somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

পান্থজন জাহাঙ্গীর
আমি পান্থজন জাহাঙ্গীর নিতান্তই শাদা মনের মানুষ। যার কারণেই প্রথম দর্শনে যে কাউকে আপন করে নিতে চায় মন। এই জন্য মানুষ সহজেই আঘাত দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে আমি বিবাহিত। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। দর্শণ নিয়ে অধ্যয়ন করলেও আমি সাহিত্যের একজন সমঝদার মানুষ। শিক্ষকতার পাশ

তুলশী এবং কাক!

০৫ ই আগস্ট, ২০১১ বিকাল ৫:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকাল সকাল উঠে তুলশী বালা কাকগুলো কে মুড়ি ছিটিয়ে খাওয়াচ্ছিল। দেশী চালের সরস মুড়ি। শহরের যে বস্তিতে তুলশী থাকে সেখানে এরকম মুড়ি পাওয়া না। বাবার বাড়ি থেকে পাঠিয়েছে। মুড়ি বিক্রি তুলশীর বাব-দাদাদের পেশা। সপ্তাহ অন্তে পাঁচ-দশ কেজি মুড়ি তুলশীর জন্য বাবা পাঠিয়ে দেয়। তুলশী কে না দিলে নাকি বাবার ব্যবসার আয় বরকত হয় না-এ তার বাবারই কথা। হয়তো ছেলেদের রক্তচক্ষু এড়াতেই। ছালামত বস্তির টিনের চালে এখন প্রায় শ’ খানিক কাক ছুটাছুটি করছে। তার মধ্যে একজোড়া কাক তুলশীর বেশ প্রিয়। খেতে খেতে অনেক সময় এরা তুলশীর হাতে এসে পড়ে। একবার তুলশী এদের ধরে পায়ে দু’ টাকা দামের সিলভার রিং পরিয়ে দেয়। এর পর থেকে এদের সাথে তুলশীর দহরম-মহরম আরো বেড়ে যায়। ফজরের আজান দেয়ার সাথে সাথে কাকজোড়া জানলার পাশে এসেই ডাকতে থাকে। তুলশীর স্বামী অনেকটা রাগ করে বলে-,’ অই ওঠ, যা তর বাপ আইছে; খাওয়ায় আয়...।’ তুলশী বলে,’ হ্যাঁ আমারই বাপ তো। আমার বাপ বলেই তো এত সুন্দর করেই ডাকতাছে। তুলশীর পিত্ততে শ্লেষের ছিটা লাগাতে না পেরে তার স্বামী এবার চটে গেল ,’অই মাগি কস কি! জগতের সবার কাছে কাক হইছে বিরক্তিকর পাখি আর তর কাছে এইডা কোকিলা হয়ে গেল এ্যাঁ? তর কোকিলারে কও সাজ সকালে আমার ঘুম না ভাংতে। তুলশী এবার বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।

পুবাকাশে সূর্য তার আপন রং ছড়াল। মুড়ি খাওয়া প্রায় শেষ। কাকগুলো টিনের চালে খুশিতে ক্রীড়ায় মত্ত। তুলশী মোড়ায় বসে পা নাড়ছিল। তুলশীর স্বামী এবার চোখ মুছে ধীরে ধীরে ওঠে তুলশীর দিকে এগিয়ে গেল। তারপর আবার শ্লেষ-‘দেইখ্যা তো মনে হচ্ছে বাংলা সিনেমার শুটিং চইলতাছে। নায়ক- নায়িকারা তো অনেক সুন্দর হয় তোমার এই কাল্লু বাবাদের নাচা-নাচি আর ঝাপাঝাপি দেইখ্যা মনে হইচ্ছে গুন্ডাবাহিনী আর তোমারে দস্যুরাণী...’ চুপ কর! রাখ তোমার পন্ডিতি কথা। এত কথা শিখ কোথাই থেইক্যা এ্যাঁঁ? হারাদিন রিকশা চালাইয়া সিনেমা হলে টেহা ঢালি আইসো আর লম্বা লম¦া বুলি শেইখ্যা আসো এ্যাঁ? ভাত দুইটা পেটে দিয়া তাড়াতাড়ি বের হইয়া যাও।

তুলশী কে যখন বিয়ে দেয় তখন যৌতুক হিসেবে মেয়ে কে দশ ভরি স্বর্ণ দেয়,জামাই কে নগদ এক লাখ টাকা এবং একটি মোটর সাইকেল দেয়। ছন্নছাড়া জামাই সব কিছু বেঁেচ খেতে খেতে অবশেষে তুলশীর চন্দ্রহার টা বিকিয়ে একখানা রিকশা নেয়। এখন সে বাসের ড্রাইভার থেকে রিকসার ড্রাইভার।
- তুমি আমার গলার হার টা বেইচা ফেলাইচ! আমার এই হার তুমি কিনে দিইবা কইলাম।
-হ কিনে দিব!
-কখন দিবা?
-তোর বাপ থেইকা জিগাইস।
এই কথা শুনে তুলশীর রক্ত মাথায় উঠল। সে ক্ষোভে অপমানে আর কোন কথা বলল না। পরদিন সকালে তুলশী কাকগুলো কে আবার মুড়ি খাওয়াচ্ছিল। হঠাত রিং পরা কাকটি কে তুলশী ধরে আদর করতে লাগল। বুকের কাছে নিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলতে লাগল,‘বাবা, অ বাবা, ক্যান আছিস? তুই কি আমারে গলার হার কিনে দিবি? কওনা দিবা...
কাকটি তুলশীর চোখের দিকে চেয়ে কা কা করতে লাগল। সকালে বাবা বাবা রবে তুলশীর স্বামীর ঘুম ভাঙ্গে। এগিয়ে গিয়ে দেখে তুলশীর কোলে একটি কাক এবং কাক এবং তুলশী উভয়ই কাঁদছে।

