আমার সামনে এখন মাঝ বয়সী যে লোকটা বসে আছে তাকে ঠিক জলহস্তী বললে ভুল হবে।মাঝারী সাইজের একটা হাতি বলা চলে।এই হাতি গত চার দিনে আমার কান ঝালাপালা কইরা ছাড়সে,কিছুক্ষন পর পর ফোন-আপনের সাথে সাইক্ষাত করতে চাই(সিলেটি ভাষা হবে)মাঝে মাঝে দু”চার বার যে ইংরেজী বলে নাই ,তা না -বলসে।তার মধ্যেও খাঁটি সিলটি টান আছে।দোষটা আসলে এই লোকের না,আমার আগের অফিসের বসের।তার সাথে আমি টানা দু’বছর কাজ করসি।তার বড় মেয়ের নাম রোদসী,আমার নামের সাথে বিরাট মিল।এর পর থেকেই বসের মাথায় আমার চিন্তা আর আমার মেয়ের চিন্তা ঢূইক্যা গেল।উনি বড় ভাইয়ের রূপ নিলেন-বুঝলেন রোদেলা,আপনার বিয়ে করে সংসারি হয়া উচিত।
-স্যার,ন্যাড়াতো বার বার বেল তলায় যায় না।
এর পর ইসলামে বিয়ে সম্পর্কে কি কি বানী দেওয়া হয়েছে উনি আমাকে পড়ে শোনান।বলা দরকার,এই সম্পর্কে তার নিজের একটা ওয়েবসাইট আছে।কিন্তু আমার এক্স বস মোটেও হুজুর নন,আধুনিক হুজুর।হাত দেখেন,দোয়া পড়ে ফুঁ দেন।একবার অদ্রীয়ানা খুব জ্বালাচ্ছিলো,তিন রাত ঘুমালোনা।আমার সুফী বস রাত ভরে কি দোয়া পড়লেন কে জানে সেই রাত থেকে কোন শব্দ নাই,বারোটার মধ্যে অদ্রী ঘুম।আমি অবশ্য এইগুলা বিশ্বাস করিনা।তবে ঘটনা সত্য।
একদিন স্যার তার এক ব্যাংকার বন্ধুর সাথে আমাকে পরিচয় করায় দেওয়ার জন্যে অস্থির হইয়া গেলো।আমি বললাকা করে,আমার পছন্দ না।স্যার বললেন-করে দেখেন প্লিজ।আমি সিরিয়াসলি বললাম-দেখা করতে পারি এক শর্তে-আপনের বন্ধুরে কন,আমার লগে লিভ টুকেদার করতে ।তাইলে আমি রাজি।
এর পর এই দেখা দেখি পর্বটা স্যার নিজেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।কিন্তু এক বছর পর এই হাতীরে আমার কাছে কেন পাঠাইসে।এর লগেতো লীভ টুগেদার না,ডাইরেক্ট ডেট টুগেদার হইয়া যাইবো।যাই হোক,ভদ্রতা বইল্যা তো একটা জিনিষ আছে।আমি তাকে সামনের চেয়ারে বসতে বললাম,সে পড়ি মড়ি করে বসলো।
(তার বিস্তৃত নীতম্ব ওইটুকু চেয়ার নিতে পারছিলো না বলেই পড়ি পড়ি অবস্থা,চেয়ার যে ভাইংগা পড়ে নাই,তাই বেশি।)
কিছুক্ষন আগে আমি আর্টিকেল ১৯ এর সাথে মিটিং শেষ করেছি।শ্যামলী হলের এই ফুড কোটটা কাছে বলেই এখানে আসা,আরো একটি উদ্দেশ্য আছে।আমার গল্প –“নীরবে নির্জনে” চিত্র নাট্য হয়ে গেছে।বি এফ টি আই পার্মিশন দিয়েছে,ডিরেক্টর টোকন এখানেই আসছেন স্ক্রীপ্ট নিয়ে।আমি ভাবলাম-তাহলে এক সাথে দুটো মিটিং হয়ে যাক।সামনের ফিল্ম ফেস্টিভালে ছবিটি যাবে যদি আমরা কাজটি করতে পারি।
আমার হাতে আর্টিকেল ১৯ এর দেওয়া লাঞ্চ,আমি খাচ্ছি।লোকটা খালি মোবাইল টিপছে আর ঘামছে,কারন আছে-এই ফুড কোটে কোন এ সি নাই।এইসব আমাদের জন্যে কোন বিষয় না,কিন্তু যার জন্ম ইংল্যান্ডে তার জন্যে বিশাল একটা ফ্যাক্টর।আমি মজা পাচ্ছি।
-আপনি কি কফি বা ঠান্ডা জাতীয় কিছু নিবেন?
