চলুন দেশকে কীভাবে দিতে হয় তা জেনে নেই৷ এবার আপনাদের সাথে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঘটনা শেয়ার করবো৷ আমি কোরিয়ান অর্থনীতি পড়েছি৷ দেশটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১৯৭০ সালের পর থেকে প্রায় আকাশে উড়ছিলো৷ ১৯৯৭ সালে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠি দেউলিয়া হয়ে গেলে বিদেশীরা দেশটির অর্থনীতির প্রতি আস্থা হারায়৷ তারা বৈদেশিক পূঁজি বের করে নিয়ে যেতে থাকে৷ আতংকের কারণে কয়েকদিনের মধ্যে বিদেশীরা ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশটির অর্থনীতি থেকে নিয়ে যায়৷ ফলে দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়৷ ভেস্তে যেতে থাকে কোরিয়ান স্বপ্ন৷
কোরিয়ান প্রফেসর সেই সময়ের কষ্টের কথা বলেছিলেন৷ ডিসেম্বরের প্রচন্ড শীতে অনেকে পাহাড়ের পদদেশে বিনা আগুনে দিন পার করছিলেন৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য সহায়তাও দিতে হয়েছিল৷ এই সংকট থেকে বাঁচার জন্য দেশটি আইএমএফ- এর দারস্থ হয়৷ বেল আউট প্যাকেজ নিয়ে এগিয়ে আসে আইএমএফ৷ দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আইএমএফ এর কাছ থেকে বিভিন্ন শর্তে ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্যাকেজ গ্রহণ করে৷ এতে আরেকটি সমস্যার সৃষ্টি হয়৷ কোরিয়ানরা সংকটের নাম দেয় আইএমএফ সংকট৷ সরকার এ সংকট মোকাবেলায় দ্রুত মাঠে নেমে যায়৷ তখনকার প্রেসিডেন্ট কিম দায়ে জং ১৯৯৮ সালের ৫ জানুয়ারি জনগণকে তাদের চিরকালের কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের ডাক দেন৷ ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় বাড়ানোর আহবান করেন৷ সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি ছিল- যার কাছে যত সোনা বা সোনার অলঙ্কার রয়েছে তা ব্যাংকে জমা দিয়ে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত রাখতে আহবান জানান৷
এই পর্যায়ে আমি আবেগতাড়িত হয়ে যাই৷ কী হতো আমাদের দেশের সরকার এমন ঘোষণা দিলে! সব সোনা ওই রাতেই মাটির নিচে চালান হয়ে যেতো৷ মুনাফাখোরদের পোয়াবারো হতো৷ ব্যয় কমানোর কথা বললে ট্রল শুরু হয়ে যায়৷ কৃচ্ছ্রতা নিয়ে হাসি তামাশা৷
অন্যদিকে, কোরিয়ার মানুষ সেটা করেনি৷ তারা দলে দলে নিজেদের সোনা গয়নাসহ দামি জিনিস সরকারের ভান্ডারে জমা দেয়৷ তাদের জমা দেয়া জিনিসের মধ্যে সোনার বার, অলংকার, নেকলেসসহ কী ছিলনা! এভাবেই আরো ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলালের সমপরিমাণ অর্থ জমা হয়ে যায়৷ ৩.৫ মিলিয়ন মানুষ এই দেশপ্রেমের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো৷ যাদের সংখ্যা পুরো জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক৷ অর্থাৎ যার কাছে সোনার গহনা ছিল কেউই তা ঘরে রেখে দেয়নি৷ বরং সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিলো৷ লি জং-বিয়ম নামের একজন বেসবল তারকা তার পাঁচ বছরের খেলোয়ারী জীবনে অর্জিত সকল স্বর্ণের মেডেলসহ জমাকৃত ৩১.৫ আউন্স সোনা সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন৷ যার মূল্য ছিল ৯ হাজার মার্কিন ডলার৷ নূতন দম্পত্তিরা দলে দলে বিয়ের আংটি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে থাকে। যাই হোক, মাত্র দুই মাসের মধ্যে, ২২৬ মেট্রিক টন সোনা যোগাড় হয়ে যায়৷ যার মূল্য ছিল ২.