কর্ম ক্লান্ত জীবনের কাছে ধরা পড়া আমরা নিজেদেরকে সময় দিতে পারিনা।তাই হয়তো নিজেকে এবং সময়কে একটু খানি সময় দেবার জন্যে অনেক দূর চলে এসেছি ।এবারের বই দুটো বের হবার পর প্রশ্নগুলো আরো তীব্রকর হলো-আপনি কি নিয়ে লেখেন,শুধু প্রেমের কবিতা?মেয়েদের কে নিয়ে লিখতে পারেন না,আপনারাই যদি লিখতে না পারেন তবে কে লিখবে?
আসলেও তো তাই,দেশে নারী লেখকের সংখ্যা খুব কম।আমারতো মনে হয় সব লেখকরাই নারীর চেতনা,অধিকার এই সব নিয়ে লিখেছে।আমি উল্লেখযোগ্য কোন লেখক নই,তবে আবার বেশীর ভাগ কবিতাই নারীর ভেতরের অজানা আকুতি ফুটিয়ে তুলবার চেষ্টা করেছি।কবিতা কি গল্প-প্রায় সব টাতেই নিজের দুঃসহ অতীতকে সামনে আনবার তাগিত ছিলো অনেক বেশী ,কারন ব্লগ এখন আমার কাছে আর ব্যক্তিগত ডায়রী নয়।এই একটা মাধ্যমে আমার চিন্তা চেতনা পৌঁছে যায় ধর্ম হীন গোত্র হীন কোন সমাজে যার বর্ন পরিচয় আমার জানা নেই।জানার প্রয়োজন নেই-কারন আমি মানুষের মগজে ঠাই নিতে চাই।তার উপলব্ধিতে জায়গা নিতে চাই,বিশেষ করে আধুনিক কিছু মেয়েদের যারা লড়াই করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হাঁপিয়ে উঠে,যারা অল্পেই বিক্রী হয়ে যায় পুরুষের শরীরে।
খুব বেশি দিন আগের কথা না।বৈবাহিক জীবনের আট বছর পাড় করে ফেলেছি,ঘরে আছে স্কুল পড়ুয়া ছেলে।বিয়ের প্রথম সময়টা মেজর সাহেবের অনেক ওডী ছিলো,টানা পোড়েনের সংসার ;যৌথ পরিবারে থেকেই মাস্টার্স কমপ্লিট করলাম।প্রথবার মিশন গিয়ে তিনি খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও পরেরবার বেশ ডলার –পাউন্ড কামাই করলেন।ব্যাঙ্কের সমস্ত দেনা পাওনা চুকে গেলো,সেই সাথে চুকে গেলো আমার বাইরে কাজ করার সুযোগ-জামাই ,এতো টাকা আর্ন করছে,বাড়ী্র বউ কর্পোরেট অফিসে ছেলেদের সাথে কাজ করবে তা কি মানায়?
মেনে নিলাম,ছেলেকে সময় দিতে হয়।বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এখানে ওখানে পোস্টিং।কোন জায়গাই ঠিক থিতু হচ্ছিলাম না।সাভার ক্যান্টনমেন্টে কেবল মর্নিং গ্লোরী আরম্ভ হচ্ছে।ইংরেজী মাধ্যম,খুব সহজ ছিলো না , সিনিয়ারদের মিসেসরাও সি ভি ড্রপ করেছেন।একদিন দুপুরে খাবার টেবিলে তরকারী তে লবন কম হয়েছে বলে প্রতিদিন কার মতোই গাল খাচ্ছিলাম-“তোমার মাতো কিছু শিখায় নাই,আমার মার কাছে এতো দিন থেকেও রান্নাটা শিখলা না।”মানাই উচিত,আমার এক্স শাশুড়ি খুব ভাল রান্না করেন।এই সব কথা তখন আমার কাছে একদম রুটিনের মতোন-শুনে শুনে অভ্যাস হয়ে গেছে।আমি বললাম-ডিম ভাজি করে দেই।
-তুমি থাকো,আমিই করতেসি।তোমার ডিম ভাজিতো একটুও ফুলেও না,গন্ধও বের হয় না।
আমার মাথায় তখন স্কুলে জয়েন করার চিন্তা।তার পিছনে পিছনে রান্না ঘরে গেলাম-মর্নিং গ্লোরিতে সিনিয়ার টিচার নিচ্ছে,আমি সি ভি দেবো।
সে খুবি অবাক হয়ে বললো-তুমি কি ইংলিশে কথা বলতে পারবা?তুমিতো আমাদের সিও(কমান্ডার ইন চিফ) ভাবীর বাঁ পায়ের নখের যোগ্যও না।