-এদের কাছে একপ্রেসো হবে?
বলেই তিনি ওয়েটার কে ডাকলেন ।বাম পাশে রাখা বড় সাইজের ব্যানা্রে ছবি দেখিয়ে জিঙ্গেস করলেন-তোমাদের কাছে ওই কফি আছে ?
ওয়েটার কি বুঝলো ,জানিনা।হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।জলহস্তী তাকে তাই আনতে বললেন।
জলহস্তীঃ তারপর আপনি কি করেন ?
-আমি তেমন কিছু করিনা,খালি লিখি।
জলহস্তীঃ ওইযে কি একটা নাম বললো যে ,পত্রিকা।।
-হুম,অনন্যা।
-ও হ্যাঁ,রুদেলা।বুঝতে পারছি।
আমার নাম উচ্চারন করেই সে ভিমড়ী খেয়ে গেলো,সাথে সাথে বললো-সরি ,আমি ভালো বাংলা কইতে পারিনা(সিলটি হবে)।
আমি মনে মনে বললাম-পারিস না,তো বলিস না,আমি ইংরেজি বুঝি।
-আর একটা নাম অবশ্যি কইসিলো।
-নুসরাত,you can ask me Nusrat .)
ব্যাটা হাফ ছেড়ে বাঁচলো।এর পর শুরু করলো নিজের গল্প।কোথায় কয়টা ইন্ডাসট্রি আছে ,দেশে কেন এসেছে।এক মাস ধরে দেশে আছে কিন্তু কোথাও ঘুরতে যেতে পারে নাই।২০ কোটি টাকার বিজনেস।
আমি মাঝ খান দিয়া ঢুইক্যা পড়লাম-আপনের ফ্যামিলী সাথে আসে নাই ?
সে মোবাইল বের করে ছবি দেখালো।ব্যাটার চৌদ্দ গুষ্ঠী থাকে লন্ডনে।মাশাল্লাহ বাচ্চা গুলাও ছোট সাইজের হাতী।তয় অনেক সুইট।দেখিয়ে বল্ল-একটা ছেলে,একটা মেয়ে ,একটাই বউ।পাত্তিওয়ালাগো সার্টিফিকেট ছাড়া আরো বউ থাকে,আমি ওই লাইনে আর গেলাম না।
লোকটার চেয়ারে বসতে অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে,কিন্তু সে উঠতেও পারছেনা।আমাকে বার বার জিঙ্গেস করছে –এটা ছাড়াও ভালো কোন রেস্টুরেন্ট আছে কিনা।আমি এমন একটা ভাব করলাম-এর চেয়ে ভালো বসার জায়গা এই ঢাকা শহরে আর একটাও নাই।আচমকাই প্রশ্ন ছুঁড়লাম-আচ্ছা ,আপনে ডায়েট করেন না ?
