজন কর্মচারী মাত্র। আমার কোন ঘর নেই। সবাই যখন বন্ধ করে চলে যায় আমি তখন পাশেই একটা হোটেলে বসে বাংলা সিনেমা দেখি। সাকিব খান আর অপু বিশ্বাসের সিনামা। যারা দেখে নাই তারা জানেই না প্রেম কাকে বলে। তারপর কোন একটা সস্তা হোটেলে বসে ডাল ভাত খেয়ে ফিরে আসি। দোকানের পিছনে কোথার মত একটা কাঠের চকিতে ভারী কাঁথা পাতা একটা স্যাঁতস্যাঁতে বালিশ এই আমার ঘর।
আমাদের এই বাজারেই এক পাগলী আছে নাম বানু। নামটা ধরে ডাক দিলেই সে চিৎকার দিয়ে ওঠে বলে এই এই আমারে এই নামে ডাকবি না। আমারে ডাকবি বিনীতা বলে। বিনীতার চুল গুলো ছোট ছোট। কাপড় ময়লা। একটাই জামা তার। দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে খাবার চাওয়াই তার প্রধান কাজ, কেউ খাবার দেয় কেউ দেয় না। আমাদের দোকানে অবশ্য সে আসে মাঝে সাঝে আমি তারে পান সাজিয়ে দেই। সে আমাকে দেখে খুশি মনে বলে মতি ভাই এক মাত্র তুমিই আমারে পান সাজায়া দাও। আর কেউ দেয় না। যার কাছে চাই সেই আমারে ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দেয়। আমি তারে বলি শোন বিনীতা যখনই পান খেতে মন চাইবে আমার কাছে চলে আসবি। কেমন?
বিনীতা তার হলুদ তরকারীর পরদ পরা দাঁতে খিলখিল করে হাসে।
বয়স তার বেশি না, সতেরো আঠারো হবে এর চেয়ে একটু বেশিও হতে পারে।বিনীতার চুল গুলো ছোট ছোট। কাপড় ময়লা। একটাই বোধয় জামা তার। ভরা যৌবনের ছায়া তার শরীরে বহতা নদীর মতই। তারে দেখলে আমার অন্তর কাঁদে! মনে হয় এই মেয়ে পাগল কেন? সুস্থ হলেই বিয়ে করে ফেলতাম আর বলতাম বিনীতা তোরে আমি প্রতিদিন পান সাজিয়ে দেব? আমারে তুই সকাল সন্ধ্যা আদর করবি? পারবি না?
বিনীতা তখন হয়তো মুচকি হাসতো আর বলত মতি ভাই কি যে বল না!
বিনীতার কথা ভাবতে ভাবতে আমার ঘুম চলে আসে। ভোর হয় আবার শুরু হয় আমার দৈনন্দিন জীবন। দোকানে কাস্টোমার আসে যায়। কেউ কেউ বেঞ্চে বসে রাজনৈতিক আলোচনা করে। আর আমি তাদের কথায় তাল দেই। সন্ধ্যায় গিয়ে বসি সিনামা ঘরে। সিনামা দেখি মনোযোগ দিয়ে। আর রাতের বেলা বিনীতার কথা ভাবতে ভাবতে চোখে ঘুম নামে। অস্বাভাবিক আচ্ছন্ন করা ঘুম। ঘুমের মধ্যে বিনীতা আসে আমি তাকে পান সাজিয়ে দেই। সে তার লাল ঠোট দিয়ে আমার ঠোট ছুঁয়ে দেয়। মশার পেনপেনানি শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায় আফসোস করতে করতে এর পরে কি হতে পারতো ভেবে ভেবে।
শেষ রাত থেকে এলোমেলো করা ঝড় শুরু হয়। দোকানের চাল টং টং করে শব্দ করতে থাকে। খানিক ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। এই সময় কে যেন দোকানের শাটারে এসে জোড়ে জোড়ে ধাক্কা দেয় আর বলে মতি ভাই ও মতি ভাই... পান খাব।
আমি শাটার তুলে বিনীতা কে দোকানের ভেতরে নিয়ে আসি। পাঁচ পদের জর্দা দিয়ে পান সাজিয়ে দেই আর বিনীতা আমার পাশে বসে আরাম করে পান খায়। চুনের রঙে আমাদের ঠোট লাল হয় বিনীতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি বুঝে ফেলি। পানের রঙে কোন ফরমালিন নাই।
সকাল বেলা পাখি ডাকার আগেই বিনীতাকে বের করে দেই দোকান থেকে। আস্তে আস্তে দোকানে ভীড় জমতে থাকে, একটা একটা করে মানুষ আসতে থাকে। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাতের ঝড়ের কথা ভুলতে ভুলতে ভুলেই যাই।
পরের রাতে বিনীতা আবার আসে পান খেতে। তার পান খাওয়ার অভ্যাস দেখে আমার ভালোই লাগে। বিনীতার জন্য আনা লাল নীল কাঁচের চুড়ি হাতে পড়িয়ে দেই, বিনীতা খিলখিল করে হাসে আর বলে মতি ভাই তুমি ভালো অনেক গুলা ভালো।
এভাবে চলতে থাকে। তারপর দেখা যায় অনেক দিন বিনীতার কোন খোঁজ নেই। আমি ছাড়া হয়তো এই পাগলী মেয়েটাকে কেউ খোঁজে না। খোঁজার অবশ্য প্রয়োজনও কারো পরে না। রাত বিরাতে বিনীতা পান খেতে আসে না। আমিও আর এত আয়েস করে কাউকে পান সাজিয়ে দেই না। এভাবে দিন যায় যেতে যেতে আমিও ভুলে যাই বিনীতার কথা। রোজকার জীবন চলতে থাকে। কখনো সিনামা ঘরে কখনো খারাপ পাড়ায়। চলতে চলতে একদিন হঠাৎ খোঁজ মেলে বিনীতার। কে যেন এসে বলে যায় যাও যাও মতি ভাই দেখে আসো বাজারের পশ্চিম দিকে বিনীতা কি কাণ্ডটাই না ঘটাইছে!
আমার আত্মা ধক করে ওঠে। দৌড়ে যাই বিনীতার কাছে।
বিনীতা শুয়ে আছে অর্ধনগ্ন হয়ে তার পাশেই ফর্শা একটা মেয়ে বাচ্চা। দেখে মনে হচ্ছে এই মাত্র ভুমিষ্ট হয়েছে। এখনো নাভির নাল কাটা পরেনি। সবাই জড়ো হয়ে দেখছে বিনীতাকে। বিনীতার হুঁশ নেই। মরে গেছে কিনা দেখতে গিয়ে তার হাতটা হাতে নিতে নিতেও নিলাম না। ঘেন্নায় দূরে সরে এলাম এমন সময় আমার পাশের দোকানের রাজু বলে উঠলো আরে আরে বাচ্চাটা দেখতে কিছুটা মতি ভাইর মত না?
সবাই হাহাহাহা করে হেঁসে উঠলো। আমি বললাম উল্টা পাল্টা কথা বললে মাইর একটাও মাটিত পরবো না কইলাম। চলে আসছি জায়গাটা ছেড়ে, কার না কার বাচ্চা আমার নামে লাগিয়ে দিলেই হল নাকি।
দূর থেকে বাচ্চাটার কান্না ভেসে আসছে৷ আর আমি মনে মনে বলছি অনেক বাঁচা বাঁচছি রে বাবা, পাগল ছাগলের সাথে আর না...
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০২১ বিকাল ৫:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