এই গল্প গুলো এখন অতীত।ওই স্কুলেই আমি সিনিয়ার শিক্ষক হিসেবে টানা দু’বছর কাজ করেছি।মেয়েকে বুকে নিয়াই IELTS দিয়েছি এবং ৬ পেয়েছি।অনর্গল ইংলিশে কথা বলছি,আজো বলেই চলেছি।এখন ভাবলে অবাক লাগে কি করে আমি বের হলাম ওই জমপুরী থেকে ।ব্যাপারটা এতো সহজ না।
কঙ্গো মিশন থেকে তার ছুটিতে আসবার কথা ,মাত্র দুই মাসের ছুটি।তখন কাজ করি সি এ টিতে ,মঞ্চ নাটকের পাব্লিকেশনের কাজ ।ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়।দূর দেশ থেকেই ক্রমাগত হুমকি ধামকি খাচ্ছি-কার সাথে এতো রাত অব্দি শুইয়া থাকি,হারামজাদী –মাগী ,আরো কতো অজানা শব্দরা আমার চারপাশে খেলা করে প্রতিদিন।২০০৮ সাল,প্রথম আলো ব্লগ আর সামুতেও ততোদিনে আমার লেখার সাথে পরিচিত সবাই।মাঝে মাঝে একা থাকতে থাকতে এমন অসহনীয় লাগতো যে মনে হতো সত্যি সত্যি কারো সাথে বিছানায় যাই,তারপর ইউটিউবে ডাউনলোড করে ব্যাটারে দেখাই।দুনিয়ার তাবত মানুষ দেখুক –-মেজরের বউ কি করে।কারন আমার পরিচয় তখন কেবল ওমুক মেজরের বউ,আমার যে একটা নাম আছে তা আমি নিজেই ভুলতে বসেছিলাম।কিন্তু যখন ছেলের মুখের দিকে তাকাই তখন সব কিছু ঠান্ডা হয়ে যায়। আমি ইথার জীবনটাকেই খুব উপভোগ করতে লাগলাম,কাউকে দেখা যায় না,স্পর্শ করা যায় না।কিন্তু সব বলে দেওয়া যায় অনায়াসে।দূর থেকে দূরান্তর থেকে আমার জন্যে বার্তা আসে,খুব সুন্দর সুন্দর ভার্চুয়াল ফুল আসে।একটা স্নিগ্ধ ভালোবা্সার ছোঁয়ায় সারা দিন আমি ভেসে যেতে থাকতাম।
ও যেটা বলছিলাম,সেই মিশনের ছুটির কথা।হুম ,তিনি আসবেন সকালের ফ্লাইটে ।আমিও গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম এয়ারপোর্ট,হাজার হোক স্বামী বলে কথা।একটু দায় ভাড়তো থেকেই যায়,যদিও তিনি তখন আমার আত্বার কাছ থেকে বহু দূরে।
লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি-এখনো স্পষ্ট মনে আছে,এশ এবং ব্ল্যাকস্ট্রাইপের একটা ফুল হাতা টি-শার্ট পড়া ছিলো ও সেদিন।আমার দিকেই হেঁটে আসছিল,পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মেজর শারমিন ; কালো রঙের ফতুয়া আর জিন্স পড়া।আমার এতো দিনের অভিংগ চোখ কানে কানে কি যেন বলতে চাইলো,আমি পাত্তা দিলাম না।শারমিনের সাথে পরিচয় হলো,তার স্বামী এবং ও নিজেও সি এম এইচের ডাক্তার ;দুজনকেই বাড়িতে দাওয়াত দিলাম।এও জেনে গেলাম বিয়ের ৭ বছরেও শারমিন মা হতে পারেনি।আহা ,মেয়েটার জন্যে খুব মায়া হলো।
সেই মায়া গিয়ে পড়লো স্বামীর হাতের উপর।গাড়িতে তার হাত ধরতে চাইলাম,পতী দেবতা হাত সড়িয়ে নিলেন।আমি কি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম,আজ এতো বছর পর নিজেকে আবার প্রশ্ন করি।নাহ ,পাইনি।আমাদের সুর কেটে গেছে।একবার সুর ছেড়ে গেলে তাতে লহরী তোলা যায় না।এখন যা আছে তা কেবল সংসার সংসার খেলা।
চলবে ...।
(লেখাটা অনেক দূর যাবে,কেউ শেয়ার দেবেন না প্লিজ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




