somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প... একজন ঢাবিয়ান ও একটি মেয়ে ছারপোকা

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

...ছোটগল্প...
একজন ঢাবিয়ান ও একটি মেয়ে ছারপোকা

(লিখাঃ- সাদমান সাকিল)
আমি একজন মৃত ছারপোকা। পাঁচ মিনিট আগে আমাকে একজন ঢাবিয়ান নৃঃশংসভাবে খুন করেছে। ঠিক কয়দিন আগে আমার জন্ম হয়েছে মনে নেই। ছারপোকারা পরিসংখ্যান পড়ে না তাই- মৃত্যুকালে আমার বয়স কত হয়েছিল তা আমি সঠিক জানি না। তবে এটা মনে আছে আমার জন্ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের একটি গণরুমে। আমার জন্মের কয়েক ঘন্টা পরেই আমার খুনীর বন্ধুর হাতে আমার মা খুন হয়। তখন আমার শরীর অত্যন্ত ক্ষুদ্র ছিল- একারণে আমি স্রষ্ট্রার কৃপায় মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাই। এরপরে আমি আমার খুনির রক্ত খেয়ে খেয়ে একটু একটু করে বেড়ে উঠি। আমার খুনির পুরো নাম আমিরুল কবির। ডাকনাম শিহাব। আমি শিহাবের একটি নীল শার্টের কলারকে বাসস্থান হিসেবে বেছে নিই।

এক শীতের সকালে ঘুম ভেঙে দেখি শিহাব কোথায় যেন যাচ্ছে। আমিও তার কলারে চড়ে সাথে রওনা দিই। দশ-বারো ঘন্টা পরে আমি শিহাবের গ্রামের বাড়িতে পৌছি। ছেলেকে কাছে পেয়ে ওর মা খুশিতে আত্মহারা। আমি ওর মায়ের চোখে জল দেখে কেঁদে ফেলি। তখন আমার খুব মায়ের কথা মনে পড়ে। মা বেঁচে থাকলে হয়ত আমার জীবনটা অনেক বেশি সুখের হতো।

পরের দিন বিকেলে ছেলেটা সমুদ্র দেখতে যায়। আমিও বিস্ময়ভরে সমুদ্র দেখি। ছারপোকা হয়ে জন্ম নিয়ে সমুদ্র দেখতে পাওয়া অত্যন্ত সৌভাগ্যের। শিহাব সমুদ্রের বালিতে বসে এক একা বাদাম খায়। আমি ওর কলারে বসে সূর্যাস্ত দেখি। দিনটি আমার জীবনের সেরা দিন।

কিছুদিন পর শিহাব ঢাকায় ফিরে আসে। একদিন খেয়াল করলাম শিহাব হলের এক কোণায় বসে একা একা কাঁদছে। তার কান্না আমি ছাড়া আর কেউ কখনো দেখেনি এবং আমি ছাড়া কেউই তার কান্নার কারণ জানে না। শিহাবের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তার বাবা নেই। মা ছোট একটা চাকরী করে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নেয়। শিহাবের জন্য তার মা একটা টাকাও পাঠাতে পারে না। জীবনের যুদ্ধে এত ঘা খেয়েও শিহাব নিয়মিত পড়ালেখা করে, মাঝে মাঝে কবিতা লেখে। আমি আমার জীবনে শিহাবকে কখনো দিনে দু'বার ভাত খেতে দেখিনি। সে দুপুরে একবেলা খেয়ে দিন কাটিয়ে দেয়। এত্তো কম খাবার খেয়েও সে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রতি চারমাসে একবার করে রক্তদান করে।শিহাবের জন্য আমার খুব মায়া হয়। ওর শরীরে রক্ত খাওয়ার জন্য চুমুক বসানোর আগে আমি অনেকবার ভাবি ওর রক্ত খাওয়া ঠিক হচ্ছে কিনা।একসময় আমি সিদ্ধান্ত নিই শিহাবের শরীর থেকে অতি অল্প পরিমাণে রক্ত খাব। রক্তের স্বল্পতার কারণে আমার শরীরও একসময় শিহাবের মত শীর্ণকায় হয়ে আসে।

শিহাব খুব ভালো গান গায়। গভীর রাতে হলের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে শিহাব তখন একা একা ছাদে উঠে। আমিও তার কলারে চেপে ছাদে উঠি। শিহাব নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠে। আমি শিহাবের অনিন্দ্যসুন্দর মায়ামাখানো চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকি। মাঝে মাঝে আমিও শিহাবের দৃষ্টি লেগে থাকা নক্ষত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। কেন জানি শিহাবকে আমার খুব ভালো লাগে। ওর গায়ের গন্ধ, ওর হাসি, ওর নিদ্রিত চোখ বা শীতল নিঃশ্বাস সবকিছুই আমার মনে দাগ কেটে যায়। শিহাব যখন ভোরের আগে আগে রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ে আমি তখনো জেগে থাকি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ওর গালে উঠে একটা চুমু দিয়ে আসি। আমার খুব লজ্জা লাগে। আমি ওকে কখনো চুমু দিতে পারি নি!

