একবুড়ো যাদুকর ছদ্রবেশে এসে চুরি কোরে নিয়ে গেলো যাদুপূর্ণ তিনটি জিনিস। রাজার তিন ছেলেমেয়ে এটা শোনে খুব রেগে গেলো। তাই যাত্রা করলো ওদের জিনিসগুলো উদ্ধার করতে। কারণ ওরা কোনো বুড়ো যাদুকরকে ভয় পায় না।
একদিন মহারাণী পারোনেইলের রাঁধুনির মনোযোগ আকর্ষণ করলো ওর রান্নাঘরের দরোজা ধাক্কানোর শব্দ। ও দরোজা খোলতেই ছেঁড়াফাঁড়া পোশাক পরা একজন ফেরিওয়ালাকে দেখতে পেলো। ওর ঠিক সম্মুখে লোকটির বারকোশভর্তি পণদ্রব্য।
‘আমি কি তোমার কাছে কিছু বিক্রি করতে পারি?’ বলল ফেরিওয়ালা। ‘লাল রেশমীফিতা, রূপোর অঙুস্তানা (সেলাইয়ের কাজে ব্যবহৃত আঙুলের টোপর), মধুর চকলেট, উঁচু হিলের জুতো- আমার এখানে সবই আছে।’
‘আজ আমার কিছু লাগবে না। তোমাকে ধন্যবাদ,’ বলল রাঁধুনি। কিন্তু ফেরিওয়ালা গেলো না।
‘আমি অনেক মাইল হেঁটে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি,’ ও বলল। ‘আমাকে একটুখানি বিশ্রামের জন্যে ভিতরে আসতে দাও। দেখো, আমি মাদুরে ভালোমত পা মোছে পরিস্কার কোরে নিয়েছি। অতএব আমি তোমার রান্নাঘর অপরিস্কার করবো না।’
কি আর করবে রাঁধুনি ওকে ভিতরে আসতে দিলো। আর খানিকটা সময় বিশ্রামের উদ্দেশ্যে ওর পুরানো চেয়ারটায় বসলো। কিন্তু বুড়ো যখন চলে গেলো তখন তিনটে জিনিস খোয়া গেছে। একথা বলার জন্যে মহারাণীর কাছে উর্ধ্বশ্বাসে প্রায় উড়ে এলো।
‘অহ্, ইওর হাইনেস!’ ও জোরেসোরে কেঁদেকুঁদে ঝড়ের মতো ড্রয়িঙ-রুমে প্রবেশ করলো। মহারাণী সেখানে বসে পশমের জামা বুনচ্ছিলেন।
‘অহ্, ইওর হাইনেস, একজন ফেরিওয়ালা আপনার নীল দুধজগ, ছোট রূপোর চামচ আর আপনার কাঠের নঁকশাখচিত পরিজ (Porridge)- এর প্লেট চুরি করেছে! হায়, আমি যে এখন কি করব!’
এই তিনটি জিনিস ছিল সম্পূর্ণ যাদুর। আর এগুলো মহারাণীর কাছে ছিল খুবই মূল্যবান।
নীল দুধজগের ক্ষমতা হচ্ছে প্রতিদিন অনবরত যত ইচ্ছে বিশুদ্ধ টাট্কা দুধ ঢেলে নেওয়া যেতো, মহারাণীর ধাত্রীর জন্যে এটি ছিল খুবই প্রয়োজনীয়, সে দুজন প্রিন্সেস আর প্রিন্সকে গৌরবের সঙ্গে নার্সারিতে দেখাশোনা কোরে।
রূপোর চামচটি যদি কেউ মুখের ভিতর রাখতো তবে তার খিদের রুচি বেড়ে যেতো। এটিও খুবই প্রয়োজনীয় একটি জিনিস ছিল যে তা নাহলে রাজকীয় শিশুদের কোনো খাবারের রুচি হতো না।
কাঠের নঁকশাখচিত পরিজের প্লেটে কোনো কিছু নিয়ে খেলে ওটা সারাক্ষণ সুর নিয়ে খেলা করতো। সেজন্যে শিশুরা এটি খুব ভালোবাসতো। এই জিনিসগুলো চুরি গেছে শোনে মহারাণী পারোনেইল অত্যন্ত শোকার্ত হলেন।
‘দেখতে কেমন ছিল ফেরিওয়ালাটি?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ‘আমি ওকে গ্রেফতার কোরে জেলে পাঠাব।’
কিন্তু হায়রে কপাল, রাঁধুনী যখন ফেরিওয়ালার প্রকৃত বর্ণনা দিলো, তখন মহারাণীর চিনতে বাকী রইল না ও-শুধু সাধারণ ফেরিওয়ালাই নয় একজন যাদুকরও বটে। যে কিনা ছদ্রবেশ নিয়ে জিনিসগুলো চুরি করেছে। রাজাকে মহারাণী বিস্তারিত জানালেন। বাস্তবিক রাজা মহাশয় এখন তিনি কি করবেন।