২ বিলিয়ন ডলার৷ সংগৃতীত সোনা গলিয়ে বার বানিয়ে দ্রুত IMF-এর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এই অসাধারণ ঘটনা, কোরিয়ান মানুষের এই অবিস্মরনীয় দেশপ্রেম পুরা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়৷ এ নিয়ে বিখ্যাত ফোর্বস পত্রিকা ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর 'হাউ গোল্ড রড টু দ্য রেসকিউ অব সাউথ কোরিয়া' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ সংকটে বিভিন্ন জাতি এমন দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নজীর রেখে আসছে৷ কোরিয়াও দেশপ্রেমের ফল পেয়েছে৷ ১৯৯৯ সালেই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে উন্নীত হয়৷ আর এখন তো কোরিয়ান স্বপ্ন বাস্তব৷ পৃথিবীর যে কোনো সূচকেই প্রথম সারিতে কোরিয়ার নাম। যে লোকগুলো অর্থনৈতিক সংকটে স্রেফ বনের দিকে পালিয়েছিলো তারা এখন পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধশালি দেশের নাগরিক৷ দেশপ্রেম আর নাগরিকদের সেক্রিফাইস দেশটিকে কোথায় নিয়ে গেছে তা নিজের চোখে দেখে এসেছি৷ এটা দেখতেই এত দেশ বাদ দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়তে গিয়েছিলাম৷ কিছু শেখার জন্য৷ ওরা আমাকে দেশপ্রেম শিখিয়ে দিয়েছে৷ এদের দেশপ্রেমের কাহিনী আমার চোখে পানি এনে দিয়েছিলো। এখনো মনে পড়লে আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই।
এবার নিজের দেশের কথা বলি। ২০২২ সালের শেষের দিকে মানুষ গুজব শুনে ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছিল৷ গুজবে মানুষ কী পরিমাণ বিশ্বাস করে তার একটা বড় উদাহরণ হয়ে গেলো এই ঘটনা৷ দেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভীতের উপরে থাকায় কোন সমস্যা হয়নি৷ কারণ দেশের প্রধান দুটি উৎসবে ব্যাংক থেকে এই ধরণের হঠাৎ অর্থ উত্তোলন শুরু করেন গ্রাহকরা৷ এসময় তারল্য সংকট হয়৷ গুজবের কারণে মানুষ এত পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে নিলেও কোন তারল্য সংকটের খবর পাওয়া যায়নি৷
সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংক তার আমানতকারীদের থেকে প্রাপ্ত আমানতের ১৮.৫০ শতাংশ অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট নগদে ও বিভিন্ন মাধ্যমে বাধ্যতামূলক জমা রাখে৷ বাকী ৮১.৫০ শতাংশ অর্থ ব্যাংক তার ব্যবসায়ে নিয়োজিত করে। গ্রাহকরা বিশেষ কারণে নগদ অর্থ উত্তোলন শুরু করলে তারল্য সংকট হয়৷ তবে জরুরি চাহিদা পূরণের জন্য এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে স্বল্প মেয়াদে, সাধারণত একদিন থেকে এক সপ্তাহ মেয়াদের জন্য, অর্থ ধার করে থাকে। এই আন্তঃব্যাংক ধারকে কলমানি বলে। এজন্য একটা সুদহারও আছে৷ চাহিদা বাড়লে কলমানি হারও বেড়ে যায়৷ এবার ৫০ হাজার কোটি টাকা নগদ গ্রহকদের দেয়ার পরেও কলমানি রেট বেড়ে গিয়ে বিরাট কোনো সংকট হয়েছে বলে সংবাদে দেখিনি৷
এত বড় বিষয় ঘটে গেলো; অথচ সাধারণ মানুষ কিছুই টের পায়নি, এটি দেশের টেকসই অর্থিক ব্যবস্থাপনার বড় প্রমাণ৷ গুজবকারীদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট৷ তারা চেয়েছিলো আর্থিক খাতে একটি গোলমাল বাধানো৷ তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে৷ এই গুজব রটনাকারী আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়৷ গুজব নিয়ে মাতামাতিকারীরা এই লেখার উদ্দেশ্য৷
এদেশের বেশিরভাগ মানুষ গুজবপ্রিয়৷ শুধু কী গুজব৷ কুৎসা রটনাতেও সিদ্ধহস্ত আর সেগুলো গোগ্রাসে গিলসে কিছু বেকুব শ্রেণির মানুষ৷ এই বেকুবগুলো আমার ইনবক্সেও এসব ভিডিও চালাচালি করে৷ এসব বেকুবগুলোরে ব্লক করতে গিয়ে ফ্রেন্ডলিস্টের চেয়ে ব্লক লিস্ট দীর্ঘতর হয়েছে৷ এরা আরো তিন বছর আগে থেকে বলে এসেছে তিনমাস পর বাংলাদেশ শেষ হয়ে যাবে। কোথায়! তারপর বছরের পর বছর চলে গেলো; বাংলাদেশ তার অবস্থানে ঠিকই রয়েছে।
