খিটখিটে বয়স্ক একবুড়ো তাঁর বাগানকে খুব ভালোবাসতেন। একদিন- তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর শখের বাগান নষ্ট হয়ে গেলো। কিন্তু দুজন পরীর ছোঁয়ায় সবকিছু আবার ঝলমলে কোরে উঠলো।
ডেভিড আর রুথ প্রাইমরোজ কটেজে বাস করতো। ওদের পাশে ছিলো ড্যাফোডিল কটেজ। এখানে একজন বুড়োলোক থাকতেন। তিনি বাগানের খুবই অনুরাগী ছিলেন। ওদের কাছেও এটি ছিল একটুকরো শান্তির স্থান।
একবার বুড়োলোকটি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাইরে যেতে হলো। ডেভিড আর রুথ বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর ড্যাফোডিল আর প্রাইমরোজে পরিপূর্ণ বাগানটির দিকে নির্ণিমেষে তাকিয়ে থাকতো।
‘বুড়ো মি. রিড নিশ্চয়ই অসম্ভব মনোকষ্ট পাচ্ছেন তাঁর এমন অপরূপ ড্যাফোডিল ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তাঁকে যেতে হয়েছে ভেবে,’ বলল রুথ। ‘আমি আশা করছি কাজের লোকটি তাঁর হয়ে বাগানের উপযুক্ত দেখাশোনা করবে।’
মি. রিড খিটখিটে মেজাজের অতি বয়স্ক একব্যক্তি,’ বলল রুথ। ‘আমরা সামান্য শোরগোল কিংবা শব্দ করলে তিনি ভ্র“ জোড়া কুঁচকে শক্তচোখে তাকান।’
‘বেড়ার ওপাশে বল চলে গেলে ওটা ফেরত আনতে যাওয়াটাও তাঁর ঠিক পছন্দ নয়,’ বলল রুথ।
‘তিনি কখনোই সুস্থ হবেন না,’ ওদের মা বলেন। ‘বাস্তবিক তাঁর বয়স হয়েছে। আমি মনে করি যে তিনি যদি খুব আনন্দময় আর সুখি মেজাজে থাকেন তাহলে তাঁকে তোমাদের মতোই সুস্থ-সবল দেখাবে।’
পাশের কটেজটির দরোজায় তালা মেরে পরিশ্রমি ছোট কাজের ছেলেটি ওর মায়ের কাছে চলে গেলো। এখন বাগানটির দেখাশোনার কেউ রইলো না এখানে, আর এদিকে ড্যাফোডিল (পীতবর্ণের পদ্মফুলের মতো পুষ্পবিশেষ) আর প্রাইমরোজ (বসন্ত ঋতুর এক পুষ্প) বাগানটি ছেয়ে গেছে, আগাছায় ভরে গেছে বাগানের কেয়ারি, লনের ছোট কোরে ছাঁটা ঘাস বেড়ে জায়গাটি কোরে তুলেছে অপরিচ্ছন্ন। বিশেষ কোরে বাগানের শেষপ্রান্তের কাটাগাছগুলো তরতর কোরে বেড়ে উঠেছে।
‘খুব মায়া হয় তাই না?’ বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে অপরিচ্ছন্ন বাগানটি দেখে বলল রুথ। ‘গ্রীষ্মকালে যা কিনা ফুলেফুলে ভরে যায়। এখন এটা মৃত মাঠের মতো দেখাচ্ছে।’
‘আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে বুড়ো মি. রিড কখন আসবেন,’ বলল ডেভিড।
‘মা বলেছে তিনি জুনে আসবেন,’ বলল রুথ। ‘তখন আমাদের বাগানটি খুব অপূর্ব দেখাবে। কিন্তু তাঁরটি থাকবে কুৎসিত দেখাবে।’
‘চলো আগামীকাল বীজ কিনে আনি,’ প্রস্তাব দিলো ডেভিড। ‘তুমি জানো, এখুনি রোপন করার উপযুক্ত সময়, নাহলে আমাদের বাগানে গ্রীষ্মকালীন ফুল ফুটতে অনেক দেরী হবে।’
ওরা মানিবক্স খালি কোরে টাকা গুনলো। এবার ওরা যথেষ্ঠ পরিমাণের বীজ কিনতে পারবে।
‘আমার খুব ইচ্ছে ছিলো সুন্দর দেখে একচাকার হাতগাড়ি (Wheel-barrow) ি, নতুন পানির ক্যান আর একটি কোদাল কেনার,’ আন্তরিক ইচ্ছা প্রকাশ করলো ডেভিড। ‘আমাদের বাগানের সরঞ্জাম গুলো পুরানো হয়ে গেছে। মাকে বলে দেখি সে নতুন কিছু আমাদের কিনে দেবেন কিনা?’
