somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিক্ষা নাগালের বাইরে গেলে কার লাভ কার ক্ষতি?

০৯ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ১১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি যখন এ লেখাটি লিখছি তখন একটা খুনকে কেন্দ্র করে মনের ভিতরে চলছে এক চাপা ক্রন্দন, একই সাথে চলছে বিক্ষোভ। যদিও কাউকে বলতে পারছিলাম না সে কথা, প্রকাশও করতে পারছিলাম না। কার কাছেই বা বলবো? শোনার মতো কেউ কি আছে? বিচার কার কাছে চাইবো? বিচার করবার মতো কেউ কি আছে? নেই, কেউ নেই। তাই চুপচাপ দেখে যাচ্ছি, শুনে যাচ্ছি সব। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে না ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণে জোর করে জল জমিয়ে রাখতে রাখতে রক্তচক্ষু নিয়ে পার করছি দিন। এই দিন পার করা শুরু হয়েছে অনেকদিন হলো। আমি শুধু লাশ গুনছি। আর কতো গুনতে হবে কে জানে? অথবা আমাকেসহ সে গননা নতুন সংখ্যা তৈরি করে কিনা সেটাই বা কীভাবে এড়িয়ে যাই। সে যাই হোক, এই লেখায় আমি আর এসব নিয়ে বলতে চাই না। অথবা এসব নিয়ে বলতেও বসিনি। বলতে বসেছি অন্য কিছু, বলতে বসেছি কি করে আমার বা আমাদের চিন্তাকে রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে সেসব কথা।

আমি গত ক’মাস ধরে ঠিকঠাক ভাবে কিছু লিখতে পারছি না, আড্ডা দিতে পারছি না, ব্ই পড়তে পারছি না, গান তুলতে পারছি না, পারছি না প্রাণ খুলে গাইতে। প্রশ্ন আসতে পারে কেন? প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ। কারণ আমরা অনেকে আজ রাজপথে। অর্থাৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আমি যেমন অনেক কিছু করতে পারছি না একটু স্বাভাবিক এবং সুস্থ মস্তিস্কে; ঠিক তেমনি আজ যারা শিক্ষার উপর ৭.৫% ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে রাজপথে আছেন, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গড়ে তুলছেন দুর্বার প্রতিরোধ, আমার মতো তারাও কেউ ভালো নেই। কেননা, ভালো থাকার সময়ও নয় এটি।

আমরা যারা এই আন্দোলনে আছি তারা কেউ শখ করে এ আন্দোলনে আসিনি। এসেছি তখন, যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল তো অনেক পরের কথা, সবার আগে আমরা মনে করছি শিক্ষার উপর ভ্যাট আরোপ কোনো যুক্তিতেই পড়ে না। এটা এমন একটি দেশ যেখানে এমপি মন্ত্রিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি করা হয় আর আমরা যারা লেখাপড়া করছি তাদের দিতে হচ্ছে ভ্যাট। এমন অশ্লীল বৈপরীত্ব পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নাই? আমরা ভাবি এসব অসঙ্গতি আমরা বুঝলেও এত উচ্চ পর্যায়ে বসে নীতিনির্ধারকরা কেন বোঝেন না? আমাদের উন্নয়নের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু মানুষ যে তাদের এসব কর্মকান্ডে সবসময় ‘ছি ছি’ করে সে বিষয়ে তাদের কি কোন লজ্জাবোধ নেই? তারা কি এতোটাই নির্লজ্জ?