যাই হোক বাংলাদেশের অর্থনীতি কচুপাতার উপর পানির মতো হালকা কোন বিষয় নয়৷ এদেশের অর্থনীতির চিরকালীন একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে৷ এদেশে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি৷ যেটাবে বলে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট৷ এই ব্যালেন্স শিটে ঘাটতি নূতন কোন বিষয় নয়৷ বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বরবর্ণ যারা জানেন তাদের কাছে বিষয়টি এমনই৷ তিনমাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বৈদেশিক মূদ্রার পেমেন্ট মেটাতে পারলেই কোন দেশের অর্থনীতি নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়৷ সেদিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিরাপদ৷ তবে হঠাৎ করেই এ বিষয়টি সামনে এনে দেশের অর্থনীতি খারাপ প্রমাণের চেষ্টা করা হচ্ছে৷ আর বেকুবগুলো তাতে গলা মেলাচ্ছে৷
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমান বিশ্বের জন্য বিস্মযের৷ বিশ্বগণমাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে প্রতিবেদন দেখলেই বুঝা যায়। করোনার ঢেউয়ে সবাই যখন কাবু দেশের প্রবৃদ্ধি থেমে নেই৷ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের মধ্যে ৩৯ তম এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ২৯তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ২য়। বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে গড়ে ৬.৩ শতাংশ হার ধরে রেখে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে৷ বর্তমানে বিশ্বের ৭ম দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে (পিপিপি) বর্তমানে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপি ৪,৬০০ মার্কিন ডলার। এই তথ্যগুলো প্রাথমিক জ্ঞান৷ এগুলো দেশের গর্ব৷ এগুলো যতবেশি প্রচার হবে পাসপোর্টের ওজন তত বাড়বে৷ দেশে বিদেশে বাঙালিদের সম্মান তত বাড়বে৷ বিদেশে থাকাকালীন দেখেছি গুটিকয়েক গুজবের হোতা হিসেবে কাজ করে৷ অথচ দেশ উন্নত হলে ভাবমুর্তি বাড়লে তার প্রথম ফলটা পাবেন প্রবাসিরা৷ এই গুজব আর অপপ্রচারের ফাঁদে পা দিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা বেশি আসছে৷ ফলে কমছে প্রবাসির আয়৷ অবস্থা এমন কিছু বললেই বলেন, সরকার আমাদের কী দেয়! দেশকে দেয়ার মানসিকতার বদলে কী দেখছি ইদানিং!
আমি দেশকে নিয়ে হতাশ নই৷ দেশের মানুষ নিয়েও না৷ যে দেশটি রক্ত আর ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে সেই দেশের মানুষের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা বোকামি৷ তবে এই ইন্টারনেটের অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে গুজব আর কুৎসা রটিয়ে যাচ্ছে গুটিকয়েক তথ্য সন্ত্রাসি৷ তাদের ফাঁদে পা দিয়েছে অগণিত মানুষ৷ নয়তো ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়৷ কোনটা সরকার বিরোধিতা আর কোনটা রাষ্ট্র বিরোধিতা সেটা বুঝা দরকার৷ বাংলাদেশের অর্থনীতি জন্মলগ্ন থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এটা নূতন কোনো বিষয় নয়। যেকোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধাপে মন্দা আসতেই পারে৷ দেশপ্রেম ছাড়া এই মন্দা কাটানো সম্ভব নয়৷ তবে আমি আসলেই জানিনা সত্যি কোনদিন অর্থনৈতিক সংকট আসলে এদেশের মানুষ কী আচরণ করবে৷
#All eyes on Rafa
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই আগস্ট, ২০২৪ বিকাল ৫:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