কিন্তু ওদের মা না বলল। ‘এখন পারবো না,’ বললেন তিনি। ‘আমি নতুন একটি ম্যানগল্ (ইস্ত্রি করার যন্ত্র) কেনার উদ্দেশ্যে টাকা জমাচ্ছি। কারণ আমারটা বিকল হয়ে যাচ্ছে। ম্যানগল্টি কেনার পর আমি তোমাদের বাগান সরঞ্জামের বিষয়টি দেখবো।’
‘অহ্, ডিয়ার,’ বলছে রুথ। ‘তাহলে আমি বুড়ি হয়ে যাবো।’
বাগানের বীজ কেনার উদ্দেশ্যে ওরা দুজন বীজ বিক্রেতার কাছে গেলো। ওরা কিনলো ক্যান্ডিটাফট, পপি, ন্যাস্টারশম্, ভার্জিন স্টক, লাভ-ইন-এ-মিস্ট্, কর্নফ্লাওয়ার- ওরা এসব ওদের বাগানে চাষ করতে ভালোবাসে। বীজ আর চারা কেনার পর ওরা ফিরে এলো।
বয়সে ছোট হলেও ওরা উপযুক্ত বাগান পরিচর্যাকারী। কেয়ারি তৈরীর পদ্ধতি ওরা ভালোমতো জানে। তাছাড়া এটাও ওরা জানে যে কিভাবে প্যাকেট ঝাঁকিয়ে একজায়গায় সঠিক পরিমাণের বীজ ফেলতে হয়। সর্তকতার সঙ্গে বীজে পানি দিয়ে আগাছা বাছাই কোরে সরিয়ে ফেলতে হয়। ওদের কাজ দেখে তাদের মা খুবই গর্ববোধ করলো।
বীজ বপন করা সময় রুথ একটি ভালো বুদ্ধি দিলো। ঘাসের উপর বসে মনের কথা প্রকাশ করলো ডেভিডকে।
‘আমি বলি কি এই বছর আমাদের প্রচুর বীজ আছে। তাই না?’ বলল ও। ‘পাশের বাড়ীর বুড়োলোকটি প্রতিদিন জানালার সামনে যেখানে বসতো সেদিকের ছোট গোলাকার কেয়ারিতে কিছু চারা রোপন করলে ভালো হয়। যদিও তাঁর বাগানটি ধ্বংশ হয়ে গেছে, অতএব তিনি যথেষ্ঠ খুশী হবেন একটি মাত্র সুন্দর ফুলে ছেয়ে থাকা কেয়ারি দেখে! এটি তাঁর জন্যে অসাধারণ একটি বিস্ময়।’
ডেভিডও চিন্তা কোরে দেখলো এটা খুব ভালো বুদ্ধি। নিজেদের ছোট বাগানে বীজ রোপনের কাজ শেষ কোরে ওরা দুজন পাশের কটেজে ছুটলো। বাস্তবিক ওরা উৎসাহ নিয়ে কঠিন পরিশ্রম করছে।
বাগানের কেয়ারিটি আগাছায় ঢাকা পড়ে আছে! তাই কোনো বীজ বোপন করার আগে সবক’টি ডেন্ডিলায়ন (উজ্জ্বল হলুদবর্ণ বিশিষ্ঠ এক প্রকার গাছ) আর বাটারকাপ (হলদে বুনোফুলের গাছ) ছাড়াও অন্যান্য আগাছা কোদাল দিয়ে খুঁড়ে আর হাতে টেনে উপ্ড়ে ফেললো।
