somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুনিয়া এবং একটি প্রেমের গল্প

১০ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ১২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০১২ সাল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ২য় বর্ষ। মুহসিন হলের সামনে বসে আছি।পাশে আধ-খাওয়া চায়ের কাপ। দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেলো। এই এক বছরে কোনোকিছুই যেন আমার অনুকুলে ছিলনা। এখানকার পরিবেশের সাথে মোটেও মানিয়ে নিতে পারছিনা।বিশ্ববিদ্যালয়, হল জীবন সম্পর্কে যে ধারনা আমার ছিল, বাস্তবে তার সাথে একেবারেই মিল নেই। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে একটি চটপটে নারী কন্ঠ ভেসে আসল।
-কে সৈকত ভাই?
-কে?
-আমি মুনিয়া। চিনতে পারনি?
হ্যা এক মুনিয়াকে আমি চিনি। আমাদের দু:সম্পরকের এক আত্মিয়র মেয়ে। তার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ নাই।
তারপর কুশল বিনিময়। তার পর আরও অনেক কথা। জানলাম সে রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে ভর্তি হয়েছে। সেইদিন টিউশনি থাকায় বেশি কথা হয়নি। এরপর মাঝে মাঝেই ফোনে কথা হত। ক্লাসের পড়া নিয়ে কথা, মাঝে মাঝে এটা ওটা দেখিয়ে দেয়া এর মধ্যেই কথা সীমাবদ্ধ থাকত।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষ আমার খুব খারাপ যায়। পড়াগুলো খুব কঠিন লাগতো।শত চেষ্টা করেও ভাল করতে পারছিলাম না। আমার বন্ধুবান্ধব তেমন ছিলনা। সারাদিন শুধু একা একা হাটতাম। একটা টিউশনি করাতাম। আর নিজের পড়া পড়তাম।
আমার এই একাকিত্ত আর সাদামাটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হঠাত মুনিয়া প্রবেশ করল। তার সঙ্গ আমার খুব ভাল লাগা শুরু করল। সে প্রতিনিয়ত আমার খোজ নিত।
বেশ কিছুদিন কথার পর একদিন সে বলল-
- সৈকত ভাই একটা কথা বলব। তোমার সাদামাটা জীবনের সঙ্গী হিসেবে কি আমাকে নেয়া যায়? সেই ক্লাস এইট থেকে তোমাকে দেখে আসছি। কখনো বলার সাহস পাইনি। আর তুমি তো সারাক্ষণ নাকের উপরে চশমা লাগিয়ে বইএর মধ্যে ডুবে থাকতে। ক্যামন আছ জিজ্ঞেস করলে ভ্রু কুচকে জবাব দিতে।

আমি কথাটা শুনলাম লক্ষ করলাম ওর কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। গলাটাও বোধহয় কাপছিল। সেদিন আর কথা হল না। আমি ভাবতে লাগলাম। ফেসবুকের ছবিগুলো বারবার দেখলাম। কি অদ্ভুত মিস্টি দেখতে হয়েছে মেয়েটি। ওর ফ্যামিলির কথা ভাবতে লাগলাম। ওরা আর্থিকভাবে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সচ্ছল। একটা যায়গায় খুব আতংকিত হলাম। অতীতের কোন এক ভুল বোঝাবুঝির কারনে ওদের ফ্যামিলি আর আমাদের ফ্যামিলির মধ্যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক।
বড় আপা শুনলে আমাকে গুলি করে মারবে হয়ত।
তার পরদিন সারাদিন শুধু মুনিয়ার কথা ভাবলাম। একটা ক্লাস করে আর করলাম না। মনোযোগ নাই ক্লাস করে কি হবে? এ রকম কিছু একটা হবে আগে কেন ভাবলাম
না এই ভেবে রাগ হতে লাগল। বিকালের দিকে ভাবাভাবিটা উত্তেজনায় রুপ নিল।আমার গা হাত পা কাপাকাপি শুরু হয়ে গেল।
অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। পরদিন আমরা সাভাবিক ভাবেই কথা বলতে থাকলাম।
এর পর কিছুদিনের মধ্যেই ঈদের বন্ধ শুরু হয়ে গেলে আমরা দুজনই বাড়িতে গেলাম। বাড়িতে এসে সারাদিন এস এম এস এ কথা বলছি। আমরা দেখা করব। কিভাবে দেখা হবে তারই প্লান বানাচ্ছি। অবশেষে ঠিক হল দূরে একটি পার্কে দেখা করব। একদিন সকালে রওনা দিলাম। গিয়ে দেখি ও অনেক আগেই পৌছে গেছে।দেখে একবারে চমকে গেলাম। সেদিনের সেই পুচকে মেয়েটা এতো বড় হয়ে গেছে। ও আমার বয়সে দুই বছরের ছোট। চোখে ভারি গ্লাসের চশমা লেগেছে। আকাশি রঙের জামাটাতে কি সুন্দর লাগছে তাকে। আমি রিতিমত মুগ্ধ হয়ে গেলাম তাকে দেখে।কি মিস্টি হয়েছে মেয়েটা দেখতে! এরপর অনেক কথা, অনেক গল্প। সেদিন বিকেল পর্যন্ত একসাথে ছিলাম আমরা। যাবার সময় ওর চঞ্চল মুখটা একই বারে শুখনো হয়ে গেল। আমারটাও বোধ হয় খুব একটা ভাল ছিলনা। যাবার আগে দুহাতে তার ছোট্ট মুখটা ধরে বললাম আমি খুবই সাধারন আর ক্ষমতাহীন একটা ছেলে। তা সত্বেও আমি তোমাকে কোনদিন একটুখানি কষ্টও পেতে দেবনা। কি আস্পর্ধা নিয়ে সেই কথাটি বলেছিলাম জানিনা।