‘এই যাদুকর এতো শক্তিশালী যে ওকে জেলে পাঠানো আমাদের পক্ষে যথেষ্ঠ কষ্টকর,’ বললেন তিনি। অস্বস্তি নিয়ে মাথা নাড়লেন। ‘আমরা ওকে যত ভালো ভাবেই বুঝিয়ে বলি না কেন সে আমাদের জিনিস ফেরত দেবে না। আমি সত্যি জানি না এখন কি করব।’
এরিমধ্যে দুজন প্রিন্সেস আর প্রিন্স জেনে গেল কিভাবে যাদুকর ওদের দুধজগ, পরিজের প্লেট আর চামচ চুরি করেছে, ওরা খুবই ক্ষেপে গেছে।
‘বাবা একশো সৈন্য পাঠিয়ে ওকে গ্রেফতার কোরে আনুন,’ চেঁচিয়ে ওঠল ছোটরাজকুমার রোল্যান্ড। রাজার সোজা টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
‘নির্বোধের মত কথা বলো না, মাই ডিয়ার চাইল্ড,’ বললেন রাজা। ‘ওর ইচ্ছাশক্তির কাছে বশীভূত নেকড়ের দল ওকে সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে। ওদের রক্তজল করা দীর্ঘ আর্তনাদ এখানেও ভেসে আসে। তুমি নিশ্চয়ই এটা পছন্দ করবে না। না কি করবে?’
‘ওয়েল ফাদার, তাহলে এমন কাউকে পাঠান যে ওর কাছ আমাদের সমস্ত জিনিস চুরি কোরে নিয়ে আসবে,’ বলল সবার বড় রাজকুমারী রোজাল্যান্ড, পূর্ব-পুরুষদের ধারায় ওর উজ্জ্বল স্বর্ণালী কোঁকড়ানো চুল।
‘তুমি জানো না, কি বিষয়ে কথা বলছো,’ খিটখিটে স্বরে বললেন রাজা। ‘তোমরা সবাই নার্সারীতে ফিরে যাও। রেলগাড়ী নিয়ে খেলা কোরে গে।’
ওরা নার্সারীতে ফিরে এলো। তবে রেলগাড়ী নিয়ে ওরা খেলা করল না। ওরা এককোণে বসে শলাপরামর্শ করছে। ওদের যাদুর জিনিসগুলো চুরি যাওয়া রোজাল্যান্ড আর রোল্যান্ড অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছে। তারপর আচমকা রোল্যান্ডের মাথায় একটি আইডিয়া এলো।
‘আমি বলি কি রোজাল্যান্ড, আমি এক যাদুকরের ছদ্রবেশ নিয়ে ওই যাদুকরের কাছে যাবো যে আমাদের জিনিসগুলো নিয়েছে। সম্ভবত: ওগুলো ফিরিয়ে আনার কোনো এক উপায় আমি বের করতে পারবো। আমি কোনো বুড়ো যাদুকরকে ভয় পাই না।’
‘আমিও আসবো,’ বলল রোজাল্যান্ড। ও সবকিছু করতে পছন্দ কোরে।
‘আর আমিও,’ বলল সবার ছোট গোল্ডিলক্স।
‘তুমি খুবই ছোট,’ জানালো রোল্যান্ড।
‘আমি বাদ পড়েছি,’ বলল গোল্ডিলক্স। ‘আমাকে না নেওয়া হলে আমি খুব কাঁদবো।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি আসতে পারো,’ বলল রোল্যান্ড। ‘কিন্তু তুমি যদি পোকামাকড়ের কামড় খাও কিংবা অন্যকিছু যদি ঘটে যায়, তাহলে আমাকে অভিশাপ দিতে পারবে না।’
এবার ওরা প্ল্যান্ আঁটলো, খুবই অসাধারণ ওদের পরিকল্পনা। সেরাতে ওরা বিছানা থেকে পিছলে নেমে নিচের তলায় চলে এলো পোশাক পড়ার জন্যে, তখন কোথাও কেউ নেই। রোল্যান্ড পেলো ওর বাবার একটি চমৎকার আরখেল্লা আর পালকের টুপি। দু’বালিকা ওদের সঙ্গে নিলো একজোড়া হাপর, আতশবাজি রাখার আলমারি হতে একবাক্স আতশবাজি আর পানি ঢালার উদ্দেশ্যে দুটো পানিভরা ক্যান। কি অদ্ভুদ, তাই না?