এখন ওরা বীজের আবাদ করছে। কর্নফ্লাওয়ার যেহেতু খুবই চমৎকার আর লম্বা তাই এগুলো মধ্যস্থলে ফেললো। চক্রাকারে ফেললো ক্যান্ডিটাফট্ (মসৃণ শাদাপালক, গোলাপী অথবা লালবেগুনি রঙের এক ধরণের ফুলের গাছ), এখানে ওখানে ছড়িয়ে দিলো পপি ফুলের বীজ, একসঙ্গে মিল রেখে সামনে ফেললো লাভ-ইন-এ-মিস্ট্ আর নাস্টারশম্ (লাল কমলা হলুদ রঙের ফুলের গাছ, এর পাতা গোলাকৃতি সবুজ), কেয়ারির কিনারে রোপন করলো ধূসর ছাই রঙের ছোট ভার্জিন স্টক। কাজ শেষ কোরে ওরা অত্যন্ত খুশী হলো। এবার কেয়ারিটা খুবই পরিচ্ছন্ন আর সুসজ্জিত দেখাচ্ছে।
‘কাজতো শেষ হলো,’ বলল ডেভিড। ‘মাঝেমধ্যে আগাছা সাফ করতে আর পানি দিতে আসতে হবে। গ্রীষ্মের সময়ে কেয়ারটি অপূর্ব দেখাবে! নিশ্চয়ই বুড়ো মি. রিড খুব আশ্চর্য হবেন!’
তোমাদের জানা দরকার যে এই বীজগুলো থেকে কেমন উৎপাদন হয়েছিলো। এক কথায় অসাধারণ। ওদের বাগান খুব চমৎকার দেখাচ্ছে। তবে পাশের বাড়ীর গোলাকার কেয়ারিটি হয়েছে অবিশ্বাস্যকর।
ঘননীল কর্নফ্লাওয়ার, শক্ত-সবল ক্যান্ডিটাফট্ আর ভার্জিন স্টকে ছেয়ে গেছে কেয়ারি।
‘বুড়ো মি. রিড আগামীকাল ফিরছেন,’ উত্তেজিত স্বরে বলল রুথ। ‘তিনি অসম্ভব অবাক হবেন!’
তিনি ফিরে এলেন- আর বাস্তবিক অত্যন্ত বিস্মিত হলেন! ছেলেমেয়েরা বেড়ার ওপাশ থেকে তাকিয়ে দেখছে। তিনি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন নিবিষ্ট বিস্মিয় নিয়ে। তিনি ওদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন।
‘হাল্লো, রুথ আর ডেভিড,’ বলছেন তিনি। ‘এই গোলাকার কেয়ারির দিকে একবার তাকিয়ে দেখো! এটি একটি ছবির মতো, তাই না? আমি ফিরে এসে চিন্তা কোরে ছিলাম যে এবার গ্রীষ্মে কোনো ফুল আমি পাবো না- আর এই প্রথম দেখলাম রঙে পরিপূর্ণ কেয়ারি। তোমরা কি জানো এগুলো কে রোপন করেছে?’
এই কাজটি যে ডেভিড আর রুথ করেছেতা ওরা প্রকাশ করতে চাইছে না।
‘সম্ভবত: কোনো পরীদের কাজ,’ বললেন মি. রিড। ‘শুধু কি আমি একাই আশ্চর্য হয়েছি, তোমরা হওনি? যাইহোক, আমি এই অসাধারণ মহৎ কাজের জন্যে অবশ্যই পুরস্কৃত করবো। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে আজকের রাতের পর তোমাদের কেউ একজন কি আসবে সূর্য ঢলে পড়ার পর আমার কেয়ারিতে পানি দিতে? আমি ফিরে আসার পর যে পরীরা আবার এখানে আসবে তা আমি আশা করি না। তোমাদের কি ধারণা?’
