"তুমি কি মাদ্রাসা'র ছাত্র?" আমার বন্ধু আসাদ বিসিএস ভাইভা বোর্ডে ঢুকেই বসার অনুমতি পাওয়ার আগেই প্রশ্নটা শুনে একটা ধাক্কার মতো খেলো। সে থতমত খেয়ে বলল, "জ্বী, ইয়ে মানে না স্যার।" অথচ ভাইভা বোর্ডে যারা আছেন তাদের সবার হাতেই আসাদের শিক্ষা জীবনের অর্জিত সব সার্টিফিকেট। যা তারা প্রার্থী কক্ষে প্রবেশ করার আগেই স্টাডি করে নেন। সেখানে কোনোটাতেই লিখা ছিলোনা যে সে মাদ্রাসা'র ছাত্র। তাহলে কি কারণে এই প্রশ্ন? কারণ তার মুখে দাড়ি ছিলো, আর এই একটি প্রশ্ন দিয়েই তাকে শুরুতেই বুঝিয়ে দেয়া হলো তুমি "বাতিল"। অথচ, আসাদ যখন ভাইভা বোর্ড থেকে বের হয়ে আমাকে বললো,
"দোস্ত আমাকে মনে হয় নেবেনা।"
"কেন? ভাইভা ভালো হয়নি?"
"হয়েছে। ১৫ মিনিট ধরে অনেক প্রশ্ন করেও ওরা আমাকে আটকাতে পারেনি।"
"তাহলে?"
তখন সে জানালো এই হচ্ছে ঘটনা। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,
"আরে ধুর। ওসব কোনো ব্যাপার না। তোর সাথে একটু দুষ্টুমি করেছে আরকি। দেখিস তোর ঠিকই হয়ে যাবে।"
কিন্তু দু'দিন যেতে না যেতেই আরেক প্রার্থী রানা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। ওর মুখেও দাড়ি আছে। তার বাড়ী কক্সবাজারে। সে ভাইভা'র আগেরদিন ঢাকায় এসেই আমার কাছে জানতে চাইলো তার দাড়ি নিয়ে কি করবে। আমি কিছু সাইকোলজিক্যাল টিপস দিলাম। বলে দিলাম খবরদার ভুলেও ইসলামের প্রতি মায়া মহব্বত দেখাতে যাসনা। যাই হোক তাকে দাড়ি নিয়ে কিংবা ইসলাম নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলোনা। ভালোয় ভালোয় সেও ভাইভা শেষ করলো। সে চলে আসবে এমন সময় একজন পরীক্ষক তাকে আবার বসালেন।
"কক্সবাজার জেলার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে কি কি সমস্যা তৈরি করছে?" সে ভালোই জবাব দিলো। কিন্তু উক্ত পরীক্ষক সাহেব তাকে বললো,
"আপনি আসল ব্যাপারটা কেনো এড়িয়ে যাচ্ছেন? রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে জঙ্গী তৈরীর কারখানা। এটা আপনি জানেননা?"
"হরকাতুল জিহাদের আমীর কে?"
"তাদের মূল-লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি?"
সে বললো, "স্যার আমি জানিনা।"
"আপনি জানেন। কিন্তু বলবেননা। ননসেন্স কোথাকার।"
দাড়িওলা আরেক বন্ধু তারেককে করা প্রশ্নের নমুনা দেখুন,
"জামাত-শিবির করেন?"
"না স্যার।"
"করেন করেন। আমি জানি। কিন্তু স্বীকার করবেননা। বলেন দেখি জামাতের প্রতিষ্ঠাতার নাম কি?"
"মওদূদীর সাথে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বিরোধের কারণ কি?"
"জামায়াতের কোন নায়েবে আমীর মওদূদীর বিরোধীতা করে জামাত ত্যাগ করে?"
"ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ বলতে কি বুঝেন?" এই হলো প্রশ্নের ধরণ যার জবাব দিলেও বিপদ না দিলেও বিপদ। অতএব ঐ প্রার্থী যৌক্তিক কারণেই বাতিল।
মাসুদ একটা মন্ত্রণালয়ে প্রথম শ্রেণীর একটা পদে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইভা দিতে এসেছে। এর মুখে আবার কোনো দাড়ি নাই। তার বাবা নয় নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের উপর তার বাবার লেখা কয়েকটি বই ও বেরিয়েছে। ভাইভা দিয়ে বের হয়েই আমার মোবাইলে মেসেজ পাঠালো, "আমারে বস্ত্রহরণ কইরা ইজ্জত হরণ করছে।" আমি প্রথমে বুঝিনাই সে কি বলতে চেয়েছে, তাই ফোন দিলাম। ১৯ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড ধরে সে আমাকে তার ভাইভার কাহিনী শোনালো। তার ভাইভা বোর্ডে পিএসসি'র সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহাজোট সরকারের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে মোহাম্মদ হোসেন সেরনিয়াবাত। মাসুদকে প্রশ্নের ধরণ-
"তোমার বাড়ি বরিশালের কোথায়?"
"তোমার বাবা কি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন?"
"কোন সেক্টরে?"
"৯ নং সেক্টরের কমান্ডার কে ছিলেন?"
"ঐ সেক্টরে আর কে কে কমান্ডার ছিলেন?"
"মেজর জলিল ছাড়া অন্যদের নাম জানোনা কেনো"
"মেজর জলিল জামাত করতেন তাই শুধু তার নাম জানো তাই না?"
"তোমার বাবা কি সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?"
"এটাতো ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট। রেদোয়ান আহমেদের স্বাক্ষর? সেতো একটা আস্ত রাজাকার।" বলেই সার্টিফিকেটের উপর লাল কালি দিয়ে বিশাল একটা ক্রস এঁকে দিলেন।
"মুক্তিযুদ্ধে তোমার বাবা কাদের মেরেছিলেন? রাজাকারদের? নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের?"
"তোমার বাবাতো জামাত করেন তাইনা?"
"তুমি ভাইভা দিতে আসছো কি জন্য? তোমার বাবাকে আসতে বলো ভাইভা দিতে।"
"চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে অনার্স মাস্টার্স করে এই চাকরি করতে আসছো কেনো?"
"মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরকে তো আমরা বিসিএস এ নেবো।"
"ও বুঝছি আমাদের উপর তোমাদের কোনো আস্থা নেই তাই এখানে ভাইভা দিতে এসেছো।"
"শিবিরের ছেলেগুলো বড়ই নাছোড়বান্দা। ওরা যে করেই হোক সরকারী চাকরিতে ঢুকবেই। ভার্সিটিতেতো সবসময় শিবিরের মিছিল করে বেড়িয়েছো। পড়ালেখা করছো কখন? এগুলোতো সব নকল করে পাস করা সার্টিফিকেট। এগুলোর কোনো মূল্য আমার কাছে নাই। যাও চলে যাও। এখানে তোমার চাকরি হবেনা। আর শোনো কষ্ট করে বিসিএস ভাইভা দিতে আসার দরকার নাই তোমার। তোমাকে নেওয়া হবেনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


