somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেদিন বাতাসে বৃষ্টি ছিল

৩০ শে মার্চ, ২০১৭ দুপুর ১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তিনদিন ধরে অনবরত বৃষ্টি পড়ছে । আমার কিন্তু বৃষ্টি বেশ ভালই লাগে , বৃষ্টির সময় নিজের ভিতর গুটিয়ে থাকা যায় ।
অফিস থেকে বের হয়ে , একদৌড়ে গেলাম টং দোকানটায় , সিগারেট ধরিয়ে , চায়ের জন্য বললাম । চিনি ছাড়া দুধ চা । চা খেতে খেতে, আশে-পাশের বিভিন্ন মানুষের কথা শুনি , বেশ সময় কেটে যায় । এটা আমার প্রতিদিনের রুটিন । বাসায় গিয়ে কিছু করার থাকে না , টিভিও দেখতে ভালো লাগে না । তাই প্রায় প্রতিদিনই অফিস থেকে দেরিতে বের হই , টং দকানে চা খাই , আমার দিন কেটে যায় ।
আজ বৃষ্টির জন্য বোধহয় রিকশা অনেক কম , তারমধ্যে অনেক লোক দাড়িয়ে , আমারও কোন তাড়া নেই । বৃষ্টি কমে আসলে , ধীরেসুস্থে রওয়ানা দেবো ।
আমি একা থাকি , ছোট একটা দু-রুমের ফ্ল্যাট আমার । নিজের মত করে থাকি , নিজেই সব কাজ করি, যেন আমার সময় কেটে যায় । রান্না করি সময় নিয়ে , কোন দিন মজা হয় , কোন দিন হয় না । অভিযোগ জানাবার তো কেউ নেই ।
বাবা-মা নেই অনেকদিন হল । তাদের মারা যাবার পর আমার পৃথিবীটা একদমই ফাকা হয়ে যায় । আমার নিরানন্দ পৃথিবীতে হঠাৎ করেই , মিরার আগমন হয় । মিরাকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনছিলাম , তারপর সেখানেও ছন্দপতন । মিরা চলে যায় , আবার আমি গুটিয়ে যাই ।
বাসায় এসে আমার প্রায় দিনের ডিনার মেন্যু , খিচুড়ি চড়িয়ে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম । তখনই একটা ফোন আসলো ,
- প্রবাল ভাই বলছেন ?
- বলছি ।
- ভাই , আপনার একটা হোম ডেলিভারি ছিল , একটু নিচে নেমে নিয়ে যাবেন ?
- কিন্তু আমি তো কোন কিছু অর্ডার করিনি ।
- কিন্তু ভাই , প্যাকেটে তো আপনার নাম , ফোন নাম্বার আর ঠিকানা ,সব মিলে গেছে ।
- আচ্ছা ঠিক আছে , কত টাকার ডেলিভারি ?
- সবকিছু পে করা আছে , আপনি শুধু নিয়ে যান ।
এবার আমি কিন্তু বেশ অবাক হলাম । আমার নামে কে প্যাকেট পাঠালো । নিচে নেমে দেখি , অল্প বয়সী একটা ছেলে দাড়িয়ে আছে , হাতে মোটামুটি একটা বড় প্যাকেট ।
- আপনি কি প্রবাল ভাই ?
- হ্যাঁ ।
- এখানে একটা সাইন করেন ।
আমি ডেলিভারি চালানে সই করে প্যাকেটটা নিলাম । ওজন অন্তত , দু-কেজি হবে । প্যাকেটের ওপর লেখা “শুধু তোমার জন্য ” ।
প্যাকেটটা টেবিলের উপর রেখে , লেখাটা মনোযোগ দিয়ে দেখলাম । অপরিচিত লেখা । আমাকে কে গিফট পাঠাতে পারে ? এমন করে মাঝে মাঝে আমাকে একজনই চমকে দিত , মিরা ।
...........................
তখন , সবে মাত্র চাকরিতে ঢুকেছি , কাজ বোঝার চেষ্টা করছি । হঠাৎ একদিন বিকালে ফোন আসলো , আমার রুমমেটের , “দোস্ত , তাড়াতাড়ি বাসায় আয় , ঝামেলা হয়েছে ” । সাথে সাথেই ছুটলাম বাসায় । গিয়ে দেখি রুমমেট আমার বসে আছে , হাতের ইশারায় একটা প্যাকেট দেখিয়ে বলল যে , একটা মেয়ে এসে নাকি এই প্যাকেট দিয়ে গেছে আর বলে গেছে যে , খুব জরুরি , জীবন-মরণের সমস্যা ।
আমি প্যাকেট খুলে দেখি যে , ভিতরে সুন্দর একটা পাঞ্জাবি আর ছোট একটা চিরকুট “ চলে আসো , এখনই ,আমাদের জায়গায় , অনেকদিন তোমায় দেখিনা – মিরা ” ।
মনটা আমার সাথে সাথেই ভালো হয়ে গেল আর মিরার পাগালামিতেও মজা পেলাম । মিরা , আমার নাটুকে মিরা । বিকেলটা সেদিন দারুণ কেটেছিল , মনে আছে আমার এখনো ।