-করি,চিনিতো খাই না।ট্রেসে ট্রেসে ঘুম আসে না, মোটা হইয়া গেসি।
হায়রে ট্রেস,কার যে কখন ট্রেস হয় কে জানে।ডিরেক্টর ব্যাটা এখনো আসতেসেনা না,১০ মিনিটের জায়গায় ২০ মিনিট হইয়া গেলো।
ওয়েটার কফি নিয়ে এলো,কফি দেখেতো জলহস্তী একদম রেগে মেগে ফায়ার –এইটা কি একপ্রেসো?তোমারেনা আমি ছবি দেখাইলাম?
-হুম,ছবিরটাইতো বানাইসি।
-উফ,ছবির সাথে মিলাইয়া দেখোতো মিলে নাকি?
আমি দেখলাম তার শাউটে এলাকা গরম,পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে বললাম-actualy এখানে এটাকেই এক্সপ্রেসো বলে।
-আরে না ,ওদের তো শিখতে হইবো,এইটা লাটো।দুধ –চিনি দিয়া বানাইসে।
কার কাসে কিয়ের কি কয়।আমি কি লাটো ফাটো বুঝি।আমি বুঝি ভদ্রতা,রেস্টুরেন্টে শাউট করা যাবে না।আমি বললাম –থাক,এইটা আপনার খাইতে হবে না,আপনে অন্য কিছু খান।
সে প্রায় উঠতে উঠতে বললো-চলেন ,আমরা ধানমন্ডি যাই,ওখানে অনেক ভালো রেস্টুরেন্ট আছে।
-সরি ভাই,এখন আমার খুব গুরূত্ব পূর্ন একটা মিটিং আছে পরিচালকের সাথে।আপনি স্যারকে আসতে বলেন,তারপর চলে যান।আমি যাবো না।
বেচারা তার দীর্ঘ শরীর নিয়া আবার বসলো ।ছবির দিকে আঙ্গুল দিয়া দেখালো-আপনেদের কাছে কি ম্যাংগো জুস হবে?গ্রীন ম্যাঙ্গো,নো সুগার।
ওয়েটার পুনুরায় দৌড় দিলো জুস আনবার জন্যে।ঠিক সেই মুহূর্তেই পরিচালক সাহেবের প্রবেশ।তাকে ডান পাশের চেয়ার দেখিয়ে দিলাম,জলহস্তীকে দেখে সে একটু অবাকই হলেন।জলহস্তী তার প্রিয় বন্ধুকে ফোন করছে,আমরা আমাদের চলচ্চিত্রের চরিত্র নিয়ে আলাপ করছি।
এর মধ্যে ম্যা্নগো জুসের প্রবেশ।বাছাধন স্ট্রতে ঠোঁট দিয়াই আবার বিরক্ত-উফ ,এইটাতো টক।
এই বার তার শরীরের ধাক্কায় চারকোনা টেবিল মোটা মোটি আমারেই চিড়া চ্যাপ্টা কইরা ফেললো-পিছনে দেওয়াল,আমি সজোড়ে ধাক্কা দিলাম,কিন্তু পাহাড় সমান হাত টেবিলের উপর-কিছুতেই নড়াইতে পারলাম না।যতোদূর সম্ভব নিজের চেয়ার পিছনে নিলাম।মনে মনে গাইল যে কয়টা আছে দিতে লাগলাম বসরে।আমার রুচি সম্পর্কে সে ভালোই জানে ,তাও এই পিস আমার কাছে কেন পাঠাইসে।নেহাত মজা করা ,নাকি অন্য কিছু?
খুব রাগ হচ্ছে এখন।আমি বললাম-আপনি স্যারকে ফোন করে অন্য কোথাও যান,এখানকার খাবার আপনি খেতে পারবেন না।তিনি ফোন কানে দিয়েই আবার ওয়েটা্রকে ডাক দিলেন,তখনি আমি খেয়াল করলাম তার হাতের মধ্যে সাদা রঙের পাইপ –তার থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে।সব্বনাশ এই ইংল্যান্ডি খোলা রেস্টুরেন্টে বইস্যা হুক্কা টানতাসে।সে আমারে লেটো শিখায়।
আমার কিছু কইতে হইলো না,গেট থেকে গার্ড চলে এলো-আপনি কি স্মোকিং করছেন ?