এরপর প্রতি মাসে টিউশনির টাকাটা পাওয়া মাত্রই রাজশাহী দৌড়াতাম। সে আসতে বলতনা। আসলে আমিই থাকতে পারতাম না। রাতের বাস এ রওনা দিয়ে পরদিন আবার রাতের বাসে ঢাকা ফিরতাম।সারাদিন গল্প করতাম।ওর কথা বলার ক্ষমতা অসাধারণ। আমি এম্নিতেই স্বল্পভাষি‚ তাই ওই সবসময় কথা বলত আমি চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ওর কথা শুনতাম। তন্ময় হয়ে শুনতাম। ওর চটপটে কথা গুলো আমার কানে রিন রিন করে বাজত। ও হাত আর মাথা নেড়ে নেড়ে কথা বলত। আর ওর বব চুল গুলো অদ্ভুতভাবে দোল খেত। আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতাম। কি অপরুপ!!! মন আপনা থেকেই বলে উঠত জীবন সুন্দর, জীবন অদ্ভুত সুন্দর।সন্ধে বেলা যখন যাবার সময় হত সে আর কোনো কথা বলত না আমার দিকে তাকাতও না। মাঝে মাঝে সে আমাকে নূডুলস্ বানিয়ে দিতো পথে খাওয়ার জন্য। মাঝপথে যখন বক্স খুলতাম দেখতাম সাদা শরীরের একটা ডিম শুয়ে আছে। আমি একটু রোগা ছিলাম কি না তার হয়ত চিন্তা হত। এভাবে এই অসাধারন মেয়েটা আমার জীবনটা ভরিয়ে দিল। আমি তাকে তেমন কিছু দিতাম না। সে আসলে দিতে দিতনা। তবে তার জন্য প্রায়ই বই নিয়ে যেতাম। খুব পড়ুয়া মেয়ে সে।সে সাজগোজ খুব একটা করত না তার পরেও একবার চারুকলার সামনে থেকে বিভিন্ন রঙের অনেকগুলো কাঁচের চুড়ি নিয়ে গিয়াছিলাম।সেই চুড়ি দেখে ও যে এত খুশি হয়েছিল এত খুশি হয়েছিল, সেটা লিখে বোঝান যাবে না। সেই খুশির যে সৌন্দর্য্য আমি দেখেছি, সেই সৌন্দর্য্য দেখার ভাগ্য হয়ত খুব কম মানুষেরই হয়।
আমার বন্ধু বান্ধব খুব একটা নেই, সে-ই আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু হয়ে গেল।
আমরা যে কত খুনসুটি করতাম। পড়াশোনা,.সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক সব কিছুই তার সাথে হত। একদিন একটা সিগারেটও টেনে দেখলাম, দুজনেই খুক খুক করে কাশলাম। একদিন খবর পেলাম সে তার ব্যাচ এ প্রথম হয়েছে। অথচ আমি সারা জীবন মাঝামাঝি রেজাল্ট করে গেলাম। আমার সেদিন খুব খুশি লাগল। মমতাময়ী প্রকৃতি যেন তার
আশির্বাদের দ্বার খুলে দিয়েছে। আমি কি খুব বেশি পুন্য করেছিলাম?

এখন ২০১৫ সাল। মাস্টার্সের শেষের দিকে। একটা চাকুরী খুব তারাতারি দরকার। ওদিকে মুনিয়ার বাড়িতে প্রচুর প্রস্তাব আসছে। অমন মিষ্টি মেয়েকে সবাই পেতে চায়। মুনিয়া খুবই বুদ্ধিমতী। খুব দক্ষতার সাথে এগুলো ডিল করে যাচ্ছে। আব্বা অবসরে গেছেন কয়েকমাস হল। আর সেই বিখ্যাত পারিবারিক টানাপোড়েন তো আছেই। সব মিলিয়ে জীবনের এই পর্যায়ে এসে কঠিন বাস্তবতাগুলো মাথাচাড়া দিচ্ছে। বাস্তবতাকে পরাজিত করা কি খুব কঠিন?? বাস্তবতা তো মানুসষেরই সৃষ্টি...



সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ১২:৪৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাবধানের মার্ নেই

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৩১


নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরার পথে নিউ আর্ক্ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন এরোপ্লেনে উঠে নির্দিষ্ট সীটের কাছে পৌঁছলাম দেখলাম এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক জানালার পাশের সিটটাতে অলরেডি বসে আছেন। আইল ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×