চোখের সামনে যেন হাসিমুখে বসে আছে ছেলে-ছেলের বউ। আর দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয় নাতী। ছেলে যেন এখনই বলবে, ‘কি মা- কিছু বলবে? তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসবো? ঘুম আসছে না? কাঁদছো কেন মা? আমিতো তোমার সামনেই আছি।
কিন্তু মা-তো জানে তার বুকের ধন আর ফিরে আসবে না। ঘাতকের নৃশংসতায় সে চলে গেছে না ফেরার দেশে। তবু ছেলের ছবি দেখেই যেন তার ফিরে আসার ক্ষণ গোনা।
এভাবেই দিন কাটছে সাংবাদিক সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনিরের।
বাসার সামনের কক্ষেই শুয়ে আছেন তিনি। নড়াচড়ার শক্তি যেন আর অবশিষ্ট নেই। ঘরে ঢুকতেই বাঁ দিকে কাত হয়ে চোখ দুটো খুলে বললেন, ‘এসো বাবা, তোমাদের দেখলে মনে হয় আমার সাগরকে দেখছি। বাবা, তোমরা আমার মানিকরে এনে দাওনা কেন? সে-তো এতদিন আমার খবর না নিয়ে থাকে না।’
এখন কোন সাংবাদিক দেখলেই তাদের মধ্যে সাগরকে খুঁজে ফেরেন তিনি।
চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ছে অনবরত। কোন সান্তনাতেই এ অশ্রু বন্ধ হয় না। কিছুক্ষণ পরপরই ‘আমার সাগর, আমার সাগর’ বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
ছেলে সাগর, ছেলের বউ রুনি আর নাতী মেঘের ছবিটা তার বিশেষ অনুরোধে দেওয়ালে এখনও টানিয়ে রেখেছেন সাগরের বোনরা। বাকি সব ছবি তারা নামিয়ে ফেলেছেন, যেন মা ওইসব ছবি দেখে শোকে কাতর না হন।
দেওয়ালের সে ছবিই এখন তার সঙ্গী। ঘুমতো চোখ থেকে হারিয়েই গেছে। তবু মাঝেমধ্যে একটু চোখ বন্ধ করে পরক্ষণেই আবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন। ঘুমের ঔধষও চোখে ঘুম আনতে পারছে না।
ছেলে খুন হওয়ার পর থেকে তার খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ। কান্না করতে করতে খাদ্যনালী কিছুটা ফুলে গেছে বলে জানালেন সাগর সরওয়ারের মেজ বোন মঞ্জু আরা।
‘বাবা, আমার সাগর তো কোনদিন কারও ক্ষতি করেনি। সে-তো সন্ত্রাসী না। একজন সন্ত্রসীকেও এভাবে মারে না। ওরা আমার সাগরকে যেভাবে মেরেছে। তাদেরও তো মা আছে। এক মায়ের ছেলেকে মারার সময় তারা কি তাদের মায়ের কথা মনে করেনি?’
এক এক করে কথাগুলো বলেছেন আর ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তার কান্নায় ঘরের সবার চোখ ছলছল করছে।
ছেলে জার্মানি যাবে। মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে গেলেন। দূর দেশে মা ফোন করলে বলতো, ‘মা আমি একটু ব্যস্ত আছি। কিছু বলবা মা?’ মার সাথে কথা বলতে না পারায় ছেলের কত বিনয়।’
‘বাবা, আমি কি বিচার পাব? মরার আগে এ বিচার দেখে যেতে চাই।’
সরকার এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার করবে বলে এখনো বিশ্বাস রাখেন সালেহা মনির। তবে তদন্ত দলের কিছু কর্মকাণ্ডে এ নিয়ে কিছুটা সংশয়ও জেগেছে তার।
বললেন, ‘শুনেছি তদন্ত কর্মকর্তারা ওই ফ্ল্যাটের গ্রিল কাটা অংশ দিয়ে একটি শিশুকে প্রবেশ করিয়ে এটি ডাকাতি কিনা তা পরীক্ষা করছে। কিন্তু এটি মনে হয় তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার একটি চেষ্টা।’
ছেলে যত দূরেই থাকুক প্রতিদিন মা’র খবর না নিলে মনে ঘুমই হতো না। সময় পেলেই ছুটে আসতো মা’র কাছে।
মায়ের শিয়রে বসে মাথায় হাত রেখে সুবোধ বালকের মতো মা-ছেলের কত কথা। এসব স্মৃতিই এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে।
সাংবাদিক সাগরের বোন মঞ্জু আরা বললেন, ‘মা-বাবার বিবাহবার্ষিকী ১৭ জুন। আর সাগরের ছেলের জন্মদিন ১৬ জুন। দুটি দিবসই একসাথে পালন করতো সাগর। প্রায়ই বলতো মেঘের জন্মদিন একদিন পরে হলে কত ভালো হতো।’
ছেলে ছাড়া এখন বাকি সব প্রসঙ্গই অর্থহীন তার কাছে। টেলিভিশনে ঘুরেফিরে ছেলে আর ছেলের বউকে নিয়ে করা সংবাদগুলো দেখেন। পত্রিকায় ছেলের ছবি দেখলেই তাতে হাত বুলান। মায়ের নিঃস্বার্থ মমতার পরশ বুলিয়ে দেন ছেলের গালে।
চোখের জলে সেই ছবি ভিজে গেলে যত্ন করে বুকে জড়িয়ে ধরে আবার শুকিয়ে নেন।
চার বোনের অতি আদরের, শ্রদ্ধার একমাত্র ভাইয়ের খুনিরা প্রভাবশালী তকমায় যেন বেঁচে না যায় সরকারের কাছে সে দাবিই জানালেন সাংবাদিক সাগরের বোনরা।
২০০৪ সালে বাবা মারা গেছে। এরপর থেকেই সব সময় মার কাছে কাছে থাকতেন সাগর। বিয়ের এক বছরের মাথায় পেশার ব্যস্ততায় আলাদা বাসা নিলেও মা’র খবর নিতে এতটুকু ভুল হতো না তার।
বোনদেরও সংসার-চাকরির ব্যস্ততা। মাকে কে দেখবে? এজন্য মেজবোন মঞ্জু আরাকে বলতো ‘তুই আমার বোন না, তুই আমার ভাই। মাকে দেখেশুনে রাখিস। মা যেন কোন কষ্ট না পায়। অথচ সেই ভাইর শোকে আজ এক সপ্তাহ মা‘র খাওয়া-দাওয়া, ঘুম কিছুই নেই।’
কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে এলো মঞ্জু আরার। নিজের কর্মস্থল টঙ্গী। তবু ভাইর অনুরোধে মাকে দেখাশুনার জন্য মা’র বাসায়ই থেকে গেলেন তিনি।
একমাত্র ছেলের মৃত্যু কখনোই ভোলার নয়। তবু জঘণ্যতম এ খুনের বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদবে না এমন আশায় বুক বেঁধে আছেন সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


