শত-সহস্র অ-সার্ব বসনীয় হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত বসনীয়-সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিককে (৬৩) গ্রেফতার করা হয়েছে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেইডের উপকন্ঠ থেকে। সার্ব কর্তৃপক্ষ এ-তথ্য প্রকাশ করেছে মঙ্গলবার। জানানো হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর ইউরৌপের সর্ব-বৃহৎ গণহত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী এ-ব্যক্তি এতোদিন পর্যন্ত ছদ্মবেশ ধারণ করে বেলগ্রেইড শহরের উপকন্ঠের নিউ-বেলগ্রেইড নামে পরিচিত স্থানটিতে 'অল্টারনেটিভ মেডিসিনের' ডাক্তার হিসাবে কাজ-কর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সার্ব-কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত ফটৌতে দেখা যায় লম্বা-শাদা চুল আর বড়ো চশনা ধারণ করে আর শরীরটাকে শীর্ণ করে আগের চেহারা পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন কারাদজিক। গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইবুন্যালের হাতে হস্তান্তর করার জন্য তাকে এতোদিন ধরে খোঁজা হচ্ছিলো। গ্রেফতার বিষয়ে তথ্যদান-কালে সার্ব-মন্ত্রী ঋৎসিম লৎজাজিক জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সোমবার কোনো এক সময়ে কারাদজিককে আটক করা হয়। তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত এ-ব্যক্তি এতোদিন পর্যন্ত বলতে গেলে খুঁতহীন 'ভূয়া' পরিচয় ব্যবহার করছিলেন। তবে কারাদজিক সার্বিয়ান পরিচয় বহন করছিলেন না বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। তথ্যানুসারে কারাদজিক এতোদিন দ্রাগান দাবিক নামে নিজেকে পরিচিত করছিলেন। এ-নাম ব্যবহার করে তিনি নিউ-বেলেগ্রেইডে একটি ফ্ল্যাটও ভাড়া করেন। বারো বছর আত্মগোপনে থাকার পরে ধরা পড়লেন কারাদজিক। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিকের দেয়া তথ্যের বরাতে জানা যায়, গ্রেফতারের পর-পর তাকে বেলগ্রেইডের ওয়ার ক্রাইমস কৌর্টে হাজির করা হয়েছে।
বেলগ্রেইড শহরে একটি চলমান বাস থেকে কারাদজিককে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যম। সার্ব কর্তৃপক্ষ এ-ব্যাপারে কোনো তথ্য দেয়নি। এতোদিন পর্যন্ত হদিশ জানা থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে যে-খবর বেরিয়েছে, তাও অস্বীকার করা হয়েছে। বেলগ্রেইড জানিয়েছে, কারাদজিকের সামরিক কমান্ডার রাৎকো ম্লাদিককে গ্রেফতারের দায়িত্বে থাকা লোকজনের একটি টীম কারাদজিককে খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য, ম্লাদিকের বিরুদ্ধেও আর্ন্তজাতিক আদালতে গণহত্যা-যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এদিকে, কোনো-কোনো সংবাদ-মাধ্যম জানিয়েছে, কমপক্ষে ৮ হাজার বসনিয় মুসলিম হত্যার দায়ে অভিযুক্ত কারাদজিককে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তাকে খুব সহসা আর্ন্তজাতিক আদালতে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, বসনিয়া-হারজেগোভিনার গণহত্যায় জড়িত থাকা অপর তেত্রিশ ব্যক্তির বিচার চলছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেইগ শহরের আর্ন্তজাতিক আদালতে। বিচারধীনদের বেশির ভাগ সার্ব হলেও, কয়েকজন বসনিক আছেন বলে জানা যায়। সার্ব ও ক্রৌয়েটদের বিরুদ্ধে গণহত্যা-যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বসনীয়দের একজন হলেন জেনারেল রাসিম দেলিক।
স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৯১ সালে অক্টোবরে তৎকালীন যুগোশ্লাভিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার পর-পর বসনিয়া-হারজেগোভিনার বসনীয় (বসনিয়ার মুসলিম), সার্ব ও ক্রোয়েটদের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়ার সার্ব আর্মড ফৌর্স এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অফ রিপাবলিকা স্রপস্কার প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অ-সার্বদের - বিশেষতঃ বসনীয় মুসলিমদের - বিরুদ্ধে একাধিক গণহত্যা পরিচালনা করেন কারদাজিক। ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে আত্মটগোপনে চলে যান তিনি। এরপরে ২০০৫ সালে একবার কারাদজিককে বসনিয়া-হারজেগোভিনার ফোকা শহরে দেখা যাবার খবর আসে। ২০০৭ সালে তাকে রাশিয়াতে দেখা যাবার খবর দেয় বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
কারদাজিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যে, সার্ব-অবরোধের মুখে বসনীয়দের জন্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর ঘোষিত 'সেইফ হ্যাভেন' এলাকা থেকে প্রায় ৮০০০ বালক ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে গণহত্যা করেন তিনি। এক সময়কার কবি, ফুটবল দলের পেশাদার মনোবিজ্ঞানী এবং পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক ও সমরবিদ রাদোভান কারদাজিকের বিরুদ্ধে মৃত্যুশিবির পরিচালনারও অভিযোগ রয়েছে।
বসনিয়ার গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত কারাদজিক ১২ বছর পর ধৃত
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ব্যাস্ততম শহরে এক ছুটির দিন
নিউ ইয়র্ক দুনিয়ার অন্যতম ব্যাস্ততম শহর। বলা হয় The City that never sleeps! এরই মাঝে এবার মিলে গেলো এক ছুটির দিনে পিকনিকে যাওয়ার সুযোগ। শহরের সীমানা ছেড়ে প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
আজকের ডায়েরী- ১৯৯

সিরাজ ভাই বললেন, টেংরা মাছের ডিম আপনার কাছে কেমন লাগে?
আমি বললাম, ভালোই লাগে। শুধু রুই মাছের ডিম আমার ভালো লাগে না। সিরাজ ভাই বললেন, রুই মাছের ডিম সঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর বক্তব্য। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা।

জিন্নাহর সেই ভাষণ
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভাষা আন্দোলন নিয়ে জিন্নাহর একটি বক্তব্য যাতে দাবী করা হচ্ছে তিনি নাকি আমাদের ওপর উর্দু যেভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে এতকাল “প্রচার”... ...বাকিটুকু পড়ুন
গালিব সাহেব, মিথ্যারও তো একটু সামাজিক মর্যাদা আছে!

মির্জা গালিব বলেছেন -
“পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলা হয় ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে, যেটা আদালতে। আর সবচেয়ে বেশি সত্য বলা হয় মদ ছুঁয়ে, যেটা পানশালা।”
গালিব সাহেব, আপনার কথায় যুক্তি আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
লাউঞ্জ এন্ড ফুড রিভিউ; দ্যা সেন্স

নিয়মিত-অনিয়মিত গত এক যুগ ধরে ভ্রমণ করছি এবং প্রায়োরিটি পাস দিয়ে বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টে লাউঞ্জ ব্যবহার করছি প্রায় ৪ বছর ধরে। দীর্ঘ ফ্লাইট, লং ট্রানজিটের মধ্যে এয়ারপোর্টে ফ্রিতে দৃষ্টিনন্দন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।