
বড় এবং শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পাশে ছোট ও দূর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্র কী আচরণ করবে ? এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধিক্ষেত্রে দুইটা তত্ত্ব আছে৷৷ ছোট প্রতিবেশি রাষ্ট্র এর উপর ভিত্তি করে বৈদেশিক পলিসি সাজায়৷ এক্ষেত্রে সঠিক নীতি গ্রহণ করতে না পারলে ছোট রাষ্টের অনেক ঝুঁকি রয়েছে৷
আসুন তত্ত্ব দুটি জেনে নেই৷
একটি হলো পাইলট ফিস আচরণ। এই তত্ত্ব দিয়েছেন স্কেন্ডেনেভিয়ান সমাজবিজ্ঞানি এরলিং বিজল। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো প্রতিবেশি বড় ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে বিবাদে না গিয়ে তার অবস্থানকে স্বীকার করে নিয়ে সুকৌশলে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে সমূদ্রে পাইলট নামের ছোট একটি মাছের আচরণ অনুসরণ করা৷ এই মাছটির গায়ে জেব্রার মতো ডোরা কাটা দাগ৷ খেতেও সুস্বাদু৷ কিন্তু ধরা মুসকিল৷ মাছটি খুব চালাক প্রকৃতির। কারণ এটি হাঙরের গা ঘেঁষে চলে৷ তার গায়ের সাথে লেপ্টে থাকে৷ তবে হাঙ্গরের মুখের গ্রাসের সামনে পড়েনা৷ এতে হাঙর তাকে খেয়ে ফেলতে পারে না৷ আবার হাঙ্গর যখন শিকার করে সেই খাবারের ছোট অংশে ভাগও বসাতে পারে৷ এতে উভয় পক্ষের ফিফটি ফিফটি লাভ৷ পাইলট মাছ অন্য কোন শিকারি মাছের শিকারে পরিণত হয়না৷ হাঙ্গর দেখে অন্য শিকারি মাছ দূরে থাকে৷ আর হাঙ্গরের লাভ হচ্ছে, যখন পাইলট মাছ তাকে ঘিরে রাখে দূর থেকে অনেক বড় কোন প্রাণির মতো দেখায়৷ ফলে হাঙ্গরের চেয়ে বড় প্রাণিও তার থেকে দূরে থাকে৷
এই পাইলট ফিশ আচরণ তত্ত্বের স্বার্থক প্রয়োগকারী হচ্ছে ফিনল্যান্ড। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে থেকে তার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেছিল ফিনল্যান্ড৷ এভাবে দেশটি নিজের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা টিকিয়ে রেখেছিলো।
অন্য তত্ত্বটি হচ্ছে পয়জনাস শ্রিম্প বা বিষাক্ত চিংড়ি নীতি। এ নীতিতে বড় দেশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বড় শক্তির আগ্রাসী মনোভাব দূর্বল করে দেওয়া। তারপর স্বকীয় বৈশিষ্টে টিকে থাকা৷ চায়নিজ একটি প্রবাদ আছে, বিগ ফিশেস ইট স্মল ফিশেস৷ সত্তুরের দশকে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান একবার বলেছিলেন, “In a world where the big fish eat small fish and the small fish eat shrimps, Singapore must become a poisonous shrimp,” মানে হচ্ছে, এই বিশ্বে বড় মাছ ছোট মাছ খায়৷ ছোট মাছের খাবার হলো ছোট চিংড়ি৷ আমরা বিষাক্ত চিংড়ি হতে চাই৷ এই বিষাক্ত চিংড়ি ছোট মাছ খেলে তারা মারা পড়বে৷ ওই মাছ বড় কোন মাছ খেলে সেও মারা পড়বে৷
এক্ষেত্রে কিউবাকে বিষাক্ত চিংড়ির উদাহরণ দেয়া যায়। দেশটি ৬৪ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশি হলেও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল৷ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে সাহস পায়নি। যাই হোক কিউবা অতি সৌভাগ্যবান৷ যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ের বাইরে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে কয়েকটি দেশের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়েছে৷ ভেনিজুয়েলার নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়৷ দেশটিকে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপদের মোকাবেলা করত হয়েছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে। কিউবার ক্ষেত্রে সেরকম কিছু হয়নি৷ বরং মানবিক চিকিৎসক তৈরি করে দেশটি চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশ্বের রোল মডেল হয়েছে৷ অর্থনৈতিক দিক থেকে টেকসই অবস্থায় রয়েছে।
ইউক্রেন- রাশিয়া যুদ্ধের পর পাইলট ফিশ বিহেভিয়র পুনরায় আলোচনায় এসেছে৷ সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের পর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন থেমে গেছে৷ ফলে ছোট দেশগুলোর সমন্বিত প্রায়াস আর দেখা যায়না৷ দেখা যাচ্ছে, জাতিসংঘে রাশিয়ার পক্ষে বিপক্ষে সমর্থন দানে ছোট দেশগুলো প্রতিবেশি বড় দেশগুলোর পদক্ষেপ অনুসরণ করছে৷ এক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের গরম চোখকেও পরোয়া করছেনা৷
ইউক্রেনে রাশান হামলার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাশিয়ার বিপক্ষে ভোটদানে বিরত ছিল বাংলাদেশ। প্রতিবেশি দেশ ভারতও ভোটদানে বিরত ছিল। তবে ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার জেরে উদ্ভূত মানবিক সংকট নিরসনে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনা প্রস্তাবে ইউক্রেনের পক্ষে ভোট দেয় বাংলাদেশ। ওই একবারই বাংলাদেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করে। যদিও ভারত তখনো ভোটদানে বিরত ছিল। শ্রীলঙ্কা এক্ষেত্রে পুরাপুরি ভারতের অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশ ভারসাম্য এনে বড়দের রক্তচক্ষু এড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্র কারো সাথেই বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়নি।
এবার আপনি বলুন বাংলাদেশের কী পাইলট মাছ হওয়া দরকার না কি বিষাক্ত চিংড়ি?
সবকিছু দেখে আমার মনে হয় বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষাক্ত চিংড়ি নয়; বরং পাইলট ফিশ বিহেভিয়রই এখন অনেকটা নিরাপদ৷এটা বাংলাদেশের মতো দুর্বল ও জনবহুল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রযোজ্য। বর্তমান বিশ্বে বিষাক্ত চিংড়ি হয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০২৪ সকাল ১০:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




