১৯৩৩ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম সমারসেট মম বাগদাদের একটা গল্প লিখেছিলেন৷ গল্পের নাম দ্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইন সামারা বা সামারায় সাক্ষাৎ৷
চলুন গল্পটা শুনে আসি৷
বাগদাদে এক ব্যবসায়ী ছিলেন৷ তিনি তার চাকরকে কিছু জিনিসপত্র কেনার জন্য বাজারে পাঠালেন৷ তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই চাকর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এসে বলল, হুজুর, আমি বাজারে যাওয়ার পর এক মহিলা আমাকে ধাক্কা দেয়। ভিড়ের মধ্যে আমি তার দিকে ফিরে তাকালাম৷ দেখলাম, সে আসলে মৃত্যু৷ মৃত্যুই আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়েছে৷
চাকর বললো, এই মুহূর্তে আমাকে আপনার ঘোড়াটা ধার দিন৷ আমি এই শহর থেকে পালিয়ে গিয়ে আমার ভাগ্য এড়াতে চাই। আমি সামারায় চলে যাব৷ আর সেখানে মৃত্যু আমাকে ধরতে পারবেনা৷
ব্যবসায়ী তাকে তার ঘোড়া ধার দিলেন৷ চাকর ঘোড়ায় চড়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ধূলা উড়িয়ে যত দ্রুত ঘোড়া ছুটতে পারে তত দ্রুত সামারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল।
ব্যবসায়ী কৌতুহল নিয়ে বাজারে গেলেন এবং মৃত্যুকে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তিনি মৃত্যুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আজ সকালে তুমি আমার চাকরকে দেখে ধমক দিয়েছিলে কেন?
মৃত্যু বললো, আমি তাকে হুমকি দেইনি, চোখও রাঙ্গাইনি। ওটা ছিল আমার অবাক হওয়ার পালা। তাকে বাগদাদে দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম, কারণ আজ রাতে তার সাথে সামারায় আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। সে বাগদাদে কী করছে!
দুই.
এবার খৃস্টধর্মের একটা গল্প বলি। বাদশাহ সলোমন বা হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের সময়ও এরকম একটি ঘটনার কথা জানা যায়৷ তিনি একদিন তার এক মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। এসময় দামি পোশাক পরা সুদর্শন এক ব্যক্তি সুলাইমান আ. এর দরবারে প্রবেশ করে এবং কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে যায়।
পরে মন্ত্রী হজরত সুলাইমান আ. কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর নবি! আপনার কাছে যে লোকটি এসেছিলো, সে কে?
হজরত সুলাইমান আ. বললেন, সে ‘মালাকুল মাউত’ মৃত্যুর ফেরেশতা।
মালাকুল মাউত-এর কথা শুনে মন্ত্রীর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়৷ তার শরীর কাঁপতে থাকে৷ তিনি বলতে লাগলেন, অনুগ্রহ করে বাতাসকে হুকুম দেন, সে যেন আমাকে বহূদূরে হিন্দুস্তানে পৌঁছে দেয়। কারণ মৃত্যুর ফেরেশতার বসার জায়গায় আমার বসা অসম্ভব৷
বাতাস হজরত সুলাইমান আ. এর অনুগত ছিল৷ তিনি মন্ত্রীকে হিন্দুস্তান পৌঁছে দিতে বাতাসকে নির্দেশ দেন। বাতাস সাথে সাথে তা বাস্তবায়ন করে।
কিছুক্ষণ পরে মৃত্যুর ফেরেশতা পুনরায় সুলায়মান আ. এর কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর নবি! আপনি কী জানেন, আপনার মন্ত্রী কোথায়?
হজরত সুলাইমান আ. জানালেন, আপনার ভয়ে বাতাস তাঁকে হিন্দুস্তান পৌঁছে দিয়েছে।
মৃত্যুর ফেরেশতা বলল, কিছুক্ষণ আগে আপনার মজলিসে এসে ওই মন্ত্রীকে দেখে অবাক হয়েছিলাম। কেননা আল্লাহ আমাকে হিন্দুস্তান থেকে তার প্রাণ হরণের জন্য আদেশ দিয়েছিলেন৷ অথচ আমি এসে দেখলাম তিনি কয়েক হাজার মাইল দূরে আপনার কাছে বসে আছেন৷
মৃত্যুর ফেরেশতা জানায়, আমি নির্দিষ্ট সময়ে হিন্দুস্তান পৌঁছে আপনার মন্ত্রীকে নির্দিষ্ট জায়গায় দেখতে পেয়েছি৷ পরে তার জান কবজ করে আবার আপনার কাছে ফিরে এসেছি।
তিন.
হাদিস শরীফেও এ বিষয়ে বলা হয়েছে, হজরত আবু আযযাতা ইয়াসারি ইবনে আবদিল্লাহ আল-হুজালি রা. বর্ণনা করেছেন, নবি দ. বলেছেন, ‘আল্লাহ তার কোনো বান্দাকে নির্ধারিত স্থানে মৃত্যু চাইলে; তাকে সেখানে যেতে কোনো না কোনো প্রয়োজন সৃষ্টি করে দেন।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ)
পবিত্র কুরআনেও মৃত্যু সম্পর্কিত আয়াতগুলোর ভাষ্য একই৷ আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না। (সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৪৫) ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু তোমাদের আটক করবেই। তা সুরক্ষিত দূর্গের ভেতরে অবস্থান করলেও।’ (সুরা নিসা আয়াত ৭৮) ‘হে নবী দ. ওদের বলুন, যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালাতে চাচ্ছ, তোমাদেরকে তার মুখোমুখি হতেই হবে।’ (সূরা জুমআ, আয়াত ৮)
চার.
কিছুদিন আগে বিশ্বের অগণিত অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষকে কাঁদিয়ে আটলান্টিকের গভীর জলে হারিয়ে যায় টাইটান৷ সাথে সলিল সমাধি হয় পিতাপূত্রসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তির৷ সৃষ্টির শুরু থেকে অজানাকে জানার যে অসীম আগ্রহ তাতে বলি হয়েছেন অনেক অভিযাত্রী৷ তবুও থেমে থাকেনি বিপদযাত্রা৷ কেউ এই যাত্রায় মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন৷ হিমালয়ের চূড়ায় উঠতে গিয়ে অনেক লাশের দেখা মেলে৷ মৃত্যই তাদের হিমালয়ে ডেকে নিয়ে গেছে৷ টাইটানের যাত্রীদের ডেকে নিয়ে গেছে আটলান্টিক মহাসাগরের অনেক গভীরে৷
মৃত্যু ডেকে নিয়ে যায়; অদৃষ্টের ইশারায়। মৃত্যু অবধারিত৷ সময়মতো সে হাজির হবেই৷ এটা নিশ্চিত৷
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২৪ সকাল ১১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