সেদিন মিরা একটা লাল শাড়ি পড়েছিল , কপালে ছিল লাল টীপ । বিকালের ওই আভাতে মিরার মুখটা এখনো আমার চোখের সামনে । পায়ে হেটে সেদিন ঘুরে বেড়িয়েছি খুব । হাতধরে কেটেছিল , সেদিনের সন্ধ্যাটা । ফুটপাতের ফুসকা , চায়ের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে । মিরাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম ,
- এমন কাহিনী করে দেখা করলে কেন ?
- কাহিনী না করলে কি আর তোমার সাথে দেখা হতো ? চাকরি পেয়েই , আমাকে ভুলে যাওয়া শুরু করেছো, দেখা করার সময়ই হয় না তোমার ।
- কি যে বল মিরা , তোমাকে ভুলে যাবো তাই কি হয় ?
- আমার সারপ্রাইজটা কেমন লাগলো তোমার ? পাঞ্জাবীটাতে তোমাকে কিন্তু বেশ মানিয়েছে ।
- এমন সারপ্রাইজ যেন বারে বারে পাই , নাইবা থাকল তাতে কোন বাহ্যিকতা ।
মুচকি হেসেছিল সেদিন মিরা ।
এখন মিরা শুধুই আমার দীর্ঘশ্বাস । সেই মিরা চলে গেছে , আমাকে একা রেখে গেছে । মিরা আমাকে ছেড়ে যাবার পরও আমি অনেকদিন পর্যন্ত আশায় ছিলাম , হয়ত ফেরত আসবে কিন্তু আসেনি । শুনেছি , বিয়ে করেছে , ভালো আছে ।
-----------------------------------
প্যাকেটটা খোলার সাহস পাচ্ছি না । ভিতরে কি আছে জানার কৌতূহল হচ্ছে কিন্তু যদি না জানি যে , এটা কে পাঠিয়েছে , কিভাবে’ইবা খুলে দেখি । মন বলছে , এটা মিরা পাঠায়নি । এতদিন পরে এটা হবার কথা না । আচ্ছা , এটা পারমিতা পাঠাইয়নি তো ?
পারমিতা , আমার কলিগ । আমার স্থির জীবনে , কিছুটা উদ্যম নিয়ে আসে । অফিসে , আমি তেমন কারো সাথেই ঘনিষ্ঠ না । অফিসের কাজে যতটুকু দরকার , সবার সাথে তার চেয়ে বেশি কথা হয় না । আলাদা , শুধু পারমিতা । মেয়েটা নিজেই আমার ডেস্কে আসে , কথা বলে । নিজের কথা বলে , অফিসের সবার ব্যাপারে বলে । আমি তার খুব ভালো শ্রোতা । ওর ভেতরের প্রানচাঞ্চল্য আমার ভালই লাগে । মিথ্যা বলবো না , হঠাৎ হঠাৎ করে মিরাকে ওর মাঝে খুজে পাই । পারমিতা আমাকে আমার কথা জিজ্ঞেস করে , কেন আমি এত চুপচাপ ? মাঝে মাঝে মনে হয় যে , ওকে আমার অনেক জমানো কথা বলি , আবার মনে হয় , থাক , কি দরকার !
এইতো সেদিন পারমিতা আমাকে বলছিল ,
- আপনাকে একদিন একটা সারপ্রাইজ দিবো । খুব চমকে যাবেন আপনি ?
- কেন বলুন তো ?
- চমকে দেবো আপনার মুড ভালো করার জন্য , আপনি সারাক্ষন কাজ করেন , আর কি যেন ভাবেন , এসব থেকে আপনাকে বের করার জন্য ।
- না তো , আমি বেশ ভালো আছি , নিজের মত আছি , এই যে , আপনার সাথে আড্ডা দিচ্ছি ।
- এতকিছু জানি না , আপনাকে চমকে দেবো একদিন ।
এই প্যাকেটটা মনে হয় , পারমিতাই পাঠিয়েছে কিন্তু এভাবে কিছু পাঠানো পারমিতা মনে হয় করবে না । ও এত কিছু ভেবে কাজ করে না । পারমিতা হল , খোলা বইয়ের মত , বোঝা যায় , ওর ভেতরে কি আছে ।
তাহলে কে পাঠাতে পারে ?
হঠাৎ করেই নাকে পোড়া গন্ধ আসলো । তাড়াতাড়ি গেলাম রান্নাঘরে । খিচুড়ি পুরে একাকার । প্যাকেটের চিন্তায় , আমার এদিকে নজরই ছিল না কিন্তু আমার খিচুড়ির জন্য একটুও আফসোস হচ্ছে না । প্যাকেটটা না পেলে তো আজ , মিরার কথা মনেই হত না , পারমিতার কফির কাপে চুমুক দেয়া চোখেই ভাসতো না ।
থাক , আজ আর কিছুই খাব না বরং প্যাকেটটা খুলে দেখি কি আছে ভেতরে । খোলার আগেই চোখে পড়লো লেখাটা “শুধু তোমার জন্য ” ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ভিতর থেকে উঠে আসে, আমাকে “তুমি” করে বলার মত কেউ যে আজ নেই ।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০১৭ দুপুর ১:৫৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি মিনি পোস্ট!