এমন উল্টো রথে দেশ কেন চলছে সেই প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা প্রথমে হতাশ হলেও বুক টানটান করে সোজা রথে দেশকে আনার এক চেষ্টা চালানোর উদ্যোগ নেই। অন্তত এই ভ্যাট ইস্যুতে। সেই ধারাবাহিকতায় “নো ভ্যাট অন এডুকেশন”। আমরা সব তরুণ। আমরা সব গণজাগরণ প্রজন্ম। হ্যা, আমি এই প্রজন্মকে গণজাগরণ প্রজন্মই বলবো। কেনোনা সেই নব্বইয়ের পর তরুণদের এমন জাগরণ এর মাঝে কেউ আর দেখেছে বলে আমার জানা নেই। সেই প্রজন্মই আজ প্রতিবাদ করতে শিখে গেছে। তারা বুঝতে শিখেছে অন্যায়কে যতই প্রশ্রয় দেয়া হবে ততই তা বড় হতে হতে অজগর সাঁপে পরিণত হবে। যেমনটা ১৯৭১ এর পর স্বাধীনতা বিরোধীরা হয়েছে। হঠাৎ কেন একথা বললাম, অনেকেই বলতে পারেন। কিন্তু বলার পেছনে কারণ আছে। একবার ভাবুন আজ যে অযৌক্তিক ভ্যাট আমাদের উপর বসালো সরকার সে ভ্যাট যদি বহাল থাকে তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ৭.৫% কত তে গিয়ে ঠেকবে? প্রতি সেমিস্টারে যে হারে সেমিস্টার ফি বাড়ে সে হারে ভ্যাট দিতে গেলে তো ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা বলে আর কিছু সাধারনের নাগালে থাকবে না।

এভাবে শিক্ষাকে পণ্যে রুপান্তর করার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে? তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে সত্যিই আমি কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাইনি। বারবার সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে শুনতে পাচ্ছি, যেহেতু শিক্ষার্থীরা বিপুল পরিমান টাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দিতে পারে সেহেতু আমাদেরও(সরকারকে) দিতে হবে। বাহ! কি চমৎকার শত্রুভাবাপন্ন বক্তব্য। আমরা যেন ইচ্ছে করে এসব বিশ্ববিদ্যালয় নামক মুরগীর খোঁয়াড়ে ভর্তি হতে চেয়েছি? যেহেতু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত সিট নেই সেহেতু আমাদের পড়তে হচ্ছে এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাও আবার পড়ছি নিজের বাবার টাকায়। আচ্ছা ধরেই নিলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসা করছে প্রচুর। কিন্তু প্রশ্ন আসে মনে, এটা না অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো ১৯৯২ সালে? ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের যে সংশোধনী করা হয়েছে সেখানেওতো শিক্ষার্থী ফি’কে প্রধান আয়ের উৎস বলা হয়নি। আইনের ধারা-৪১ কি তবে লোক দেখানো? ‘ইউজিসি’ নামক প্রতিষ্ঠানটি কি করছে? অলাভজনক প্রতিষ্ঠান লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপ পায় কি করে? প্রতি সেমিস্টারে কিসের ভিত্তিতে ফি বাড়ানোর সুযোগ পায় প্রতিষ্ঠানগুলো? একই বিষয়ে স্নাতক করতে কোথাও সাত থেকে আট লাখ টাকা লাগলে কোথাও আবার দেড় দুই লাখ টাকায় লেখাপড়া শেষ হয় কি করে? টাকার পরিমান নির্ধারনের মাপকাঠি কি? দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজ কি? দেশে কি শিক্ষা মন্ত্রনালয় বলে কিছু আছে? সে মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর কি আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে? বাজেট ঘাটতি পূরনের আরো অনেক খাত থাকতে এইখানেই কেনো ভ্যাট আরোপ? নাকি শুরুতে যে প্রশ্ন করেছি, আমাদের কি অন্ধ করে রাখতে চাইছে কেউ? কোন অদৃশ্য শক্তি কি চাইছে শিক্ষা নামক বস্তুটা দিন দিন সাধারনের নাগালের বাইরে চলে যাক?