এরপর অনেকদিন ধরে কাক মেলায় তুলশীর কাকবাবা আর আসে না। প্রতিদিন সে মুড়ির বাঢি নিয়ে বের হয় সব কাক আসে কিন্তু বাবা আসে না। বাবার শোকে সে নাওয়া খাওয়া ও ভুলে গেছে। শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কাকযন্ত্রণায় স্বামীও অতিষ্ট তবু বউয়ের বিরহে সেও বিরহী না হয়ে পারে না। সারা শহরে রিকশা নিয়ে দাবিয়ে বেড়ায় সে। ভাড়া নিয়ে যায় শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আর চোখ রাখে মোড়ের সব ডাস্টবিনে। একদিন তো এক মেম সাহেব কে নিয়ে তিন রাস্তার ডাস্টবিনে ঢুকে পড়ল।
-এই,এই! এখানে থামলি ক্যান রে বেটা এ্যা ঁ?
-আপা একটু দাঁড়ান আমি কাকগুলো দেইখ্যা আসি।
মেম সাহেব ঘৃণায় দাঁত কড়মড় করে বলল,
-এই বেটা ভাড়া ফেলে তোর কাক নিয়ে এত আগ্রহ কেন? শহরে কি কাকের অভাব হয়েছে যে ডাস্টবিনে গিয়ে কাক দেখতে হবে?’
-আপা তাইলে কই হোনেন, ছিলাম ছাত্র টগবগে যুবক, কৃষকের পোলা ফান্দে পইড়া লেখাপড়া ছাইড়া হয়েছি বেকার। বেকার ছেলেকে বউ দিবে না তাই ধরছিলাম বাস। ভাগ্যেও গুনে বাস ছাইড়্যা রিকসা চালাইতেছি। সামনে দেখছি রিকশাটাও ছাইড়্যা ভেন্ডা পাগল হইয়া রাস্তায় দিন কাটাইতে অইবো। কারণ আমার বউ এক কাককে ভালবাইসা বাব ডাইকছে। সে অহন আর হ্যার কাছে আইয়্যে না। তই কাক শোকে সে শয্যাশায়ি। তই দেখছিলাম কাক টা সেখানে আছে কিনা।
- তুই এখনই দেখছি ভেন্ডা পাগল হয়ে গেছিস। এত কাকের ভিড়ে ঐ কাক চেনা যাবে কি করে?’
- চিনবে আপা চিনবে। লাইলি যেমন বনে গিয়েও মজনুরে চিনছিলো। তেমনি আমার বউও এইটার পায়ে রিং পরাইয়া দিচে চেনার জন্য।
রাতে তুলশীর স্বামী এসে খাওয়া দাওয়া শেষ করে তার পাশে বসে এবং তাকে ডাকে। জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন সে কোন সাড়া দেয় না। এরপর স্বামী বলল,‘আইজ এক ভদ্রলোক একটি কাকের গল্প শোনাইচে তুমি কি শুনবা?’ কাকের কথা শুনতেই তুলশী নড়েচড়ে উঠল।
শুনো তাইলে,
-একদিন বাদশাহ নাকি নাসিরুদ্দিন কে প্রশ্ন কইরছিল তার রাজ্যে কয়টা কাক আছে?
-নাসিরুদ্দিন কি উত্তর কইছিল?
- নাসিরুদ্দিন কইছিল নাকি নয় কোটি, নয় লক্ষ, নিরান্নব্বই হাজার, নয় শত ,নিরান্নব্বইটি
-যদি একটা কম হয়?
-তাইলে মনে করবা ইন্ডিয়া চইল্যা গেছে। আবার কোন এক সময় আইসা পইড়বো।
-আর যদি বেশি হয়?
-তাইলে মনে করবা ইন্ডিয়া থেইক্যা আইছে।
তোমার বাবা হয়তো ইন্ডিয়া চইল্যা গেছে। মাঝে মাঝে তারা তীর্থে যায়। যেমন গয়া -কাশী, আজমীর শরীফ ইত্যাদি। এই জন্য মানুষ কথায় কথায় বলে ‘তীর্থের কাক’। চল উঠো তোমার মাথায় পানি ঢালি ।

কাকের মতো একটা বিশ্রী পক্ষীর প্রতি এত দরদ দেখে তুলশীর স্বামীর মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়। কিন্তু তবু তার অস্স্থু শরীরের দিকে তাকিয়ে সেই রাগ চাপায় রাখে। ‘শুনো আগামীকাইল তোমারে আমি একটা টিয়া কিনা আইনা দিমু। তুমি সারাদিন হের লগে কথায় মজে থাইকতে পারবা। সাহেবদের টিয়াগুলো না কি সুন্দর কইরা কথা বলে!’ জ্বরে বিকারগ্রস্ত তুলশী কিছু কানে নেয় আর কিছু নেয় না। দিনে প্রচন্ড গরমের পর রাতে তীব্র বাতাস সহ ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনের চালের বৃষ্টির ঝনঝন আওয়াজে তুলশীর স্বামীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। বৃষ্টির ছন্দে ছন্দে এই নিরক্ষর ধর্মহীন কর্মী ঈশ্বর কে ডাকতে থাকে।

প্রভাতে সূর্য ওঠার আগেই কাকের কা কা ঝাঝালো কর্কশ রবে তুলশীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে দেখে জানলার ভাঙ্গা শার্শীতে দুটি কাক বিলাপের সুরে ডাকছে। একটির পায়ে রিং পরা এবং ঠোঁটে তুলশীর বিয়েতে বাবার দেয়া সেই চন্দ্রহার!
































২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×