somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরার আগে বিচার দেখে যেতে চাই: সাগরের মা

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সকাল ১১:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চোখের সামনে যেন হাসিমুখে বসে আছে ছেলে-ছেলের বউ। আর দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয় নাতী। ছেলে যেন এখনই বলবে, ‘কি মা- কিছু বলবে? তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসবো? ঘুম আসছে না? কাঁদছো কেন মা? আমিতো তোমার সামনেই আছি।

কিন্তু মা-তো জানে তার বুকের ধন আর ফিরে আসবে না। ঘাতকের নৃশংসতায় সে চলে গেছে না ফেরার দেশে। তবু ছেলের ছবি দেখেই যেন তার ফিরে আসার ক্ষণ গোনা।

এভাবেই দিন কাটছে সাংবাদিক সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনিরের।

বাসার সামনের কক্ষেই শুয়ে আছেন তিনি। নড়াচড়ার শক্তি যেন আর অবশিষ্ট নেই। ঘরে ঢুকতেই বাঁ দিকে কাত হয়ে চোখ দুটো খুলে বললেন, ‘এসো বাবা, তোমাদের দেখলে মনে হয় আমার সাগরকে দেখছি। বাবা, তোমরা আমার মানিকরে এনে দাওনা কেন? সে-তো এতদিন আমার খবর না নিয়ে থাকে না।’

এখন কোন সাংবাদিক দেখলেই তাদের মধ্যে সাগরকে খুঁজে ফেরেন তিনি।

চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ছে অনবরত। কোন সান্তনাতেই এ অশ্রু বন্ধ হয় না। কিছুক্ষণ পরপরই ‘আমার সাগর, আমার সাগর’ বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

ছেলে সাগর, ছেলের বউ রুনি আর নাতী মেঘের ছবিটা তার বিশেষ অনুরোধে দেওয়ালে এখনও টানিয়ে রেখেছেন সাগরের বোনরা। বাকি সব ছবি তারা নামিয়ে ফেলেছেন, যেন মা ওইসব ছবি দেখে শোকে কাতর না হন।

দেওয়ালের সে ছবিই এখন তার সঙ্গী। ঘুমতো চোখ থেকে হারিয়েই গেছে। তবু মাঝেমধ্যে একটু চোখ বন্ধ করে পরক্ষণেই আবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন। ঘুমের ঔধষও চোখে ঘুম আনতে পারছে না।

ছেলে খুন হওয়ার পর থেকে তার খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ। কান্না করতে করতে খাদ্যনালী কিছুটা ফুলে গেছে বলে জানালেন সাগর সরওয়ারের মেজ বোন মঞ্জু আরা।

‘বাবা, আমার সাগর তো কোনদিন কারও ক্ষতি করেনি। সে-তো সন্ত্রাসী না। একজন সন্ত্রসীকেও এভাবে মারে না। ওরা আমার সাগরকে যেভাবে মেরেছে। তাদেরও তো মা আছে। এক মায়ের ছেলেকে মারার সময় তারা কি তাদের মায়ের কথা মনে করেনি?’

এক এক করে কথাগুলো বলেছেন আর ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তার কান্নায় ঘরের সবার চোখ ছলছল করছে।

ছেলে জার্মানি যাবে। মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে গেলেন। দূর দেশে মা ফোন করলে বলতো, ‘মা আমি একটু ব্যস্ত আছি। কিছু বলবা মা?’ মার সাথে কথা বলতে না পারায় ছেলের কত বিনয়।’

‘বাবা, আমি কি বিচার পাব? মরার আগে এ বিচার দেখে যেতে চাই।’

সরকার এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার করবে বলে এখনো বিশ্বাস রাখেন সালেহা মনির। তবে তদন্ত দলের কিছু কর্মকাণ্ডে এ নিয়ে কিছুটা সংশয়ও জেগেছে তার।

বললেন, ‘শুনেছি তদন্ত কর্মকর্তারা ওই ফ্ল্যাটের গ্রিল কাটা অংশ দিয়ে একটি শিশুকে প্রবেশ করিয়ে এটি ডাকাতি কিনা তা পরীক্ষা করছে। কিন্তু এটি মনে হয় তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি চেষ্টা।’

ছেলে যত দূরেই থাকুক প্রতিদিন মা’র খবর না নিলে মনে ঘুমই হতো না। সময় পেলেই ছুটে আসতো মা’র কাছে।

মায়ের শিয়রে বসে মাথায় হাত রেখে সুবোধ বালকের মতো মা-ছেলের কত কথা। এসব স্মৃতিই এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে।

সাংবাদিক সাগরের বোন মঞ্জু আরা বললেন, ‘মা-বাবার বিবাহবার্ষিকী ১৭ জুন। আর সাগরের ছেলের জন্মদিন ১৬ জুন। দুটি দিবসই একসাথে পালন করতো সাগর। প্রায়ই বলতো মেঘের জন্মদিন একদিন পরে হলে কত ভালো হতো।’

ছেলে ছাড়া এখন বাকি সব প্রসঙ্গই অর্থহীন তার কাছে। টেলিভিশনে ঘুরেফিরে ছেলে আর ছেলের বউকে নিয়ে করা সংবাদগুলো দেখেন। পত্রিকায় ছেলের ছবি দেখলেই তাতে হাত বুলান। মায়ের নিঃস্বার্থ মমতার পরশ বুলিয়ে দেন ছেলের গালে।

চোখের জলে সেই ছবি ভিজে গেলে যত্ন করে বুকে জড়িয়ে ধরে আবার শুকিয়ে নেন।

চার বোনের অতি আদরের, শ্রদ্ধার একমাত্র ভাইয়ের খুনিরা প্রভাবশালী তকমায় যেন বেঁচে না যায় সরকারের কাছে সে দাবিই জানালেন সাংবাদিক সাগরের বোনরা।

২০০৪ সালে বাবা মারা গেছে। এরপর থেকেই সব সময় মার কাছে কাছে থাকতেন সাগর। বিয়ের এক বছরের মাথায় পেশার ব্যস্ততায় আলাদা বাসা নিলেও মা’র খবর নিতে এতটুকু ভুল হতো না তার।

বোনদেরও সংসার-চাকরির ব্যস্ততা। মাকে কে দেখবে? এজন্য মেজবোন মঞ্জু আরাকে বলতো ‘তুই আমার বোন না, তুই আমার ভাই। মাকে দেখেশুনে রাখিস। মা যেন কোন কষ্ট না পায়। অথচ সেই ভাইর শোকে আজ এক সপ্তাহ মা‘র খাওয়া-দাওয়া, ঘুম কিছুই নেই।’

কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে এলো মঞ্জু আরার। নিজের কর্মস্থল টঙ্গী। তবু ভাইর অনুরোধে মাকে দেখাশুনার জন্য মা’র বাসায়ই থেকে গেলেন তিনি।

একমাত্র ছেলের মৃত্যু কখনোই ভোলার নয়। তবু জঘণ্যতম এ খুনের বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদবে না এমন আশায় বুক বেঁধে আছেন সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×