একরাতে কিছু পুরুষ ছারপোকা হাঁটতে হাঁটতে শিহাবের কলারের কাছে চলে আসে। আমাকে ওরা দেখতে পায়। আমাকে দেখতে পেয়ে ওদের শরীরে কামনা জেগে উঠে। আমার শরীরে কামনার আগুন ঢেলে দেওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠে তারা। আমি কিছুতেই ওদের সুযোগ দিই না। দ্রুত পায়ে দৌড়ে শিহাবের বুকের ভেতর লুকিয়ে পড়ি। শিহাবের কোমল বুকের কালো কেশে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙলেই নিস্তব্ধ রাতের শহরে একটা মাত্র শব্দই কানে আসে। শিহাবের হৃদয়ের ধুকপুক শব্দ। আমি না ঘুমিয়ে জেগে থাকি। ওর হার্টবিটের শব্দ আমার মনের দরজায় ধ্রুপদী গান হয়ে টোকা দেয়।

কিছুদিন পর খেয়াল করলাম শিহাব পাল্টে যাচ্ছে। সব সময়ই তার মুখে খুশি খুশি ভাব। ইদানিং সে ফোনে বেশি কথা বলে। নাদিয়া নামের একটা মেয়ের সাথে ওর খুব ভালো বন্ধুত্ব। শরতের এক দুপুরে শিহাব ও নাদিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাঁটছে। হঠাত নাদিয়া তার ব্যাগ থেকে একতোড়া গোলাপফুল বের করে শিহাবের হাতে দিয়ে বলে উঠে- 'আমি তোমাকে ভালোবাসি।' শিহাব হাসিমুখে নাদিয়াকে গ্রহণ করতে দেরী করে না। এসব দেখে আমার ছোট্ট শরীরে প্রচন্ড শক্তিশালি বিদ্যুৎতরঙ্গ খেলে যায়। আমার চোখ ঘোলাটে হয়ে পড়ে। আমি ভাবতে থাকি এটাই কি আমার শিহাব? যাকে এতো ভালোবাসি সেই শিহাব? আমি অজোরে কাঁদতে থাকি। আমার কান্না শিহাব বা নাদিয়ার চোখে পড়ে না। তারা দুজন খুশি খুশি চেহারা নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

শিহাব আর নাদিয়া প্রচুর ঘোরাঘুরি করে। ঢাকা শহরের কোনো জায়গা ওরা বাকি রাখে না। প্রথম প্রথম দু'একদিন শিহাবের কলারে চেপে আমিও বের হতাম। ওদের ভালোবাসাবাসি আমার সহ্য হয় না। ওদের পাশাপাশি দেখলে আমার মনে হয় কে যেন আমার বুকে ধারালো সূচ দিয়ে অনবরত খুঁচিয়ে যাচ্ছে। এরপরে অনেক দিন আমি ওদের সাথে বের হইনি। শিহাবের কবিতার খাতার ভেতরে আমি সারাদিন গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকি। মাঝে মাঝে কাঁদি, মাঝে মাঝে পাগলের মতো হেসে উঠি। হাসলে আমার শরীর থেকে গা ঘিনঘিনে করা একটা উৎকট গন্ধ বের হয়।প্রতিদিন রাতে শিহাব যখন হলে ফিরে আমি তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। সে যখন ঘুমিয়ে পড়ে আমি আমার দুর্বল পায়ে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে তার কানের লতিতে গিয়ে বসে থাকি। চিৎকার দিয়ে বলি, 'শিহাব বাবু, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।' শিহাব আমার কথা কখনোই শুনতে পায় না।

একদিন কেন জানি আমার মনে হলো শিহাবের সাথে বাইরে বের হওয়া উচিত। নাদিয়ার সাথে ওর সম্পর্ক এখন কেমন তা জানা দরকার। আমি শিহাবের কলার আঁকড়ে ধরি। শিহাব আমাকে নিয়ে বের হয়ে পড়ে। নাদিয়ার সাথে দেখা করতে সে গার্লস হোস্টেলের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় নাদিয়া হোস্টেল থেকে বের হয়। আমি কলারের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে নাদিয়ার দিকে তাকাই। নাদিয়া কাছে এসেই শিহাবকে বলে, 'এই শিহাব, তোমার কলারে ছারপোকা। ছিঃ।' শিহাব 'তাই তো!' বলে আমাকে দুই নখের ফাঁকে নিয়ে প্রচন্ড শক্তিতে চেপে ধরে। আমার রক্তে (বা শিহাবের রক্তে!) লাল হয়ে থাকে শিহাবের আশ্চর্যসুন্দর নখদুটো..
(চলবে)

FB id : http://www.facebook.com/sadmansakil

সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১:৩১
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য সাইলেন্ট ইকো

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১০


এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ফিকশনাল ইনভেস্টিগেটিভ ক্রাইম থ্রিলার। গল্পের সমস্ত চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, স্থান, সাল ও অপরাধের মোটিভ লেখকের কল্পনানির্ভর। বাস্তব কোনো ব্যক্তি, পেশাজীবী বা অমীমাংসিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাপাসিটি চার্জের পর এবার নজর খাম্বায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৩


বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে কেবল একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের মাসে প্রিপেইড মিটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৯



কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি সংবিধানের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই বেশি হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×