ওরা প্রচন্ড উওেজিত। যখন সবাই বিছানায়, ঘড়িতে এগারোটা বাজা পর্যন্ত ওরা খুব কষ্ট কোরে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলো। তারপর ওরা কাপড় পাল্টানোর জন্যে নিচে নেমে এলো।
রোল্যান্ড জলদি কোরে ওর বাবার চমৎকার সোনালী-রূপালী রঙা আলখেল্লাটি পড়ে ফেললো। এটির গলা আর ঘাড়ের পাড়ে অসংখ্য বড় হিরে ঝুলে আছে। বাবার আড়ম্বর পূর্ণ পালকের টুপিটা মাথায় কোঁকড়ানো চুলের ওপর চাপালো। ওটা চমৎকার ভাবে ফিট্ হবার জন্যে ভিতরে কিছু কাগজ ঠেশে পুড়লো। অবিলম্বে ওরা হাপর, আতশবাজি ও পানি ঢালার ক্যানের সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে চললো পর্বতের ঢালে যাদুকরের ছোট বাড়ীটির উদ্দেশ্যে, খুব বেশী দূরে নয় ওটা।
চারিদিক কালিগোলা অন্ধকারাচ্ছন্ন শুধু কাছে পিঠের জানালা দিয়ে আসা একটি বাতির আলো কেবল ওদের আঁধার থেকে রক্ষা করলো।
‘সে আছে,’ বলল রোল্যান্ড। ‘বেশ! তোমরা দুই বালিকা জানো এখন তোমাদের কি করতে হবে। তাই না? যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি চিমনি দিয়ে আসা আমার চিৎকার শোনতে পাবে, তখন তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন করবে। গোল্ডিলক্স, যদি তুমি কোনো ভুল কোরো, আগামীকাল আমি তোমার চুল ছিঁড়ে নেবো। এখানেও নিতে পারি।’
‘বাগানের কুঁড়েঘর থেকে মইটি বের করার জন্যে আমাকে সাহায্য কোরো,’ বলল রোজাল্যান্ড। ওরা কটেজের কাছে চলে এলো।
রোল্যান্ড আর দু’বালিকা এটিকে নিঃশব্দে বয়ে এনে স্থাপন করলো কটেজের ছাদের দিকে তারপর বিড়ালের মতো চুপিচুপি দুই প্রিন্সেস ওপরে ওঠে গেলো। আধমিনিটের মাথায় সব কিছু চিমনির সামনে করলো। ওদের পাশে হাপরজোড়া, আতশবাজির বাক্স আর পানি ঢালার ক্যান।
এবার রোল্যান্ডের দায়িত্ব পালনের সময়। খুব ভালোমত বড় আলখেল্লাটি কাঁধে জড়িয়ে নিয়ে দরোজার সামনে এসে দাঁড়াল ও। সযতেœ বাছাই কোরে একটি ভারী পাথরখন্ড বেছে নিয়ে দরোজার উপর এমন জোরালো আঘাত করলো যে প্রচন্ড বিকট শব্দ হলো। যাদুকরের শরীরের ভিতরটা পর্যন্ত লাফিয়ে ওঠলো।
‘এমন সময় আবার কে হতে পারে?’ তিনি আশ্চর্য হোন। ‘কিছু বড়মাপের ডাইনী আর যাদুকর আমার দরোজায় এমন হাতুড়ির মতো বিকট আঘাত করতে পছন্দ কোরে।’
তিনি দরোজা খোললেন। রোল্যান্ড মোটেও নার্ভাস না হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