শিক্ষা নাগালের বাইরে গেলে কার লাভ কার ক্ষতি? এমন প্রশ্নের উত্তর মোটামুটি আমি হালকা হলেও খুঁজে পেয়েছি। লাভ হলো তাদের যারা দেশকে হীরক রাজার দেশে পরিনত করতে চায়। যারা চায় এমন এক শ্রেনীর মানুষ তৈরি হবে যারা কোনো প্রশ্ন করবে না। শুধু শুনবে। শুধুমাত্র জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর করবে। আর তাতে ক্ষতি হবে এই দেশটার। মজার বিষয় হলো, দেশের ক্ষতি হলে কারইবা কি আসবে যাবে? এদেশের নীতি নির্ধারকরা তো নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। দেশ নিয়ে তাদের ভাববার সময় কোথায়? তাদের সন্তানরা লেখাপড়া তো আর এ দেশে করে না। এছাড়া যে দেশের রাজনীতিকরা সম্পূর্ণ নিজেদের প্রয়োজনে নামে বেনামে হরতাল-অবরোধ ডেকে পেট্রোল বোমা, বাসে আগুন, গান পাউডার ঢেলে মানুষ মারে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যহত করে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পারে না সে দেশে শিক্ষায় ভ্যাট অনেক ক্ষেত্রে "একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও" মনে হতে পারে।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন তারা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? তারা কি জানতেন যে সংবিধানকে এভাবে লঙ্ঘন করা হবে? শোষনহীন সমাজের অর্থ কি বর্তমানে যা ঘটছে তা? তাহলে মহান সংবিধানে এমন গালভরা কথা কেন লিখে রাখা হয়েছে? ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি কোর্স’ তো প্রায় সবাই প্রতিযোগিতা করে কমপ্লিট করেছে, এখন সেই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানকে লঙ্ঘন এবং বিকৃতির প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে। এমন আরো কতকিছু কতদিন চলবে তা আমাদের জানা নাই, তবে শিক্ষায় ভ্যাট আমরা কোনভাবেই মানতে পারছি না এটুকু বলতে পারি। তাই এই প্রতিবাদ এই প্রতিরোধ। আমরা এই লড়াইয়ে জিতবো না হারবো তা জানিনা। তবে এর শেষ আমরা দেখেই ছাড়বো। মহামন্য রাষ্ট্রপতিকে দেয়া স্মারকলিপির একদম শেষে আমরা লিখেছিলাম; ‘আমরা বিশ্বাস করি, এ মাটিতেই লাখো শহীদের জন্ম। সেই মাটির সন্তানেরা কখনো অন্যায় ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত মানেনি, মানবেও না।’ সবশেষে একটা কথা মনে পড়ে গেলো। কলেজে পড়া অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে যখন কলেজে যেতাম তখন দেয়ালে আঁকা দুটো লাইন আমাকে সব সময় টানতো...

জীবন যেখানে দ্রোহের প্রতিশব্দ,
মৃত্যু সেখানে শেষ কথা নয়।

এখানে দুটো লাইনকে ‘লেখা’ না বলে আঁকা এ কারনে বললাম, এই দু’টো লাইনকে কখনো আমার শুধু কথা মনে হয়নি, কতগুলো শব্দ মনে হয়নি; মনে হয়েছে প্রতিবাদের একটি চিত্রকল্প আঁকা হয়েছে দেয়ালে। যে চিত্রকল্প আজো মনের মধ্যে আগুন জ্বালায় যখন দেখি পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে কোন অন্যায় ঘটতে থাকে। তখনই প্রতিবাদে সোচ্চার হই তাদের পক্ষে। হোক সে মুসলমান, হোক সে হিন্দু অথবা পাবলিক অথবা প্রাইভেট।

(০৯ আগস্ট ২০১৫, পল্টন)

(লেখাটি প্রিয় ডটকমে ০৯ আগস্ট ২০১৫ তে প্রকাশিত..)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ১১:৫৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাবধানের মার্ নেই

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৩১


নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরার পথে নিউ আর্ক্ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন এরোপ্লেনে উঠে নির্দিষ্ট সীটের কাছে পৌঁছলাম দেখলাম এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক জানালার পাশের সিটটাতে অলরেডি বসে আছেন। আইল ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×