যে বিকালে বাচ্চারা ওদের ফুটোওয়ালা পানির ক্যান নিয়ে গেলো পাশের বাড়ীর কেয়ারিতে পানি দিতে। মি. রিড জানালা দিয়ে ওদের দেখছেন। ডেভিড আর রুথ কেয়ারিতে কিছু জিনিসপত্র পড়ে থাকতে দেখলো- তোমাদের কি জানতে ইচ্ছে করছে এগুলো কি ছিলো?
এখানে ছিলো চমৎকার একটি নতুন একচাকার হাতগাড়ি, এরমধ্যে দুটো শক্ত মজবুত কোদাল আর একটি সম্পূর্ণ লাল পানির ক্যান। গাড়ীতে একটি চিঠি ছিলো। তাতে লেখা আছে : ‘বর্তমানে যে দয়ালু হৃদয়বান ভালো পরীরা আমাকে বাস্তবে খুশী করেছে।’
ওরা এখন কি করবে তা বুঝতে পারছে না। সত্যিই কি মি. রিড ভাবছেন এটা পরীদের ঘামঝরানো কাজ ছিল? অহ্, বাগানের এই জিনিসগুলো কি ঝলমলে সুন্দর দেখাচ্ছে- যথার্থ ওদের যা প্রয়োজন তা নষ্ট হয়ে গেছে।
ওরা দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে এগুলোর দিকে।
‘তোমাদের নতুন জিনিসগুলোর সম্পর্কে কি চিন্তা করছো,’ জানালা থেকে উঁচু গলায় বললেন মি. রিড।
‘অহ্, এসবই কি আমাদের?’ অসামান্য খুশীতে চিৎকার কোরে উঠলো বাচ্চারা। ‘চিঠিতে লেখা আছে এগুলো ভালো পরীদের।’
‘আচ্ছা, তোমরা কি ভালো পরীদের মতো কাজ কোরো নি?’ হাসিমুখে বললেন বুড়ো মি. রিড। ‘তোমরা আমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ সারপ্রাইজ দিয়েছো। আমি এখন তোমাদের দিলাম। একজন বয়স্ক খিটখিটে মেজাজের বুড়োলোকের প্রতি সত্যি তোমরা খুব সদয় আচরণ করেছো। বিশেষ কোরে এই অপ্রত্যাশিত সুখ পাবার পর থেকে আমি এখন খুবই সুস্থ এবং আমার মেজাজ-মর্জিও ভালো যাচ্ছে। তাই আমি আশাকরি তোমরা মাঝেমধ্যে আমার এখানে এসে চা খেয়ে যাবে আর আমার নতুন কেনা কুকুর ছানার সঙ্গে খেলা করবে। এখন আমার বাগানে পানি ঢালার কাজ শেষ হলে জিনিসগুলো নিজেদের বাসায় নিয়ে গিয়ে তোমাদের মাকে দেখাবে।’
‘অশেষ ধন্যবাদ,’ বলল বাচ্চারা। ওরা এতই আনন্দিত যে ভালোমত পানির ক্যান ধরে রাখতে অসুবিধা হচ্ছে। ওদের মা প্রকৃত ঘটনা শোনার পর বলল?
মা অত্যন্ত খুশী হয়েছিলেন।
‘তোমাদের সারপ্রাইজের উপযুক্ত পুরস্কার তোমরা পেয়েছো,’ বললেন তিনি। ‘তোমরা যাকে ভালোমতো পছন্দ করতে না, অথচ তাঁর প্রতি তোমরা ভালো আচরণ করেছো। এখন নিশ্চয়ই তোমাদের বন্ধুত্ব হওয়ায় একসঙ্গে তোমরা ভালো সময় উপভোগ করছো।’
তোমরা নিশ্চয়ই দেখছো যে ডেভিড আর রুথ ওদের নতুন জিনিসপত্র দিয়ে বাগানে কাজ করছে। ওরা পরিপূর্ণ সুখি যে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না- এসবই ঘটেছে রুথের এক খিটখিটে বয়স্ক বুড়োলোকের প্রতি মমত্ববোধ আর একটি ভালো বুদ্ধির জন্যে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০১০ ভোর ৫:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