‘গূড ইভনিঙ উইজার্ড,’ বলল ও। ‘আমি রিল্লোবাই-রিম্মোনি-রু চাঁদের যাদুকর। আমি তোমার সম্পর্কে অনেক শুনেছি যে তুমি আশ্চর্যকর অনেককিছু করতে পারো। আমাকে এর কিছু নমুনা দেখাও।’
রোল্যান্ড চমৎকার আলখেল্লা আর টুপি দেখে যাদুকর ভাবলেন ও- অবশ্যই একজন ধনী আর বড় যাদুকর হবেন। তিনি সামান্য ঝুঁকে সম্মান প্রদর্শন করলেন।
‘আমার হুকুমে বাতাস থেকে স্বর্ণ ঝরে নামে, নদী প্রবাহ হতে রূপো, আর নক্ষত্রের থেকে সঙ্গীত,’ বললেন তিনি।
‘দূর!’ রূঢ়স্বরে বলল রোল্যান্ড। ‘যে কেউই এটা করতে পারবে! তোমার আদেশে কি বাতাস ডেকে আনা যায়?’
‘গ্রেট স্যার, এটা কেউই করতে পারে না,’ উপহাসের কন্ঠে উওর দিলেন যাদুকর।
‘তুমি আমাকে তুচ্ছ করলে, তাই না?’ বলল রোল্যান্ড। চিমনির কাছে এগিয়ে গেল, আর দু’হাত উপরে তোলে চিৎকার কোরে বলল, ‘বাতাস আমার কাছে আসো। এই হতভাগা যাদুকরকে দেখিয়ে দাও কিভাবে আমার হুকুম মানতে হয়।’
সেই মুর্হুতে রোজাল্যান্ড আর গোল্ডিলক্স ওদের হাপর চেপে বড়োবড়ো ফুঁড়ে দম্কা বাতাস সরাসরি নিচে পাঠাল। আগুনের সঙ্গে বাতাস মিলেমিশে সারাঘরে ধোঁয়ার কুন্ডুলী পাকালো। যাদুকর ভীষণ কাশতে শুরু করেছেন। তাকে অত্যন্ত ভর্য়াত দেখালো।
‘অনেক হয়েছে, যথেষ্ঠ!’ চিৎকার কোরে ওঠেন তিনি। ‘আমাকে ধোঁয়া থেকে রেহাই দাও। চিমনি দিয়ে আসা বাতাসকে থামতে হুকুম কোরো।
‘হে বাতাস থামো!’ চিমনির ওপরের দিকে উঁচু গলায় হুকুম করলো রোল্যান্ড। সেসময় ছাদের উপরের দু’বালিকা ওদের হাপরের কাজ বন্ধ কোরে দিলো। প্রচলিত পথ ধরে চিমনি দিয়ে ঘরের ধোঁয়া বের হয়ে গেল।
‘অসাধারণ, বিস্ময়কর!’ রোল্যান্ডের দিকে খুবই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর বললেন যাদুকর। ‘আমি এখনোও পর্যন্ত এমন কাউকে দেখিনি যেকিনা বাতাসকে নিজের ভৃত্যের মতো পরিচালনা করেছে।’
‘এটা তো কিছুই না,’ চমৎকার ভঙ্গিতে বলল রোল্যান্ড। ‘আমার হুকুমে বৃষ্টিও নামে।’
‘আদেশ করলে এখুনি নামবে?’ খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন যাদুকর। রোল্যান্ড চিমনির উপরে চেঁচিয়ে বলল, ‘বৃষ্টি, আমার আদেশে চলে আসো।’
সেমুর্হুতে রোজাল্যান্ড আর গোল্ডিলক্স ওদের পানির ক্যান দিয়ে চিমনির নিচে মুষলধারায় পানি ঢালতে শুরু করলো। ঘরের যেস্থানে অগ্নিকুন্ড আছে তার উপর পড়ে আগুন চাপড়ে নিভবার হিসহিস শব্দ হলো।