জল স্তীর নির্লিপ্ত জবাব-এইটা ইলেক্ট্রিক সিগারেট ,এতে ক্ষতি নাই।
-সেটা বলতেসিনা,এখানে স্মোকিং করা নিষেধ।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারকে উদ্দেশ্য করে সে বললো-তুমি আমাকে বললানা কেন?এই কথা গার্ড এসে বলে কেন?
বয় ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো-আমিতো দেখি নাই আপনে সিগারেট খাচ্ছেন।পরিবশ যা দাঁড়াইসে তাতে এই হলে আমার সিনেমা দেখাই বন্ধ হইয়া যাইবো।বাড়ির পাশে একটা আরশি নগর তাও যদি হারাই এই মোটকার জন্যে।
আমি বললাম-বাদ দেন,আজ আমার উঠতে হবে।বাসায় গেস্ট আসবে।
বলেই টোকনদাকে উঠতে ইশারা করলাম।তখনি হাসতে হাসতে বসের প্রবেশ।আমি তার হাসির কারন ভালোই বুঝতে পারছি।আমার বাম পাশের চেয়ারে বসেই বললো-অদ্রীয়ানা কেমন আছে?
-অদ্রী বেড়াচ্ছে।
-আর অদ্রীর মা কেমন আছে(কৌতুক হাসি)
-অদ্রীর মা মহানন্দে আছে।
-কি আমার বন্ধুরে পছন্দ হইসে(চাপা স্বরে)?
-খুউব,সিরাম পিস।
-দারুন না?
জলহস্তীর ঘর্মাক্ত চেহারা দেখে স্যার বল্লো-কিরে তুই বসতে পারতে্সোশ না,অবশ্য না পারারি কথা।এতোক্ষন ধইরা যে বইসা আসশ তাই কম কি ?
সবাই হাসতে হাসতেই বাইরে এসে দাঁড়ালাম।জলহস্তী একটা ছোট্ট ছেলেকে ডাকলো-এই বাচ্চা ছেলে ,রেড শার্ট।
রেড শার্ট বুঝলো কিনা কে জানে।আওয়াজ শুনে কাছে আসলো,তার হাতে জুসটা দিয়ে বললো –যাও এক সাথে মিলে খাও।
যাক, মানুষের সব কিছু খারাপ না।ভালো মন্দ মিলিয়েইতো মানুষ।
জলহস্তী তার বিরাট সাইজের হাতীর সমান গাড়ি নিয়ে বিদায় হলো।আমি পরিচালক কে শ্যূটিং- এর স্পট দেখতে বলে সেই লোকাল ৯ এ উঠে বসলাম।পাশে উঠে এলো কম বয়সী একটা মেয়ে যার কোলে একটা,আর হাতে ধরা আর একটা ছেলে।নিজের বুকেই একটা দখল করে আছে,আর একটারে কই বসাবে।আমিই কোলে নিলাম।তার শীর্ন দেহ,হাড় ভাঙ্গা শরীর নিয়ে পুরো রাস্তা আমার কোলেই ঘুমালো।পাশে চেয়ে দেখি বাচ্চা কোলে মাও ঘুম।
এই আমরা –কেউ কেউ কোটি টাকার হিসেব মেলাতে গিয়ে রাতে ঘুম হয় না,একটার পর একটা মেডিসিনো ঘুম আনে না চোখে ।আর যারা এক মুঠো ভাতের জন্যে প্রতি দিন যুদ্ধ করে তাদের চোখে এতো ঘুম,এতো নিশ্চিত ঘুম কি করে আসে।তাদের বুঝি কিছু হারাবারো নেই,কিছু পাবারো নেই।কি বিচিত্রি...কি বিচিত্র ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