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৬

ইদানীং ব্যস্ততার কারণে সামুতে আসা হয়না। মাঝে মাঝে ঢু মারলেও লগইন করা হয়না।
আজ একটা ভাবনা মনে উদয় হওয়ায় সবার সাথে শেয়ার করতে এলাম-

জামায়াতের একজন সংসদ সদস্য সংসদে দাড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই সৈনিকটি কি রাতে ঘুমাতে পেরেছিল?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৯


সেই সৈনিকটি কি রাতে ঘুমাতে পেরেছিল?

এই বাংলাদেশের পলিমাটিতে ইতিহাস খুব ভয়ংকর।

এখানে কখনো কখনো নদী শুধু পানি বহন করে না- বহন করে রক্তের স্মৃতি।
গাছ শুধু ছায়া দেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কুরআন থেকে মাদ্রাসার ছাত্রের বিস্ময়কর বিদ্যুৎ আবিস্কার :-ls

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫২

চারিদিকে বিদ্যুতের জন্য ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার মধ্যে মাদ্রাসার এই ছাত্রটি কুরআন গবেষণা করে আমাদের জন্য ফ্রি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। বিজ্ঞান পড়েননি, পড়েছেন কুরআন-হাদিস! সেই মাদ্রাসাছাত্রই বানালেন মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে বিদ্যুতের যন্ত্র!

অবেশেষে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে----- ড্রাকুলা হাসিনা।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৭



ড্রাকুলার হাসিনা তো আর এমনি এমনি বলেনি যে, আমি ভারতকে যা দিয়েছি ভারত চিরকাল তা মনে রাখবে।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা মূলত ভারতকে একতরফা সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবিশ্বাস্য, অবিস্মরণীয়! বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে!!! :-ls B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯



অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত, অতুলনীয়,অবিস্মরণীয় যে বিশেষণই ব্যবহার করি না কেন বাংলাদেশের এই জয়ের মহত্ব বুঝাতে কোন শব্দ ভান্ডারই যেন যথেষ্ট নয়। আমি রীতিমত বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি বাংলাদেশের এমন পারফর্মেন্স দেখে!! বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×