‘বৃষ্টি থামাও!’ তিনি কান্নার মতো চিৎকার কোরে ওঠেন। ‘এটা যদি চিমনি দিয়ে এমন অবিবেচক ভাবে আসে তাহলে আমার ঘরের আগুন নিভে যাবে।’
রোল্যান্ডের মোটেও ইচ্ছে নেই যে ঘরের আগুন নিভে যাক। মুষলধারায় অবিরত বর্ষনকে থামতে আদেশ করলো। আর এদিকে দু’বালিকা ওদের পানির ক্যান নামিয়ে রেখে যাদুকরের বিস্মিত আর্তনাদ শোনে ওরা মুখ চেপে নিঃশব্দে হাসতে শুরু করলো।
‘তুমি নিশ্চয়ই এরচে’ বড় কিছু করতে পারো?’ রোল্যান্ডকে বললেন যাদুকর।
‘আমি বজ্র আর আলোকে স্বাচ্ছন্দ্যে ডেকে আনতে পারি,’ বলল রোল্যান্ড। ‘অপেক্ষা কোরো আমি এদের সামান্য নমুনা অবশ্যই নিচে নামাবো।’
আতঙ্কিত যাদুকর ওকে থামানোর আগেই রোল্যান্ড আবার চিমনির উদ্দেশ্যে হাঁক দিলো। ‘বজ্র আর আলো, এখানে নেমে আসো।’
সেই সময় রোজাল্যান্ড হাত ভরে আতশবাজি নিচে ফেললো। ওগুলো উজ্জ্বতার সঙ্গে রামধনুর মতো রঞ্চিত হয়ে মেঝেতে পড়েই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা নিয়ে সারি বেঁধে সশব্দে ফাটলো। ভয়ার্ত যাদুকর ঘরের এককোণে ছুটলেন। রোজাল্যান্ড আরও কিছু পট্কা ফেললো, দুটো পট্কা রকেটের মতো লাফিয়ে ওঠে আগুনের দিকে ছুটলো। ওখানকার এককোণে যাদুকর আতœগোপন কোরে আছে।
‘অহ্অহ্, বজ্রঝড় আমাকে ধরতে আসছে,’ তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন। ‘ওদের দূরে সরিয়ে নাও, হে মহান যাদুকর, ওদের দূরে সরিয়ে নাও।’
রোল্যান্ড খুব প্রাণখোলে হাসতে ইচ্ছে করছিল, তবে হাসা মোটেও উচিত হবে না। আতশবাজির পরবর্তী ঝাঁকটা যখন নিচে নামলো। যাদুকর তাড়াতাড়ি একটি তলে লুকোলেন।
‘বজ্র আর আলো তোমরা থামো!’ চিমনির উদ্দেশ্যে বলল রোল্যান্ড। তখুনি দু’বালিকা নিচে আতশবাজি ছোঁড়া বন্ধ করলে কামরায় শান্তিপূর্ণ নিরবতা নেমে এলো। যাদুকরও আশঙ্ককপূর্ণ বিলাপ থেকে রেহাই পেলেন।
‘আমি কি একজন ক্ষমতাবান যাদুকর নই?’ চমৎকার ভঙ্গিতে বলল রোল্যান্ড। ‘তুমি কি আমার গুপ্তরহস্য জানতে আগ্রহী?’
‘ওহ্ প্রভু, আমাকে কি ওগুলো বলবে?’ আনন্দে বিগলিত হয়ে বললেন যাদুকর।
‘আমি এগুলো তোমার জন্যে একটি কাগজে লিখে দেবো। তবে আগামীকাল ভোর না-হওয়া পর্যন্ত এটা তুমি দেখতে পারবে না। এখন বলো এর বিনিময়ে তুমি আমাকে কি দিচ্ছো?’
‘বস্তাভরা সোনা, ঘোড়ার গাড়িভর্তি রূপো,’ গদগদে হয়ে জানালেন যাদুকর।
‘দূর!’ অবজ্ঞার স্বরে বলল রোল্যান্ড। ‘এসব আমার কি কাজে আসবে?’ পৃথিবীর সমস্ত একত্রিত মানুষের চে’ও আমি ধনী।’
‘আমার সারাঘরে একবার নজর বুলিয়ে দেখে তোমার খেয়াল খুশীমতো একটা কিছু পছন্দ কোরো,’ সঙ্গেসঙ্গে বললেন যাদুকর। ‘তাকিয়ে দেখো আমার এখানে কিছু আজব জিনিস আছে- আশা করি তুমি সন্তুষ্ঠ হবে।’
সময় নষ্ট না কোরে রোল্যান্ড আশেপাশে চোখ বুলালো, একটি শেলফ্রে উপর নীল দুধজগ, রূপোর চামচ আর পরিজের প্লেট দেখতে পেলো।
‘হুম,’ বলল ও। ‘আমার পছন্দ হওয়ার মত তেমন কিছুই আমি দেখছি না। আচ্ছা, এখানে তো খুব সুন্দর প্রশংসনীয় একটি দুধজগ আছে। আমি এটা বাতাসের গুপ্তমন্ত্রের বিনিময়ে নেবো। এখানে একটি রুচিসম্পন্ন রূপোর চামচও আছে। এটা আমি বৃষ্টির গোপনীয়তার পারিশ্রমিক হিসেেেব নিচ্ছি। আমি এখন বজ্র আর উজ্জ্বল আলোর বিনিময়ে কি নেবো? এই পরিজের প্লেটটা আমি ভালোবাসার সঙ্গে ব্যবহার করবো। যাদুকর আমি এসবই নিচ্ছি। এখন নিশ্চয়ই আমার হাতে একটি খাম দেখতে পাচ্ছো। এটার ভিতরে তুমি পাবে বাতাস, বৃষ্টি আর বজ্র-আলোর একান্ত গোপন রহস্যের সমাধান। যা কিনা তুমি আজরাতে সচোখে দেখলে। আগামীকাল ভোর না-হওয়া পর্যন্ত এটা তুমি মোটেও খোলো না।’
রোল্যান্ড দুধজগ, চামচ আর পরিজের প্লেট নিয়ে দরোজা দিয়ে বেড়িয়ে গেলো। যাদুকর অত্যন্ত বিনীত সম্মান পূর্বক ওকে অভিবাদন জানালো। ততক্ষণে রোজাল্যান্ড আর গোল্ডিলক্স মই বেয়ে নেমে এসে ওর জন্যে অপেক্ষা করছিল। ওরা হাপর, পানির ক্যান ও অন্যান্য জিনিসপত্রাদি দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুট দিলো। তারপর ছেলেমেয়েরা যখন নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদবোধ করলো তখন ওরা প্রাণখোলে বুদ্ধি-কৌশলের খেলাটির কথা ভেবে হেসে ওঠলো।
রাজা আর মহারাণী দুজনেই ওদের দুষ্টুমীর কথা শোনে প্রথমে খুব বকাঝকা দিলেও পরে ওদের অত্যন্ত প্রশংসা করলেন।
‘তোমরা দুষ্টু সাহসী বিচ্ছুর দল,’ জোরালো কন্ঠে বললেন মহারাণী। ‘তোমরা কেন ব্যাঙের মতো বেড়াতে সাহস করলে?’
এদিকে, পরদিন সকালে যাদুকর যখন খামটি খুললেন। আর এতে যা লেখা ছিল তা পড়ে বাস্তবিক খুবই হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। রোল্যান্ড ওর জন্যে লিখে ছিল : ‘বাতাসের মন্ত্র হচ্ছে দুটো হাপর। বৃষ্টির রহস্য হচ্ছে দুটো পানির ক্যান। বজ্র আর আলোর গুপ্ততথ্য হলো আতশবাজি। হাঃ! হাঃ!’
এখন হতভাগা যাদুকর পৃথিবীময় সবস্থানে অনেক পরিভ্রমন কোরে বেড়িয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন এমন একজন যথার্থ পন্ডিত আর বুদ্ধিমানের খোঁজ পেতে যেকিনা তাকে সঠিক ব্যাখ্যা কোরে বোঝাবে হাপর, পানির ক্যান আর আতশবাজির রহস্যের। কিন্তু কেউ ওকে পছন্দ করলো না।
(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০১০ ভোর ৫:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


